পোড়ামাটির গ্রাম – চতুর্থ পর্ব

poramatir gram 4th

দুপুরের নীরবতা ভেদ করে কোথা থেকে যেন কুবোপাখির ডাক ভেসে আসছে। নিরন্তর ডাক। যেন এক দীর্ঘ অন্তর্গত কথোপকথন। কার সঙ্গে সে কথা বলে চলেছে, তা কেউ জানে না। আরও গভীরে, খেতের আল থেকে পশ্চিম দিকে যে রাস্তাটা গভীর জঙ্গলের মধ্যে এঁকেবেঁকে অদৃশ্য হয়েছে, সেই রাস্তা ধরে একটু এগিয়ে গেলেই এমন এক রহস্যাবৃত জঙ্গল, যেখানে দিনে, রাতে সবসময় ঝিঁঝিঁ পোকার এক সঙ্গীতময় আকুল কান্না শুনতে পাওয়া যায়। ঝোপের পাশে যে ঝিম ধরা ঠান্ডা বাতাস ছুটে আসে, সেই শ্যাওলাগন্ধের বাতাসে ঘোর লেগে যায়। দুপুর হলেও, বাংলার এই গভীর জঙ্গলের মদহ্যে তার রোদ্দুরের একফালিও এসে পড়ে না। অথব হয়তো পড়ে, অনেক উচ্চে, বনস্পতির পত্ররাশির উপর।

চন্দন তেমনই এক বনস্পতির গোড়ায় বসে বসে ভাবছিল, এই শান্ত নির্বান্ধব অথচ নিবিড় আত্মীয়তাপূর্ণ দুপুরের কথা। এই জায়গাটি থেকে কিছুটা দূরে এগিয়ে গিয়েই একটা উঁচু ঢিবি। সেই ঢিবি কেন উঁচু, তা কেউ জানে না। এলাকার লোক বলে ঢিবিপাহাড়। ঢিবিপাহাড় ছাড়া কাছেদূরে কোথাও পাহাড়ের কণামাত্র নেই। কিন্তু সেই ঢিবিপাহাড়ের মধ্য থেকে ক্ষীণতনু এক নদী কিশোরীর ইচ্ছের মতো লাফাতে লাফাতে কোনও দিঘির মধ্যেই হয়তো বা হারিয়ে গেছে। সামান্য একফালি জীবন তার। কিন্তু এই একফালি জীবনেই,সে অর্জন করে নিয়েছে ছন্দ। অর্জন করে নিয়েছে বাধা। আর বাধাকে ডিঙিয়ে সে অর্জন করে নিয়েছে একটা মনের মতো দিঘি। যেখানে সে আত্মহারা হয়ে মিশে গেছে। যেন বা কেউ এক কিশোরীকে নিয়ে এক মেলায় এসে পড়েছে। আর সেই কিশোরী মেলায় এসে আত্মহারা হয়ে মিশে গেছে মেলার মধ্যে। তার বাড়ি ফেরার তাড়া নেই। তার বরং ছিল হারিয়ে যাওয়ার তাড়া।

চন্দন এই সব ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে যায়। তার মনে হয়, বারবারই মনে হয়, এই জগতের অন্তরালে, এমন কিছু আছে, যাকে সে চিনতে পারছে না। সে কল্পনা করে সেই সব অন্তরালে থাকে মানুষগুলিকে। কেই বা বলতে পারে, সেখানে হয়তো কোনও ঢিবি নেই, কোনও ঝরনার মতো শীর্ণ বেণী নিয়ে কিছু এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছে না তাদের গ্রামের সীমান্তের এই পাগলাদিঘির বুকের ভিতর। হয়তো এই সব কিছুই নেইসেখানে। একই জায়গায়, তাদেরও নেই এই দিঘি। হয়তো এই বনস্পতি সেখানে মৃত। এই সবুজ সেখানে মৃত। এত পাখির ডাক আর প্রতিধ্বনি হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে না কোথাও।

শিবচরণ এই সময় ব্যস্ত ছিল তার পোড়ামাটির কারখানায়। দূরে, মেলায় তখন গৌড়েশ্বরীর মেলা বসেছে।

গৌড়েশ্বরী। এই এলাকার প্রাণ। সেই কবে থেকে যেন এই পুজো চালু। এই মূর্তির দক্ষিণ হাতে আছে তরবারি, বামদিকের হাতগুলিতে ঢাল ও ভূমিস্পর্শ-মুদ্রায় ধৃত একটি পাত্র। বাহনরূপে যে প্রাণীটি আছে তাকে গরুড় বলেই মনে হয়। পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তির এই স্থানই হল সেই মহাস্থানগড়। এখানকার লিপি ‘পুডনগল’ লিপি। এখানেই আছে    বাণগড়। এর আগে বহু বছর,কত বছর জানা নেই, এসব এলাকায় ছিল বৌদ্ধদের বসবাস। এই মহাস্থানগড়, বানগড় এবং পার্শ্ববর্তী মালদহ জেলার বিভিন্ন প্রান্তরে রয়েছে বৌদ্ধ স্তূপ। শিবচরণ মাঝেমাঝে চলে যায় সেখানে। কাজের বরাত আসে। বৌদ্ধ মূর্তিগুলিকেই একটু বদলে নিয়ে বিভিন্ন মন্দিরে বসিয়ে দেওয়ার কাজটিও তো এই ভাস্করকেই করতে হয়। এর ফলে, শিবচরণের একটু সুবিধাই হয়েছে বলা যায়। বৌদ্ধযুগের নানান শিল্প সে নিজে হাতে নাড়াচাড়া করে। এক একটি মূর্তি থেকে সে পেয়ে যায় অন্য অনেক মূর্তির চিন্তা। যদি না ভেঙে ফেলত স্তুপগুলি, তাহলে হয়তো এই শিল্প, এই ভাস্কর্য তার মতো শিল্পীদের হাতে আসত না। কিন্তু একদিকে যেমন বৌদ্ধস্তুপগুলো থেকে ভেঙে নিয়ে আসা মূর্তিগুলি ইতিহাসকে ভেঙে ফেলার সাক্ষী, অন্যদিকে এই শিল্পের সঙ্গে বাংলার শিল্পকে মিশিয়ে দেওয়ার কাজ করে ফেলার এক অসীম সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে এখানে।  এই জেলার মহদীপুর থেকে পোড়ামাটির মিথুনমূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে যা এই অঞ্চলের একদা প্রচারিত বজ্রযানী বৌদ্ধমতের প্রমাণ। আছে তো। শিবচরণ নিজেই চেনে কয়েকজন বৌদ্ধভিক্ষুকে। কিন্তু তাদের অনেকেই বাংলা ছেড়ে নেপাল হয়ে চলে গেছে তিব্বতে। আবার অনেকে বাংলার প্রধান বন্দর তাম্রলিপ্ত ধরে পাড়ি দিয়েছে সমুদ্র পেরিয়ে কোনও কোনও দেশে। শিবচরণ সবই বোঝে। বয়স তারও কম হল না। তার মনে পড়ে, বয়স যখন তার কুড়ি, তখন আলাপ হয়েছিল বৌদ্ধ সাধু বিদ্যাকরের সঙ্গে। বিদ্যাকর এখন কোথায় আছেন কে জানে। তিনি একটি গ্রন্থ লিখেছিলেন। সেই গ্রন্থ থেকে মাঝেমাঝেই পাঠ করে শোনাতেন। গ্রন্থটির নাম ‘সুভাষিত রত্নকোষ’।  মালদহ-দিনাজপুর অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মচর্চার ধারাটি প্রায় মৌর্যযুগ থেকে আরম্ভ করে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বহমান ছিল। তারপর এল বজ্রযানী বৌদ্ধ মতাদর্শ। এলেন রক্ষক দেবী। এই দেবী পরবর্তী সময়ে হিন্দুদেবী হয়ে গেলেন। ব্রাহ্মণরা পুজো করতে শুরু করল। শোনা যায় আমাদের এই গৌড়েশ্বরী সেই রক্ষক দেবীই। 

