দীপক হালদারের কবিতা : আত্ম-মন্ময়তার পাঠ

00fe0e3c 5e60 4fe7 b536 ca27b4753ff0

দীপক হালদার বিশ শতকের সত্তরের দশকের কবি। তাঁর কবিতা আপাতদৃষ্টে সহজবোধ্য মনে হলেও, তার গভীরে প্রোথিত আছে অস্থির সময়ের দর্পণ এবং অস্তিত্ববাদের জটিল রসায়ন। কবিতার মধ্যে তিনি মানুষকে কেবল একটি জৈবিক সত্তা হিসেবে দেখার পরিবর্তে, বরং তাকে দেখেছেন শ্রম, সংকল্প, প্রকৃতি এবং মহাজাগতিক শূন্যতার এক সন্ধিক্ষণ হিসেবে। কবিতার পাতায় মানুষের অস্তিত্বের পদচিহ্ন ও যৌবনের উত্তাপ মাখা শরীরী উপস্থিতিকে দৃশ্যমান দৃঢ়তায় যিনি বাঁধতে পেরেছেন, তাঁর কবিতার দার্শনিক ভিত্তি তো অনেক গভীরে প্রোথিত থাকবে এটাই স্বাভাবিক। দর্শনের সেই বোধ থেকেই দীপক হালদার মানুষের কথা লিখে ফেলতে পারেন, ‘মানুষ’ শীর্ষক কবিতাতেই,

“মানে দু-খানি পায়ের দৃঢ় ছাপ বিন্যস্ত শরীরে
হাঁটা অন্তহীন চোখ জুড়ে যৌবনের খরতাপ”

এখানে ‘পায়ের ছাপ’ শ্রমের এবং ‘অন্তহীন হাঁটা’ নিরন্তর সংগ্রামের দিকেই দিশা স্থাপন করে। দর্শনের ভাষায় একে বলা যায় ‘Sisyphus’-এর সেই অন্তহীন যাত্রা, যেখানে ক্লান্তি আছে কিন্তু থামা নেই। ‘যৌবনের খরতাপ’ কেবল বয়স নয়, বরং চেতনার সেই তীব্রতা যা জগতকে দহন করে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে চায়। এটি মানুষের সেই আদিম ইচ্ছাশক্তি, সেই Will to Power, যা তাকে স্থবির হতে দেয় না কখনও। আজীবন ঋজু মেরুদণ্ড নিয়ে দীপক হালদার বাংলা কবিতার পাঠককে চিনিয়ে যেতে চেয়েছেন নৈতিকতা ও প্রতিরোধের দর্শন। অত্যন্ত নিপুণভাবে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন তিনি,

“মূলত কণ্ঠের কথা মেরুদণ্ডের কথা
স্পষ্টত এবং লক্ষ্যের”

মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার হাড়-মাংসের কাঠামোয় নয়, বরং তার কণ্ঠের সাহসে এবং মেরুদণ্ডের ঋজুতার মধ্যে। ‘কণ্ঠ’ বলতে বাক-স্বাধীনতা ও সত্যের উচ্চারণ, আর ‘মেরুদণ্ড’ বলতে চারিত্রিক দৃঢ়তার কথাই বোঝাতে চাইছি। যখনই মানুষ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় বা মেরুদণ্ড হারায়, সে তার ‘মানুষ’ পরিচয়টিও হারায়। কবি অস্তিত্ববাদের সেই তত্ত্বকেই ছুঁয়ে যান, যেখানে বলা হয় মানুষ যা হতে চায়, সে তাই। মানবজীবনের উপাদানগত ঐকতানের মধ্যে যে সঞ্জীবনী শক্তি নির্ধারণ করা আছে। তাই মানুষ কোনও বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। তার অস্তিত্বের মূলে রয়েছে প্রকৃতি। কবি লিখছেন, “আর/ মাটি ও জলের সাথে মেঘ ও রোদের কথা/ সঞ্জীবনী এই”

এখানে কবি আসলে ভারতীয় দর্শনের সেই পঞ্চভৌতিক তত্ত্বের দিকেই ইঙ্গিত করছেন না কি! মাটি, জল, আগুন অর্থে রোদ এবং বায়ু বা আকাশ বোঝাতে মেঘ-এর উপাদানগুলোর মিথস্ক্রিয়াই মানুষের সঞ্জীবনী শক্তি। প্রকৃতির এই বৈপরীত্য অর্থাৎ মেঘ ও রৌদ্রই মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখের দ্বান্দ্বিকতাকে ধারণ করে। নুয়ে পড়ে মানুষ, মহাজাগতিক মুক্তি খুঁজে চলে গভীর হাহাকার ও উত্তরণের পথ ধরে। ‘মানুষ পড়েছে নুয়ে, অন্তরীক্ষ ধুয়ে দাও তার। বলো, নিজেই রচনা করো দিন’। সভ্যতা বা পরিস্থিতির চাপে মানুষ যখন নুব্জ হয়ে যায়, কবি তখন তাকে মহাজাগতিক বা আধ্যাত্মিক মুক্তির কথা বলেন। ‘নিজেই দিন রচনা করা’ মানে ঘোরতর আত্মনির্ভরতার দর্শন, যাকে আমরা সচরাচর Self-reliance বলে থাকি। ভাগ্য বা বিধাতার ওপর নির্ভর না করে নিজের সময় বা ইতিহাস নিজেকেই লিখতে হবে। ‘জাল ছিঁড়ে আসা’ সামাজিক ও মানসিক শৃঙ্খল মুক্তির আহ্বান। ‘সেতারের তার’ বাঁধার মতো করে জীবনকে একটি সুশৃঙ্খল ও সুরময় ছন্দে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন, যা কেবল শাণিত ও সংকল্পবদ্ধ মনই করতে পারে। মানুষের জীবনের নানা ‘বাঁক’ ও অস্তিত্বের সংকটে পাঠককে এক চূড়ান্ত দার্শনিক জিজ্ঞাসার সম্মুখীন করেন কবি,

