পাপ -পর্ব ১৮

paap18

চিঠিটা শেষ পর্যন্ত লিখতে পেরেছিলাম অনেক কষ্টে। অশৌচ বাড়ি বলে পুরুষ মানুষেরা একটা ঘরে বিচালি বিছিয়ে তার ওপর কম্বল পেতে এক সঙ্গে শুচ্ছিল। জায়েরা তো আমাকে গ্রহণ করতে পারছিল না , তাই আমি আর ওদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে গল্পে যোগ দিচ্ছিলাম না। সেদিনের পর আর ওদের সঙ্গে কথা বলার প্রবৃত্তি হয়নি। খুব কেজো কথা ছাড়া ওরাও আমার সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী হয়নি। এক সুযোগে দুপুরে সবার অলক্ষ্যে শৈলেন বাবুর ঘরে ঢুকে একটা নীল রঙের চিঠির কাগজ আর পোষ্ট কার্ড নিয়ে এলাম । হব্যিষ‍্যি দিতে আসা এক প্রতিবেশিনীর হাতে দিয়ে অনুরোধ করেছিলাম যেন সেটা ডাক বাক্সে দেওয়া হয়। পরে জেনেছিলাম সে চিঠি ঠিকানায় পৌঁছায় নি। হয়তো অতি কৌতূহল বসত আঠা খুলে পড়ে দেখতে গিয়ে সেখানা আর পাঠানোর যোগ্য ছিল না।

কঙ্কার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। জায়েরা আলোচনা করছিল এবার সবাই বাড়ি ফিরে আসবে। মানদা আর আমি থাকবো, দেওরেরও বিয়ে হচ্ছে। সংসারে কাজ করার অনেক লোক হল, সুতরাং ওকে আর দরকার নেই। শয্যাশায়ী শাশুড়ির সেবা যত্নের জন্য তার দরকার ছিল, এখন রোগীর মৃত্যুর পর প্রয়োজন ফুরিয়েছে। তাছাড়া অমন দুশ্চরিত্রাকে বাড়িতে রাখা মানে নিজেদের বিপদ ডেকে আনা। ওদের মতে পুরুষ মানুষের স্বভাবই হল ফুলে ফুলে মধু খেয়ে বেড়ান। মেয়েমানুষ দেখলেই ছোঁক ছোঁক করা হল ওদের প্রকৃতি। তাদের আর দোষ কী, বিধাতা তাদের অমন করেই গড়েছেন। মেয়েমানুষ যদি নিজেদের সামলে সুমলে না রাখে তাহলে দোষটা তাদেরই। নষ্ট চরিত্তিরের মেয়েরা অবশ্য এমনটাই করে। পুরুষ মানুষের চার পাশে ঘুরঘুর করে বেড়ায়, শরীরের লোভ দেখায়। দার্শনিকের মতো মুখ করে নিজেদের কুযুক্তি পূর্ণ কথা গুলো ওরা আলোচনা করে। নারী হয়েও অন্য নারীর চরিত্রের দিকে আঙ্গুল তুলতে এদের বাধে না। কুশিক্ষায় আকন্ঠ নিমজ্জিত এই মানুষ গুলো নিজের সন্তানদেরও এমনই কুশিক্ষা দেয়।

একসময় অশৌচের কাল ফুরোলো, শ্রাদ্ধের আগের দিন এঁদের মামার বাড়ি থেকে ঘাট কাজের নতুন বস্ত্র এল। পাড়া প্রতিবেশী, চেনা মানুষজন এবং এদের আত্মীয় স্বজনরা হব্যিষ‍্যি হিসেবে প্রচুর ফলমূল, আতপ চাল, ঘি ইত্যাদি দিয়ে ভাঁড়ার ঘর ভরিয়ে ফেলেছিল। আস্তে আস্তে বাড়ি ভরে উঠতে লাগলো আত্মীয় স্বজনে। এঁদের কাউকেই তো চিনি না, সবার আলোচনার বিষয় বস্তু হয়ে নিজেকে যে কতটা অসহায় অবাঞ্ছিত মনে হচ্ছিল তা একমাত্র ভগবানই জানেন। জায়েদের বাপের বাড়ির লোকজন এল কিন্তু নিমন্ত্রণ পত্র পাঠানো হলেও আমার বাপের বাড়ির কেউ এল না। তাদের বাড়ির মেয়ের বিয়ে তাই অশৌচ বাড়ি থেকে নিজেদের দূরে রাখল। লোক দিয়ে কিছু টাকা হবিশ্যি আর ঘাট কাজের কাপড়ের জন্য পাঠিয়ে কর্তব্য সেরে ফেলল। বলাবাহুল্য সে লোক বাইরের ঘর থেকেই বিদেয় নিয়েছিল এ বাড়ির জল পর্যন্ত স্পর্শ করেনি। তার আসার খবর আমি অনেক পরে পেয়েছিলাম। খুব আশা করেছিলাম কেউ যদি আসে তাহলে এই পাপ পুরী থেকে পালিয়ে বাঁচব, লতাকে বাঁচাব। 