হৈমন্তীকে তার গৌড়েশ্বরী দেবীর মতোই মনে হয়।

যদিও সে দূর থেকে লক্ষ্য করে চন্দনের সঙ্গে তার কৈশোরলীলা।

এর  ফলে যে তার মনের মধ্যে ক্রোধ জন্ম নেয়, তা নয়। বরং আরও দেখতে ইচ্ছে করে দূর থেকে, লুকিয়ে। যে উজ্জ্বল আলো, যে নশ্বর সৌন্দর্য হৈমন্তীর মধ্যে ফুটে ওঠে, তা কি কখনো কোনও দেবীর মধ্যেও ফুটে উঠতে পারে?

শিবচরণের মনে হয় মানুষই দেবতা। এ নিয়ে তার কম তর্ক হয়নি বাচস্পতি মহাতর্করত্নের সঙ্গে। তিনি ছিলেন নবদ্বীপের পণ্ডিত। এখানেই যদিও জন্ম। কিন্তু নবদ্বীপ ছাড়া উচ্চশিক্ষালাভ অসম্ভব। তাই একটা সময় এই এলাকার পাট চুকিয়ে তিনি নবদ্বীপে চলে যান। কিন্তু চলে গেলেও, এই এলাকার প্রতি টান তাঁর থেকেই যায়। তাই মাঝেমাঝেই বাচস্পতি আসেন।

শিবচরণ তাঁর বাল্যবন্ধু।

শিব বলে ডাকেন তিনি। শিবচরণের পোড়ামাটির কারখানায় গিয়ে বাচস্পতির সব বাক্য যেন ফুরিয়ে যায়। তিনি সেখানে গেলেই যেন নিজেকে নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েন। বলেন, বুঝলি শিব, আমার মতো লক্ষ লক্ষ পণ্ডিতের সহস্র পুঁথির আর সহস্র প্রহরের তর্ক থাকবে না। থাকবে তোর শিল্প। চিরকাল।

এ কথা শুনে শিবচরণের মুখে সামান্য হাসি ফুটে উঠলেও, সে হাসি ক্রমশই কাষ্ঠল হয়ে যায়। কারণ শিবচরণের গৃহে হাঁড়ি চড়ে না। প্রায়শই চাল বাড়ন্ত।

চারিদিকে এত খেত, এত ধান, কিন্তু শিবচরণের ঘরে খাওয়ার অভাব।

শিবচরণের যে পুত্র, সেই গোবিন্দচরণ,যাকে সবাই গোবিন্দ নামেই ডাকে, সে তাই শিল্প আর কবি দেখলেই রেগে যায়।

সে বরং কৃষিকাজ করে।

চন্দনের সঙ্গে তার অগাধ বন্ধুতা। গোবিন্দর চাষের খেতে চন্দন পাখির মতো নাচতে নাচতে ঘুরে বেড়ায়।

গোবিন্দ তাকে কবি বলে গাল পাড়ে। সহ্য করে চন্দন। তার সহ্যশক্তি অপরিসীম।

শিবচরণ সবকিছুই লক্ষ করে। আর মনে মনে কল্পনা করে কাহিনি। এ কাহিনি সে কিছুতেই লিখবে না। কিন্তু মাটির গায়ে ছবি আঁকবে। মাটির গায়ে খোদাই করে রাখবে।

হৈমন্তীকে দেখেই তার মনে হয়েছিল গৌড়েশ্বরী দেবী। তা সে বৌদ্ধযুগের হোক বা হিন্দুর।

তাদের গ্রামে একটা সময় কয়েকজন বৌদ্ধতান্ত্রিকও ছিল। সেই সব বৌদ্ধতান্ত্রিকদের ভিক্ষু না বলে লোকে বলত ঠাকুর। তারা নিয়ে এসেছিল অনেক মূর্তি। পূজা করত এক সপ্তমাতৃকা ভাস্কর্যকে। পালযুগের মাঝামাঝি থেকেই বজ্রযানী বৌদ্ধরক্ষক দেবদেবীরা হিন্দু  হয়ে যায়। শিবচরণের কাছে, এই ধরনের মূর্তি প্রচুর রয়েছে। শিবচরণ তার পোড়ামাটির কাজে এই সব মূর্তিগুলিকে ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করে যায়। দ্বারবাসিনী বলেই এই সব মূর্তিগুলিকে ডাকে এলাকার লোকজন। মাঝেমাঝে নিয়ে যায়। গ্রামে পুজো হয়।  পায়ের তলায় সিংহ নিয়ে উপবিষ্টা ও চতুর্ভুজা এই মূর্তিটির ডানহাতগুলিতে আছে অভয়মুদ্রা ও তরবারি এবং বামহাতগুলিতে ভূমিস্পর্শমুদ্রা ও কাল শোভা পাচ্ছে। এর সঙ্গে প্রচুর মিল আছে পূর্বালোচিত বারাহীর আয়ুধের। এই ধরনের অসংখ্য মূর্তি, কেবল বামকোলে একটি ছেলে, দিনাজপুর জেলার বংশীহারী এলাকায় ছড়িয়ে আছে। শিবচরণ হাঁটতে হাঁটতে মাঝেমাঝে সেখানেও চলে যায়। সেখানকার লোকরা এই সব মূর্তিগুলিকেই বলে চণ্ডী। এক একটা গল্প যেন ভাসতে থাকে শিবচরণের চোখের সামনে।

ভেসে ওঠে গান।

শিবচরণকে এমন উদাস ভাবে বসে থাকতে দেখে উঠোন পেরিয়ে চলে আসা গোবিন্দ কিছুক্ষণ থমকে গেল।গো

লোকটাকে বলে বটে কিছু করে না, সারাদিন ভাবে। কিন্তু এই লোকটা মাঝেমধ্যে প্রচুর টাকা, মূদ্রা অর্জন করে চলে আসে। কিন্তু লোকটা যদি কিছু অর্জন করে নাও আসত, বাবা হিসেবে গর্ববোধ করত গোবিন্দ।

তার কারণ লোকটা মাটির মধ্যে প্রাণ ফুটিয়ে তুলতে পারে।

শিবচরণ বারবার গোবিন্দকে বলেছে পোড়ামাটির এই সব কাজ করতে। কিন্তু গোবিন্দ রাজি হয়নি। কারণ তাদের ঘরে ভাতের অভাব।

মাঝেমাঝেই জমিদার আর রাজার সেনারা এসে লুন্ঠন করে চলে যায়।

তারা মৌর্য না পাল না সেন এ বিষয়ে এরা কোনোদিন কিছু জানে নি। এখনো জানে না। শুধু জানে, শাসকের কোনও ধর্ম নেই। শাসকের কোনও ভাষা নেই।

শাসকের ভাষা হল চাবুক। শাসকের ভাষা হল ভয় দেখানো।

রানীকে যখন ধরে নিয়ে চলে গেল মুসলমান শাসকরা, তখন শিবচরণের বা গোবিন্দর কিছু করার ছিল না। রানী, মানে, শিবচরণের মেয়ে।