“মানুষ নিয়েছে বাঁক এ ছাড়া কোনো ফাঁক-ফোকর নেই
পৃথিবীর উপদ্রব অত্যাচার নেই
মানুষ তাহলে কি অপার্থিব বিষয় আজ জটিল গ্রন্থনা
নাকি মানুষ মানেই শূন্যতা ভরানোর ডাক”

‘মানুষ নিয়েছে বাঁক’—এই উক্তিতো আসলে বিবর্তনের বা চেতনার পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। যখন মানুষ তার মানবিক সত্তা থেকে বিচ্যুত হয়ে যন্ত্র বা অন্য কিছুতে রূপান্তরিত হয়, তখন পৃথিবীর জাগতিক অত্যাচারগুলোও যেন অর্থহীন হয়ে যায়। কবি প্রশ্ন তোলেন, মানুষ কি তবে এই পৃথিবীর কেউ নয়! সে কি কোনও ‘অপার্থিব জটিল গ্রন্থনা’! মানুষ মানেই কি তাহলে ‘শূন্যতা ভরানোর ডাক’! যা নিহিলিজম বা শূন্যতাবাদের এক চমৎকার উত্তর। মহাবিশ্বের যে আদিগন্ত শূন্যতা, মানুষ তার কর্ম, প্রেম এবং অস্তিত্ব দিয়ে সেই শূন্যতাকে পূরণ করার চেষ্টা করে। তবু ‘খাঁ খাঁ চারদিক’, চারিদিক রিক্ততা ভরে আছে। মানুষ যখন নিজেকে চিনতে পারে, তখন এই রিক্ততা আর যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে না। প্রতিটি মানুষই তার নিত্যদিনের যাপন কলায় লড়াকু সত্তা থেকে শুরু করে মহাজাগতিক একাকীত্ব পর্যন্ত দীর্ঘ পথ পরিক্রমা করে। এই পথ পরিক্রমায় তার শরীর নশ্বর হলেও, শক্ত ‘মেরুদণ্ড’ এবং নির্দিষ্ট ‘লক্ষ্য’ তাকে অবিনশ্বরতা দান করে। আর দীপক হালদারের কবিতা হয়ে ওঠে আধুনিক মানুষের যান্ত্রিকতার বিপরীতে তার অন্তর্গত ‘সঞ্জীবনী’ শক্তিকে চিনে নেওয়ার এক দার্শনিক ইশতেহারের মতো।

দীপক হালদারের জন্ম ১ আগস্ট ১৯৫০ সালে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ডায়মন্ড হারবারে। সত্তরের দশক থেকে কবিতা লেখা শুরু করলেও, তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মগ্ন শিকড়ে একা’ প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালে। এরপর ধারাবাহিক ভাবে একাধিক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পেতে থাকে। যথাক্রমে সেই তালিকায় রয়েছে, ‘আকরিক’ (১৯৯৪), ‘হে অনঙ্গ উত্তরীয়’(১৯৯৫), ‘কে তুমি অনন্ত চোখে’ (১৯৯৬), ‘তোমাকে প্রসন্ন করি’ (২০০১), ইত্যাদি। ২০১৫ সালে প্রতিভাস থেকে তাঁর ‘নির্বাচিত কবিতা’ প্রকাশিত হয়।

 দীপক হালদারের কবিতায় মানুষের অন্তর্গত সত্তায় সঞ্জীবনী শক্তির ইশারার পাশেই প্রতিধ্বনিত হয় জাগতিক বন্ধন মুক্তির এক গভীর হাহাকার, মৃত্যুচেতনা। অস্তিত্বের রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গেই কাব্যভাবনার কেন্দ্রে মৃত্যুর অমোঘ আহ্বান রেখে গেছেন তিনি। মৃত্যুকে কেবল প্রাণের শেষ হিসেবে দেখেননি, বরং তাকে দেখেছেন একটি ‘ট্রান্সফরমেশন’ বা রূপান্তর হিসেবে। ‘ঘণ্টা’র শব্দে মহাকালের ডাক বা প্রস্থানের সংকেত বুঝিয়ে যেতে চেয়েছেন। তাই অন্ধকারে চিতার উপস্থিতি অন্ধকারের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দেয় না, বরং মৃত্যুকে আরও অনিবার্য ও মহিমান্বিত করে তোলে। একাকীত্বের দর্শন প্রতিফলিত হয়। মানুষ জন্মায় একা, মরেও একা,  ‘সুনসান একা গমন’ করে। যদিও ব্যষ্টিক নির্জনতার মধ্যে এ কেবল শারীরিক একাকীত্ব নয়, এটি আত্মার সেই যাত্রাপথ যেখানে সঙ্গী, স্মৃতি বা সংসার কোনও কিছুরই প্রবেশাধিকার নেই। তবে একাকীত্বকে কবি ভয়ের বিষয় হিসেবে দেখার পরিবর্তে, বরং একটি অনিবার্য গন্তব্য হিসেবে দেখিয়েছেন। যা আসলেই নিঃসঙ্গতার নান্দনিকতা, যাবতীয় বন্ধনমুক্তির লড়াই। কবি লিখছেন,

“ডালপালা ভুলে শিকড়-বাকড় ছিঁড়ে
পূর্ণতর আগুনের দিকে নিক্ষেপের কথা”

ডালপালা ও শিকড় আমাদের পার্থিব মায়া, সম্পর্ক, খ্যাতি এবং সংসারের সঙ্গে গভীর ভাবে জড়িয়ে রাখতে চায়। প্রতিটি গাছ যেভাবে শিকড় দিয়েই মাটির সাথে নিজেকে বেঁধে রাখে, আমরাও সেভাবেই জীবনের সাথে আটকে থাকতে চাই ওতপ্রোতভাবে। কবি মনে করেন মুক্তি বা মোক্ষ লাভের জন্য এই মায়াবন্ধন ছিন্ন করা ভীষণ আবশ্যক। এটি যন্ত্রণাদায়ক কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া। কাজেই ‘আগুন’ আপাতভাবে ধ্বংসকারী হলেও, এক্ষেত্রে কিন্তু পবিত্রকারী। কাজেই সাধারণ আগুনের চেয়ে ‘পূর্ণতর আগুন’ যে একটি উচ্চতর চেতনার দিকেই ইঙ্গিত করছে, যেখানে বিলীন হয়ে যাওয়াই হল পূর্ণতা লাভ করা, তা পাঠকের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এ সবকিছুই যে জোড়ালো আওয়াজ করতে করতে ঘটে যাবে, সবসময় এমনটা ভাবাও খুব সংগত নয়। কারণ স্তব্ধতারও গুরুত্ব থাকে, যাকে আমরা Aesthetics of Silence বলি। দীপক হালদারের মতো মগ্ন চৈতন্যের কবিরা সেই স্তব্ধতার কথা বলেন। ঠিক যেমন শঙ্খ ঘোষ লিখতে পারেন ‘চুপ করো, শব্দহীন হও’, তেমনই দীপক হালদারও লেখেন,

