বংবাড়ির ভোজবাজি – পর্ব ৩

man handing meal coupon at wedding

বঙ্গজীবনের অঙ্গই হল ভোজ। পেটুক বাঙালি যেমন খেতে ভালোবাসে, তেমনি খাওয়াতেও ভালোবাসে। জন্ম থেকে মৃত্যু ইস্তক নানান কিসিমের অনুষ্ঠানের মূল নির্যাস হল কব্জি ডুবিয়ে কিংবা পাত পেড়ে ভোজন। নানা ধরনের গণভোজনেই ইদানীং কালে বিশেষে হুড়োহুড়ির হুড়োতে বাঙালি বেশ কাবু।

দু-ধরনের ব্যবস্থা এখন চালু— বাফেট, অর্থাৎ কিনা আমাদের ভেতো বাঙালির উচ্চারণে যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ব্যুফে’, অন্যটা হল সেকালের চেয়ার-টেবিল-ভোজাসন। চট কিংবা পিড়ির গল্পটা গত শতকেই বিদায় নিয়েছে। ব্যুফে ব্যাপারটায় ওই ‘খাচ্ছি কিন্তু গিলছি না’ গোছের একটা ব্যাপার থাকে। আড়াই মনিয়া চায়না ক্লে-র বাহারি ডিশ হাতে ধিনিকেষ্টা সেজে খাওয়ার অভিনয়টা হয়; অধিকাংশ সময়ে গড়পড়তা বাঙালির খাওয়াটা তেমন জুতসই হয়ে ওঠে না। টেবিলে পাত পেড়ে খাওয়ার বিকল্প এখনো গজিয়ে ওঠেনি; আর সেখানেই যত গোলমাল।

সাধারণত বিয়ে-সাদি থেকে শুরু করে জন্মদিন, অন্নপ্রাশন— প্রায় সবকিছুর ভোজবাড়ির মেগা ভোজবাজিটা এখন অধিকাংশ সময়েই হয় রাতের দিকে। সেই ভোজবাজির প্রাইম টাইম হল গ্রীষ্মকালে ৯টা থেকে ১০.৩০টা এবং শীতকালে ৮.৩০ থেকে ৯.৩০টা। তার আগে নড়নচড়ন নেই। ভোজকর্তারা নিমন্ত্রিতদের হাতে-পায়ে ধরলেও নিমন্ত্রিতরা প্রথম ব্যাচে গাল চেটে স্ন্যাক্সের স্টলে টহল কাটতে থাকে, আর ৯টা বাজলেই সব একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বাস্, শুরু হয়ে যায় নানাকিসিমের লাইন ধরে দাঁড়ানোর ট্যাকটিক্স। সবে চাটনি পড়েছে, পাঁপড় তখনো লাইনে ঢোকেই নি— পরের ব্যাচের লোকজন দাঁড়িয়ে পড়ে চেয়ার ধরে। ভাবুন, শেষ পাতে বেশিরভাগ সময়েই থাকে আইসক্রিম। চটপট করে খাওয়াও যায় না, ফেলে যাওয়ার তো প্রশ্নই নেই, কিন্তু পাশে গায়ের উপর একজন বেঁকে দাঁড়িয়ে আছে আপনার ছেড়ে যাওয়া কুর্সির প্রত্যাশায়। তারপর চলে ক্যাচমারামারি, “দাদা, হেঁ হেঁ… কেউ নেই তো? ইয়ে, মানে আপনার হলে—”। আপনাকেও হেঁ হেঁ করে ভদ্রতা করে মনে রাখতে হবে, কে আপনাকে আগাম ইয়ে দিয়ে গেল। তারপর আছে বনগাঁ লাইনে ট্রেনে ওঠার স্টাইলে দঙ্গল-হুড়োহুড়ি করে লাইনে ঢুকে পড়া। এসব কিস্যা-কুর্সিকা ভোজবাড়ির প্রাইম টাইমে লেগেই আছে। তারপর হুড়োহুড়ি করতে গিয়ে অনেক সময় সাদের বালুচরি কিংবা বেনারসি অথবা পাঞ্জাবির কোনায় ছেড়ে যাওয়া টেবিলের উপর ডাঁই করে রাখা ভুক্তাবশেষের ঝাল-ঝোল চলকে চৌদ্দ হয়ে যাওয়ার চান্স।