খুবই সুন্দর দেখতে। এমন সুন্দর, যেন মনে হত ফুলের পাপড়ি থেকে চুঁইয়ে পড়া শিশির দিয়ে তাকে রচনা করেছে কেউ।

কিন্তু তাকে তুলে নিয়ে যায় সুলতানি সেনাদল।

একই সঙ্গে তারা পুড়িয়ে দিয়েছিল এলাকার সমস্ত খেত।

সে দৃশ্য এখনও মনে মনে ভাবলেই শিউড়ে ওঠে গোবিন্দ।

চারিদিকে সমস্ত খেত জ্বলছে। বাড়ি জ্বলছে। সুলতানি সেনারা ঘর থেকে এক এক করে তরুণী নারীদের তুলে নিয়ে যাচ্ছে।

শিবচরণের মনে পড়েছিল পাল বংশের রাজারাও একইরকম ভাবে গ্রামের পর গ্রাম লুন্ঠন করত। খেত জ্বালিয়ে দিত। তাদের সেনারাও গণধর্ষণ করত।

লোকমুখে প্রচারিত ছিল একটাই কথা, আমাদের জীবন একটা সুতোর উপর। যদি আক্রমণ হয়, তাহলে রাজায় রাজায় যুদ্ধ হবে। আর প্রাণ যাবে তাদের।

শিবচরণ আর কিছুই করতে পারে না, এই সব মাটির শিল্পে খোদাই করে রাখে।

গোবিন্দ দেখে, শিবচরণ চুপ করে বসে আছে কারখানার বাইরে যে ছোট্ট জঙ্গল মতো, সেখানে।

–        কী গো, একাই বসে আছ?

–        বসে আছি। কেন?

–        তোমার এখন কাজ কমে গেছে?

–        না, করছি তো। লোটন বিবি মসজিদের জন্য।

–        আচ্ছা। এসব হিন্দু দেবদেবী দিয়ে মসজিদ হবে?

–        হ্যাঁ আগেও তো অনেক করেছি।

–        মুসলমানদের রাগ হয় না? ওদের ধর্মে তো মূর্তিপুজো নেই।

–        না না। ওরা শিল্পের অনুরাগী। শিল্পের ধর্ম হল শিল্প। এছাড়া আর কোনও ধর্ম নেই রে।

–        সে তো বুঝলাম।কিন্তু আমাদের কর তো একটু কম করতে পারে।

–        বাহারুদ্দিনের সঙ্গে দেখা করতে হবে।

–        বাহারুদ্দিন?

–        সম্রাটের কাছের লোক। যেতে হবে একদিন। তিনি আমার কাজের খুব খাতির করেন।

–        তাহলে তাড়াতাড়ি করো। এই তিন ভাগের দুই ভাগ দিয়ে তো আর পারি না। আমার তো বউবাচ্চা আছে। ওরা তো তোমারও কেউ হয় নাকি?

–        হয় যে, তা কি আমি অস্বীকার করেছি কখনো?

গোবিন্দ চুপ করে গেল। বাবার সঙ্গে এতটা রূক্ষ ব্যবহার করতে তার ভাল লাগে না। কিন্তু হয়ে যায়। সারা গা ঘামে চপচপ করছে। কল্পদিঘির জলে গা ধুয়ে নিতে হবে। এই দিঘির নাম নাকি রেখেছিলেন কোনও একজন কবি। হায়! এই কল্পদিঘিতেই ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন তার মা। বোনকে সুলতানি সেনা তুলে নিয়ে যাওয়ার পরে।

এক বছর পর বোন ফিরে এসেছিল। টুকটুকে সুন্দর বোনটা হয়ে গেছিল কেমন পচে যাওয়া বেগুনের মতো।

চোখের তলায় ঘন মেঘের মতো কালি।

কিন্তু গ্রামের কেউ তখন তার নামে খারাপ কথা বলেনি। কারণ সকলেরই বাড়ি থেকে কেউ না কেউ এই সুলতানি সেনাদের হাতে অত্যাচারিত হয়েছিল।

মায়ের কথা শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল রানী।

আস্তে আস্তে অবশ্য সে দুঃখ সয়ে যায়। কারণ রানী যখন এসেছিল, তখন সে গর্ভবতী। তার গর্ভের সন্তানের পিতা কে, এ বিষয়ে কেউ একটি কথাও জিজ্ঞেস করেনি।

তার মায়ের জন্য পিন্ডদান করেছিল রানী।

এ প্রথা অবশ্য এখানকার বহুদিনের। বামনপাড়া এলাকার একটি গর্তে নাগর ধানুকাদি জাতি পিত্তদান করিত। পিণ্ডদানের মন্ত্র এই-

“জয়াকা ছাতু কেলাকা পাত্তা।

লে পুরুখা হাতে হাণ্ডা।

তু খাবিত খোন মু খাচি।।”

গৌড়ে জ্যৈষ্ঠ-সংক্রান্তির সময় রামকেলি মেলা চলে। সে সময় প্রচুর মহিলা গর্ভধারিণী জননীর পিণ্ডদানের জন্য এই স্থানে আসে। দুঃখের মেলা যেন আকাশ বাতাস ফাটিয়ে প্রতিধ্বনিত হয়। এখানে একটি গর্তের কাছে পিণ্ডদান করে তাঁরা কাছে রাখা (অন্যান্য সময় নাকি মূর্তিটি কোনও ব্যক্তিবিশেষের কাছে থাকে) ও কাপড়ে জড়ানো গৌড়েশ্বরীর  মূর্তি জড়িয়ে কেঁদে থাকে। এরপর তাঁরা তুলসি মন্দিরের উপরে গিয়ে স্বর্গতা-জননীর উদ্দেশ্যে প্রদীপ জ্বালিয়ে থাকেন। এই তুলসী মন্দিরই এখন ফিরোজ মিনার হয়ে গেছে।  এই যাত্রিনীর দল মালদহের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শুরু করে পূর্ণিয়া, কাটিহার, কিষাণগঞ্জ, ভাগলপুর, এমনকী মুঙ্গের থেকেও এসে থাকে।

এখান থেকে একটু দূরেই চণ্ডীপুর গ্রাম। সেখান থেকে অনতিদূরে রয়েছে সাগরদিঘি। সাগরদিহি আর কল্পদিঘি কোনও না কোনওভাবে যুক্ত। একটি ছোট নদী এই দুটি দিঘির মধ্যে সংযোগ বজায় রেখেছে।

রানী এখানেই পিণ্ডদান করেছিল তার মায়ের।

গর্ভবতী রানী তারপর একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেয়।

শিবচরণ তাকে ফেলে দিতে পারেনি। রানীও পারেনি। শিবচরণের বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যেই একটি মাটির বাড়িতে রানীর সেই ছেলে বড় হচ্ছে।

তার নাম কানু।

কানুর রূপ খুলেছে রানীর মতোই। তার উপর রয়েছে সুলতানি রক্ত। কে যে তার পিতা না জানলেও বোঝা যায় কোনও তুর্কী পিতার ঔরসেই তার জন্ম।

কিন্তু সে হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হয়তো কখনোই পারবে না।

কানু নামের কারণেই হোক বা অন্য কারণে, তার সঙ্গী বাঁশি। মাঝেমাঝে অবাক লাগে শিবচরণের, পরিবারের মধ্যে কীভাবে শিল্পের ধারা বজায় থাকল।