‘এ সময় কোনো শব্দ নয় আর’

জীবনের শেষ লগ্নে এসে ভাষা তার অর্থ হারায়। জাগতিক সমস্ত কোলাহল, যুক্তি এবং আর্তনাদ তখন নিরর্থক। এই স্তব্ধতা তো আধ্যাত্মিক আত্মসমর্পণেরই সমীকরণ। চিতার আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে ভাষা যখন স্তব্ধ হয়ে যায়, তখন মহাকালের সেই ‘ঘণ্টা’ শোনা সম্ভব। বৃত্তাকার গঠনে এ শূন্যতার আবর্তন ​চলতে থাকে। জীবনের শুরুতে ঘণ্টা বেজে ওঠে কোলাহল কলোরবে, আর শেষের ঘণ্টায় ‘অন্ধকারে চিতা’র শব্দগুলো রয়ে যায়। এভাবেই সমস্ত গতির অবসান ঘটে শুধু স্থবিরতা ও মহাপ্রস্থানের অপেক্ষায়। কাজেই দীপক হালদারের কবিতা পড়তে পড়তে, উপনিষদীয় বৈরাগ্য এবং আধুনিক অস্তিত্ববাদের এক অনন্য মিশ্রণ খুঁজে পাই আমরা। তিনি দেহকে ‘ডালপালা’ ও ‘শিকড়’ হিসেবে গণ্য করে আত্মাকে সেই ‘পূর্ণতর আগুনের’ দিকে ধাবিত করার কথা বলেন। কাজেই তাঁর কবিতা শোকের কবিতা হওয়ার বদলে, অনেকবেশি ত্যাগের মাধ্যমে পূর্ণতা খোঁজার গভীরতর আধ্যাত্মিক অভিভব হয়ে ওঠে। আধুনিক বাংলা কবিতার মানচিত্রে তা যেন এক নির্জন ও গভীর আত্মানুসন্ধানের প্রতিফলন। মানুষের অন্তরের গভীর হাহাকার থেকে অস্তিত্বের সত্য খুঁজে চলেন কবি। তৃষ্ণা ও দহনের বৈপরীত্য প্রবাহ থেকে ‘অলীক ছবি’ কবিতার শুরুতে তিনি লিখছেন,

“আমাকে কেউ জলের কথা বলুক
আমাকে কেউ তলের কথা বলুক”

এখানে ‘জল’ হল জীবনের উৎস, শান্তি এবং শুদ্ধতার রূপ। অন্যদিকে ‘তল’ বলতে গভীরতাকে বোঝাতে চাইছেন কবি। কারণ অগভীর লৌকিকতায় তিনি ক্লান্ত; তাই তিনি এমন কারও সন্ধান করছেন যিনি জীবনের গভীর সত্য বা মূল শেকড় সম্পর্কে তাঁকে অবগত করবেন। এ তো এক অর্থে তাঁর আধ্যাত্মিক বা মানসিক তৃষ্ণারই বহিঃপ্রকাশ। আবার তিনি যখন বলেন,

“আমাকে কেউ বুকের ছবি দিয়ে
পথের রেখা বলুক”

তখন বোঝাই যায় তিনি দিশাহীনতায় ভুগছেন। কাজেই আশ্রয় ও পথের দিশা তাঁর বড়ো প্রয়োজন। তাই ‘বুকের ছবি’তে আবেগ, মমতা বা আন্তরিকতাকে ফুটে ওঠে। যান্ত্রিক কোনও মানচিত্র নয়, বরং হৃদয়ের উষ্ণতা দিয়ে কেউ তাকে জীবনের সঠিক পথটি দেখিয়ে দেবে, এটাই কবির প্রত্যাশা। পথ এবং হৃদয়ের মেলবন্ধন ঘটাতে চেয়েছেন কবি দীপক হালদার। এমন এক কণ্ঠস্বর শুনতে চেয়েছেন যা যান্ত্রিক নয়, প্রাণবন্ত। জ্বরের মধ্যে তীব্র এক দহন লুকিয়ে থাকে, সে জ্বর যদি শরীর ছাপিয়ে অনুভূতির শিকড়ে পৌঁছে যায়। কবিও চান এমন কেউ আসুক, যে তার ভেতরের কষ্ট বা দহনকে অস্বীকার করবে না, বরং তা অনুভব করবে। তাই তাঁর সরাসরি উচ্চারণ,

“চোখের ভাষা দিয়ে
ঘরের দোরে টানাক”

আসলেই তিনি নিবিড় আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষা করেছেন। ‘ঘর’ তো নিরাপত্তারই অনুরূপ। কাজেই বাইরের জগতের জটিলতা থেকে মুক্তি পেয়ে চোখের ইশারায় বা ভালোবাসার টানে কেউ তাকে আপন আলয়ে ফিরিয়ে আনবে, এমন এক আর্তি এখানে স্পষ্ট। এই মূর্ত বোধের পাশে চূড়ান্ত এক বিমূর্ত বোধ কাজ করছে, ‘গানের ডানা’র কল্পনায়, মানুষকে ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্নে। বাস্তবতার পাশেই কি তাহলে অলীকতার প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠল না! যদিও পরক্ষণেই কবি বলে ওঠেন,

