ট্রেনের দুলুনিতে কখন যে ঘুম এসে গেছে মৃন্ময়ের, তা সে নিজেই জানে না। ঘুম ভাঙতেই তার মনে হল, এ কোথায় সে এসেছে, কেনই বা এসেছে। কারণ যেখানে সে পড়ে আছে, তা একটা খেতের আলপথ। তবে কি ট্রেন থেকে তাকে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে? এমন তো হওয়ার কথা নয়। সে তো ঘুমিয়েই পড়েছিল স্বপ্ন দেখবে বলে। স্বপ্নের মধ্যে সূত্রধর পাল এসে তাকে বলত, আর সে সেখানে নেমে যেত। ডাক তো সে শুনতে পেয়েছিল। কিন্তু এখানে তো ট্রেনের চিহ্নমাত্র নেই।
গ্রীষ্মকাল। সন্ধে হলেই একটা হালকা শীতল হাওয়া বয়ে যায়। প্রাণ জুড়িয়ে যায়। কিন্তু কে তাকে এমন ভাবে ট্রেন থেকে নামিয়ে খেতের মধ্যে ফেলে দিয়ে চলে গেল? সেই লোকটা কী? যে তাকে অনুসরণ করছিল, বলে, তার মনে হয়েছিল? কিন্তু তাকে তো সে চোখেও দেখেনি।
না কি, এটাও স্বপ্নের মধ্যে ঘটছে। সে নিজেকে চিমটি কেটে দেখল, ব্যথা তো করছে। অবশ্য স্বপ্নের মধ্যেও নিজেকে চিমটি কাটলে কি ব্যথা করে না? কিন্তু ঠিক কোথায় সে এসে পড়েছে? কোনখানে? ট্রেনলাইনটাই বা কোথায় গেল?
সে যেখানে শুয়েছিল, তার পাশেই তার ব্যাগটাও পড়ে আছে।
মানে, যে তাকে ট্রেন থেকে নামিয়ে এনেছে এই ট্রেনলাইনের ধারে, সে এই ব্যাগটাকেও নিয়ে এসেছে। কিন্তু তার মোবাইল ফোনটা নেই। সে ব্যাগটা খুলে তন্নতন্ন করে তার মোবাইলটা খুঁজল। কিন্তু পেল না।
সবই আছে। শুধু মোবাইলটা নেই। এমনকি তার নিয়ে আসা ছোট আয়নাটাও আছে। ছোট্ট রেডিওটাকেও সে খুঁজে পেল জামাকাপড়ের মধ্য থেকে। রেডিওটা অন করে সে কিছু শোনার চেষ্টা করল। কিন্তু ঝিরঝিরে একটা শব্দ ছাড়া সে আর কিছুই শুনতে পেল না।
এই শব্দ হল নেটওয়ার্ক না থাকার শব্দ। এখানে তার মানে আকাশবাণী নেই। বিবিধভারতীও নেই। অনুরোধের আসরও নেই। কেমন একটা দিকশূন্যপুরে সে হাজির হয়েছে। দিকশূন্যপুরের কথা সে পড়েছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসে। নীললোহিতের এই লেখাগুলি সে খুবই ভালবাসে। কিন্তু সে এখন কী করবে, এ নিয়ে তার মনে একটা কুচিন্তা উদয় হল। হয়, সে একটা স্বপ্নের মধ্যে আছে, নয় সে একটা দুঃস্বপ্নের মধ্যে আছে। কিন্তু সে কোনও বাস্তবের মধ্যে আছে কিনা, তা বোঝার উপায় পর্যন্ত নেই। সামনেই কাশফুলের মাঠ। এই কাশফুলের মাঠ দেখলেই তার পথের পাঁচালীর কথা মনে পড়ে যায়।
অনেকটা পথের পাঁচালীর মাঠের মতোই কাশবন। কিন্তু সেক্ষেত্রে তো কাছেই কোনও রেললাইন থাকার কথা। কিন্তু তা আছে কিনা, জানার জন্য তাকে উঠে একটূ খুঁজতে হবে। এখন ভোরবেলা। কিন্তু ভোরের সূর্য ক্রমশ চড়া হচ্ছে। মাথার উপরে উঠে আসছে। এটা তো কল্পনা তো হতে পারে না। স্বপ্ন হতে পারে না। রোদ এসে পড়ছে তার গায়ে। গরম হচ্ছে। আকাশে বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্ন ছোট ছোট সাদা মেঘ উড়ে যাচ্ছে। দূর আকাশে মেঘের মধ্য দিয়ে উড়ে যাচ্ছে সাদা সাদা বক। অনেক পাখিও উড়ছে। একদম উঁচুতে কিছু চিল ওড়াউড়ি করছে। কাশবনের মধ্য দিয়ে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে হেঁটে গেল মৃন্ময়। মাটিটা কেমন ভিজে ভিজে। ভিজে ভিজে মাটি থেকে একধরনের সোঁদা সোঁদা গন্ধ আসছে। কাশবনের মধ্য দিয়ে যেতে যেতেও একটা আশ্চর্য গন্ধ টের পাচ্ছিল মৃন্ময়। এই গন্ধ কি বিশুদ্ধতার গন্ধ, নাকি স্বপ্নের গন্ধ?
কাশবনের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে বুঝতে পারল মৃন্ময় এই কাশবনের মধ্য দিয়ে যাওয়ার কোনও পায়ে চলার রাস্তাও নেই। কিন্তু মানুষ বাস করে, এমন কোনও একটা জায়গায় তাকে যেতেই হবে। এমন পাণ্ডববর্জিত জায়গায় কী করে থাকা সম্ভব? দূরে গাছের মধ্যে অসংখ্য পাখির বাসা। বিশেষ করে টিয়াপাখির ঝাঁক একবার গাছগুলি থেকে আকাশের কোনও একটা দিকে উড়ে যাচ্ছে, আবার ফিরে আসছে গাছে। অথবা অন্য কোনও একটা দিক থেকে টিয়াকাপাখির ঝাঁক উড়ে আসছে এই সব গাছের দিকে। কাশবনের মধ্য দিয়ে কিছুটা এগিয়েই মৃন্ময় দেখা পেল একটি ছোট নদীর। এই ছোট নদীটাকে কি আগে কখনো সে স্বপ্নের মধ্যে দেখেছে?
মনে মনে কী একটা ইঙ্গিত যেন টের পাচ্ছিল মৃন্ময়। এমন সময় সে দেখতে পেল নদীর ওপাড় থেকে একটি মুন্ডিতমস্তক ব্যক্তি হাতে লাঠি এবং কাঁধে ঝোলা নিয়ে এগিয়ে আসছে নদীর দিকে।
কে সে?