সে যে বাঁশি বাজায়, তাকে তো কেউ কখনো শিখিয়ে দেয়নি।

দিঘির ধারে ভোরবেলায় সে বাঁশি বাজায়। তাকে জিজ্ঞেস করলেই তার চোখে এক অপরিচিত দেশের মায়া লেগে থাকে।

যেন সে মায়ের দুঃখ বুকে নিয়ে জন্মেছে। রানীও প্রথম প্রথম তাকে দুষলেও, তাকেই আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকে।

রানী তার দাদা গোবিন্দর সঙ্গে খেতের মাঠের কাজে সাহায্য করে।

দাদার জন্য ভাত বেড়ে দেয়।

কানু কিছুই করে না।

কাছাকাছি আছে হরিপণ্ডিতের পাঠশালা।

ওই যেখানে বালির স্তুপ, তা পেরিয়ে গেলেই নদী পেরোনোর চরা। সেই চরা পেরিয়েই আবার একটা বড় দিঘি। সেই দিঘির পাশেই আছে হরিপণ্ডিতের মাটির বাড়ি আর পাঠশালা।

সেখানে অনেক ছাত্রই পড়তে যায়।

পড়তে যায় কানুও। পড়তে যায় সেই সকালে। কিন্তু কোথাও যেন সে হারিয়ে যায়। গ্রামের পথে ঘাটে, মাঠে, ফসলের খেতে, হয়তো বা গাছের তলায় সে তার বাঁশি নিয়েই ঘুমিয়ে পড়ে।

কোনও ফকির বা সন্ন্যাসীর সঙ্গে হয়তো বেশ কিছুটা পথ হেঁটে চলে যায়।

লোকে বলে এ নির্ঘাৎ বৌদ্ধ ভিক্ষু হবে।

কোন ধরনের ভিক্ষু? যারা গান গেয়ে গেয়ে গ্রামের পথে ঘাটে ঘুরে বেড়ায়। অনেকটা তাদের মতো।

তাদেরই বেশ কয়েকজন আবার ইসলাম ধর্মও গ্রহণ করেছে। কিন্তু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও তারা যেমন ভবঘুরে তেমনই আছে।

এমন ভবঘুরেদের কি শিবচরণ তার মাটির শিল্পের মধ্যে খোদাই করে রাখেনি?

রেখেছে তো। সে লোকগানকেও তার মাটির শিল্পের মধ্যে খোদাই করে রাখতে চেয়েছে।

বিষ্ণুপুরে যখন সে মন্দিরের কাজ করার বরাত পেয়েছিল, তখন একটি দল তৈরি করে সে ছুটেছিল সেই মল্লরাজাদের দরবারে। সেখানে সে পোড়ামাটির শিল্পের ভিতর খোদাই করতে চেয়েছিল সাপের কথা, মনসার কথা।

সে এক অন্য কাহিনি।

শিবচরণ গোবিন্দকে বলে, হয়ে যাবে, চিন্তা করিস না। কিছু না কিছু হয়ে যাবে। আমরা তো কিছু না কিছু করে ঠিক বেঁচে আছি। আমার এখন শুধু এক শালভঞ্জিকাকে প্রয়োজন।

–        শালভঞ্জিকা?

–        হ্যাঁ রে।

–        এও কি মনসার মতো কেউ?

–        না, তা কেন হবে? এ হল শালভঞ্জিকা। আর তার কিছু ছায়া আমি চারিদিকে দেখতে পেয়েছি। কিন্তু ভালো করে তাকে পাচ্ছি না।

–        তুমি আবার ক্ষ্যাপা হয়ে যাচ্ছ?

–        আচ্ছা ক্ষ্যাপা কাদের বলে বল তো? সেই বৌদ্ধ কবিরা, যারা শুধু হেঁটে যেত, গান গাইত, ভালোবাসার কথা বলত, তাদের থেকেই ক্ষ্যাপা এসেছে।

–        আচ্ছা, আমি তো তোমার মতো অত কিছু জানিনে। আমি শুধু জানি, তুমি কাজ করো, আমি কাজ করি। আমরা যেন বেঁচে থাকি।

–        আমি যখন বিষ্ণুপুরে কয়েক বছরের কাজের জন্য গেছিলাম তুই তখন খুব ছোট। তোর মনে নেই হয়তো।

–        হ্যাঁ মনে আছে। মা বলত বাবা আসবে কিনা কে জানে? জয়পুরের জঙ্গলে নাকি বাঘ আর ভালুক আর সাপ।

–        হ্যাঁ সেই সাপ নিয়েই প্রচুর কাজ করেছিলাম।

–        কেমন কাজ?

–        বিষবিদ্যার কাজ।

–        বিষবিদ্যা?

–        তার জন্য তো তোকে সাপের গল্প জানতে হবে। বাংলার সাপ কি আর যে সে সাপ রে ভাই। আমাদের সাপ আমাদের মতো। সাপ বড় অলস। কিন্তু সুখে থাকে। নোংরা তার পছন্দ নয়।  একটা মশা সহ্য করতে পারে না, গর্তে একটা পিঁপড়ে থাকলে বেরিয়ে আসে। সাপ হল বড়লোকের বাড়ির বউয়ের মতো।  সাপের গা ঠান্ডা। শীতকালে সাপের বড় শীত পায়, তাই গরম খোঁজে। গরমকালে মানুষেরই মতো হাওয়া খেতে বার হয়। পুরুষ সাপের বিষ থাকে না, মেয়ে সাপেরই বিষ। সাপিনীরাই বিষধরী। পুরুষ সাপ হচ্ছে ঢ্যামনা, ঢোঁড়া -এরা। খরিশ বা গোখুরা সাপের সঙ্গে ওইসব পুরুষ সাপের সঙ্গমদৃশ্যকে বলে ‘শংখ লাগা’। তুই শঙ্খ লাগা দেখেছিস? আমি একবার আমার পোড়ামাটির একটি শিল্পে শঙ্খলাগাকে করে তুলেছিলাম শিল্প। আর সেই অলংকার এখনো আমাদের বিষ্ণুপুরের মন্দিরের দেওয়ালে আছে। জানিস তো,  বিষসাপের বাচ্চার অর্থাৎ ‘ডেকা বাচ্চা’র বিষ মারাত্মক। সাপ  জন্মের দু-তিন দিন পরেই তার মুখে বিষ জন্মাতে পারে। বোড়া সাপের ডিম হয় না, একেবারে বাচ্চা হয়। একবারে একশোটা বাচ্চাও হয়। সাপের মুখের ভিতরে দুপাশে দুটি বিষের থলি থাকে। দেখতে অনেকটা রসুন কোয়ার মতো। ওই দুটি থলি ছুরি দিয়ে কেটে ফেলা হয়। তাকেই বলে ‘সাপের বিষদাঁত’ ভেঙে দেওয়া। প্রকৃতপক্ষে দাঁত ভাঙা হয় না। দাঁত ভাঙলে সাপ খাবে কী করে, আহার ধরবে কী করে! জিভ চেরা হলেও চক্চক্ করে দুধ খায়। কলা ঠিক খেতে পারে না। তবে ‘কলাপাকা’র অংশ দাঁতে কেটে নিতে পারে। বিষথলি কেটে দেওয়ার পরেও সাপের মুখে বিষ হয়, বিষশিরায় কাজ ঠিক চলতে থাকে, তবে থলির অভাবে সে বিষ জমতে পায় না। সাপের বিষ নামানো মন্ত্র আছে, একটি মন্ত্র শোন। ঝাঁপানের সময় ‘চোট’ লাগলে এই মন্ত্র বলতে হয় :

হেড দলদল উপর আসমান

মুই মারি বিষ খোদা প্রমাণ।

খোদা গুরু মহম্মদ শিব

মারো ধাক্কায় সাই বিষ।

–        আচ্ছা? তবে কার আজ্ঞায়?

