নিজের স্বপ্নকে তাড়া করে যে এভাবে ঘর ছেড়ে বেরোতে পারবে কোনোদিন, সে কথা মৃন্ময় বুঝতেই পারেনি প্রথমে। আসলে এ কথা বোঝা যায় না। কথায় বলে, যখন ডাক আসে, তখন একমাত্র বোঝা যায় সে ডাক কেমন। সে ডাক নাকি মনের ভিতরে এমন এক টান দেয়, যখন তাকে আর অগ্রাহ্য করা যায় না। মৃন্ময়ের প্রতিটি স্বপ্নে সুত্রধর পাল যখন তখন আসত, আসত সেই অপরূপ সুন্দরী শালভঞ্জিকা। কিন্তু শালভঞ্জিকা কোনও কথা বলত না। শুধু তাকিয়ে থাকত। একটি মূর্তি হিসেবে নয়, বরং এক জীবন্ত অস্তিত্ব হিসেবেই তার এই আকাশের মতো তাকিয়ে থাকা।
আকাশের দিকে তাকিয়ে ঠিক এমনটাই মনে হত মাঝেমাঝে মৃন্ময়ের। যেন ডাকবে বলে অপেক্ষা করে আছে। কে ডাকবে, কখন ডাকবে, কবে ডাকবে, তা বোঝা যায় না।কিন্তু ডাকবে। মনের মধ্যে এতদিন ধরে লালন করে রাখা সমস্ত সমাজ, সামাজিক আশা আকাঙ্খা, যশ, ভয়, হারানোর ভয় সব যেন সে মুহূর্তে লুপ্ত হয়ে যায়। তখন একটাই কাজ যেন বা, তার কাছে পৌঁছনো। আকাশের দিকে তাকিয়ে দু চোখ থেকে টানা জল পড়ত মৃন্ময়ের। সে নিজেই বুঝতে পারত না, এ কান্না কার জন্য। তার নিজের জন্য? নাকি অন্য কারো জন্য। একেই কি রাধাভাব বলে? জগবন্ধু লেনের যে দিকটা একটা বড় মাঠের সঙ্গে মিশে গেছে, সেখানে প্রতিবছর কীর্তন বসত। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে কীর্তন গাইতে লোকে আসতেন। মৃন্ময় সারারাত ধরে কীর্তন শুনত আর তার চোখ জলে ভরে আসত। এ ঠিক কেমন করে লেখা। ঠিক কার কথা লেখা? রাধা কি তার মধ্যেই আছে? কে সেই কৃষ্ণ? রাধাকৃষ্ণের অপেক্ষা কি চিরন্তন?
‘যে গেছে—তার সবই গেছে, কুল গেছে—মান গেছে,
রূপ গেছে, লাবণ্য গেছে, প্রাণ যেতে বসেছে।
তায় তোমায় কি ব’য়ে গেছে, আরও বিষয় বেড়েছে।
পাঁচ পদে যে ব্যাপার করে, এক পদে যদি সে হারে,
হানি কি সে জানতে পারে?’’
‘‘দেখে আমার ব্রজের কথা মনে পড়েছে আজ,
সে কথা শুনাই তোমা বল রস রাজ!”
“ছিল ধেনু গোপের পাড়া—
এথা কত হাতী-ঘোড়া;
সেখানে পরিতে ধড়া,
এথা কত জামা জোড়া,
রাই-পদে লুটান-মাথায় পাগড়ী পড়েছে তেড়া।
ছিলে নন্দের ধেনুর রাখাল,
তারপরে রাই রাজার কোটাল,
একা এসে হয়েছে ভূপাল।”
ট্রেন চলছে। কোন দিকে চলছে,তার হুঁশ নেই মৃন্ময়ের। সে শুধু এটুকু জানে, তার দুচোখ দিয়ে অনবরত জল পড়ছে। এত কান্না ছিল তবে তার মনের ভিতরে? মানুষ কি এই কান্নাটুকু বোঝার জন্যই ঘর ছেড়ে আজীবনের জন্য বেরিয়ে পড়ে? কোথায় তার বাড়ি ছিল যেন? কেন তার বাড়ি ছিল? কেন সে ফিরে যেতে চাইত সেই বাড়িতে, এ সব এখন আর মনে পড়ছে না মৃন্ময়ের। এমনকি সে মৃন্ময় – এই নামটুকুও ভুলে যেতে চেষ্টা করছে। সে জানে একবার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ার মানে হল আর ফিরে না যাওয়া। প্রতিটি পথই তো গেছে শ্মশানের দিকে, তাহলে আর ঘরে ফেরা কেন? এমনকি যে পথ ঘরের দিকে ফিরে চলেছে, সে পথও তো গেছে শ্মশানের দিকে। কোনও পথই আসলে কোথাও যায় না। পথ আর রাস্তা এক নয়। রাস্তা ক্ষুদ্র। এক জায়গা থেকে অন্য একটা জায়গায় নিয়ে যায়। আর পথ হল পথিককে চিরকালীন পথিক করে রেখে দেওয়ার পথ।
মৃন্ময়ের ঘুম আসছে না এই ট্রেনের মধ্যে। কিন্তু সে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাতে চাইছে না। কারণ সে মনে করতে চায় না কোন পথে সে সূত্রধরের কাছে পৌঁছে যাবে। সূত্রধর এমন এক দেশের লোক, যা তার স্বপ্নের মধ্যে আছে। সেই স্বপ্ন কি আর বাস্তবে আসতে পারে?