ব্যাজার মুখে বসে থাকতে হয় টেবিলে ডাঁই করে রাখা এঁটো-কুটোর সামনে, কখন আসবে সাফাইয়ের জনগণ। সঙ্গে পওনা পেটে ক্ষিধের নিয়ে নাকে-মুখে গা গোলান পাঁচমেশালি খাবারের বদ-খদ মৌতাত।

মুক্তির উপায় কী? খুব সোজা— একটু পরিকল্পনা। বাস্, তাতেই কেল্লা ফতে। অনুষ্ঠানবাড়িতে সটান চলে যান। যতই “আশীর্বাদই একমাত্র কাম্য” গোছের আবেদন থাকুক না কেন, গড়পড়তা বাঙালি খালি হাতে নেমন্তন্ন-বাড়ি কেউ একটা যান না— খানিক প্রগতিশীলরাও হাতে নিদেনপক্ষে একটা ফুলের তোড়াটোড়া নিয়েই যান। যতাযোগ্য স্থানে কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে অস্থানে সেটা গছিয়ে দিয়ে স্ন্যাক্স স্টলে টহল দেবার রীতি। স্ন্যাক্স স্টলের পাশে শুধু একটা ছোট্ট কাউন্টার দেওয়া দরকার। সেখান থেকে পাত পেড়ে খাওয়ার কুপন সংগ্রহের ব্যবস্থা রাখতে হবে, তাতে থাকবে আপনার ব্যাচ নং, টেবিল নং এবং সিট নং। খাওয়ার জায়গায় শুধু একটা ডিজিট্যাল ডিসপ্লে— কত নং ব্যাচ এখন চলছে, আপনি বুঝে গেলেন আপনার সম্ভাব্য সময়। এখন অনুষ্ঠানবাড়িতে কত রকমের বিনোদনের ব্যবস্থা। টেনশনমুক্ত হয়ে তাতে যোগ দিন। ফুচকা বা কাবাব স্টলে কিংবা মকটেলে কতটা সময় ব্যয় করতে পারবেন তার আন্দাজ ও পেয়ে গেলেন। তা ছাড়া সেলফি কিংবা দুলফি তুলে টাইমপাশ তো আছেই। একটা একটা ব্যাচ শেষ হবে সিনেমা হলের স্টাইলে ১০ মিনিটের গ্যাপে। এঁটো-কাটা সাফ-সুতরোর শেষে আপনি পাবেন প্রবেশাধিকার। ক্যাটারিং স্মার্ট বয় আপনার কুপন মোতাবেক আগে থেকেই চিহ্নিত টেবিল ও চেয়ারে বসানোর ব্যবস্থা করবে— নো হুটোপুটি, নো চেয়ার খাবলানো।

ভোজকর্তা কি একটু চিন্তায় পড়লেন? হঠাৎ কেউ ভিআইপি এলে কী করবেন? নো চিন্তা। প্রতি ব্যাচের একটা-দুটো টেবিলের কুপন নিজের পাঞ্জাবির পকেটে রাখুন— হঠাৎ ভিআইপির উদয় হলে খাতিরদারি ম্যানেজ করতে। গণতান্ত্রিক দেশে আমরা সবাই সমান হলেও, আম আদমির মধ্যে দু-চারটে খাস তো থাকবেই, না হলে যে ‘আম আদমি’ কথাটাই তামাদি হয়ে যায়— ঠিক বললাম কি না?

ক্রমশ

বং বিবাহের লগ্নবাজি – পর্ব ২


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top