–        কার আজ্ঞায়? মা মনসাদেবীর আজ্ঞায়।

–        ওহ দারুণ তো!

–        এসব মন্ত্র অন্য লোককে বলতে নেই। আরও মন্ত্র আছে ‘বিষবন্ধন মন্ত্র। সাপে কাটলে কাটার আশপাশ হাত দিয়ে দেখতে হয় ঠান্ডা কিনা তদর ঠান্ডা ও কালচে, ততদর বিষ উঠেছে। তার উপর বাঁধন দিতে হয়।

–        তুমি সেখানে এই সব পোড়ামাটির শিল্প তৈরি করেছ?

–        হ্যাঁ। বাঁকুড়া-পাঁচমুড়ার মনসার ‘চালি’, মনসার ‘বারি’, হাতি ঘোড়া-ছোট ও বড়, সংখ্যায় অনেক। গেলেই পাবি। আমাদের এই সব কাজ নিয়ে  শ্রাবণ-সংক্রান্তির সকাল থেকেই বিভিন্ন পরব হত মনসামাড়ে। প্রথমে ‘খইধারা’। শ্রাবণ মাসের শেষের দিকে মাঠের কাজ শেষ হয়েছে, তাই এই পরব। আরও অনেক পরব আছে। বিষ্ণুপুরের শাঁখারীবাজারে আমি থাকতাম। এমন সব কত পরবের মধ্যে হারিয়ে যেতাম। চেষ্টা করতাম সেই সব পরবের গল্পগুলোকে আমার পোড়ামাটির বুকে ফুটিয়ে তুলতে।

–        পারোনি? এখন বেলা হয়ে এল।

–        আমার সত্যিই বেলা হয়ে এল রে।

–        না, তোমার বেলা হল বলিনি।

–        না হলে দেখ, আমার শালভঞ্জিকা আর তোর বন্ধু চন্দনের মধ্যে গল্প চলছে তো চলছেই।

বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় খেতের ধারটুকু যেখানে শেষ হয়েছে, সেই জায়গাটি। সেখানে ছায়া। চন্দন সেখানে বসে আছে আর হৈমন্তীও সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। দেখে মুখে হাসি ফুটল গোবিন্দর। চন্দনের মনের ইচ্ছা পূরণ হল তবে?

মনের ইচ্ছা পূরণ না হলেও চন্দন আর হৈমন্তীর মধ্যে জমে উঠছিল তখন নতুন এক রসায়ন।

অন্যদিকে যে এক ঝড় তার শিয়রে উপস্থিত হচ্ছে, তা তারা টের পায়নি।

ঠিক যেমন টের পায়নি সূত্রধর পাল।

সূত্রধর পাল হারিয়ে যাননি কোথাও। তিনিও কোথাও থেকে ফিরে আসারই চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তিনি যে হারিয়েই গিয়েছিলেন, এ কথাও খুব একটা লোকে জানে না। হৈমন্তীর বাবা কণিষ্ক তাঁর পোড়ামাটির পুরীতে কাজ করতে করতে বুঝতে পারছিলেন, একদিন এই সমস্ত কিছুকেই ধ্বংস করে দেবে কেউ। কিন্তু কেন তিনি এসব ভাবছিলেন?

-রূপকথা আঁকতে পারো, রূপকথা?

সূত্রধরের কথা শুনে কণিষ্ক চমকে গেছিলেন।

–        কীসের রূপকথা? রাজা রানীর?

–        রাজারানীর রূপকথা তো সকলেই লেখে। কিন্তু আমাদের রূপকথা তো আর রাজারানীর রূপকথা নয়। আআদের রূপকথা আমাদের।

–        কী আছে তাতে?

–        তাতে রাক্ষস আছে। মাটি ফুঁড়ে উঠে আসা ঝড় আছে। আকাশ থেকে ঝরে পড়া আগুন আছে। আর আছে এমন একটা দেশে চলে যাওয়া, যেখানে কোনও রাজা নেই, সুলতান নেই, সম্রাট নেই। আমাদের কথা।

–        আমাদের কথা লিখলে বা আঁকলে তো তা আর রূপকথা থাকবে না।

–        আমি একটা রূপকথা তৈরি করব। আমাদের পরের সময়ের রূপকথা।

–        আচ্ছা, আমাদের পরের সময়টা ঠিক কেমন হবে?

–        কেমন হবে জানিনা। তাই তো রূপকথা। এই সব নদী মাঠ ঘাট হয়তো শুকিয়ে যাবে। হয়তো এসব জায়গা শ্মশান হয়ে যাবে। হয়তো বিরাট বিরাট প্রাসাদ গড়ে উঠবে। কে জানে? মানুষ হয়ত আরও হিংস্র হয়ে উঠবে।

–        আরও হিংস্র? আর কত হিংস্র হবে মানুষ?

–        মানুষ তো হিংস্রই। মানুষ হিংস্র আর পাগল। ভাল পাগল না খারাপ ধরনের পাগল। মানুষ খুনি। মানুষ খুন করে আনন্দ পায়। আমরা মূর্তি গড়ে আনন্দ পাই, আর কিছু মানুষ হত্যা করে আনন্দ পায়। কিন্তু কোনও প্রাণী মানুষের মতো এত হত্যা করে আনন্দ পায় না।

–        মানুষ মানুষকে খায় না।

–        এটাই তো। মানুষ মানুষকে খায় না, কিন্তু ভোগ করে। মানুষের কাছে সবথেকে লোভের জিনিস হল মানুষ।

–        তা তোমার রূপকথায় কি মানুষ ঈশ্বর হয়ে গেছে?

–        জানি না, আমি কিছুই জানি না। আমি তো মাটি নিয়ে কাজ করি, তুমিও যেমন মাটি নিয়ে কাজ করো। আমরা কী করে জানব বলো। কিন্তু ইচ্ছে হয়, রূপকথার জন্য একবার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি।

সূত্রধর পালকে কখনোই বুঝতে পারেননি কণিষ্ক। কণিষ্ক যেমন ফুলবল্লী প্রস্তুত করতেন, তেমনই সূত্রধর খুব ভাল পারতেন মৃত্যুলতা আঁকতে।

এ নিয়ে দুজনের মধ্যে খুনসুটিও কম হত না।

–        কিন্তু মুসলিমরা এসব কি বুঝতে পারবে?

–        ওরা মুসলিম হিন্দু এমন কিছু না জানো তো? ওরা শাসক। তবে ওরাও তো এখানে আছে বহুদিন হয়ে গেল। দুশো বছর তো হয়েই গেল। ওরা তো আমাদের বাড়িঘর বানানোর কায়দা দেখে নিজেদের মসজিদ, সমাধি এসবও বানাচ্ছে।

–        রহমতুল্লা বলে একজন এসেছিলেন আমার কাছে। বলছিলেন, পান্ডুয়ায় এমন একটা বড় মসজিদ হবে, অত বড় নাকি গোটা ভারতে কোথাও নেই।

–        পান্ডুয়ায়?

–        পান্ডুয়ায় তো আগে একটা বিরাট বৌদ্ধমন্দির ছিল না?

