চারিদিকে সবুজের মধ্যে যখন বসে থাকি, তখন মনে হয় আমিও এই প্রকৃতির অংশ হয়ে গেছি। নির্জনতাই ভালো লাগে, সবুজ পাঞ্জাবিতে সবুজের মধ্যে আমাকে আলাদা করে বোঝাও যায় না।
দূরে নেপাল সীমান্তের আবছা পাহাড়, ছবিতে ধরা যাবে না এতটাই অস্পষ্ট। উত্তর বিহারের রুক্ষ প্রকৃতি এখন সজল মেঘের আনাগোনায় নবদূর্বাদলশ্যাম। মাঝেমাঝে উত্তরের দিক থেকে দলে দলে নীল গাইয়ের ঝাঁক ক্ষেতে নেমে আসে। জ্যোৎস্না রাতের সেই সব ক্ষেতে নেমে আসা নীল গাইয়ের ঝাঁক দেখে মনে হয় এ এক রূপকথার জগৎ। মাচার ওপর থেকে চাষীরা আওয়াজ তোলে—“হোওওও লখনওয়া, লীলগাই আইল বা রেএএএ।” নীল গাইকে এরা লীলগাই বলে।
এখানে আমার কিছু নিজস্ব বাগান আছে, নিঝুম, দিনের বেলাতেও ঝিঁঝিঁর ডাক। ওইসব বাগানে ঘুরে বেড়াই, এখন একটু সাপের উপদ্রব। মাঝে মাঝে ঠাকুর শিবজি সিং ঘোড়ায় চড়ে টহলে বের হয়। একদিন আমাকে ওই বাগানের পথে দেখে বলেছিল—“চলিয়ে মাস্টারজী, হুইস্কি পিতে হ্যাঁয়।” জিনের খাঁজ থেকে বেরিয়ে এসেছিল জ্যাক ড্যানিয়েল, সঙ্গে কড়া চুরুটের গন্ধ। আম বাগানের ছায়ায় সেই কড়া পুরুষালি ঘ্রাণ মেখে নিতে নিতে আমাদের গল্প হয়েছিল চাঁদনি রাতে ভেড়িতে যাওয়ার। তারপর “পালসা” খেলার দিন ঠিক করা যাবে। “পালসা” মানে পায়ে হেঁটে শিকার। শিবজি সিংয়ের শিকারের নেশা, তবে এখন ওয়ার্ট হগ আর সম্বর ছাড়া এই অঞ্চলে পারমিট দেয় না।
বাঙালি মাস্টারমশাই শিকারের উপযুক্ত কি না দেখার জন্যই হয়তো আমাকে নির্জন ভুট্টা ক্ষেতে নিয়ে গিয়ে শিবজি সিংয়ের ভাই ললন সিং একটা ডাবল ব্যারেল গ্রীনার তুলে দিয়েছিল। ছোটোবেলায় চালাতাম, দাদুর এই গ্রীনারই ছিল, তাই হাতে বসে গেছে। দিগন্তের দিকে ব্যারেলটা ঘুরিয়ে দুটো ট্রিগারই একসাথে টেনে দিয়েছিলাম। বারুদের তাজা গন্ধে চারিদিক ভরে গেছিল। ললন সিং বলেছিল—“বঙ্গালি লোগ বন্দুক ভি চলাতে হ্যাঁয়?” আমি মনে করিয়ে দিয়েছিলাম, বহু বছর আগে দুই বাঙালি যুবকই এই সীমান্তবর্তী এলাকা কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তোমরা এখনো স্ট্যাচু করে রেখেছ। ক্ষুদিরাম আর প্রফুল্ল চাকী। বাঙালিরা চালাতে পারে অনেক কিছুই, তবে মগজটাই চালায় বেশি।
তারপর বিস্তীর্ণ ক্ষেত পেরিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে ফেরা, যাওয়ার সময় জিপে গেছিলাম। কিন্তু জমিদারি খেয়াল, হঠাৎ ঘোড়া আনার হুকুম হয়েছিল। ঘোড়ায় চড়তে আমিও পারি, বাড়িতে ছিল, ছোটোবেলায় চড়েছি। আমি কালো আরবি ঘোড়াটা বেছে নিলাম।
এই জীবনটাই আমি চেয়েছি চিরকাল, অ্যাডভেঞ্চারাস, ম্যানলি। এই শিকার এবং অশ্বারোহণের স্বাদ কাউকে বলে বোঝানো যায় না, এইসব পুরুষালি মেজাজ।
এখানে ওই নির্জনতার বাইরে বেরোলে এভাবেই বেরোই। একদিন ইচ্ছে আছে ওই সুনীল পাহাড়টার দিকে যাব, সঙ্গে শিবজি সিংকে নেব। দুটো তাঁবু আর দুটো ঘোড়া, হুইস্কি আর রাইফেল তো শিবজি সিং নেবেই। দিগন্ত বিস্তৃত এসব জমি, এদেরই। আমি যাদের স্কুলে মাস্টারমশাই হয়ে এখন আছি।
চলবে




অর্ঘ্য রায়চৌধুরীর লেখা পড়তে সত্যিই খুব ভাল লাগে। ঝরঝরে এবং তরতরে। এগিয়ে চলুক লেখা।