মনের মধ্যে একটা আশার সঞ্চার হল মৃন্ময়ের। তার মানে, যেখানে এসেছে সেই জায়গা মানুষবর্জিত নয়। মানুষবর্জিত যে নয়, তা সে জানে, কারণ স্বপ্নের মধ্যেও সে মানুষবর্জিত কোনও জায়গায় চলে যায়নি। এমন কিছু লোক তাকে ডাকছিল স্বপ্নের মধ্যে, যারা ঠিক সে যেখানে থাকে, সেখানে থাকে না। স্বপ্নের মধ্যে কোনও অন্য একটা জায়গায় থাকে। এমনটি তো হতেই পারে, যে একসঙ্গে অনেকগুলো বিশ্ব রয়েছে। আর তাদের মধ্যে যোগাযোগও আছে। কিন্তু এই যোগাযোগটা তথাকথিত বাস্তবতার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না। খুঁজে পাওয়া যায় স্বপ্নের মধ্যে। আর কিছু কিছু মানুষ হয়তো একইরকম স্বপ্ন দেখে। তাদের স্বপ্নে যে সব চরিত্রগুলিকে তারা দেখতে পায়, তারাও তাদের স্বপ্নে তাদেরকেই দেখে। এভাবে একটা ভিন্ন সমাজ, ভিন্ন আত্মীয়তা, ভিন্ন বন্ধন তৈরি হয়। যাকে ঠিক জাগ্রত অবস্থায় বাস্তবতার আয়নায় দেখা সম্ভব হয় না। মানুষ কি আজও বাস্তবতা কাকে বলে, তাকে ব্যাখ্যা করতে পেরেছে? মানুষ শুধু তার চারপাশের বাস্তুবতার বর্ণনা করতে পারে মাত্র। কিন্তু তার বাইরে এই যোগাযোগগুলির মধ্যে থাকে শিল্প, দর্শন, এমনকি বোধ।
মৃন্ময় নদীর ধারে এসে দেখতে লাগল, কতক্ষণে সেই ভিক্ষুক এসে পৌঁছন তার কাছে। ভিক্ষুর নজরেও তিনি পড়েছিলেন, কিন্তু সেই ভিক্ষু তাকে দেখে কেন যে মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন, তা সে জানে না। হয়তো, এই জায়গায় কেউ আসে না। হয়তো, এই জায়গা একেবারেই মনুষ্যবর্জিত। হয়তো তিনি প্রত্যাশা করেননি, শহর থেকে এতদূরে, কেউ একটা ট্যুরিস্ট ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।
সূত্রধরের কাছ থেকে বিদায় নিতে হবে, এ কথা জানতেই শান্তভিক্ষু। কারণ, এই প্রেমের সম্পর্ক না সেই সময়ের সমাজ গ্রহণ করতে পারবে, না পারবে তাদের ভিক্ষুসমাজ। তারা তো সংসার ত্যাগ করে বোধির সন্ধানেই পথের পর পথ ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা তো সব মার থেকে বেরিয়ে গেছে। যদিও এই মার এসে তাদের বারবার আক্রমণ করে। বারবার বুঝিয়ে দেয়, সহজ নয়। কিছুতেই সহজ নয়, এভাবে বাঁচা।
মার আসবেই। বোধ আক্রান্ত হবেই।
শান্ত ভিক্ষু বহু আগেই বাংলা ছেড়ে চলে গিয়েছিল। ভিক্ষুদের একটা দল তখন গিয়েছিল নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবশ্য কিছুই বাকি নেই তখন। মুসলমানরা এদেশে আসার বহু আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে নালন্দা সহ আশিটি বিশ্ববিদ্যালয়।
সে এক হৃদয়বিদারক ইতিহাসের কাহিনি। দক্ষিণের দিকে যেতে যেতে এসবই ভাবছিলেন শান্তভিক্ষু। শান্তভিক্ষু তার জন্মগত পরিচয় নয়। তিনি ছিলেন দক্ষিণের লোক। গঙ্গার দুটো স্রোত আলাদা হয়ে যাওয়ার পরে গঙ্গা নিচে নেমে যায়। তিনি এখন গঙ্গার দিকেই চলেছেন। এখান থেকে তিনি নৌকো ধরে যাবেন গঙ্গাসাগর। গঙ্গার মোহানায় যাওয়ার বহুদিনের ইচ্ছা তাঁর। সেখানে বহু আগে থেকেই একটি আশ্রম আছে। আশ্রমটি যদিও ব্রাহ্মণ সাধুদের, কিন্তু বৌদ্ধ ভিক্ষুরা সেখানে গেলে, তাঁদেরও তাঁরা থাকতে দেয়। শান্ত ভিক্ষু সেখান থেকে আবার একটু ঘুরে গিয়ে যাবেন তাম্রলিপ্ত। তাম্রলিপ্ত থেকে ব্যবসায়ী জাহাজ ছাড়বে ব্রহ্মদেশের দিকে। শান্তভিক্ষু সেই ব্রহ্মদেশ হয়েই চলে যাবেন আরও পূর্বে।
বহু বৌদ্ধভিক্ষু এই পথে সেখানেই চলে গিয়ে স্থায়ীভাবে থেকে গেছেন। কারণ এখানে যেভাবে ব্রাহ্মণরা রাজাদের সাহায্য নিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিল, তাদের সমস্ত স্তপ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, তখন তাদের পালিয়ে বাঁচার থেকেও বড় একটি দায়িত্ব এসে বর্তেছিল। আর তা হল বৌদ্ধ জ্ঞানভাণ্ডারকে রক্ষা করা। যে জ্ঞানভাণ্ডারকেই ধ্বংস করার উদ্দেশ্য নিয়ে ব্রাহ্মণরা সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করেছে। হাঁটতে হাঁটতে নিজের ভাবনার পথে শান্তভিক্ষু যেন পৌঁছে যান রাজা লক্ষ্মণ সেনের সময়ে। সে সময়ে বাংলার রাজা লক্ষণ সেন ছিলেন বাংলার রাজধানী নদিয়ায়। কারণ নদিয়া ছিল বহিঃশত্রুর কাছ থেকে সবচেয়ে সুরক্ষিত অঞ্চল। বলা হয়ে থাকে যে নদিয়ায় আসার কিছু আগে রাজসভার কিছু দৈবজ্ঞ পন্ডিৎ তাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে এক তুর্কি সৈনিক তাকে পরাজিত করতে পারে। এতে করে লক্ষ্মণ সেনের মনে ভয় জাগে। নদিয়ার প্রবেশপথ রাজমহল ও তেলিয়াগড়ের নিরাপত্তা জোরদার করেন॥ লক্ষ্মণ সেনের ধারণা ছিল যে মগধের দিক থেকে এগিয়ে তারপর শ্বাপদশংকুল অরণ্যদিয়ে কোন সৈন্যবাহিনীর পক্ষে নদীয়া
আক্রমণ করা সম্ভব নয় কিন্তু বখতিয়ার খিলজি সেইপথেই তার সৈন্যবাহিনীকে নিয়ে আসেন। নদিয়া অভিযানকালে বখতিয়ার বিহারের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে এত দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয়েছিলেন যে তার সাথে মাত্র ১৮ জন সৈনিকই তাল মেলাতে পেরেছিলেন। বখতিয়ার সোজা রাজা লক্ষ্মণ সেনের প্রাসাদদ্বারে উপস্থিত হন এবং দ্বাররক্ষী ও প্রহরীদের হত্যা করে প্রাসাদের ভিতরে প্রবেশ করেন। এতে প্রাসাদের ভিতরে হইচই পড়ে যায় এবং লক্ষ্মণ সেন দিগ্বিদিক হারিয়ে ফেলে প্রাসাদের পেছনের দরজা দিয়ে নৌপথে বিক্রমপূরে চলে যান। সেখানে আশ্রয় নেন। একে বলে একেবারেই বিনা রক্তপাতে বাংলা বিজয়। নদিয়া জয় করে পরবর্তীকালে লক্ষণাবতীর বা গৌড়ের দিকে অগ্রসর হন এবং সেখানেই রাজধানী স্থাপন করেন। এই লক্ষণাবতীই পরবর্তীতে লখনৌতি নামে পরিচিত হয়। গৌড়জয়ের পর আরোও পূর্বদিকে বরেন্দ্র বা উত্তর বাংলায় নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন।