–        মন্দির না, স্তুপ। সেখানে ওই যাকে বলে বৌদ্ধরা উপাসনা করত। পড়াশুনো করত। কত সব ভিক্ষু আসত। খ্যাপা সব।

–        হ্যাঁ, সে সব তো ধ্বংস হয়ে গেছে কবে।

–        ধ্বংস কিন্তু মুসলিমরা করেনি।

–        সেটা জানি। কিন্তু মুসলিমরা বড় হিংস্র। ওদের কথার আগে ছোটে তরবারি।

–        কোন শাসকের ছোটে না বলতে পারো? শুনেছি তো পালরাজারা বৌদ্ধ ছিলেন।

–        হ্যাঁ। কিন্তু ওরাও গ্রামের পর গ্রাম অত্যাচার করেছে। পুড়িয়েছে। ধ্বংস করেছে। ধর্ষণ করেছে।

–        সেনরাও করেছে। মুসলিমরাও করেছে। আমরা কোথায় যাব আর? আমাদের যাওয়ার জায়গা কোথায়? যাদের হাতে হাতিয়ার, তাদের ধর্ম আসলে হাতিয়ারের ধর্ম।

–        তোমার কি মনে হয় আমরা বেঁচে আছি? আমরা তো দাস। যে কোনও সময় আমাদের মেরে দিতেপারে।

–        মারছে না কেন বলো তো?

–        কেন?

–        কারণ আমরা মরে গেলে ওরা শাসন করবে কাদের? কাদের কাছ থেকে কর আদায় করবে? শ্মশানে বা কবরে গিয়ে তো জাহির করা যায় না আমি তোমাদের সুলতান বা আমি তোমাদের রাজা।

সূত্রধর আর কণিষ্ক দুজনেই হোহো করে হেসে উঠল।

–        কিন্তু শিবের খবর কী? সে তো শুনছি বিষ্ণুপুর নিয়েই মেতে আছে।

–        হ্যাঁ। তার কাছেও হয়তো খবর যাবে।

–        আমার একটা গোপন কথা তোমায় বলব?

–        গোপন? প্রেমে পড়েছ নাকি গো?

কণিষ্ক উঠে পাশের ছোট সেই চৌবাচ্চা থেকে জল নিয়ে হাত ধুতে ধুতে ফিরে তাকায়- “না কি আবার কারো প্রেমে পড়েছ?

–        আরে, শিল্পী হয়ে জন্মেছি, প্রেম তো আমাদের অন্তরের গো। প্রেম তো চিরসঙ্গী। আর সে তো যে সে প্রেম নয়। যে সব প্রেমে বিপদের পর বিপদ। প্রেম মানে একটা সুতোর উপর দিয়ে যাওয়া।

–        হ্যাঁ সে তো বুঝলাম, কিন্তু সময়টা তো ভালো না ভাই। এই মুসলিমদের প্রতি আমার কোনও বিশ্বাস নেই। এরা ধর্মের নামে মাথা কাটে। কোনও নীতিবোধ নেই।

–        আমার তা মনে হয় না। মুসলিম শাসক আর মুসলিম পীর, কি এক? যারা ইসলাম ধর্ম নিয়েছে তারা তো আমাদেরই লোকজন। তারা কি আমার শত্রু? আসলে, শাসক সব জায়গাতেই একরকম।

–        সূত্রধর, একটা কথা বলো ভাই, এটাই কি তোমার গোপন কথা?

–        না। আরেকটা গোপন কথা আছে। কিন্তু তা শুনলে তুমি আমাকে পাগল ভাববে।

–        কী ?

–        আমার স্বপ্নের ভিতরে না একজন আসে। আমি দেখতে পাই একটা অন্য জায়গা। আমি সে সবের ছবি আঁকতে চাই। জানি না সে কোনখানে আছে, কিন্তু আমি তাকে আসতে বলেছি।

–        আমি কিছুই বুঝলাম না।

কণিষ্ক অবাক হয়ে তাকিয়েছিল সূত্রধরের দিকে। সূত্রধরকে ছোট থেকেই একটু অন্যরকম লাগে। শুধু তার নয়, গ্রামের সকলেরই মনে হত একটা সময় সূত্রধর একটু পাগল পাগল। কেমন যেন খ্যাপাটে। মাঝেমাঝে হারিয়ে যেত কোথায়। আবার কয়েকদিন পরে ফিরে আসত। দু চোখে অদ্ভুত একটা মায়া লেগে আছে। সবসময় যেন দুই চোখ কিছু একটা খুঁজছে। দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। মাথার চুল লম্বা হয়ে দুদিকে এলিয়ে পড়েছে। গায়ের রং তামাটে। মধ্যবয়স হওয়ায় চুলে এবং দাড়িতে অল্প পাকও ধরেছে। চামড়ায় সামান্য দাগ। কিন্তু ম্রিয়মান হয়ে যায়নি তার চোখদুটো। সবসময়ই উজ্জ্বল। কিছুই যেন তাকে দমিয়ে রাখতে পারে না। আর তার আঙুলগুলো যেন নমনীয় গাছের শাখা। এমন ভাবে আঙুলগুলো সে মাটির উপর বোলায় যেন বা কিছু একটা বাজাচ্ছে। এক বৌদ্ধ ভিক্ষু পথ হারিয়ে একবার চলে এসেছিল তাদের গ্রামে। তার সঙ্গে সূত্রধর পাড়ি দিয়েছিল একবার বেশ কয়েক মাসের জন্য। কোথায় গেল, কী শিখে এল, তার কিছুই সে জানায়নি।

–        তুমি শুনেই চুপ করে গেলে যে?

সূত্রধর জিজ্ঞেস করল। সে জানত তার মনের এমন অদ্ভুত বিষয় নিয়ে কেউ কখনো আগ্রহী হবে না। বরং গ্রামে আরও রটে যাবে যে সে কতটা পাগল হয়ে গেছে এখন।

কিন্তু কণিষ্কের প্রতি বিশ্বাস রাখা যায়।

সে বড়জোর অবাক হয়ে যাবে,কিন্তু রটিয়ে দেবে না।

–        আমি তোমার কোনও কথাই বিশ্বাস করলাম না। তুমি যাকে স্বপ্নে দেখেছ তাকে আবার এখানে আসার আমন্ত্রণ দিয়েছ এ কথার মানে কী হয়?

–        মানে আসতে বলেছি। তুমি নিশ্চিত থাকো, সে আসবেই।

–        সে আসবে কীভাবে?

