বেলা বাড়তে না বাড়তে বাড়িতে পাড়ার লোক ভেঙে পড়লো। মৃতার শরীর একটা শীতল পাটিতে করে তুলসী তলায় নামানো হয়েছে, মাথার কাছে মাটি সুদ্ধু তুলসী চারা। যত্ন করে চন্দনের ফোঁটা দিয়ে কপাল সাজিয়ে দিয়েছে কেউ। চোখের ওপর তুলসী পাতা। পাড়ার ছেলেরা বাঁশ কেটে চালা তৈরী করছে। শব দেহের দুর্গন্ধ চাপা দেয়ার জন্য অগরু ছড়ানো হচ্ছে, গোছা গোছা ধুপকাঠি ধরানো হয়েছে।
বাড়ির বড় আর মেজ ছেলেরা খবর পেয়ে তড়িঘড়ি নিজের নিজের পরিবার নিয়ে চলে এসেছে। দেহ ঘর থেকে বের করার আগে মৃতাকে গঙ্গা জল খাওয়ানোর হিড়িক পড়ে গেল । শেষ সময় কে ছিল, মুখে জল দেওয়া হয়েছিল কিনা। অবস্থা এত খারাপ তাও কেন খবর দেওয়া হয় নি … এসব দোষারোপ চলতেই থাকলো। পাড়ার মহিলারাও তাতে যোগ দিল । আমি ওখান থেকে সরে এসে নিজের ঘরে দোর বন্ধ করে মেঝেতে বসলাম । উঠোনে সমস্বরে চিৎকার করে কান্নাকাটি শুরু হয়েছে, রোদনকারীনিদের কারও গলা আমার পরিচিত নয়। শুনতে শুনতে আমার চেতনা অত্যাধিক মানসিক চাপে অবলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল না শ্রান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পরেছিললাম জানি না । দরজার ধাক্কায় সম্বিত ফিরলো। শ্মশান যাত্রীরা এবার রওনা দেবে, এক বার শেষ দেখার জন্য মানদা ডাকতে এসেছে। বেলা বেড়ে গেছে, শ্মশান যাত্রীরা সমবেত কণ্ঠে হরিধ্বনি দিয়ে খই ছড়াতে ছড়াতে এগিয়ে গেল। এ বাড়িও গোবর গঙ্গা জলের ছড়া দিয়ে শুদ্ধ করা হল। শাশুড়ির খাট থেকে তাঁর ব্যবহৃত সব জিনিস টেনে নিয়ে তাঁর সঙ্গেই শ্মশানে পাঠানো হয়েছে। মানুষটার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সমস্ত চিহ্ন যেন জীবিতদের জন্য অকল্যাণকর হয়ে উঠেছে। তাই দূর করো দূর করো, সব ঝেঁটিয়ে বিদেয় করে দাও এই মনোভাব নিয়ে সব ফেলে দিয়ে গঙ্গা জলে সব অশুচিতাকে মুছে ফেলা হল। হায় রে মানুষ! বেঁচে থাকতে নিজেকে সংসারের জন্য অপরিহার্য ভাবে।
শ্মশান যাত্রীরা শব দাহ করে ফিরে লোহা আর অগ্নি স্পর্শ করে শুদ্ধ হল। আমি স্নান করে কোরা থান পরলাম। জায়েরাও লাল পেড়ে কোরা শাড়ি পরল। এ সময়ে জামা আর পেটিকোট পরা নিষিদ্ধ। আজ দাহ কার্য সম্পন্ন করার পর বাড়ির সবাই ফল মূল খাবে। কাল থেকে হবিষ্যান্ন গ্রহণ করতে হবে।
“সেজ গিন্নি বেশ আট ঘাট বেঁধেই আসরে নেমেছো দেখছি। জা ভাসুররা নেই, গোটা বাড়িটা একা ভোগ করবে বলে নিজের খুড়তুতো বোনকে আনার ব্যবস্থা করলে?”
শীতের বেলা পড়ে আসে বড় তাড়াতাড়ি। বড়দি মেজদি আর আমি খোলা উঠোনে মাদুর পেতে বসে নরম রোদে আধ ভেজা চুল শুকোই। ওদের হাতে থাকে উল কাঁটা, পশমে কোন দোষ নেই তাই অশৌচের অবসরে ছেলে পুলের শীতের পোশাক নানা নকশায় বুনে চলেছে দুজনে। এটা আমি শিখিনি আর শিখেই বা কী করবো?
আজকাল আমার মনটা অনেক শান্ত থাকে, এখন ঘর ভর্তি লোকজন। দুই জা,ভাসুর আর ছোট ছোট ছেলে মেয়ে। শাশুড়ী মারা যাওয়ার রাতে যে ভয়ে দম আটকে আসছিল সেটা আর নেই। বড় জায়ের ঠেস মারা কথা শুনে, আহত হলেও মৃদু স্বরে বললাম , “কার কাছে জানলে গো দিদি?”