ইখতিয়ার উদ্দীন বখতিয়ার খিলজীর আগমনে এদেশের সাধারণ মানুষ নতুন করে চেতনা পেল। অন্ত্যজ শ্রেণীর লোকেরা বখতিয়ারের আগমনকে স্বাগত জানিয়েছিল, এমনকি কিছুসংখ্যক ব্রাহ্মণও বৃদ্ধ রাজা লক্ষণ সেনকে বিভ্রান্ত করে দেশত্যাগ করতে সহায়তা করেছিল। মানুষে মানুষে বিভাজন মুসলমান আমলে আর রইল না, পাল আমলেও এটা ছিল না। মুসলমানরা একটি নতুন বিশ্বাসকে আনলেন, এদেশের সংস্কৃতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করলেন এবং একটি বিস্ময়কর মানবিক চৈতন্যের উদ্বোধন ঘটালেন। নালন্দা শব্দটি এসেছে “নালম” এবং “দা” থেকে। “নালম” শব্দের অর্থ পদ্ম ফুল যা জ্ঞানের প্রতীক রূপে প্রকাশ করা হয়েছে আর “দা” দিয়ে বুঝানো হয়েছে দান করা। তার মানে “নালন্দা” শব্দের অর্থ দাঁড়ায় “জ্ঞান দানকারী”, প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৮০০ বছর ধরে জ্ঞান বিতরণের মত দুরূহ কাজটি করে গেছে নিরলসভাবে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টির অবস্থান পাটলিপুত্র থেকে ৫৫ মাইল দক্ষিণ পূর্ব দিকে অবস্থিত “বড়গাঁও” গ্রামের পাশেই। মৌর্যদের রাজধানী ছিল এই পাটালিপুত্র। সম্রাট অশোক এখান থেকেই রাজ্য পরিচালনা করতেন বলে জনশ্রুতি আছে।নালন্দায় বিদ্যা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১০,০০০। তাদের শিক্ষাদান করতেন প্রায় আরো ২,০০০ শিক্ষক। গড়ে প্রতি ৫ জন ছাত্রের জন্য ১ জন শিক্ষক । কত বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলে এত বিপুল সংখ্যক ছাত্রেরবিদ্যা দান সম্ভব, তাও আবার থাকা খাওয়ার সুব্যবস্থাসহ, ভেবে সত্যি অবাক না হয়ে উপায় নেই। বৌদ্ধ ধর্মের পাশাপাশি বেদ, বিতর্ক, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, ব্যাকরণ, সাহিত্য, গণিত, জ্যোতিষ বিদ্যা, শিল্প কলা, চিকিৎসাশাস্ত্র সহ দান চলত এখানে। শিক্ষকদের পাঠ দান আর ছাত্রদের পাঠ গ্রহণে সর্বদা মুখরিত থাকত এই বিদ্যাপীঠ। নালন্দার সুশিক্ষার খ্যাতির সুবাতাস এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে অনুন্নত-প্রতিকুল যোগাযোগ ব্যবস্থাও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি সুদূর তিব্বত, চীন, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, পারস্য, গ্রীস, তুরষ্ক থেকে ছুটে আসা বিদ্যা অনুরাগীদের।
নালন্দা বেশ কয়েকবার বহিঃশত্রুর দ্বারা আক্রমণের মুখে পড়ে। যতদূর জানা যায় সেই সংখ্যাটা মোট তিনবার। প্রথমবার স্কন্দগুপ্তের সময়ে (৪৫৫-৪৬৭ খৃষ্টাব্দে) মিহিরাকুলার নেতৃত্বে মধ্য এশিয়ার যুদ্ধবাজ হানাদের দ্বারা। উল্লেখ্য মিহিরকুলার নেতৃত্বে হানারা ছিল প্রচণ্ড রকমের বৌদ্ধ-বিদ্বেষী। বৌদ্ধ ছাত্র ও ধর্মগুরুদের হত্যা করা হয় নির্মমভাবে। স্কন্দগুপ্ত ও তার পরবর্তী বংশধরেরা একে পুনর্গঠন করেন।
প্রায় দেড় শতাব্দী পরে আবার ধ্বংসের মুখে পড়ে। আর তা হয় বাংলার শাসক শশাঙ্কের দ্বারা। শশাঙ্ক ছিলেন বাংলার অন্তর্গত গৌড়’র রাজা। তার রাজধানী ছিল আজকের মুর্শিদাবাদ। রাজা হর্ষবর্ধনের সাথে তার বিরোধ ও ধর্মবিশ্বাস এই ধ্বংসযজ্ঞে প্রভাব বিস্তার করে। রাজা হর্ষবধন প্রথমদিকে শৈব (শিবকে সর্বোচ্চ দেবতা মানা) ধর্মের অনুসারী হলেও বৌদ্ধ ধর্মের একজন পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হন। কথিত আছে, তিনি সেই সময়ে ধীরে ধীরে গজিয়ে উঠা ব্রাহ্মণদের বিদ্রোহও দমন করেছিলেন। অন্যদিকে রাজা শশাঙ্ক ছিলেন ব্রাহ্মণ্য ধর্মের একজন শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষক ও এর একান্ত অনুরাগী। উল্লেখ্য রাজা শশাঙ্কের সাথে বুদ্ধের অনুরুক্ত রাজা হর্ষবর্ধনের সবসময় শত্রুতা বিরাজমান ছিল এবং খুব বড় একটি যুদ্ধও হয়েছিল। রাজা শশাঙ্ক যখন মগধে প্রবেশ করেন তখন বৌদ্ধদের পবিত্র তীর্থ স্থানগুলোকে ধ্বংস করেন, খণ্ড বিখণ্ড করেন বুদ্ধের ‘পদচিহ্ন’কে। বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি তার বিদ্বেষ এত গভীরে যে তিনি বৌদ্ধদের প্রধান ধর্মীয় তীর্থস্থান বুদ্ধগয়াকে এমনভাবে ধ্বংস করেন যাতে এর আর কিছু অবশিষ্ট না থাকে ।
সাধারণভাবে প্রচলিত ইতিহাস নালন্দার প্রাচীনত্বকে বুদ্ধের সময় পর্যন্ত নিয়ে যায়। পাল রাজাদের (আট থেকে বারো শতক) সময়েই এটি বিভিন্ন কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। ধারণা করা হয় যে, গুপ্ত সম্রাটগণই নালন্দা মহাবিহারের নির্মাতা এবং সম্রাট প্রথম কুমারগুপ্তই সম্ভবত এক্ষেত্রে প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সাত শতকের দিকে নালন্দা একটি শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। চৈনিক তীর্থযাত্রী হিউয়েন-সাং পড়াশোনার জন্য এখানে কয়েক বছর অতিবাহিত করেন। তাঁর সময় থেকেই নালন্দা বিশিষ্ট পুরোহিতগণের তত্ত্বাবধানে শিক্ষা ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল। হিউয়েন-সাং-এর ভ্রমণের ৩০ বছরের মধ্যে ই-ৎসিঙ (৬৭৫ থেকে ৬৮৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ১০ বছর এখানে শিক্ষাগ্রহণ করেন) সহ কমপক্ষে ১১ জন কোরীয় ও চৈনিক তীর্থযাত্রীসহবিশিষ্টজনেরা নালন্দা ভ্রমণ করেন বলে জানা যায়। কনৌজের হর্ষবর্ধন (৬০৬-৬৪৭ খ্রি.) নালন্দা বিহারের একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
