১
দীর্ঘ এই নতশরীর
দীর্ঘ এই নতশরীর |
ছুঁয়ে দেখো,
কেউ শুয়ে নেই।
কেবল মুছে গেছে
মধ্যরাত পেরোনো
পথ…
তবুও ভোর নেমে
এলে কেন রন্ধ্রে রন্ধ্রে
ক্ষুদ্র হই?
২
কিছু শব্দ
তুমি কি কেবলই আঘাত
চেনো, সবুজ?
তোমার তৃণশরীর পেরিয়ে
যারা ঢেকে দিল প্রপাত,
তাদের জন্য তুলে রেখো
না অন্ধকার।
ছেঁড়া রাত্রির পরতে পরতে
মুছে গিয়েছে তোমার কালপুরুষ।
পড়ে থাকা শব্দে তার ব্যবধান
খুঁজে মরি, ভোর নেমে এলে।
৩
জল পাতালের শব্দ
যদি চাও, মেঘে মেঘে ঢাকো সমস্ত
জল পাতালের শব্দ…
আজীবন মনে মনে ক্রুর করো।
অথচ প্রার্থনায় অবিচল থাকা খুব
কষ্টকর নয়, নয় গুপ্ত হলুদের ভেতর
আজন্ম ছড়িয়ে পড়া, উদ্ধত বিস্ময়ে—
যদি চাও, শঙ্খনীলে মলিন করো মাটি,
তার গোপন বিভ্রমে কেউ কি তোমাকে
ফিরিয়ে দিয়েছে— আমৃত্যু কল্পে ও গুল্মলতায়?
জল পাতালের শব্দে থৈ থৈ শূন্য ওড়ে তোমার
আগুনে ও সমস্ত স্ফীতির পথে…
স্পর্শ করো। মনে মনে বাতাস ভেবে।
৪
শ্বাপদ
নেই, তবুও ডাক ভেসে আসে।
আমি ধুলোর চোখে চোখ রেখে
দেখি কি পরম তীক্ষ্ণতায় আমাকে
মূলাধারে পাঠাচ্ছ, জড়িয়ে ধরছ
ঘূর্ণি পেরিয়ে !
অথচ এই সর্বস্বান্ত দিনে কেউ ছিল
না ইশারায়,
কেউ ছিল না ঘ্রাণ-সর্বস্বে।
গুপ্ত দলের অন্তরে তোমার একান্ত
দুয়ার ভেঙে দিল বিচ্ছিন্ন ঘাস !
৫
শুকতারা
শুকতারা এখনো কেটে নেয়
অপার ভঙ্গিমা
জুড়ে যেতে যেতে সন্ততিমুখে
যে দীর্ঘ মুদ্রা মসৃণ হতে পারে,
তার বৃত্তে আবদ্ধ করে নরম আগুন,
শূন্য থেকে শূন্যে তাদের কেউ দিয়েছে
কি স্পর্শাগম?
সমস্ত শঙ্খের উর্ধ্বমুখ আড়াল করে
ছুঁয়ে দাও রূপোরং…




অন্তর্মুখী ও আত্মসন্ধানী জীবন দর্শনের পথিক শিবালোক দাস
✍️
পাঁচটি কবিতায় কবি শিবালোক দাস এক অন্তর্মুখী, অস্তিত্ববাদী ও প্রান্তর-চেতনার জগৎ তৈরি করেছেন। তাঁর কবিতায় বাহ্যিক কোলাহলের চেয়ে অন্তর্লোকের নিঃসঙ্গতা, ক্ষয়িষ্ণুতা, এবং আত্মিক অনুসন্ধানের সুরটি বেশি জোরালো।
অস্তিত্বের নিঃসঙ্গতা ও রিক্ততাবোধ বোঝাতে শিবালোক দাসের কবিতায় এক গভীর নিঃসঙ্গতা ও হাহাকার প্রচ্ছন্ন রয়েছে । প্রথম কবিতায় যেমন দেখি—
“দীর্ঘ এই নতশরীর / ছুঁয়ে দেখো, / কেউ শুয়ে নেই। / কেবল মুছে গেছে / মধ্যরাত পেরোনো পথ…”
এই পঙক্তিগুলো মানুষের জীবনযাত্রার ক্লান্তি এবং চূড়ান্ত শূন্যতার কথাই বলে। কোলাহলপূর্ণ পৃথিবীতে মানুষ একা এবং তার সমস্ত পথচলার শেষে অন্তরের গভীরে এক ধরনের রিক্ততা ও ক্লান্তি জমা হয়।
দ্বিতীয় ও চতুর্থ কবিতায় আঘাত ও অস্তিত্বের সংগ্রামের চিত্র ফুটে ওঠে। সবুজ বা প্রাণময় সত্তার ওপর নেমে আসা আঘাত, কালপুরুষের মুছে যাওয়া কিংবা ‘শ্বাপদ’-এর মতো অদৃশ্য আতঙ্কের মধ্য দিয়ে কবি জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে চিহ্নিত করেছেন। সমস্ত সর্বস্বান্ততার মাঝেও নিঃশব্দে টিকে থাকার যে আকুতি—
“নেই, তবুও ডাক ভেসে আসে। / আমি ধুলোর চোখে চোখ রেখে দেখি…”
—তা কবির লড়াই করার মানসিকতা ও জীবনপ্রবাহের সঙ্গে অবিচল বোঝাপড়াকে নির্দেশ করে।
কবির কবিতায় প্রকৃতি কেবল বাহ্যিক রূপ নিয়ে উপস্থিত হয় না, বরং তা মানুষের অবচেতন মনের প্রতীক হয়ে ওঠে। ‘জল পাতালের শব্দ’, ‘শঙ্খনীল মাটি’, ‘গুল্মলতা’, ‘বট-পাকুড় বা বুনো ঘাস’-এর মতো উপমাগুলো তাঁর কবিতায় এক রহস্যময় আবহ তৈরি করে। প্রাত্যহিক জীবনের বাইরে এক আদিম ও অবিনশ্বর প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মিক যোগসূত্র তিনি অন্বেষণ করেন।
তৃতীয় ও পঞ্চম কবিতায় প্রার্থনার শান্ত রূপ এবং তার সমান্তরালে জমে থাকা এক ধরনের অভিমান ও সংশয় লক্ষ করা যায়। জীবনকে নিখাদ সহজ হিসেবে না দেখে, তার ভেতরের জটিল জ্যামিতি, গোপন বিভ্রম এবং নরম আগুনের তাপকে কবি স্পর্শ করতে চান। শুকতারার আলো বা রূপোরং ছোঁয়ার আকুলতা প্রমাণ করে যে, অন্ধকারের ভেতর থেকেও আলোর দিকে ফিরে যাওয়ার এক চিরন্তন বাসনা কবির অন্তরে কাজ করে।
শিবালোক দাসের জীবনদর্শন মূলত অন্তর্মুখী ও আত্মসন্ধানী। বাহ্যিক প্রাপ্তি বা কোলাহল তাঁর কাব্যের মূল সুর নয়; বরং স্মৃতির অবশেষ, অপ্রকাশিত দীর্ঘশ্বাস, এবং ভেঙে যাওয়া ইশারার ভেতর থেকে সত্যকে খুঁজে নেওয়ার নামই তাঁর কবিতা। যন্ত্রণাকে এড়িয়ে না গিয়ে, তাকে শিল্পের আলোয় চিনে নেওয়ার এক ক্লান্তিহীন অভিযাত্রী হলেন এই কবি।
#
তৈমুর খান