বড় জা শ্লেষ ভরা সুরে বলল, “কার কাছে আবার, বুজুর বাপের কাছেই শুনেছি। ছেরাদ্দের ফর্দ তৈরি হচ্ছিল, তো পুরুত ঠাউরকে ছোট ঠাকুরপো বললো বছরকি নাকি একসঙ্গেই হবে। তা এই ফাগুনেই নাকি বে?”
“দিদি তিনি কি একথা বলেছেন যে এ বিয়ের সম্বন্ধ আমি ঠিক করেছি?”
“তা বাপু তুমি ঘটকালি না করলে কি হতো?
আমি মাথা নিচু করে বললাম, “না গো দিদি, আমাকে কেউ কিচ্ছু বলেনি। এমনকি আমার বাপের বাড়িও আমাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি। আগে জানলে এ সম্বন্ধ আমি হতে দিতাম না। বোনটাকে আমি কোলে করে বেড়াতাম ওর জন্মের পর থেকেই। বাপের ঘরেও কেউ আমার খোঁজ রাখে না, নইলে … দোহাই বড়দি, তুমি পার না এই বিয়েটা ভেঙে দিতে?”
বড় জা অবাক হয়ে বলল, “ওমা ওকি কথা গো! খামোখা বে ভাঙতে যাবো কেন বলো দিকিনি? তোমার বাপের ঘরে বড়রা যদি খোঁজ খবর না নিয়ে বে দেয় সে দায় কি আমাদের?”
মেজ হেসে জা বললো, “শুনলাম নাকি মেয়ে পছন্দ হওয়ায় তোমাদের বাড়িতেই আশীর্বাদ পর্যন্ত হয়ে গেছে। দোষ বাপু তোমার বাপের বাড়ির কম নয়, ঠাকুরপোর মাথার ওপরে দুই বড় ভাই, ভাজ, তিন দিদি। কারুক্কে না জানিয়ে চুপেচাপে আশীর্বাদ হয়ে গেল! কেন এত তাড়া কিসের? নাকি মেয়ের কোন দোষ আছে? আর এ বে তে তোমারই বা আপত্তি কিসের বুঝি না। বিয়েটা হলে দিব্যি দুই বোনে মিলে মিশে সংসার করবে। আমরা না হয় আঁটির মতো দূরেই থাকব।”
বড় জা আবার বলল, “হ্যাঁ সেই কথাই তো ভাবছি। আগে ভাবছিলাম নিজের বোনকে সংসারে এনে এ বাড়ি দুই বোনে ভোগ দখল করতে চাইছো। এখন তো দেখছি বোনকেও ভাগ দিতে নারাজ। কী মতলব তোমার বল দেখি সেজ বউ। গায়ে থান জড়িয়ে সতী সেজে ছোট দেওরের সঙ্গে বেলেল্লাপনা, বেহায়াপনা করবে? আর আমরা দূর থেকে মুখ বুজে সে সব বিনি পিতিবাদে সহ্য করব? ছোট দেওরের বে হলে রাজপাট সব গোল্লায় যাবে, তাকে আর আঁচলে বেঁধে রাখতে পারবে না তাই এত ভয়!”
মেজ জা বলল, “যা বলেছ দিদি, আমার তো গোড়া থেকেই সন্দেহ ছিল। অত বড় দেওর, নেকাপড়া জানা মানুষ। তার সঙ্গে অতো ঢলাঢলি কিসের? আমরাও তো আগে এ বাড়িতেই কত বছর সংসার করেছি। কই কখনো তো দেওর ভাসুর শ্বশুরের সঙ্গে কথাটি কইনি। অবিশ্যি আমাদের সেজ বউও আবার নেকাপড়া জানা মেয়েছেলে কিনা। তার বোলচাল তো আলাদা হবেই।”
ছিটকে উঠে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার চোখ মুখ বোধহয় হিংস্র হয়ে উঠেছিল। দু চোখে আগুন ঝরিয়ে বলেছিলাম, “আজ যা বললে এ কথা যদি জীবনে দ্বিতীয় বার শুনি তাহলে তোমার সম্মান রক্ষা করার আমার কোন দায় থাকবে না। উপযুক্ত জবাব পাবে। তোমাদেরকে দেখে আমার ঘেন্না হচ্ছে বুঝেছ! ঘেন্না হচ্ছে!”
নিজের ঘরে চলে এসেছিলাম। ঠিক করেছিলাম ওদের সঙ্গে আর কোন কথা বলব না।
(ক্রমশ)
আগের পর্ব : paap16