বাংলার পাল রাজগণ নালন্দার প্রতি তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত রাখেন। এটি পরিচালনার ক্ষেত্রে ধর্মপাল বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। লামা তারনাথ উল্লেখ করেন যে, ধর্মপাল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বিক্রমশীলা মহাবিহার তত্ত্বাবধানকারী প্রধান ব্যক্তি নালন্দা দেখাশোনা করার জন্যও রাজা কর্তৃক আদেশপ্রাপ্ত হন। সুবর্ণদ্বীপের শৈলেন্দ্র রাজা বালপুত্রদেব জাভার ভিক্ষুদের বসবাসের জন্য দেবপাল-এর অনুমতি নিয়ে নালন্দায় একটি বৌদ্ধ মঠ নির্মাণ করেন। এদের প্রতিপালনের জন্য দেবপাল ৫টি গ্রামও দানকরেন। সে সময় নালন্দা বিহার ছিল বৌদ্ধ সংস্কৃতিজগতের বিশেষ কেন্দ্র এবং এর অভিভাবক হিসেবে পাল রাজগণ সমগ্র বৌদ্ধ জগতে উচ্চস্থান লাভ করেন। ঘোসরাওয়া শিলালিপি থেকে নালন্দা বিহারের প্রতি বিশেষ আগ্রহ এবং বৌদ্ধ ধর্ম ও বিশ্বাসের প্রতি দেবপালের গভীর অনুরাগের কথা জানা যায়। মহাভারতের সময়ও ব্রাহ্মণদের মধ্যেই একদল বিদ্রোহীর খোঁজ পাওয়া গিয়েছল।
শান্তভিক্ষু সে সব পড়েছে লাসায় বিভিন্ন পুথি পড়ার সময়। এদের নাম হেতুবাদী। তারা আসলে নাস্তিক। তারা বলতেন, পরকাল আত্মা ইত্যাদি বড় বড় কথা বেদে আছে কারণ ভণ্ড, ধূর্ত ও নিশাচর এই তিন শ্রেণীর লোকরাই বেদ সৃষ্টি করেছে, ভগবান নয়। বেদের সার কথা হল পশুবলি। যজ্ঞের নিহত জীবন নাকি স্বর্গে যায়। চার্বাকরা বলেন, যদি তাই হয় তাহলে যজ্ঞকর্তা বাজজমান তার নিজের পিতাকে হত্যা করে স্বর্গে পাঠান না কেন…‘… এই ঝগড়া বাড়তে বাড়তে বেদ ভক্তদের সংগে বৌদ্ধদের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঝাপ দিতে হয়। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা যে নাস্তিক, চার্বাকদের উক্তিতেই প্রমাণ রয়েছে। অতএব বৌদ্ধরা মূর্তিপূজা যজ্ঞবলি বা ধর্মাচার নিষিদ্ধ করে প্রচার করছিল পরকাল নেই,জীব হত্যা মহাপাপ প্রভৃতি। হিন্দু ধর্ম বা বৈদিক ধর্মের বিপরীতে জাত ভেদ ছিল না। প্রগতিশীল বৌদ্ধবাদ যখন জনসাধারণের গ্রহণযোগ্যতা পেতে শুরু করল তখন থেকে শুরু হল ব্রাহ্মণ্যবাদের সাথে বৌদ্ধবাদের বিরোধ। সংঘাত ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্র হয়ে উঠল। উভয় পক্ষই পরস্পরকে গ্রাস করতে উদ্যত হল। হিন্দুরা তাদের রাজশক্তির আনুকুল্য নিয়ে বৌদ্ধদের উৎখাতের প্রাণান্ত প্রয়াস অব্যাহত রাখে। কখনো কখনো বৌদ্ধরা রাজশক্তির অধিকারী হয়ে তাদের মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করার সর্বাত্মক প্রয়াস নেয়। বৌদ্ধবাদ কেন্দ্রিক নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর ভাঙন সৃষ্টির জন্য হিন্দুরা চাণক্য কৌশল অবলম্বন করে। বৌদ্ধদের মধ্যকার অধৈর্যদের ছলেবলে কৌশলে উৎকোচ ও অর্থনৈতিক আনুকূল্য দিয়ে বৌদ্ধবাদের চলমান স্রোতের মধ্যে ভিন্ন স্রোতের সৃষ্টি করা হয় যা কালক্রমে বৌদ্ধদের বিভক্ত করে দেয়। বৌদ্ধবাদকে যারা একনিষ্ঠভাবে আঁকড়ে থাকে তাদেরকে বলা হতো হীনযান। আর হিন্দু ষড়যন্ত্রের পাঁকে যারা পা রেখেছিল যারা তাদের বুদ্ধি পরামর্শ মত কাজ করছিল তাদেরকে ব্রাহ্মণ্য সমাজ আধুনিক বলে অভিহিত করে। এরাই ছিল মহাযান।
এরাই প্রকৃত পক্ষে পঞ্চমবাহিনীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। মহাযান নতুন দল হিন্দুদের সমর্থন প্রশংসা পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে বৌদ্ধবাদের মূল আদর্শ পরিত্যাগ করে মূর্তিপূজা শুরু করে। ফলে বৌদ্ধ ধর্মের ভিত্তিমূলও নড়ে যায়। বৌদ্ধদের এই শ্রেণীকে কাজে লাগিয়ে প্রথমত নির্ভেজাল বৌদ্ধবাদীদের ভারত ভূমি থেকে উৎখাত করে এবং পরবর্তীতে মহাযানদেরও উৎখাত করে। কিন্তু যারা একান্তভাবে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের আশ্রয় নিয়ে বৌদ্ধ আদর্শ পরিত্যাগ করে হিন্দু সভ্যতা ও সংস্কৃতির মধ্যে তাদের জাতি সত্তাকে বিসর্জন দেয় তারাই টিকে থাকে। সে কারণে আজ বৌদ্ধের সংখ্যা বৌদ্ধবাদের জন্মভূমিতে হাতে গোনা। কোন জাতি তার আদর্শ ও মূলনীতি পরিত্যাগ করে অপর কোন জাতির সভ্যতা ও সংস্কৃতির মধ্যে অবগাহন করলে সেই জাতিকে স্বাতন্ত্রবিহীন হয়ে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হতে হয়। ছয় শতকে যখন আরবে জাহেলিয়াতের অন্ধকার বিদীর্ণ করে ইসলামের অভ্যুদয় হয়েছে সে সময় বাংলায় চলছিল বৌদ্ধ নিধন যজ্ঞ। ৬০০ থেকে ৬৪৭ সাল পর্যন্ত বাংলার শিবভক্ত রাজা শশাঙ্ক বাংলা থেকে বৌদ্ধ ধর্মকে উৎখাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন বুদ্ধদেবের স্মৃতি বিজড়িত গয়ার বোধিদ্রুম বৃক্ষ গুলিতিনি সমূলে উৎপাটন করেন। যে বৃক্ষের উপর সম্রাট অশোক ঢেলে দিয়েছিলেন অপরিমেয় শ্রদ্ধা সেই বৃক্ষের পত্র পল্লব মূলকাণ্ড সবকিছু জ্বালিয়ে ভস্মীভূত করা হয়। পাটলিপুত্রে বৌদ্ধের চরণ চিহ্ন শোভিত পবিত্র প্রস্তর ভেঙে দিয়েছিলেন তিনি। বুশিনগরের বৌদ্ধ বিহার থেকে বৌদ্ধদের বিতাড়িত করেন। গয়ায় বৌদ্ধ মন্দিরে বৌদ্ধদেবের মূর্তিটি অসম্মানের সঙ্গে উৎপাটিত করে সেখানে শিব মূর্তি স্থাপন করেন। গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান নেপালের পাদদেশ পর্যন্ত বৌদ্ধ নিধন কার্যক্রম চালিয়েছিলেন কট্টর হিন্দু রাজা শশাঙ্ক।