………………………………………………

আজিকে হয়েছে শান্তি জীবনের ভুল ভ্রান্তি সব গেছে চুকে।

রাতদিন ধুক ধুক তরঙ্গিত দুঃখ সুখ 

থামিয়াছে বুকে।

(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

শ্রাদ্ধের দিন পুত্রবধূ হিসেবে ছয় দান দিলাম, সংস্কৃত মন্ত্র গুলোর অর্থ জানি না, শুধুমাত্র কল্যাণ কামনা আর প্রার্থনা আত্মাকে তার মোহের কালিমা ঘুচিয়ে সুন্দর সচ্চিদানন্দ স্বরূপে ফিরিয়ে আনতে পারে কিনা তাও জানি না । আমি সর্বান্তকরণে প্রার্থনা জানিয়ে ছিলাম ভগবানের কাছে এই মাত্র। 

ষোড়শ উপাচারে শ্রাদ্ধ হল। বড় ভাসুরের ইচ্ছে ছিল বৃষোৎসর্গ শ্রাদ্ধ করবেন। কিন্তু তার খরচের বহর শুনে পিছিয়ে এলেন। সমস্ত খরচ তিন ভাই মিলে করলেও মাঝে মাঝেই খরচ আর হিসেব নিয়ে বিস্তর কথা কাটাকাটি হয়েছে। নিজেদের কর্মক্ষেত্রের লোকজনকে নিমন্ত্রণ করতে গিয়ে অন্য ভাইদের কাছে খরচ বেড়ে যাওয়ার জন্য খোঁচা খাওয়া এবং খোঁচা দেওয়া এসব চলছিল। দুই জায়ের মধ্যেও এ নিয়ে তিন বার ঝগড়া এবং কথা বলা বন্ধ হল। যদিও পরে আবার মিটমাট হয়ে গিয়েছিল।

আদ্যশ্রাদ্ধ, নিয়মভঙ্গ, মৎসমুখীর পর বাড়ি আবার নির্জন হয়ে এল। বউ আর ছেলে মেয়েদের নিয়ে রতনও এসেছিল। ছোট ভাইয়ের বিয়ের ব্যাপারে আলোচনার জন্য ভাসুররা থেকে গেলেন, ছেলে পুলের পড়াশোনা হচ্ছে না বলে দুই জা চলে গেল। সঙ্গে নিয়ে গেল রতনের বউকে। ছেলে মেয়ে গুলোর সামনেই পরীক্ষা তাই ওরা এখনই এ বাড়িতে আসবে না। পরীক্ষা শেষ হলে একেবারে তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে আসবে। মানদা এবাড়িতে সব সময় রাতে থাকে না, কোন কারণে থাকলে রান্না ঘরে শোয়। কঙ্কা রান্নার কাজ খুঁজতে শুরু করেছে। ও জানে আর এখানে থাকা হবে না, এরা ওকে তাড়িয়ে দেবে। 

বিকেলের পর থেকেই এ বাড়ির চারদিকটা যেন থমথমে হয়ে যায়। গাঁয়ের মানুষের ভুত প্রেতের ভয় সংস্কারের গভীরে প্রোথিত হয়। আমিও তার ব্যতিক্রম নই, এখন সন্ধে দিতে গেলেও শাশুড়ির ঘর থেকে তাড়াতাড়ি বের হয়ে আসি। শুধু তো এই ভয় নয় , আরও এক ভয়ে সর্বক্ষণ কাঁটা হয়ে থাকতে হয়। চিরকালের মুখচোরা আমি কোন জাকে বলতে পারিনি যে তোমরা চলে  যাচ্ছ যখন আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যাও। তবে বললেই কি তারা নিয়ে যেত? বিধবা মানুষের নিরামিষ বাসন কোসন, উনুন এসব হাজার বায়নাক্কা কেন তারা সহ্য করবে? তাদের সঙ্গে কোন সম্পর্ক গড়ে ওঠার আগেই ভেঙে খান খান হয়ে গিয়েছিল।

সেদিন কঙ্কাকে বলেছিলাম, “আমার ঘরে কিছুদিন শোবে কঙ্কা? সবাই চলে যাচ্ছে, আমার খুব ভয় লাগছে।”

  ও আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে কোন উত্তর না দিয়ে চলে গেল। অগত্যা নিরুপায় হয়ে মানদাকে ধরলাম, “মানদা, তুমি কিছুদিন আমার ঘরে শোবে গো? আমার খুব ভয় করছে।”
সে অবশ্য রাজি হল। বলল, “ও সেজ বৌমনি, তুমি চিন্তে করোনি গো। যতদিন না বড় আর মেজ বউ এ বাড়িতে আসছে এই মানদা তোমাকে একা শুতে দেবেনি। তুমি নিশ্চিন্তি থেকো। পেতথম পেতথ্ম ওমন একটু গা ছমছম করবে। পরে সব ঠিক হয়ে যাবে, তুমি দেখে নিও। সব মিটলে দাদা বাবুদের বোলো গয়ায় গিয়ে  বাপ মায়ের আর ছোট বউয়ের পিন্ডি দে আসতে। ভুত পেরেতে আর কোন উপদ্রপ করবেনি কো।” 


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top