–        কেন, স্বপ্নের মধ্য দিয়ে। যেভাবে আমরা স্বপ্নের মধ্য দিয়ে গান খুঁজে পাই, পদ্য খুঁজে পাই, ছন্দ খুঁজে পাই।

–        কিন্তু মানুষ আসে না। স্বপ্নের মানুষ স্বপ্নেই থাকে

–        কিন্তু সে আসবে।

–        সূত্রধর, তুমি বাড়ি ফিরে যাও। আর এসব কথা কাউকে বোল না। এসব কথা জমিদারের বা ইজারাদারের কানে গেলে তোমাকে পাগল বলে শূলে চড়িয়ে দিতে পারে।

–        জানি। মাথা কেটে ফেলতে ওদের বেশিক্ষণ লাগে না। ব্রাহ্মণদেরও লাগে না, যবনদেরও লাগে না। কিন্তু সে আসবে।

কণিষ্ক ভিতরের ঘরে ঢুকে গেল।

সূত্রধর আস্তে আস্তে কণিষ্কর কারখানা থেকে বেরিয়ে মাটির রাস্তাটায় এসে দাঁড়াল।

মাটিটা কেমন যেন ভিজে ভিজে। একটা অদ্ভুত সোঁদা গন্ধ। যেন কেউ স্নান করে এসেছে।

মাটির রাস্তাটা গিয়ে পড়েছে আলপথে।

সেই আলপথ দিয়ে ওকে এখন যেতে হবে। একটু ঘুরে। আলপথ দিয়ে দু পাশের ফসলভর্তি মাঠের পাশ দিয়ে সে চলে যাবে একটা পুকুরের পাশে। নামেই চোরপুকুর। চোরপুকুর কেন নাম হয়েছে এটা কেউ জানে না। কিন্তু এই পুকুরের সামনে একটা ছোট্ট মন্দির আছে। সেখানে কোনও দেব বা দেবীর মূর্তি নেই। রয়েছে দুটি পাথর রাখা। কিন্তু এই পাথর শিবলিঙ্গ নয়। এই দুটি পাথরের গায়ে লাল সিঁদুরের দাগ। সামনে বনতুলসী ফুল।

ইনি একজন দেবী। এখানকার লোকেদের কাছে এর নাম বনঘাঘরা।  বনঘাঘরা দেবীর কাছে সূত্রধর প্রতিদিন বসে থাকে। সামনে পুকুর। মাথার উপরে বনস্পতি। পাতা আর ঝুরিগুলো এমন ভাবে নেমে এসেছে যেন প্রপিতামহের ইতিহাস।

সূত্রধর এখানে বসে থাকে। ভাবে। আবার ঘুমিয়ে পড়ে। যখনই ঘুমিয়ে পড়ে,  স্বপ্ন দেখে এক অন্য জগতের। জায়গাটা যে কোথায় তা সে জানে না। সম্পূর্ণ অচেনা অজানা মানুষ। যখন ঘুম ভাঙে সে দেখে সে শুয়ে আছে নিরাপদে বনঘাঘরা মন্দিরের সামনে। এখানে গাছটায় অসংখ্য পাখি এসে বসে। আর এখানেই তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল শান্তভিক্ষুর।

শান্তভিক্ষু। নাম যেমন, তার আচরণও তেমন। যবনদের, দস্যুদের আক্রমণে তাদের সমস্ত মঠ ধ্বংস হয়ে গেলেও, তাদের কেউ কেউ এ বাংলারই পথে ঘাটে ঘুরে বেড়াত। মাধুকরী নিয়েই চলত। যদিও বেশিরভাগ ভিক্ষুই বাংলা ছেড়ে পাড়ি দিয়েছিল হয় সমুদ্রপথে নয় হিমালয় পেরিয়ে নয় ভারতেরই আরও অন্য সব দিকে। কিন্তু কেউ কেউ ঘুরে বেড়াত এই বাংলায়।

তাদের নিজস্ব কোনও গ্রাম ছিল না। স্বল্পস্থায়ী কুটির ছিল। সেখানে হয়তো কয়েক বছর কাটালেন। আবার বেরিয়ে পড়লেন।অন্য কোথাও চলে গেলেন। শান্তভিক্ষু অনেকদিন আসেননি। তিনি কোথাও চলে গেছেন হয়তো।

এর আগেরবার যখন দেখা হয়েছিল, শান্তভিক্ষু সেবার এই গ্রামেই এসেছিলেন বহুদিন।

সেই ভিক্ষুর সঙ্গে পাড়ি দিয়েছিল সূত্রধর।

মনে পড়ে সূত্রধরের।

মনে পড়লেই মন খারাপ হয়ে আসে। শান্তর কথা সে ভুলে থাকতে চায়। কিন্তু মনের মধ্যে বারবার হানা দেয় শান্তর মুখ।

শান্ত কবি। সুরও তার মনের ভিতরে খেলা করে।

এই গাছের তলায় বসে কতদিন সে একটির পর একটি গান গেয়ে চলেছে। অদ্ভুত মরমীয়া এক একটি গান।

পুরোনো এক অচেনা ভাষায় এই খ্যাপা গান গেয়ে চলে।

সূত্রধর আর সে কোথায় চলে গেছিল সেবার, তা নিয়ে গ্রামের লোকেদের ভাবনার অন্ত ছিল না।

কেউ বলত সূত্রধর সন্ন্যাসী হয়ে গেছেন। কেউ বলত সূত্রধরকে মেরে দিয়েছে ওই বৌদ্ধ  সন্ন্যাসী। ও নিশ্চয় তান্ত্রিক।

কিন্তু সূত্রধর সে সব কিছুই নয়। শান্তও কিছুই নয়। যে কথা সূত্রধর কাউকে বলতে পারেনি, তা হল সূত্রধর শান্তর প্রেমে পড়েছিল।

একে তো ভালবাসার টানই বলে। হতে পারে শান্ত পুরুষ। হতে পারে সূত্রধরও পুরুষ। কিন্তু তাদের দুজনের মধ্যে কি ভালোবাসার কোনও বীজ অঙ্কুরিত হতে পারে না?

অন্ধকার এক রাতে সূত্রধর আর শান্ত যখন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুয়েছিল এই পুকুরের ধারে বনঘাঘরা মন্দিরের পাশে, তখন শান্ত সূত্রধরকে বলেছিল, তুমি ঘরে যাও। আমিও ভিক্ষু। জড়িয়ে পড়তে চাই না এই মায়ার টানে। আর আমাদের এই সম্পর্ক সবাই ছি ছি করবে। আমার তো কিছু না। আমি তো আবার চলে যাব অন্য কোনও জায়গায়। কখনো আর ফিরে আসব না। কিন্তু তুমি কোথায় যাবে?

–        আমি তো তোমার প্রেমে পড়েছি শান্ত।

–        আমি একজন ভিক্ষু। প্রেম এবং ভালবাসাই আমার ধর্ম। আমি তোমাদের ভাষায় একজন সন্ন্যাসী। এ কথা তুমি তো জানো। কিন্তু তুমি একজন শিল্পী।

–        আমি তোমার সঙ্গে এমন বেরিয়ে পড়তে পারি না? তুমি যেমন ভাবে পথের ধুলো মেখে প্রান্তরের পর প্রান্তরে হেঁটে বেড়াও?

শান্ত এ কথা শুনে চুপ করে গিয়েছিল। হয়তো মনে মনে তখন কল্পনা করেছিল অন্য কোথাও তাকে চলে যেতে হবে।

কিন্তু সূত্রধরও তাকে ছাড়ার পাত্র ছিল না।

বনঘাঘরা মন্দিরের সামনে এলেই শান্তর কথা মনে পড়ে সূত্রধরের। দুই চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে আসে। নিজের শরীরের জন্য দুঃখ হয়, যন্ত্রণা হয়। নিজের শরীরকে মাটির আরও কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার জন্য সে মাটি কামড়ে ধরে। মাথার ভিতরে যেন প্রচুর রোদ তখন একটা সময় থেকে আরেকটা সময়ের দিকে ছুটে ছুটে চলে যায়।

এখানে বেশিক্ষণ থাকলেই তার মন ভারি হয়ে আসে।

শান্তর সঙ্গে সে পাড়ি দিয়েছিল পাহাড়ের দিকে। মাঠ ঘাট পেরিয়ে সে কত দূর!