বৌদ্ধরা শুরু থেকে হিন্দুদের দানবীয় আক্রমণ প্রতিরোধ করেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী তারা প্রতিক্রিয়াশীল-চক্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। ৬২৯ খৃস্টাব্দে একজন চীনা বৌদ্ধ সন্নাসী ১২০ বছর পর নাটকীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করেন। ৬২৯ সালে আর একজন চীনা পর্যটক গান্ধারা সফর করে বৌদ্ধবাদের করুণ পরিণতি দেখে মানসিকভাবে বিপন্ন হন।
আবার একইরকম ভাবে উঠে আসছে ব্রাহ্মণ্যশক্তি। শান্তভিক্ষু এসব ভাবতে ভাবতেই পথ হাঁটছিলেন। বাংলার অবস্থা যে খুব একটা ভাল না, তা তাঁর চেয়ে ভাল আর কেউ বোঝে না। এত সব ইতিহাস তিনি জেনেছেন তাঁর মহাভিক্ষুর কাছ থেকেই। বাংলায় যবে থেকে ব্রাহ্মণদের অত্যাচার শুরু হল, সে সময়ের পর থেকেই বৌদ্ধভিক্ষুরা বিচ্ছিন্ন ভাবে লুকিয়ে এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকেন। মহাভিক্ষু নির্বাণ তাঁকে যে ইতিহাস লিপিবদ্ধ করে রাখতে বলেছেন, তার জন্যই তাঁকে আরও ঘুরেবেড়াতে হবে। আরও দেখতে হবে এই দেশটাকে। ইতিহাসের স্বার্থেই কখনো কখনো ছদ্মবেশ ধারণ করতেও হতে পারে।
কারণ এই ব্রাহ্মণরা যখন নালন্দা বা বিক্রমশীলা মহাবিহার আক্রমণ করে, তখন তারা জ্বালিয়ে দিয়েছিল সমস্ত পুথি। এখন তারাই চারিদিক রটিয়ে বেড়াচ্ছে যে মুসলিমরা ধ্বংস করেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে। মুসলিমরা যে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃতপ্রায় দশাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই ধ্বংসের সূত্রপাত তো রাজা শশাঙ্কর সময় থেকেই শুরু হয়েছে। যে বাংলা ছিল বৌদ্ধদের স্বর্গরাজ্য, সেই বাংলাকেই বৌদ্ধদের শ্মশানভূমি করে তোলার জন্য এ দেশের ব্রাহ্মণরা রাজাদের সঙ্গে মিলে তৈরি করেছলেন ষড়যন্ত্র।
এই ষড়যন্ত্রে সবই ধ্বংস হয়ে যাবে। সব। সেই ধ্বংসের হাত থেকে জ্ঞানভাণ্ডারকে বাঁচানোর জন্যই পাড়ি দিতে হবে এই দেশ থেকে বাইরে। কিন্তু আবার ফিরেও আসতে হবে। কারণ এই দেশই তো তার জন্মভূমি। তাম্রলিপ্তর কাছেই একটি গ্রাম সুরি। সেখানেই তার বাড়ি। তার বাবা ছিলেন সেই গ্রামের একজন কৃষক। পাঠশালায় পড়তে পড়তেই তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল ভিক্ষু নির্বাণের।
নির্বাণের করুণ চোখে তাকিয়ে থাকা, দুঃখহীন মেধাবী এক উজ্জ্বল দৃষ্টি দেখে তাঁর দিকে তাকিয়েছিলেন শান্ত। শুধুই তাকিয়েছিলেন।
সেই যে মন তার উথালপাথাল হতে শুরু করে দিয়েছিল, তার মন তারপরই কেন যে বারবার খারাপ হয়ে যেত, তা তিনি বুঝতে পারতেন না।
কৃষিজমির ভিতর দিয়ে যেতে যেতে দূরের ওই কাশবন দেখতে পাওয়া যায়। কাশবন দেখলেই মন কেন যে আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে যায়, তা জানেন না শান্ত। কিন্তু এই পথ ধরে সোজা সেই কাশবনের দিকে যাওয়া যাবে না। কারণ, এই পথ গিয়ে পড়েছে একটি নদীর তীরে। সেই নদীর ধারে একটি ডিঙি বাঁধা আছে। সকলের জন্যই বাঁধা আছে এই ডিঙি। যারাই এখানে এসে নদীটা পেরোতে যায়, তারা ডিঙি করে এই এই নদীটা পেরিয়ে সেখানে একটা পাথরের সঙ্গে আবার ডিঙিটাকে বেঁধে চলে যায়। দুটি করে ডিঙি বাঁধা আছে এপারে, এবং ওপারেও।
এই সময়ই হাঁটতে হাঁটতে তাঁর চোখে পড়ল সম্পূর্ণ বিদেশি একজনের দিকে। এমন পোশাক সে জীবনে দেখেনি। দুটো পায়ে কোমর থেকে পায়ের গোছ পর্যন্ত একটি পোশাক। পায়ে জুতোটাও ভিন্ন রকমের। শরীরে ঊর্ধ অংশে রয়েছে আরও একটি পোশাক। কাঁধে এক বিচিত্র থলি। চোখে একটা কী যেন পড়ে আছে। কাচের মতোই লাগছে। কিন্তু দুচোখের সেই দুটি কাচ দুটি সরু পাতলা ধাতু দিয়ে কানের সঙ্গে যুক্ত। লোকটি এই নদীর দিকেই আসছে। লোকটির মুখ দেখে মনে হচ্ছে কিছুটা বিভ্রান্ত।
আগ্রহ জন্মাল শান্তভিক্ষুর মনে। মনে হচ্ছে বিদেশি। এ কি মুসলমানদের পাঠানো কেউ। তবে কি তাদের এই গুপ্ত পথের কথা মুসলমানেরা জেনে গেছে? না কি এ দক্ষিণের কোনও সম্রাটের পাঠানো চর? কোনওরকম ভ্রম নয় তো? কিন্তু নিজের চোখকেও বিশ্বাস করা যায় না, এমন একটা অদ্ভুত দৃশ্য।
নদীর তীরে এসে তিনি ওপাড়ে তাকিয়ে দেখলেন সেই লোকটি ওখান থেকেই দু হাত উঁচু করে দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে।
কী একটা অদ্ভুত ভাষায় কথা বলছে।
(এইখানে একটি কথা বলে রাখা ভাল। শান্তভিক্ষু কিংবা অন্যরা মধ্যযুগের বাংলায় যে বাংলায় কথা বলতেন, তা শুনে আধুনিক কালের বাঙালি না বুঝতেও পারেন। এমনকি এই কাহিনির লেখকের পক্ষেও সেই ভাষা আয়ত্ত্ করা সম্ভব নয়। তাই কিছুটা সৃজনশীল লাইসেন্স নেওয়া হয়েছে। পাঠককে একটু কল্পনশক্তির আশ্রয় নিতে হবে, এটুকু বোঝার জন্য যে আধুনিক কালের একজন মানুষ মধ্যযুগের একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন সরাসরি)
মৃন্ময় দেখল সেই ভিক্ষু, নিশ্চয় বৌদ্ধ ভিক্ষু নদীর একেবারে পাড়ে এসে দাঁড়িয়েছেন।
তিনি অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছেন কেন, সেটিই বুঝতে পারল না মৃন্ময়।
সে হাত নেড়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য বেশ উচ্চকণ্ঠে ডাকল—এই যে দাদা, শুনতে পাচ্ছেন? আমি কীভাবে নদীটা পেরোবো জানেন?