“আমাকে কেউ অলীক ছবি ছিঁড়ে
রেখায় রেখায় আরও…”

‘অলীক ছবি’ হল সেই মোহ বা মায়া যা আমাদের ঘিরে থাকে, ঘিরে রাখে। কবি এই মায়াবী আবছায়া থেকে মুক্তি পেতে চান। তিনি চান সেই অলীক কল্পনাগুলো কেউ ছিঁড়ে ফেলুক এবং বাস্তবের রূঢ় ও স্পষ্ট ‘রেখায়’ তাকে জীবনের প্রকৃত রূপ দেখাক। ‘রেখায় রেখায় আরও’ এই অসম্পূর্ণতা প্রকৃতপক্ষে ইঙ্গিত দিয়ে যায় যে, সত্যের কোনও শেষ নেই; এটি একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া। যে প্রক্রিয়ায় ‘আমাকে কেউ…’ আর্তি বা অনুরোধের কাঠামোয় পাঠককে কবি তাঁর একাকীত্বের সাথে একাত্ম করে তোলেন। পাঠককে এই একাত্ম করতে পারার সার্থকতাটাই তাঁর কবিতার ধীর লয়ের সুর, যা অনেকটা প্রার্থনার মতো শোনায়। তাঁর এক একটি কবিতা আধুনিক মানুষের নিঃসঙ্গতা থেকে সত্যে ফেরার ব্যাকুলতা হয়ে ওঠে। মানুষ প্রতিনিয়ত যে মিথ্যে আবেগ আর মেকি ছবির আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখে, কবি সেই আবরণ ভেঙে এমন এক পৃথিবীতে পৌঁছাতে চান যেখানে আবেগ হবে স্বচ্ছ জলের মতো, গভীরতা হবে প্রকৃত তলের মতো এবং জীবন হবে অলীকতাহীন। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই দীপক হালদারের কবিতা পড়ার পরেই তা শেষ হয়ে যায় না, তাঁর কবিতা যেন পাঠকের মনে এক চিলতে হাহাকার আর গভীর অনুসন্ধিৎসা জাগিয়ে রাখে। ক্ষুদ্র অবয়বের কবিতাগুলিতে কবি অস্তিত্বের দহন, গন্তব্যের তৃষ্ণা এবং সৃষ্টির উৎস নিয়ে এক গভীর দার্শনিক বয়ান তৈরি করেন। যেমন ‘তাপ’ কবিতা তার চমৎকার দৃষ্টান্ত। তাপ সাধারণত রূপান্তরের প্রতীক। এটি একদিকে যেমন ধ্বংসাত্মক, অন্যদিকে তেমনই সৃজনশীলতারও শক্তি। কবির দৃষ্টিতে মানুষের জীবন বা চেতনা এক নিরন্তর উত্তাপের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। এই তাপ হল পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, না-পাওয়ার বেদনা এবং জীবনের গূঢ় সত্য অনুসন্ধানের এক ছটফটানি। সেই কবিতা শুরু হচ্ছে শুরু হচ্ছে ‘জল’ও ‘গানের’ কথা বলতে বলতে। কবি লিখলেন,

‘জল কোনো শব্দ নয় গান”

‘জল’ যে জীবনের প্রবহমানতা বয়ে আনে, একথা নতুন করে বলার কিছু নেই। তবে কবির দৃষ্টিতে জল কেবল বস্তু নয়, এটি একটি ছন্দ। কবি একে ‘শব্দ’ যা কেবল কানে শোনা যায়, তা না বলে ‘গান’ যা হৃদয়ে অনুভূত হয় সেরকম ভাবতে পেরেছেন। গান হল শৃঙ্খলাবদ্ধ সৌন্দর্য। জীবনের এই তারল্য বা প্রবাহ যখন সুসংগত হয়, তখনই তা সার্থক হয়। ‘গান’ জীবনের পরম প্রশান্তি বা মোক্ষকে নির্দেশ করে। আধুনিক মানুষের জাগতিক তৃষ্ণা উপলব্ধি করেছেন কবি। তাই মানুষের জাগতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও গতির প্রতি আসক্তি ফুটে উঠেছে তাঁর কাব্যভাবনায়, ‘তুমি বেগবান যান চাও বলে বহুদিন বায়না ধরেছো’। আধুনিক মানুষ স্থিরতায় বিশ্বাসী নয়; সে নিরন্তর ছুটতে চায়। এই ‘বেগবান যান’ হতে পারে উন্নতির আকাঙ্ক্ষা বা জাগতিক সাফল্যের প্রতীক। কিন্তু এই গতির নেশায় মানুষ প্রায়ই প্রকৃতির সহজ ‘আলো’ ও ‘আলপথ’ থেকে বিচ্যুত হয় এবং একা হয়ে পড়ে। চেতনার গভীরতর সংকট থেকেই কবিকে লিখতে হয়,

“তোমার দু-চোখ প্রতিদিন জলে ও আগুনে এক ভয়ংকর তাপ ছুঁয়ে আছে”

এখন প্রশ্ন হতে পারে, জল ও আগুনের সহাবস্থান কি কখনও সম্ভব! দীপক হালদারের কবিতার সংঘাত এখানেই। গভীর অর্থে প্রতিটি মানুষের চোখ বা অন্তর্দৃষ্টি একই সাথে অশ্রু বা জল এবং দহন বা আগুন ধারণ করে আছে। এটি মানবের এক চিরন্তন বৈপরীত্য। একদিকে সে আবেগে সিক্ত হতে চায়, অন্যদিকে কামনা-বাসনায় দগ্ধ হতে থাকে। এই দুইয়ের সংঘর্ষে যে ‘ভয়ংকর তাপ’ উৎপন্ন হয়, তা-ই মানুষের অস্তিত্বকে কুরে কুরে খায় অহর্নিশি। আসলে মানুষ কোনও শান্ত ‘দ্বীপ’ নয়, বরং সে এক অশান্ত অস্থিরতা। তাই দ্বৈতবাদের বিলোপের পর যে পরম উপলব্ধি জাগে, সেই উপলব্ধির গভীরতর প্রদেশ থেকে উত্থিত হয় প্রগাঢ় সত্যের বীজ,

