মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস- পর্ব – ১৭

murderonorientexpressparbo17


এরকুল: আপনি ইস্তাম্বুল থেকে প্যারিস যাচ্ছেন?
হার্ডম্যান: ঠিক তাই।
এরকুল: কারণটা জানতে পারি?
হার্ডম্যান: প্লেন অ্যান্ড সিম্পল ব্যবসা।
এরকুল: আপনি কি বরাবর ফার্স্ট ক্লাসেই যাতায়াত করেন?
হার্ডম্যান: অবশ্যই। কোম্পানির পয়সায়—পরের ধনে। ওরাই যাতায়াতের খরচ বহন করে কি না।
এরকুল: আচ্ছা মি. হার্ডম্যান, গতকাল রাতের ঘটনা সম্পর্কে আপনি কি জানেন?
হার্ডম্যান: কিছুই না।
এরকুল: গতকাল রাতে ডিনারের পর থেকে আপনি ঠিক কী করেছিলেন একটু যদি বলেন। না না, এটা রুটিন, আমরা সবার কাছ থেকেই জানতে চাইছি।
হার্ডম্যান: (একটু অপ্রস্তুতভাব দেখিয়ে) উত্তর দেওয়ার আগে যদি কিছু মনে না করেন, আপনাদের পরিচয় জানতে পারি?
এরকুল: অবশ্যই। ইনি মঁসিয়ে বুঁ, এই রেল কোম্পানির অন্যতম ডিরেক্টর। আর (ডাক্তারের দিকে নির্দেশ করে) উনি ডা. কনস্টানটাইন। উনিই প্রথম লাশটিকে পরীক্ষা করেছিলেন।
হার্ডম্যান: আর আপনি?
এরকুল: আমি এরকুল পোয়ারো। এই রেল কোম্পানি আমাকে এই খুনের তদন্তের জন্য নিয়োগ করেছে।
হার্ডম্যান: আচ্ছা, আপনিই মঁসিয়ে পোয়ারো! আমি আপনার নামের সঙ্গে বিলক্ষণ পরিচিত। তাহলে সবকিছু খোলাখুলিই আলোচনা করা ভালো।
এরকুল: অবশ্যই, আপনি যা জানেন খোলাখুলিই বলতে পারেন। এতে তদন্তেও সুবিধা এবং আপনারও।
হার্ডম্যান: আপনি জিজ্ঞাসা করছিলেন না ঘটনা সম্পর্কে আমি কতটুকু জানি। বিশ্বাস করুন, আমি কিছুই জানি না। কিন্তু খুন হওয়া সম্পর্কে আমার সবকিছুই জানা উচিত ছিল, আফসোস, আমি কিছুই জানতে পারলাম না।
এরকুল: একটু খুলে বলুন, আপনার বক্তব্যের কোনো মানেই বোঝা গেল না।
হার্ডম্যান: (মুখের চুইংগামটা ফেলে দিলেন এবং চেহারায় সিরিয়াসভাব এনে) দেখুন, আমার পাসপোর্টটা জাল। ওতে যা লেখা আছে আমি তার কোনোটাই নই, এই দেখুন—
মঁসিয়ে বুঁ: অ্যাটেনশনের ভঙ্গিমায় শিরদাঁড়া টানটান করে বাড়ানো কার্ডটার উপর চোখ বুলিয়ে থেমে থেমে পড়লেন—
মি. সাইরাস বি হার্ডম্যান, ম্যাকনিল ডিটেকটিভ এজেন্সি, নিউ ইয়র্ক।
এরকুল: ম্যাকনিল ডিটেকটিভ এজেন্সি! সে তো আমেরিকার অন্যতম সেরা ডিটেকটিভ এজেন্সি। আপনি তার এজেন্ট—আই মিন আপনি গোয়েন্দা! গোয়েন্দা ইতিমধ্যেই এই কেসে! এতে তো আরও জট পাকিয়ে গেল। ব্যাপারটা একটু খুলে বলুন।
হার্ডম্যান: দুজন অপরাধীকে ধাওয়া করতে করতে আমি আসি ইউরোপে। সেখান থেকে পিছু ধাওয়া করতে করতে ইস্তাম্বুলে এসে হাজির হই। এই সময় হেড অফিস থেকে আমেরিকা ফিরে আসার জন্য তার পেয়ে। যাই হোক, নিউ ইয়র্ক ফিরব ফিরব করছি, এমন সময় পেলাম এই চিঠিটা। (একটা চিঠি বাড়িয়ে)
এরকুল: (চিঠিটা খুলতে খুলতেই লক্ষ্য করলেন) হুঁ, ঠিকানা হোটেল তোকাতলিয়ান। চিঠিতে লেখা—
স্যার, বিশ্বস্তসূত্রে জানতে পারলাম যে, আপনি ম্যাকনিল ডিটেকটিভ এজেন্সির একজন সিক্রেট এজেন্ট। যদি আজ বিকাল চারটায় সময় করে এই হোটেলে আমার সঙ্গে দেখা করেন, তবে বিশেষ বাধ্য হব।
ধন্যবাদান্তে,
এস.ই. রাশেট।
এরকুল: বুঝলাম। তা আপনি দেখা করলেন?