কিন্তু লোকটা কিছু বুঝতে পারল কিনা বোঝা গেল না।
কিন্তু সেই ভিক্ষু নদীর পাড় ধরে একটু এগিয়ে গিয়ে একটু নিচে নামলেন। নিচে নামতেই দেখা গেল তিনি সেখানে বাঁধা একটি ডিঙির কাছে পৌঁছে গেছেন। ও, দুদিকেই দুটি করে ডিঙি বাঁধা আছে। কিন্তু থাক, তিনি আসুন। কথা বলে, তারপর পেরোনো যাবে।
শান্ত ভাবে ভিক্ষু দড়িটা খুলে ডিঙিটাকে বাইতে বাইতে নদীর এপাড়ে এসে পৌঁছলেন। একটি ডিঙি বাঁধলেন।
তারপর পাড় ধরে উঠে এসে সামনে দাঁড়ালেন মৃন্ময়ের। ৪
সময় এবং জীবনের এক আশ্চর্য ধারায় এই প্রকৃতির সবকিছুই পরিবর্তনশীল। এমনকি ভাষাও। কিন্তু এই প্রবাহের ধারাবাহিকতাকে যারা অনুভব করতে পারে না, তারা সময়ের বোধকে নিজের থেকে পৃথকই রেখে দেয়। আমাদের মধ্য দিয়ে নিত্য বহমান অতীত এবং আগামী সময়েরও পারস্পরিক প্রবাহ চলছে।
আমরা তা ধরতে পারি না, তাতে হয়ত মাদের উপকারই হয়। জীবনে ব্যাখ্যা করতে না পারার এক উপযোগিতা আছে। সে কথা মৃন্ময় জানত। কিন্তু সে যে স্বপ্নের মধ্যে ঢুকে পড়েছে, এ কথা সে জানত না।
শান্ত ভিক্ষু তাকে নিজের ভাষাতেই জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কে? এমন বিচিত্র পোশাক কেন?
এ বাংলা আধুনিক কালের বাংলা না হলেও, স্বপ্নের মধ্যে এই বাংলা বহুবার শুনেছে মৃন্ময়।
তাই বুঝতে অসুবিধা হল না। এই বাংলা তাকে শিখে নিতে হবে। পুরোনো বাংলা। তার ফেলে আসা ইতিহাসের মতো। তার নিজের জীবনও যেমন বুঝে ওঠা তারপক্ষে সম্ভব নয়।
সে বলল, আমার নাম মৃন্ময়। ( ভাঙা ভাঙা পুরোনো বাংলায়)
শান্ত ভিক্ষু তার মুখের এই বিচিত্র ভাষা শুনে বুঝতে পারলেন না, এই ভাষা পুরোনো না নতুন।
কালের গতিতে যে বাংলা ভাষার মধ্যে বহু ভাষা ঢুকে এই ভাষাকে এক আধুনিক সচল গতিশীল ভাষায় পরিণত করেছে, তা বোঝা সে সময়ের বাঙালির পক্ষে কোনোমতেই সম্ভব নয়।
তিনি বললেন, আপনি কোথায় যাবেন?
মৃন্ময় বুঝল, এ কথার সঠিক উত্তর দেওয়া সম্ভব নয় তার পক্ষে। কারণ এই ভিক্ষু যেখান থেকেই আসুন না কেন, তার পক্ষে এটা বোঝা সম্ভব নয়, মৃন্ময় তার স্বপ্নের পথে কোথাও একটা যেতে চাইছে।
কিন্তু সহজে সেই পথে যাওয়া সম্ভব নয়।
কিন্তু ইনি কোথা থেকে এসেছেন? সেই বা কোথায়?
মৃন্ময় জিজ্ঞেস করল, আসলে আমি বুঝতে পারছি না আমি কোথায়? আমি উত্তরের দিকে যাব বলেই বেড়িয়েছি। আমার লক্ষ্য গৌড় অথবা পাণ্ডুয়া। কিন্তু তার আগেই নেমে পড়ে পথ হারিয়েছি বলে মনে হয়েছে।
শান্তভিক্ষু বললেন, যদি গৌড়ের দিকে যেতে চান, তাহলে ঠিক পথেই আছেন বন্ধু। কিন্তু একটা কথা, এখান থেকে সে বড় জটিল পথ। কোনও রাস্তা নেই। অনেক খেত জঙ্গল নদী পেরিয়ে সেখানে যেতে হয়। পথে অবশ্য দু তিনটি গ্রাম পড়ে। কিন্তু কোনও তো পথ নেই। সময় লাগবে। আপনি তো নতুন, আপনার পক্ষে যাওয়া হয়তো সম্ভব নয়।
– কেন সম্ভব নয়? আমাকে আপনি বলে দিন কোন স্টেশন কাছাকাছি?
– আজ্ঞে? এটি কী বললেন, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
– স্টেশন, ট্রেন। বা কাছাকাছি বাস নিশ্চয় আছে।
– আপনার ভাষা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। শুধু বলি, যাওয়া এখন সহজ নয়, বিশেষ করে আপনার এই বেশে। কারণ আপনার এই বেশে আপনাকে বিদেশি চর বা ক্ষতিকারক কোনও মানূষ ভেবে আক্রমণ করতে পারে।
– কারা?
– কেন নবাবের সেনারা?
– নবাব?
– নবাব যদি নাও করেন, তাহলে ব্রাহ্মণরা যে রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে সন্ধি করেছে, তারাও আসতে পারে। আবার আসতে পারে মারাঠা দস্যুরাও। আবার মারাঠা সাম্রাজ্যের সৈন্যরাও আসতে পারে। পাশাপাশি এখানে বিভিন্ন গ্রামের নিজস্ব লাঠিয়াল আছে, তারাও আপনাকে আক্রমণ করতে পারে। বিশেষ করে এই যে অদ্ভুত একটা পোশাক পরেছেন আপনি।
– অদ্ভুত পোশাক? আমি তো খুব সাধারণ পোশাকই পরেছি।
– এইটি কী?
এই বলে ভিক্ষু তাঁর ব্যাগের দিকে দৃষ্টি দিলেন।
– এটা ব্যাগ।
– কী?
– এই যে আপনার যেমন ঝোলা। আমার তেমন। কিন্তু আপনি যা সব বলছেন, তাতে তো আমার একটা অন্য সন্দেহ হচ্ছে।
– কী সন্দেহ?
– সেটি আপনাকে বোঝানোর আগে জানতে চাই আপনার পরিচয়।
শান্তভিক্ষু একটু ইতস্ততঃ করলেন। এই লোকটিকে যদি তিনি নিজের সম্পর্কে সব বলেন তাহলে বিপদের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
তিনি একটু ভেবে বললেন।
– আমি একজন ভিক্ষু।পর্যটনই আমার কাজ। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর জন্যই বেরিয়েছি।
– আপনি কোন সঙ্ঘে থাকেন?
শান্ত ভিক্ষু মুচকি হাসলেন। এ যে দেখা যাচ্ছে সঙ্ঘের কথাও জানে। তাহলে এ একেবারে পাগল নয়। সেই সঙ্গে বদ্ধমূল হল তাঁর ধারণা। এ নিশ্চয় খোঁজখবর নিতেই বেরিয়েছে।
– আমি এখন কোনও সঙ্ঘে থাকি না। বলতে পারেন নিজের মতো থাকার জায়গা খুঁজে নিই। বুদ্ধের শরণ নিয়েছি যখন, তখন আর অত ভাবলে চলে?
– হুম। একটু কোথাও বসে আলাপ করতে পারি?
– চলুন। কাছেই একটা বটগাছ আছে। তার ছায়ায় বসা যাক।
– একটা কথা বলতে পারি?
– বলুন।
– আপনার কাছে কিছু খাবার আছে?
– আছে।
বটগাছের তলায় বসে ভিক্ষু আর মৃন্ময় কিছু খেয়ে নিল। খাবার বলতে কিছু গুড়, মুড়ি এবং কলা। সঙ্গে জল ছিল। মৃন্ময় তার ব্যাগ থেকে একটা অদ্ভুত স্বচ্ছ পাত্র বের করল। তার মধ্যে ছিল জল। সে ঢকঢক করে সেই জল খেয়ে নিয়ে বলল, আপনি একটূ খাবেন?