‘জল কোনো শব্দ না আগুনও নয়
গান’

জল ও আগুনের সংঘাতকে ছাপিয়ে এক তৃতীয় মাত্রার কথা বলে যান দীপক হালদারের মতো আত্ম-মন্ময় কবিরা। জীবন কেবল ক্লান্তি বা কেবল দহন নয়। এই সমস্ত অভিজ্ঞতার নির্যাসই হল একটি সুসংগত সুর বা ‘গান’। যখন মানুষ নিজের ভেতরের এই তাপকে শিল্পে বা উচ্চতর চেতনায় রূপান্তরিত করতে পারে, তখনই জগতের সমস্ত বিচ্ছিন্নতা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। জলে যেমন নিরন্তর জীবনপ্রবাহ, করুণা ও সৃষ্টিশীলতার প্রবাহ আছে। ঠিক তেমনই আধুনিক যান্ত্রিকতায় ইচ্ছা ও বাস্তবের সংঘাত ভেতরের দহনক্রিয়া তৈরি হলেও, গানের মধ্যে জীবনের পরম সত্যের অঙ্গিকার রাখা আছে, যা জাগতিক সমস্ত দ্বান্দ্বিকতার ঊর্ধ্বে। দীপক হালদারের কবিতা সেই দ্বান্দ্বিকতার উর্ধ্বে উঠে মানুষের অন্তর্জগতের মানচিত্র হয়ে ওঠে। জীবনের পথে চলতে গিয়ে আমরা যে দহন অনুভব করি, তা আসলে কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। জল আর আগুনের এই যে খেলা আমাদের দৃষ্টিতে বা অনুভবে চলে, তার শেষ গন্তব্য হওয়া উচিত একটি সংগতিপূর্ণ সুর। কবি এখানে বস্তুবাদী গতির চেয়ে আত্মিক প্রশান্তিকে বা সৃষ্টির আনন্দকে বড়ো করে দেখেছেন। বড়ো করে দেখেছেন ‘গান’। একাধারে সৃষ্টিতত্ত্ব, অস্তিত্ববাদ এবং বিবর্তনবাদী দর্শনের সংমিশ্রণে, অসীম সসীমের দ্বান্দ্বিকতা কবিতার পঙক্তিতে পঙক্তিতে যেন এক একটি দার্শনিক স্তরের উন্মোচন ঘটিয়েছেন। ‘ব্রহ্মাণ্ড’ কবিতার শুরুতেই মৌলিক প্রশ্ন চিহ্ন তৈরি করছেন,

‘বীজে কি ব্রহ্মাণ্ড থাকে?’

এ প্রশ্ন কেবল জীববিজ্ঞানের প্রশ্ন নয়, এ এক মহাজাগতিক জিজ্ঞাসা। এ প্রশ্ন সম্ভাব্যতা বনাম বাস্তবতার প্রশ্ন। একটি ক্ষুদ্র বীজের ভেতর একটি বিশাল মহীরুহের নকশা বা ‘ব্লু-প্রিন্ট’ সুপ্ত থাকে। দর্শনশাস্ত্রের ভাষায় এটি ‘Potentiality’ বা সম্ভাবনা এবং ‘Actuality’ বা বাস্তবতার সম্পর্ক। উপনিষদের সেই ‘অণোরণীয়ান্ মহতো মহীয়ান্’ অর্থাৎ অণু থেকে অণু, মহৎ থেকে মহৎ চেতনার প্রতিফলন এখানে লক্ষ্য করা যায়। ক্ষুদ্রের ভেতরেই বৃহতের অবস্থান, এই ধারণাই ব্রহ্মাণ্ডের মূল কথা। যদি ক্ষুদ্রতম একক বীজ পূর্ণতাকে ধারণ না করত, তবে বিশ্বের কোনও কিছুই পূর্ণতা পাওয়া সম্ভব হতো কি! কবির পুনরাবৃত্তি ‘বীজে কি ব্রহ্মাণ্ড’ তাই কোনও সংশয় নয়, বরং বিস্ময় মিশ্রিত এক ধ্রুব সত্যেরই অনুসন্ধান। আবার আত্মস্থ অসুখের সৃজনশীল যাতনা থেকে তিনি বলছেন,

“আত্মস্থ অসুখে ভাঙি শাখা ও প্রশাখা
ভেঙে ফেলি বাহারি আলাপ”

এখানে ‘অসুখ’ শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জীবনানন্দ দাশের ‘বিপন্ন বিস্ময়’ বা জিবরানের যাতনার মতো, এখানে অসুখ বলতে এক ধরণের ‘Divine Restlessness’ বা দিব্য অস্থিরতাকে বোঝানো হচ্ছে। বৃদ্ধি বা বিবর্তনের জন্য পুরাতনকে ভাঙতে হয়। বীজ যখন অঙ্কুরিত হয়, তখন তার বহিরাবরণ ভেঙে যায়। এই ‘ভাঙা’ বেদনাদায়ক হলেও তা বিকাশের পূর্বশর্ত। তাই বাহারি আলাপ বর্জন করাটাই শ্রেয়। ‘বাহারি আলাপ’ হল বাইরের চটক বা অগভীর আড়ম্বর। দার্শনিক সত্যে পৌঁছাতে হলে মানুষকে বাইরের অলঙ্কার ত্যাগ করে ভেতরের সারবস্তুর দিকে তাকাতে হয়। কবিও নিজের ভেতরের শাখা-প্রশাখা অর্থাৎ চিন্তার জটজাল ভেঙে মূল সত্যের দিকে এগোতে চাইছেন। প্রত্যক্ষ করছেন বিবর্তনের ঊর্ধ্বগমন,

‘দেখি শিখা ক্রমশ উন্নত উদ্ভিদ ও কাণ্ডময় গানে গানে’