হিমালয়ের দিকে যেতে যেতে শান্ত তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি পারবে তো? না হলে ফিরে চলো।

সূত্রধর বলেছিল, আমি হিমালয় দেখিনি কখনো। দূর থেকে হলেও দেখব।

শান্ত সূত্রধরের হাত ধরে তাকে নিয়ে গিয়েছিল হিমালয়ের দোরগোড়ায়।

সেই অপার্থিব সৌন্দর্যের কথা বর্ণনা করা অসম্ভব সূত্রধরের পক্ষে।

কিন্তু পথ একদিন শেষ হয়। যদিও সামনে ছিল আরও অনেক পথ।

কিন্তু শান্ত তাকে সে পথে যেতে বাধা দেয়।

শান্ত নিজেও ফিরে আসে,সঙ্গে সূত্রধর।

রাধার মতো কেঁদে ভাসায় সূত্রধর।

এই ফসলক্ষেতের ভিতর একা রাধার মতো যখন সে কাঁদছে, তখন শান্ত এই আলপথ দিয়েই চলে গিয়েছিল অন্য কোথাও।

সে বেঁচে আছে কিনা, তা পর্যন্ত জানে না সূত্রধর।

প্রেম হারিয়ে গেল সূত্রধরের। হয়তো হারিয়ে গেছে বলেই সূত্রধরের মনের ভিতরে প্রেম বেঁচে আছে এখনো।

যে অলংকরণ সূত্রধর মাটির বুকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে, তা তো একপ্রকার একটা ভাষা।

কেউ বুঝতে পারে না এমন একটা ভাষায় সে এক একটা শিল্প রচনা করে যায়। তারপর সেগুলিকে যখন পোড়ানো হয় চিরস্থায়ী করে তোলার জন্য, তখন তার মনে হয় যেন বা মাটির প্রাণ পুড়িয়ে তাকে চিরকালীন করে তোলা হল।

গলাটা কেমন শুকিয়ে আসছে আবার সূত্রধরের।

সে জানে, তার প্রেমের মতোই তার স্বপ্নের কথাও বেশিরভাগ মানুষের কাছে অপরিচিতই থাকবে। প্রেমের কথা কাউকে বলা যাবে না, স্বপ্নের কথা যদিও বা কাউকে বলা যায়। পুরুষে পুরুষে প্রেম যে হয় না, তা তো সকলেই জানেন।

সূত্রধর ধীরে ধীরে পা বাড়ায় গ্রামের দিকে। পিছনে পড়ে থাকেন বনঘাঘরা দেবী। পড়ে থাকে আলপথ। ফসলের ক্ষেত।

শিবচরণ দূর থেকে দেখতে পেল ফসলের ক্ষেতের পাশ দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে সূত্রধর। শিবচরণ বোঝে সূত্রধরকে। সূত্রধরের মতো প্রতিভাবান শিল্পী শিবচরণ দেখেনি। কিন্তু সূত্রধর ঠিক ততটা আলোড়ন ফেলে দেওয়া কোনও কাজ এখনো পর্যন্ত করে তুলতে পারল না।

এর কারণ সম্ভবত, শিল্প আর সূত্রধর একে অপরের সঙ্গে মিশে আছে। সেখানে শিবচরণ সফল একজন শিল্পী হয়েও সূত্রধরের মতো শিল্পকে আলিঙ্গন করতে পারেনি।

মনের মধ্যে শুধু এখন একটা মূর্তি ভেসে ভেসে বেড়ায় শিবচরণের। আর সেই মূর্তিকে শিবচরণ আগেই দেখেছে। এইবার চিংড়েখেলকে সে মাটির উপর ফুটিয়ে তুলবে। পোড়ামাটির ভাস্কর্যে এবার থেকে চিংড়েখেলের রূপও থাকবে।

তাদের গ্রামের ভিতরে এই চিংড়েখেল মাঝেমাঝেই দেখান হয়। এই চিংড়েখেল যারা খেলে, তাদের জন্যই এখনো পর্যন্ত নানা দুর্যোগেও গ্রামবাসীরা রক্ষা পায় দস্যুদের হাত থেকে।

এরা খেলে। কী খেলে? নানান শারীরিক কসরত, লাঠি নিয়ে, বর্শা নিয়ে নানান ভঙ্গিমা করে। তাদের শরীরের সুগঠিত ছাঁদ দেখতে দেখতে মাঝেমাঝে গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে। যখন মেলা হয়, তখন এরাই দড়াবাজির খেলা দেখায়। লাঠি নিয়ে, দড়ি নিয়ে সে এক দারুণ ভারসাম্যের খেলা। লাঠি এদের শরীরেরই একটা অংশ। বর্শা এদের নখের একটা অংশ। কোথাও এসব খেলাগুলোকে বলে বাঁশবাজি, আবার কোথাও বা এসব খেলাগুলোকে বলে চিংড়েখেল। তাদের গ্রামে এমন অনেকেই আছে যারা চিংড়েখেল দেখায় আর গ্রাম রক্ষা করে। এমনকি ক্ষেত পাহাড়া দেয় এরাই। তাদের হাতের লাঠি, বর্শা আর কাস্তে দেখে সবাই একটূ সমীহ করেই চলে। তাদেরই প্রায় দু বছর ধরে লক্ষ্য করতে করতে শিবচরণ তাদের নিয়ে তৈরি করছে চিংড়েখেল। কিন্তু এখনো অনেক কাজ বাকি। তাদের ফুটিয়ে তোলার জন্য অনেক বেশি লক্ষ্য করা বাকি। তাদের মুখচোখ দেখলে মনে হয় না তাদের ভিতরে কোনও দুঃখ আছে। কিন্তু সেই দুঃখ তো আছেই কোথাও না কোথাও। সেই দুঃখের ঠিকানা যদি সে না জানে, তাহলে সে কীভাবে ফুটিয়ে তুলবে? কীভাবে সে ফুটিয়ে তুলবে তার শালভঞ্জিকাকে?

আবার হৈমন্তীর কথা মনে পড়ল শিবচরণের। কেন এমন হচ্ছে, সে জানে। এ হল শিল্পীর ভিতরের অস্থিরতা। তাকে শালভঞ্জিকাকে তৈরি করতেই হবে। তার জন্য হৈমন্তীকে লাগবে তার। হৈমন্তীকে দেখেই সে বুঝতে পেরেছে হৈমন্তী ছাড়া আর কাউকে দেখেই সে শালভঞ্জিকা রচনা করতে পারবে না।

প্রশ্ন হল, সে কীভাবে হৈমন্তীকে রাজি করাবে?

এখনও চন্দন আর হৈমন্তী ফসলের খেতের ধারে বসে আছে। কিছু কথা বলছে না। কিছু কথা না বলে এই যে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকা, তা যে এক গভীর প্রেম, তা আর বুঝতে বাকি থাকে না শিবচরণের কাছে। কিন্তু এই প্রেমের পদ্য তো সে লিখতে চায় না। সে চায় এক রক্তমাংসের রমণীকে। যাকে দেখে লোভ জন্মাবে পুরুষের হৃদয়ে। যাকে দেখলে হাত বাড়াতে ইচ্ছে করবে প্রত্যেক পুরুষের। সঙ্গম করতে ইচ্ছে করবে।

কিন্তু যে থাকবে মাটির ভিতর। পোড়া মাটির ভিতর। শিল্পের আড়ালে।

শিবচরণ অপেক্ষা করে। অপেক্ষা করে।

সূত্রধর অপেক্ষা করে।

(ক্রমশ)

আগের পর্ব : poramatir gram 3rd


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top