শান্ত ভিক্ষু এবার ভয় পেয়ে গেলেন। এই অদ্ভুত পাত্র থেকে জল খেলে তার বিপদ হতে পারে। তার উপর, এ যে জলই, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।
তিনি বললেন, আমি আমার জলই খাচ্ছি।
জল খাওয়ার পরে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এবার বলুন, কোথা থেকে আসছেন আপনি?
মৃন্ময়ের সন্দেহ হচ্ছিল অনেকক্ষণ ধরেই।
সে একটি কথা জিজ্ঞেস করল, – একটা কথা বলুন, এটা কি বখতিয়ার খিলজির সময়?
– কী? বখতিয়ার খিলজি? তিনি তো একশ বছর আগের ঘটনা।
– একশ বছর? আমি ভেবেছিলাম…
– তিনি অতীত। কিন্ত তিনি যে বীজ বপন করে গিয়েছিলেন, তার ধারা এখন চলছে।
– সুলতানি শাসন?
– হ্যাঁ, আপনি জানেন দেখছি।
– তার মানে এখন ঐ টেরাকোটার মসজিদগুলো তৈরি হচ্ছে। মন্দিরগুলো তৈরি হচ্ছে?
চোয়াল একটু শক্ত হয়ে গেল শান্তভিক্ষুর। কারণ তিনি জানেন, বহু বৌদ্ধ স্তুপ এবং মন্দির ধ্বংস করেছিল প্রথমে হিন্দুরা। তারপর ধ্বংস করেছিল মুসলমানরা সেই সব হিন্দু মন্দির। তারপর সেখানেই তারা তৈরি করেছে তাদের মসজিদ। শুধু মুসলমান নয়, হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ই বৌদ্ধ স্থাপত্য ধ্বংসের অন্যতম কারণ।
তিনি মৃন্ময়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, হ্যাঁ। ধ্বংসের পর আবার সৃষ্টি করা হচ্ছে।
মৃন্ময় এই ইঙ্গিত বুঝল। কারণ বহুদিন ধরেই এই বিষয় নিয়ে সে চর্চা করছে।
– এবার বলুন আপনি কোথা থেকে এসেছেন?
– আমি আসলে কোথাও আসিনি। আমার মনে হয়, আমি ঘুমোচ্ছি কোথাও। আর সেই ঘুমের মধ্যে আমি এই স্বপ্নের মধ্যে চলে এসেছি।
– অনুগ্রহ করে একটু স্পষ্ট করে বুঝিয়ে বললে, ভাল হয়।
শান্ত ভিক্ষুর কাছে এখনো পুরো বিষয়টি পরিষ্কার হচ্ছিল না।
মৃন্ময় বলল, আসলে আমি আপনাদের সময়ের লোক নই। আমি এসেছি সেই একবিংশ শতাব্দী থেকে। আমি ঠিক আসিওনি। আমি আছি সেখানে। কিন্তু আমি স্বপ্নে এখানে চলে এসেছি।
– স্বপ্নে? মানে, আপনি স্বপ্ন দেখছেন এইসব?
– আজ্ঞে হ্যাঁ।
– আপনার স্বপ্নে আমি এসেছি আপনার কাছে? আপনার স্বপ্নে এই মেঘগুলো উড়ে বেড়াচ্ছে। আপনার স্বপ্নে ঐ গোরু চড়ছে। আপনার স্বপ্নে নদীতে জল বইছে। আপনি সেই নদী পেরোবেন একটি ডিঙিতে চড়ে?
– আজ্ঞে হ্যাঁ।
– আমি একজন ভিক্ষু, ঠিকই। কিন্তু আমি বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত পড়াশুনো করে এসেছি।
– জানি আমি, বৌদ্ধ ভিক্ষুরা জ্ঞানী।
– তাহলে এও নিশ্চয় জানেন, আমাকে বোকা মানাতে চেষ্টা করাই ভুল।
– না আমি বোকা বানাতে চাইছি না।
– আচ্ছা, যদি আপনি স্বপ্নেই এখানে চলে আসেন, তো একটা কথা বলুন। এখানে কেন এসেছেন?
– আমাকে খুব করে ডাকা হয়েছে। আমার এক বন্ধু আছে এখানে। সে খুব কষ্টে আছে। বলতে পারেন, আমি ইতিহাস পড়েছি বলেই জানি, একটা অন্ধকার যুগ চলছে এই সময়ে। সেই অন্ধকার যুগ থেকে আমার বন্ধুদের শিল্পকে রক্ষা করতে হবে। অন্তত, কিছু তো নিয়ে যেতে হবে আমাদের সময়ে।
– আপনাদের সময়ে বলতে?
– এই অন্ধকার যুগের কোনও কবিতা, শিল্প, গানের কিছুই পাওয়া যায় না। আমরা অনুমান করি, এতই ভয়ংকর যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত এই সময়ের শাসকরা, যে এখানকার সমস্ত মানুষই এই অনাচারের আগুনে দগ্ধ হয়ে পুড়ে গেছে। কিন্তু তারা কবিতা লেখেনি, গান লেখেনি, এ তো নয়। আমি চাই, সেগুলিকে শুনতে, পড়তে। আমার সময়ে গিয়ে বলতে, যে অন্ধকার যুগ আসলে অন্ধকার ছিল না।
– নয় তো। অন্ধকার যুগ যে চলছে এ কথা ঠিক। কিন্তু কোনও অন্ধকারই সম্পূর্ণ অন্ধকার হতে পারে না। তার অল্প আলো থাকেই।
– আমি সেই আলোর সন্ধানেই এসেছি যে।
– আলোর সন্ধানে এসেছেন?
এই বলে চুপ করে রইলেন শান্ত ভিক্ষু। না,তিনি কিছুতেই বুঝতে পারলেন না এই ব্যক্তি যা যা বলছেন, তা সত্য কিনা।তবে এই ব্যক্তির আগ্রহ সঠিক যদি হয়, তবে তার মধ্যে যুক্তি আছে। কিন্তু এই অবস্থায় এই ব্যক্তি যেখানেই যাবে, সেখানেই ধরা পড়ে যাবে। কিন্তু এ কাকেই বা দেখেছে তার স্বপ্নে? কার সঙ্গে এ কথা বলে?
তার পরেই তার মনে হল, এ তো সময়ের সঙ্গে এক অদ্ভুত খেলা। যদি সত্যি হয়ে থাকে, এই খেলা, তবে এই ব্যক্তি এক ঝুঁকি নিয়েছেন। কারণ যদি এমন হয়, কেউ এসে এই ব্যক্তিকে মেরে দিয়ে চলে গেল, তাহলে তার স্বপ্নটিই চলতে থাকবে। তিনি আর তাঁর বাস্তবে ফিরতে পারবেন না। আবার যদি এমন হয়, যে এখানে তাঁকে কেউ হত্যা করল, তাহলে তিনি কি তাঁর বাস্তবে ফিরতে পারবেন? আর, তাঁর কি ঘুম ভাঙবে না? এখানে এসে কি তিনি ঘুমোবেন না?
তিনি মৃন্ময়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, সেক শুভোদয়ার নাম শুনেছেন? এটি একটি অদ্ভুত কাব্য। লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি হলায়ুধ মিশ্রের লেখা সংস্কৃত গদ্যপদ্যে লেখা চম্পুকাব্য । এই ত্রয়োদশ শতাব্দীতেই তো লেখা।
– কী আছে এই কাব্যে?
– নানান ঘটনার মাধ্যমে মূলত পীরদের মাহাত্ম্য। শুধু তা-ই নয়, এতে রয়েছে বাংলা গান, চর্যা ও ভাটিয়ালী গানের একটি প্রেমসঙ্গীত। শুনবেন?
– আপনার স্মৃতিতে আছে?