হার্ডম্যান: হ্যাঁ। বিকাল চারটায় আমি ওনার সঙ্গে হোটেল তোকাতলিয়ানে দেখা করি। উনি ওনার ‘খুন হয়ে যাওয়ার’ আশঙ্কার কথা জানান। খানদুয়েক উড়ো হুমকি চিঠিও দেখান।
এরকুল: আপনার কি মনে হয় হুমকি চিঠিগুলোর জন্য মি. রাশেট খুব ভয় পেয়েছিলেন?
হার্ডম্যান: দেখুন, হাবভাবে একটা ‘Don’t care’ ভাব ছিল বটে, কিন্তু আমার মনে হয়েছিল ভেতরে ভেতরে ভালোই ভয় পেয়েছিলেন। যেহেতু ঘটনাচক্রে আমরা একই ট্রেনের ও কোচের যাত্রী, তাই উনি মনেপ্রাণে চাইছিলেন আমাদের পাশাপাশি দুটো কুপের টিকিট হোক। কিন্তু বাস্তবে তেমনটা হলো না। আমার জুটল ষোলো নম্বর। এতে উনি একটু মুষড়েও পড়েছিলেন। পরে অবশ্য বুঝলাম, ট্রেনের যাত্রীদের উপর নজরদারির জন্য, বিশেষ করে ট্রেনের নতুন যাত্রীদের ওঠানামার উপর নজরদারির জন্য এটাই সব থেকে মোক্ষম জায়গা। ষোলো নম্বরের সামনেই এই কোচ থেকে ওঠানামার দরজা, আর ওটা বেশির ভাগ সময়ই লাগানো থাকে। এই কোচের সামনে শুধু ডাইনিং কোচ, তার পরই ইঞ্জিন। ডাইনিং কোচে যেতে গেলে সবাইকেই ষোলো নম্বরের সামনে দিয়েই যেতে হয়, সুতরাং যাত্রীদের উপর নজরদারির সুবিধা বেশ ভালোই। কিন্তু সেসব থেকেও—
এরকুল: আচ্ছা মি. হার্ডম্যান, উনি যার বা যাদের থেকে তাঁর প্রাণের আশঙ্কা করছিলেন, অর্থাৎ সম্ভাব্য হত্যাকারী বা হত্যাকারীরা, সে সম্পর্কে আপনার সঙ্গে কোনো আলোচনা করেছিলেন?
হার্ডম্যান: (গলাটা একটু খাটো করে ও মাথা ঝুঁকিয়ে। বাকিরাও মাথা ঝুঁকিয়ে ফিসফিসানিতে যোগ দিলেন)। হ্যাঁ, বলেছিলেন। একটা ছোটখাটো চেহারার অশ্বেতকায় লোকের বর্ণনা উনি দিয়েছিলেন। ভদ্রলোকের গলাটা আবার নাকি মেয়েলি। শুধু তাই নয়, উনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, প্রথম রাতে তেমন কিছু ঘটবে না, ঘটবে দ্বিতীয় বা তৃতীয় রাতে। কী আশ্চর্য! ঘটলও তাই।
বুঁ: আশ্চর্যই বটে। মি. রাশেট দেখছি প্রায় গোটাটাই জানতেন।
এরকুল: হুঁ। সবই জানতেন, কিন্তু ওনার সেক্রেটারি ম্যাককুইনকে দেখছি এ ব্যাপারে কিছুই জানাননি। আচ্ছা মি. হার্ডম্যান, উনি কী কারণে এত খুন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করতেন? কিছু কি বলেছিলেন আপনাকে?
হার্ডম্যান: না না, সে বিষয়ে আমি জিজ্ঞাসা করেও কিছুই জানতে পারিনি। শুধু বলতেন, হত্যাকারী তাঁর রক্ত দেখতে মরিয়া। যে করেই হোক তা ঠেকাতেই হবে।
এরকুল: আপনি কি লোকটির আসল পরিচয় জানেন?