‘শিখা’র আগুন ইঙ্গিত দেয়, প্রাণ কেবল কোষের সমষ্টি নয়, প্রাণ এক ধরণের তেজ বা শক্তি। উপনিষদীয় অগ্নি বা হেরাক্লিটাসের ‘Fire’ দর্শনের মতো, যা সবকিছুকে রূপান্তরিত করে। ‘কাণ্ডময় গান’ এ এক অনন্য চিত্রকল্প। উদ্ভিদ যখন বড়ো হয়, তার বেড়ে ওঠার মধ্যে এক ধরণের ছন্দ বা সঙ্গীত থাকে। কবি দীপক হালদার হয়তো এখানে প্রকৃতির জ্যামিতিক প্রবৃদ্ধি বা ‘Fibonacci sequence’-এর সেই সুশৃঙ্খল সৌন্দর্যকে বুঝিয়েছেন, যা কবির কানে গানের মতো ধরা দিচ্ছে। তাই ‘উন্নত উদ্ভিদ’ মানে কেবল লম্বায় বড়ো হওয়া নয়, বরং এটি চেতনার উত্তরণ। একটি তুচ্ছ বীজ থেকে শুরু হয়ে মহাজাগতিক পূর্ণতায় পৌঁছানোর যে যাত্রা, তা-ই এখানে সার্থক হয়েছে দীপক হালদারের ব্রহ্মাণ্ড চেতনার বৈভবে। কবিতার শরীরে যিনি ক্ষুদ্রের মধ্যে বিরাটের দর্শন এঁকে রাখেন। কবি জানেন আমাদের অস্তিত্বের ক্ষুদ্র আধারেও মহাবিশ্বের সমস্ত সম্ভাবনা সুপ্ত আছে। তবে সেই পূর্ণতাকে লাভ করতে হলে প্রয়োজন ‘আত্মস্থ অসুখ’ বা ভেতরের তাগিদ এবং অগভীর বাহ্যিকতাকে বিসর্জন দেওয়ার সাহস। তাই দীপক হালদারের কবিতা দর্শনের বিবর্তনবাদকে আধ্যাত্মিক উপলব্ধির এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে অনায়াসে।

জীবনানন্দ-পরবর্তী আধুনিক কবিতার ধারায় তাঁর কবিতার এক একটি পংক্তি মানুষের জীবনদর্শনের এক একটি গূঢ় সত্যকে উন্মোচন করে। বহির্জগত বনাম অন্তর্জগতের দ্বন্দ্বে নিরন্তর প্রতিভাত হয় অস্থির মানুষের প্রতিচ্ছবি। তার চোখের নিচে জমে আছে ‘অনেকগুলো তর্ক’ এবং পায়ের তলায় ‘অনেকগুলো প্রশ্ন’। এটি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সেই ক্লান্তিকর বাস্তবতাকে নির্দেশ করে, যেখানে যুক্তি আর প্রশ্নের ভারে প্রতিটি পদক্ষেপ কণ্টকাকীর্ণ। মানুষের ‘গলায় অনেক কথা’ জমে থাকে, অর্থাৎ তার অনেক কিছু বলার আছে, অনেক প্রতিবাদ বা আকুতি আছে জমাটবদ্ধ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, মানুষ শেষ পর্যন্ত বেছে নেয় ‘গর্ভ নীরবতা’। এই নীরবতা মানে শূন্যতা নয়, বরং এক গভীর প্রসববেদনার মতো গর্ভজাত মৌনতা, যা সব কোলাহলকে ছাপিয়ে বড়ো হয়ে ওঠে। মানুষ সভ্যতার প্রয়োজনে অনেক নিয়মকানুন শেখে, জীবনের নানা পাঠ গ্রহণ করে। কিন্তু কবিতার ভাষায়,

‘তবুও সে বিদঘুটে এক জটিল বন্যমায়ায় ছোটে এবং ছোটায়’

মানুষের অবচেতন মন যেন কোনও নিয়মের তোয়াক্কা করে না। এক অদ্ভুত ‘বন্যমায়া’ বা অদম্য বাসনা তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। এই ছোটাছুটি কেবল নিজের নয়, সে তার জীবনযাপনকেও সেই অনিশ্চয়তার দিকে ছুটিয়ে মারে। এখানেই মানুষের আদিম সত্তা আর অর্জিত শিক্ষার এক সংঘাত ফুটে ওঠে। প্রশ্নের বীজ ক্রমাগত বিন্যস্ত হয়। কবি দেখান, মানুষের জীবনযাপন কেবল বর্তমানের নয়, তা আগামীর গর্ভকেও ধারণ করে। ‘অনেকগুলো বীজের অনুরণন’ তো সেইসব প্রশ্ন বা সংশয় থেকেই উঠে আসে। যা ভবিষ্যতের বুকে নতুন কোনও বোধের জন্ম দেয়। ‘রেখার পরে রেখা’ এঁকে চলে জীবনের জ্যামিতিক জটিলতা, যেখানে মানুষ প্রতিদিন নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার চেষ্টা করে, কিন্তু অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর উত্তর অধরাই থেকে যায়। আত্মসংবরণের সংবেদনশীলতায় ‘অনেক অশ্রুদমন থাকে বুকের তলায়’। এটি মানুষের সেই চিরন্তন ট্র্যাজেডি, যেখানে বাইরের তাত্ত্বিক লড়াই, যুক্তি বা বন্যমায়ার আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক পশলা বৃষ্টি। মানুষ তার সবটুকু আবেগ পৃথিবীর সামনে প্রকাশ করে না। তার বীরত্ব বা তার বেঁচে থাকার লড়াইয়ের পেছনে যে নিভৃত ক্রন্দন থাকে, তাকে সে দমন করে রাখে। এই ‘অশ্রুদমন’ই শেষ পর্যন্ত মানুষকে মানুষ হিসেবে টিকিয়ে রাখে, তাকে গভীরতা দান করে। দীপক হালদারের কবিতা তাই মানুষের যাপনের এক নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ হয়ে ওঠে। কবি বারবার দেখাতে চান, মানুষ যুক্তির পৃথিবীতে বাস করেও আসলে আবেগের বশবর্তী এক অনির্দিষ্ট যাযাবরের মতো। তার অর্জিত শিক্ষা আর ভেতরের বন্যতার মধ্যে যে ব্যবধান, তা সে পূরণ করে নীরবতা আর অশ্রুদমনের মাধ্যমে। সুতরাং তর্কের চেয়েও বড়ো সত্য হল মানুষের নীরব হাহাকার এবং তার অস্তিত্বের গভীর গহন মায়া। আধুনিক মানুষের অস্তিত্বের সংকট, আত্মবিস্মৃতি এবং প্রকৃতির সাথে বিচ্ছিন্নতার ক্ষুদ্র পরিসরে সমকালীন কোলাহল থেকে সরে এসে কবি দীপক হালদার সামগ্ৰিকভাবে এক মৌলিক সত্য বা ‘অক্ষরেখা’ খোঁজার চেষ্টা করেছেন অহরহ। আত্মানুসন্ধানের যাত্রায় ক্লান্তিও ধরা পড়ে কখনও কখনও,

