এখানে একটা নদী আছে, ‘মলি বেলোয়ার’। বাংলার মতো বিশালতা তার নেই, কিন্তু একটা স্নিগ্ধ সৌন্দর্য আছে। বাড়ি থেকে বেরিয়েই বাঁ দিকে একটু হেঁটে লিচু বাগান, তারপর সরু একটা পথ, শিমুল আর ইউক্যালিপটাস বন পেরিয়ে বাঁ দিকে ক্ষেতকে রেখে চলে গেছে ওই দিকে। ওই পথে ঝোপ, জঙ্গল, তারপর বিস্তীর্ণ আকাশের সীমানায় দূরের গঞ্জ, মাঝেমাঝে শিমুল গাছ। নিস্তব্ধ গাছের নীচে ছায়া পড়ে এলে মনে হয়, ওখানেই বসে থাকা যায়, কোনো কাজ না করলেও চলবে।
ওই নদীর পাড়েই শ্মশান, নিঝুম, বহুদূর পর্যন্ত জনমানবহীন। পাশের টাউন থেকে একটা রাস্তা এদিকে আসতে আসতে ডান দিকে ঘুরে হঠাৎ একটা বাঁশঝাড়ের নীচ দিয়ে সরু পায়ে-চলা পথে এদিকে হেঁটে এসেছে।
এক রাতে ওই পথে এনফিল্ড বুলেট নিয়ে ফিরছিলাম। সঙ্গে নগেন্দ্র সিং। ওই পথের সামনে এসে বলেছিল, “অকেলে, পয়দল ইস রস্তে সে আ পায়েঙ্গে। সামনে হি শমশান ঘাট হ্যায়। লোগ উধার বহোৎ কুছ দেখা হ্যায়।” আমি বলেছিলাম, “আপনি আমাকে এই পথের শুরুতে রেখে অন্য কাউকে বলুন বাইকটা নিয়ে যেতে। শ্মশান পেরিয়ে তিন মাথার মোড়ে শিমুল গাছটার নীচে আমার অপেক্ষা করবেন”
নগেন্দ্র সিং ভাবতে পারেনি আমি এই পথে ওই রাতে একা যেতে রাজি হব। অনেকবার না করেছিল, কিন্তু একবার যখন এইভাবে বলেছে, আমি যাবই। আর ওই অন্ধকার রাত্রে ওই ফাঁকা পথে ডান দিকে নদী, আর মাথার ওপর আকাশভর্তি তারা নিয়ে পথটা পেরোতে আমার ভালোই লাগবে। এসব ভয় আমাকে দেখিয়ে লাভও নেই। এসব একসময় অনেক করেছি।
ওই বাঁশবনের সামনে আমাকে নামিয়ে দিয়ে দূরের রাস্তায় বাইকের আওয়াজ মিলিয়ে গেল। আমার হাতে একটা টর্চ। বাঁশবন পেরিয়ে উন্মুক্ত আকাশের নীচে এসে পড়লাম। কয়েক হাত দূরেই নদী। হু হু করে ছুটে আসছে হাওয়া। মেঘ সরে গিয়ে চাঁদের আলো পথের ওপর এসে পড়লে দেখলাম শ্মশান সামনেই। মনে পড়ে গেল শরৎচন্দ্রের সেই ‘নিশীথিনীর বিরাট কালীমূর্তি’-র কথা। অন্ধকারের একটা নিজস্ব রূপ আছে, ঋগ্বেদের রাত্রিসূক্ত তার কথা বলতে গিয়ে সৃষ্টিশীল এক আঁধারের কথা বলেছেন।
শ্মশানের বেদীর ওপর কিছুক্ষণ বসেছিলাম। শ্মশান ভীষণ পবিত্র স্থান। এখানে এলেই নশ্বরতার অনুভব গাঢ় হয়ে ওঠে। আকাশ থেকে একটা তারা খসে পড়ল। নদীর ওপার থেকে হাওয়ায় ভেসে এল বহু দূরের দেহাতি গানের আওয়াজ। আমি নদীতে নামলাম, পা ভিজিয়ে একটু জল নিয়ে খেয়ে দেখলাম, খনিজ স্বাদে ভরপুর। তারপর শ্মশানকে পেছনে ফেলে হেঁটে চললাম ওই শিমুল গাছটার দিকে, যেখানে নগেন্দ্র সিং দাঁড়িয়ে আছে। এখানকার অশরীরীরা আমাকে দেখা দিল না। তারা ভালো থাক, শান্তিতে থাক।
দূর থেকে আমাকে দেখেই নগেন্দ্র সিং আওয়াজ দিয়ে উঠল, “হোওওও মাস্টারজি কা?” আমিও চিৎকার করে বললাম, “জি, ভূতলোগ হমকো ছোড় দিয়া।” কাছাকাছি যাওয়ার পর টর্চ মেরে মুখের দিকে দেখল। ওদের অনেক ব্যাপার আছে, রাত্রিবেলা পথে ঘাটে চেনা মানুষকে দেখলেও বাজিয়ে দেখে নেয়। চোখে চোখ রেখে চেনার চেষ্টা করে। যখন বুঝল আমিই, অন্য কেউ শ্মশান থেকে আমার রূপ ধরে হেঁটে আসেনি, তখন বলল, “আপকা সাহস হ্যায়।” আমি বললাম, “ইতনা সাহস সবকে পাস হ্যায়। অপনে অন্দর কোই ঠিক সে উসে ঢুণ্ডতা হি নহি।”
আমাদের বুলেট রাতের ওই নিস্তব্ধতা চিরে আমবাগানের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলল সামনের দিকে। জীবন, এক অপূর্ব উদ্ভাসের নাম।
ক্রমশ