হার্ডম্যান: কোন লোকটির?
এরকুল: মি. রাশেটের?
হার্ডম্যান: আবার এখানেও রহস্য নাকি? কী যে বলছেন কিছুই বুঝতে পারছি না।
এরকুল: রহস্য! রহস্য! চারিদিকেই রহস্য! মার্ডার হওয়া লোকটি আসলে হলেন কাসেট্রি। আমেরিকায় হৈচৈ ফেলা ডেইজি আর্মস্ট্রং হত্যা মামলার মূল অভিযুক্ত।
হার্ডম্যান: এঃ! বলেন কি? অবশ্য যখন আর্মস্ট্রং মামলা নিয়ে হৈচৈ চলছিল, তখন অবশ্য আমি পশ্চিমে ছিলাম। পরে আমি পেপারে হত্যাকারীর ছবি দেখেছিলাম, কিন্তু প্রেস ফটোগ্রাফারদের ছবির যা ছিরি, চেনাই দুষ্কর। বলব কি মশাই? আমি একবার খবরের কাগজে বের হওয়া আমার মায়ের ছবি পর্যন্ত চিনতে পারিনি। সে যাক গে, তেমন হলে—কাসেট্রির অনেক শত্রু থাকাটাই স্বাভাবিক।
এরকুল: মি. হার্ডম্যান, রাশেট সম্ভাব্য হত্যাকারীর যেমনটা বর্ণনা দিয়েছিলেন, তেমন কারও সঙ্গে কি আর্মস্ট্রং ফ্যামিলির সঙ্গে যুক্ত কারও চেহারার মিল আছে বলে আপনার মনে হয়?
হার্ডম্যান: তা বলতে পারব না। তাছাড়া শুনেছি ঐ কেসের সঙ্গে যুক্ত সকলেই মারা গেছেন।
এরকুল: ঐ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত কোনো এক অল্পবয়সী মেয়ে নাকি জানলা দিয়ে রহস্যজনকভাবে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে।
হার্ডম্যান: হ্যাঁ হ্যাঁ! মনে পড়েছে, কিন্তু সে সম্ভবত বিদেশি ছিল। তার কোনো আত্মীয়টাত্মীয় থাকতেই পারে। তবে ঐ কাসেট্রির লোকটা আর্মস্ট্রং মামলা ছাড়াও আরও অনেক মামলাতেই জড়িয়ে ছিল, শত্রুরও অভাব ছিল না। ডেইজি আর্মস্ট্রং হত্যা মামলার সঙ্গেই যে এই খুন যুক্ত, তেমনটা এত নিশ্চিত হচ্ছেন কী করে?
এরকুল: দেখুন, ডেইজি হত্যার সঙ্গেই যে এই খুনের ঘটনা যুক্ত, তার অকাট্য প্রমাণ আমাদের হাতে আছে।
হার্ডম্যান: বলাবলি কথা কি, খবরের কাগজে একটু-আধটু পড়া ছাড়া ডেইজি হত্যা মামলা সম্পর্কে আমি অবশ্য তেমন আর খোঁজখবরই রাখিনি।
এরকুল: সে না হয় নাই রাখলেন। এখন বলুন তো, কাল রাতে ডাইনিং কোচ থেকে ফেরার পর ঠিক কী কী করলেন?
হার্ডম্যান: দেখুন, আমি ঠিক করেছিলাম দিনে ঘুমিয়ে রাতে নজরদারির কাজটা করব। মি. রাশেটও তেমনই চাইছিলেন। প্রথম রাতে সন্দেহজনক তখন কিছু চোখে পড়েনি। কাল তো প্রায় সারারাতই পাহারায় ছিলাম। কিন্তু না, নতুন কাউকে তো ট্রেনে উঠতে দেখিনি।
এরকুল: আপনি নিশ্চিত?
হার্ডম্যান: ১০০ শতাংশ নিশ্চিত। বাইরে থেকে নতুন কেউ ওঠেনি। পেছনের দরজা দিয়েও কেউ ওঠেনি।
এরকুল: আর কন্ডাক্টরের গতিবিধি?
হার্ডম্যান: না না, সন্দেহজনক কিছু মনে হয়নি। নিজের সিটে বসেই তো ছিল প্রায় সারাক্ষণই।
এরকুল: ভিঙ্কোভচি থামার পর কী ওকে সিট থেকে নড়তে দেখেছিলেন?