‘বড্ড বেশি হই-হট্টগোল হল’

এই কোলাহল কেবল বাহ্যিক নয়, বরং আধুনিক জীবনের সেই অর্থহীন ব্যস্ততা যা আমাদের অন্তরাত্মাকে গ্রাস করে নেয়। ‘পাঁক ঘাঁটা’ জীবনের নেতিবাচকতা, কাদা ছোড়াছুড়ি বা কেবল জৈবিক প্রয়োজনে বেঁচে থাকার গ্লানিকে ছুঁয়ে থাকে। কাজেই জীবনের অনেকটা সময় অপচয় হওয়ার পর ‘অক্ষরেখায়’ ফেরার উপলব্ধি হওয়া স্বাভাবিক। তাই ‘অক্ষরেখা’ তাঁর কবিতায় কেবল ভূগোলের কাল্পনিক রেখা নয়, এটি জীবনের সেই মূল কেন্দ্রবিন্দু বা ভারসাম্য, যা হারিয়ে গেলে মানুষ কক্ষচ্যুত হয়। তাই প্রবল আত্মসচেতন কবি নিজের কাছে নিজেকে ফিরে পাওয়ার আহ্বান করতে পারেন, ‘সম্বিতে মাখো নিজেকে’ এই অনবদ্য পংক্তির মধ্য দিয়ে। আসলে অবয়বহীনতা ও আত্মপরিচয়ের সংকট যখন প্রবল হয়ে ওঠে তখন ভয়াবহ পরাবাস্তব সত্য উন্মোচিত হয়। কবি যখন দেয়ালে সাঁটানো ‘প্রাচীর-পত্র’ বা পোস্টারের চোখ থেকে কিছু নিতে চান, তখন দেখেন তাঁর নিজের কোনও অস্তিত্বই অবশিষ্ট নেই। তাই লেখা হয়,

“আমার চোখের আর অবশেষ নেই,
দেহেরও নেই অবয়ব!”

এটি আধুনিক মানুষের এক চরম ট্র্যাজেডি। আমরা অন্যের আদর্শ, অন্যের জীবনদর্শন বা বাইরের চাকচিক্য অনুকরণ করতে করতে নিজেদের মৌলিকত্ব হারিয়ে ফেলি। কবি তাই বলতে চাইছেন, বাইরের জগতের গোলমেলে ভিড়ে মিশে যেতে যেতে আমরা এতটাই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছি যে, আয়নার সামনে দাঁড়ালে বা নিজের মুখোমুখি হলে সেখানে কোনও পূর্ণাঙ্গ সত্তা খুঁজে পাওয়া যায় না। আমরা তখন কেবল ছায়া, কোনও রক্ত-মাংসের মানুষ নই। প্রকৃতির প্রতি বিমুখতা ও মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগের বড়ো অভাব অনুভব করেছেন কবি। সেই অনুভব থেকেই হৃদয়ের গভীরে জমা হয় একরাশ প্রশ্ন। তবে এই পতনের কারণও তিনি খুঁজতে চেয়েছেন।

‘তাহলে কি সংশ্রবে ভুল ছিল কোনো?’

এই জিজ্ঞাসা তো সেই প্রশ্নকেই উসকে দেয়। আমরা কি তাহলে একে অপরের সাথে ঠিকঠাক যুক্ত হতে পারিনি? তাহলে কি আমাদের প্রেমের ভেতরেও প্রকাণ্ড প্রতারণা ছিল? যদি তা না থাকে, তবে বৃষ্টি নামলেও মাটি কেন সেই রস গ্রহণ করতে পারল না? তবে কি সুযোগ বা সম্পদ থাকা সত্ত্বেও আমাদের ‘গ্রহণ ক্ষমতা’ নষ্ট হয়ে গেছে? শিকড় যদি জল না পায়, তাহলে আমরা আমাদের সংস্কৃতি ভিত্তি ও ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ব ক্রমশ। তাই জীবনের প্রতি কবির কৌতূহল বা ‘জিজ্ঞাসা’ বাড়ে। গাছে যদি জিজ্ঞাসার ফুল না ফোটে, তবে সে জীবন জড়তা ছাড়া আর কিছু নয়। কোলাহলে ভেসে থাকা জীবনের বিচ্ছিন্নতাবোধ বা Alienation-এ আমরা আমাদের মূল শিকড়ে জল দিতে ভুলে যাচ্ছি বলেই, ভেতর থেকে শুকিয়ে যাচ্ছি নিরন্তর। কাজেই দীপক হালদারের ‘অক্ষরেখা’ মানব-সমাজের পটভূমিতে যেন এক সতর্কবাণী। কারণ বাইরের প্রাচীর-পত্রের ভাষা পড়ার আগে নিজের ভেতরের ‘সম্বিত’ বা চেতনাকে পড়া জরুরি। যদি আমরা আমাদের নিজস্ব অক্ষরেখা থেকে এভাবে বিচ্যুত হই, তবে শেষ পর্যন্ত আমরা আমাদের দৃষ্টি, অবয়ব, আত্মপরিচয় সবই হারাতে বসব। কাজেই গভীর অতৃপ্তি ও জিজ্ঞাসার মধ্য দিয়ে, কবি দীপক হালদার বাংলা কবিতার পাঠককে তথা মানবসভ্যতাকে নিজের জীবনের ভিত্তি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেন। দীপক হালদারের কবিতা আসলেই অস্তিত্ববাদ, মানবধর্ম এবং জীবনদর্শনের এক সুগভীর নির্যাস। তাই,