– তা আছে। শুনুন তবে।
“হঙ যুবতি পতি এ হীন।
গঙ্গা সিনায়িবাক জাইএ দিন।
দৈব নিয়োজিত হৈল আকাজ
বায়ু ন ভাঙ্গএ ছোট গাছ।”
– বাহ, দারুণ তো। পড়তে পারব নিশ্চয়।
– হ্যাঁ। আপনি শূন্যপূরাণ নিশ্চয় পড়েছেন? এও কি আমাদের যুগেই লেখা।
– কী এটা?
– রামাই পণ্ডিত রচিত ‘শূন্যপুরাণ’ ছিল ধর্মপূজার একটি শাস্ত্রগ্রন্থ। বৌদ্ধদের শূন্যবাদ ও হিন্দুদের লৌকিক ধর্মের সম্মিলনে ধর্মপূজার প্রতিষ্ঠিত শূন্যপুরাণে প্রাচীন বাংলা ভাষার প্রভাব বিদ্যমান। এ কাব্যের অন্তর্গত নিরঞ্জনের রুষ্মা নামক কবিতাটিও অনবদ্য।
– আপনি দেখছি বৌদ্ধ ভিক্ষু হলেও এই সমস্তই পড়েন।
– হ্যাঁ। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তো সবরকমের গ্রন্থ এবং পুথিই ছিল। শুধু বৌদ্ধ গ্রন্থ তো ছিল না। এক লক্ষেরও বেশি গ্রন্থ ছিল নালন্দায়। সব বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্তুপ বা সঙ্ঘই আসলে এক একটি গ্রন্থাগার। কিন্তু না আছে ব্রাহ্মণদের মধ্যে এই সহিষ্ণুতা, না আছে মুসলমানদের মধ্যে এই সহিষ্ণুতা। একটি কাহিনী অনুসারে, রামাই ছিলেন একজন অপ্রিয় ব্রাহ্মণ ঋষির পুত্র। তার পিতার মৃত্যুর পর, রামাই ছিলেন রাম-কথাই বা রামাবতারম রামপাল-চরিত। তিনি বৈতি বর্ণে জন্মগ্রহণ করেছিলেন । রামাই পণ্ডিতের জন্ম হয় একটি অপ্রিয় ব্রাহ্মণ পরিবারে এবং অল্প বয়সে পিতামাতাকে হারানোর পর তিনি ধর্ম ঠাকুরের ভক্তদের দ্বারা লালিত-পালিত হন। তিনি রাজা হরিশচন্দ্রের পুরোহিত ছিলেন। রামাই পণ্ডিত ঈশ্বরের উপাসনার পক্ষে ছিলেন, যাকে তিনি ধর্ম এবং শূন্য নামে অভিহিত করেছিলেন । তাঁর পুত্র ধর্মদাস কলিঙ্গের এক রাজাকে ধর্মঠাকুর সম্প্রদায়ে রূপান্তরিত করেছিলেন ।
– শূন্য কেন?
– “শূন্য” অর্থ শূন্য এবং রামাই পণ্ডিত, বাংলা ও উড়িষ্যার অন্যান্য অনেক হিন্দু দার্শনিকের মতো, ঈশ্বরকে শূন্য ও নিরাকার হিসেবে উপাসনা করার পক্ষে।
যদিও রামাই পণ্ডিত ধর্মঠাকুরের ভক্ত ছিলেন , তবুও তাঁর ধর্ম পূজা বিধানে তিনি আরও বেশ কিছু দেবতার কথা বলেছেন। তিনি জগন্নাথকে বিষ্ণু হিসেবে লেখেন : নবম অবতারে হরি জগন্নাথ নামে পরিচিত সমুদ্রতীরে বাস করেছিলেন। রামাই পণ্ডিত ধর্ম সম্প্রদায়ের প্রথম মহান পুরোহিত, এবং ধর্ম ঠাকুর স্বয়ং রাজা ধর্মপালের পুত্রের রাজত্বকালে প্রকাশিত হয়েছিলেন।
– আমি কি রামাই পণ্ডিতের সঙ্গে দেখা করতে পারি?
– তাহলে আমাকে আপনার সঙ্গে যেতে হবে। কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন আছে। আপনি একজন বন্ধুর কথা বলেছিলেন, তিনি কে?
– হ্যাঁ আমি তাঁদেরই গ্রামে যেতে চাই। কারণ আমি দেখতে চাই পোড়ামাটির গ্রামকে।
– কী বললেন?
এইবার শান্ত ভিক্ষু সোজা হয়ে বসলেন। পোড়ামাটির গ্রামের কথা তো এই ব্যক্তির জানার কথা নয়।
– হ্যাঁ, পোড়ামাটির গ্রাম। যেখানে সব পোড়ামাটির শিল্প সৃষ্টিকারী শিল্পীরা বসবাস করেন।
– ঠিক বলেছেন। কিন্তু এত ঠিক কীভাবে বলছেন। ঠিক বলেছেন পোড়ামাটির গ্রাম এবং সেই গ্রাম ঘিরেই শিল্পীদের বসবাস, এমনকি অনেক কবিও এই অঞ্চলেই বসবাস করেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁরা বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ছেন। অনেকে পান্ডুয়ায়, কেউ কেউ পুন্ড্রে, কেউ কেউ রাঢ়ে, কেউ কেউ বা আরও দক্ষিণে ছড়িয়ে পড়ছেন। আবার কেউ কেউ মারা যাচ্ছেন না খেতে পেয়ে। কেউ কেউ আবার তাম্রলিপ্ত থেকে জাহাজ ধরে চলে যাচ্ছেন ব্রহ্মদেশ বা আরও দূরে।
– এখনো তাম্রলিপ্ত বন্দর আছে?
– আছে মানে? এই তাম্রলিপ্ত বন্দরই তো আমাদের প্রাণশক্তি। বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগের মূল জায়গা। এই বন্দর ধরেই তো বাঙালির বাণিজ্য চলে। আমরা তো নির্ভর করে থাকি এই বন্দরের উপরেই। আমি তাম্রলিপ্তর এক বীরের কথাও আপনাকে শোনাবো। কিন্তু আপাতত আপনি বলুন, পোড়ামাটির গ্রামে যে আপনার বন্ধু, তার নাম কী? কার ডাকে এত ঝুঁকি নিয়ে আপনি স্বপ্নের মধ্যে এতটা পথ চলে এসে হারিয়ে গেছেন?
– আমি নিশ্চয় আপনার উপর ভরসা করতে পারি? তাহলে আমার বন্ধুর নাম বলে একটি অনুরোধ করব কি?
– বলুন।
– আমাকে যে কোনও উপায়ে সেই বন্ধুর কাছে নিয়ে যেতে হবে যে।
– দেখুন ভাই, আমি আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি, যে যেখানে যাবার কথা ছিল, সেখানে আমি যাব না। আপনার এই অদ্ভুত যাত্রাপথের অংশ কি করবেন আমায়?
– আমি তবে একটূ বলভরসা পাব। কারণ আপনাকে দেখেও আমার মনে হচ্ছে বিশ্বাস করতে পারি। বন্ধুত্ব করতে পারি।
– তবে বলুন সেই সৌভাগ্যবান বন্ধুর নাম কী? কে এমন স্বপ্নের মধ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা সময়ের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করে, তাকে এতদূর টেনে আনতে পারল?
– তিনি প্রকৃতই একজন শিল্পী এবং কবিও বটে। তাঁর নাম সূত্রধর পাল।
– কী বললেন?
– সূত্রধর পাল।
নাম শুনেই শান্ত ভিক্ষুর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। যার জন্য তিনি ছেড়ে এসেছেন, তার জন্যই যে এবার ফিরতে হবে তাঁকে।
ফিরতেই হবে।