হার্ডম্যান: যতদূর মনে পড়ছে, বার দুয়েক ওনাকে সিট ছেড়ে উঠতে হয়। দুবারই যাত্রীদের Call অ্যাটেন্ড করতে। প্রথমবার Call attend করে উনি আমার সামনে দিয়েই পাশের কামরায় যান। সেখানে বোধহয় মিনিট পনেরো ছিলেন। এমন সময় কানে আসে পাগলের মতো কেউ কলিং বেল বাজাচ্ছেন। ওনাকে দৌড়ে আসতে দেখি। আমিও ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম, একটু নার্ভাসও হয়ে পড়েছিলাম। পরে দেখলাম ঐ আমেরিকান ভদ্রমহিলার কাণ্ড। এরপর একটা মিনারেল ওয়াটারের বোতল নিয়ে ওনাকে যেতে দেখি, হয়তো কোনো কামরায় দিতে যাচ্ছিলেন। এরপর কিছুক্ষণ পর আরেকটি কামরা থেকে ডাক আসে, হয়তো বিছানা পাতার জন্য। তারপর—ওনাকে আর নিজের সিট থেকে নড়তে দেখিনি।
এরকুল: সিটে বসে উনি ঝিমোচ্ছিলেন না সজাগ ছিলেন, সেটা কি নজর করেছিলেন?
হার্ডম্যান: সঠিকভাবে বলতে পারব না, তবে মনে হয় জেগেই ছিলেন।
এরকুল: অনেক ধন্যবাদ। আচ্ছা, এই কাগজটায় আপনার নাম, ঠিকানা ইত্যাদি— (একটা কাগজ বাড়িয়ে)।
হার্ডম্যান: দিন, দিন (লিখতে লিখতে)।
এরকুল: যদি প্রয়োজন হয় তো আবারও ডাকতে পারি। আপনার প্রকৃত পরিচয় ট্রেনের আর কোনো যাত্রীর জানার সম্ভাবনা আছে কি?
হার্ডম্যান: না, বোধ হয়। তবে ঐ ম্যাককুইনকে আমার চেনা লাগছিল। নিউ ইয়র্কে ওর বাবার অফিসে একটা কাজে গিয়েছিলাম, ওখানেই দেখি। তা-ও সেটা বেশ কয়েক বছর আগে। তবে সেভাবে আলাপ হয়নি, ও বোধহয় আমায় চিনতে পারেনি। এতদিন পর মনে রাখাটা বেশ কঠিনই। চিন্তা করবেন না, যা বললাম একদম ১০০ শতাংশ সত্যি বললাম। পরে নিউ ইয়র্কে যোগাযোগ করে কনফার্ম করে নিতে পারেন। তবে হ্যাঁ, আপনার সঙ্গে আলাপ করে বেশ ভালো লাগল।
এরকুল: (নিজের সিগারেট কেসটা হার্ডম্যানের দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে) চলবে নাকি একটা? না আপনি আবার পাইপ পছন্দ করেন?
হার্ডম্যান: (সিগারেট কেস থেকে একটা সিগারেট তুলে নিয়ে)। না, সিগারেটই। অশেষ ধন্যবাদ (বেরিয়ে গেলেন)।
ডা. কনস্টানটাইন: কী মনে হয়, লোকটা নিজের সম্বন্ধে যা বলল সব সঠিক?
এরকুল: মনে হয় না মিথ্যা বলার ঝুঁকি নেবে। তাছাড়া আমি এ ধরনের ‘লোকাল’ গোয়েন্দাদের টাইপটা চিনি। মনে হয় পরিচয়টা সত্যিই। তবে উনি একটা দরকারি তথ্য দিয়ে গেলেন, সেটা হলো সম্ভাব্য আততায়ীর বর্ণনা। জটিলতা বাড়ল। (চিন্তিত হয়ে)
বুঁ: বেঁটে-খাটো চেহারার, বাদামি গায়ের রং এবং মেয়েলি গলা।
এরকুল: সমস্যাটা হলো যে, বর্ণনাটা আবার ট্রেনের এই কোচের কোনো যাত্রীর সঙ্গেই মেলে না। ব্যাপারটা দেখছি ক্রমশ জটিল হচ্ছে। দেখা যাক।
(একটু হেসে মঁসিয়ে বুঁ-এর দিকে চোখ মটকে) এই এতক্ষণে মঁসিয়ে বুঁ-এর মনবাসনা পূর্ণ হবে। এবার ইতালীয়টির পালা।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top