‘কে কার সংলগ্ন বড়ো কথা নয়, বড়ো কথা নিজেকে বানানো’

এটি আধুনিক অস্তিত্ববাদের একটি মূল সুর। আমরা কার সাথে যুক্ত বা আমাদের সামাজিক পরিচয় কী, তার চেয়ে বড়ো হয়ে দাঁড়ায় ‘স্ব-নির্মাণ’। ফরাসি দার্শনিক জাঁ-পল সার্ত্র বলেছিলেন, ‘Existence precedes essence’ অর্থাৎ মানুষ আগে জন্মায়, তারপর নিজের কর্ম ও চিন্তার মাধ্যমে নিজেকে তৈরি করে। কবির ভাষায় এই ‘নিজেকে বানানো’ এবং ‘রাঙানো’ হল জীবনের সেই নিরন্তর প্রক্রিয়া, যেখানে মানুষ তার সীমাবদ্ধতাকে জয় করে এক অনন্য সত্তায় পরিণত হয়। ফলে শিকড় ও কাণ্ডের দর্শন তো স্থায়িত্ব বনাম অস্থিরতারই দৃষ্টান্ত। মানুষের জীবন চঞ্চল, কিন্তু কবি বৃক্ষের আদর্শে বোধের ‘গভীরে শিকড়’ এবং কাণ্ড হয়ে ওঠার কথা বলছেন। শিকড় আমাদের নৈতিক ভিত্তি এবং মূল্যবোধের প্রতীক। যার শিকড় নেই, সে সাময়িক ঝড়ে উপড়ে যায়। আর কাণ্ড হল ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা। কবি বলতে চাইছেন, জীবন এমন হওয়া উচিত যাকে ‘খরস্রোতা নদী’ অর্থাৎ বা প্রতিকূল সময়ও ভাঙতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন নিঃস্বার্থ সেবায় মগ্ন হয়ে মানুষের কাছে পৌঁছানো।

‘প্রয়োজন মানুষের কাছাকাছি থাকা, কাজে লাগা যখন-তখন’

একে বলে ‘Altruism’ বা পরার্থপরতার শিক্ষা। বৃক্ষ যেমন ফল, ফুল বা ছায়া দেওয়ার সময় কোনও বৈষম্য করে না, মানুষের জীবনও তেমনই হওয়া উচিত। প্রকৃতির উদারতা, ফসল, জল ও স্থলের কথা বলার মধ্য দিয়ে গভীর অর্থে কবি বোঝাতে চেয়েছেন, প্রকৃত সার্থকতা ভোগের মধ্যে নয়, বরং বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যে। কাজেই স্থিতধী হওয়া খুব জরুরি। কবিও সেই বার্তা দিয়ে গেছেন,

‘নিজেকেই থিতু করো রোজ’

এ কথা বলার মাধ্যমে কবি এক ধরণের ধ্যানমগ্ন স্থিতিশীলতার কথা বলতে চেয়েছেন, যা অস্থির আধুনিক মানুষকে মানসিক শান্তি ও গাম্ভীর্য এনে দেয়। চারিত্রিক দৃঢ়তা ও নৈতিক সচেতনতার প্রশ্নে সতর্ক করতে চেয়েছেন মানুষকে। তাই যা কিছু আগাছার মতো আমাদের ভেতরের কুচিন্তা বা তুচ্ছ মোহ জাগিয়ে ব্যক্তিত্বকে গ্রাস করতে চায়, তা সমূলে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়াই সংগত। শিরদাঁড়ার বাঁক বা মেরুদণ্ডহীনতা বা আপসকামিতার বদলে ঋজু মানসিকতা ও দৃঢ় মনোবৃত্তির প্রত্যাশা করেছেন কবি। বৃক্ষ যেমন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আকাশ স্পর্শ করতে চায়, মানুষের বিবেক ও শিরদাঁড়াও তেমনই ঋজু হওয়া প্রয়োজন। নৈতিক স্খলন বা মেরুদণ্ডহীনতা একজন মানুষকে বৃক্ষ থেকে আগাছায় পরিণত করে। মহাজাগতিক যাত্রা ও বোধের লালন করেছেন আদর্শের পথে। জীবন কোনও গন্তব্য নয়, বরং একটি নিরন্তর ভ্রমণ। আর এই ভ্রমণে সর্বোচ্চ পাথেয় হল ‘বোধ’। এই ‘বৃক্ষ-বোধ’ আসলে কী? এটি হল ধীরতা, সহনশীলতা, পরোপকার এবং নিজের ওপর অটল বিশ্বাস থেকে জীবনের উপত্যকায় জন্মানো সত্য ও দর্শনের অনুরণন। ফলে আমরা এ কথা বলতেই পারি যে, দার্শনিক দৃষ্টিতে কবি দীপক হালদারের কাব্যভাবনা মানুষকে তার জৈবিক অস্তিত্ব ছাড়িয়ে এক মহত্তর মানবিক সত্তায় উন্নীত হওয়ার আহ্বান জানায়। কবি বলতে চান, মানুষের আয়ুষ্কাল বা পৃথিবী তার হাতের মুঠোয় থাকলেও, প্রকৃত ‘মানুষ’ হয়ে উঠতে গেলে তাকে বৃক্ষের মতো স্থির, গভীর এবং কল্যাণমুখী হতে হবে। বাহ্যিক অলঙ্কারের চেয়ে অভ্যন্তরীণ কাঠামো বা চরিত্রের দৃঢ়তাই জীবনকে সার্থক করে তোলে। দীপক হালদারের কবিতা তাই মানুষের কথা, মানবজীবনের কথা ও মানবসভ্যতার কথা বলে যায় অহরহ। কাজেই আমাদের মনে রাখতে হবে,

‘মানুষের পাশে মানুষ দাঁড়ালে মানুষ ঈশ্বর হয়ে ওঠে’


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top