তার আবার মনে পড়ল সেই কীর্তনের কথা। রাধা যে এমন অভিসারে গেল, তাও কি এক স্বপ্নের মধ্যে? প্রেম কি মানুষকে এই স্বপ্নের মধ্যে নিয়ে যায়? এমন এক স্বপ্ন যা এক দীর্ঘ স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত। মৃত্যুর মতো। তার মনে পড়ে সেই সুর। সেই সাদা কাপড় দিয়ে তৈরি বিরাট এক পালাকীর্তনের জায়গা। সাদা কেন, প্রশ্ন এসেছিল তার মনে। হাওয়ায় সেই সাদাকাপড়গুলো দুলত। আর যেখানে কীর্তন গাওয়া হচ্ছে, সেখানে অনেক মানুষেরই চোখের কোল ভিজে। সোঁদা মাটির উপরে সে বসে পড়ত। মাটি, কী অদ্ভুত সর্বংসহা এক অস্তিত্ব। সেখানেই দেখা হয়েছিল তার সঙ্গে। হ্যাঁ, এখনো স্পষ্টভাবে মনে আছে তার মুখ। পারমিতা ঘোষ বাউল। এই নামেই সে নিজেকে পরিচয় দিত। মুখটা গোলগাল। চোখ ঢুলুঢুলু। ঠোঁটদুটো রক্তিম। এমন অভিমানী হয়ে আছে, যেন মনে হয় এখনই কাউকে আদর করতে সে প্রস্তুত। মৃন্ময়ের দিকে তাকিয়ে পারমিতা বলেছিল, আপনি বুঝি কবি?
– আমি? না না। আমি শুধু শুনি। আমি পাঠক। আমি শ্রোতা। আমি দর্শক।
– আমি কীর্তন গাই। আমার গান শূনেছেন আপনি?
– না।
– তাহলে কিছুক্ষণ পরেই শুনতে পাবেন।
– আমি অপেক্ষা করব।
– আপনি কীর্তনের কোন পদগুলি শুনতে চান?
– আমি জানি না। কীর্তন শুনলেই মনে হয়, তা যেন আমার কথাই বলছে।
– তাহলে আপনার ভিতরে বহুদিন ধরে একটা দুঃখ কাজ করছে।
– তা তো করছে নিশ্চয়।
– আপনি কাউকে ভালবাসেন?
– না তো
– নিশ্চয় বাসেন।
– না, আমি কারো জন্য অপেক্ষা করছি।
– সে তো আমরা সকলেই করছি।
– তেমনই এক অপেক্ষা। হতে পারে আমি মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি।
– মৃত্যু তো সে নাও হতে পারে। এই যে যন্ত্রণাটি আপনি মনে মনে পাচ্ছেন, এর কি কোনও তুলনা হয়?
– মানে? আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না।
– মানে, আপনার মনের এই যন্ত্রণাই হল কীর্তনের লক্ষ্য। আপনি দুঃখ যত পাবেন,তত জানবেন আমাকে পেয়েছেন।
– আপনাকে?
– হ্যাঁ আমাকে। আমি আর কৃষ্ণের মধ্যে কি খুব একটা দূরত্ব আছে নাকি? যেমন আমি আর রাধার মধ্যেও নেই। আমরা সকলেই রাধাকৃষ্ণের সঙ্গে লীন হয়ে আছি।
থমথম করছিল মনটা। যেন ঝড় আসার আগের মুহূর্ত। এই অনুভূতি মৃন্ময়ের আগে কখনো হয়নি। মন যেন সে দিয়েই রেখেছিল এই অনুভূতিমালার কাছে। কিন্তু সে মন আরও দিয়ে বসল পারমিতা ঘোষ বাউলের গান যখন শুরু হল-
‘‘এস এস বঁধু এস, আধ আঁচরে ব’স,
আজি নয়ন ভরিয়া তোমা দেখি।
আমার অনেক দিবসে, মনের মানসে
তোমা ধেনে মিলাইল বিধি।
মণি নও মাণিক নও যে হার করি গলায় পরি,
ফুল নও যে কেশের করি বেশ।
আমায় নারী না করিত বিধি তোমা হেন গুণনিধি
লইয়া ফিরিতাম দেশ দেশ।
তোমায় যখন পড়ে মনে, আমি চাই বৃন্দাবন পানে
এলাইলে কেশ নাহি বাঁধি।
রন্ধন-শালাতে যাই, তুয়া বঁধু গুণ গাই,
ধোঁয়ার ছলনা করি কাঁদি।
পারমিতা কিন্তু আর ফিরেও তাকাল না মৃন্ময়ের দিকে। আর আসেনি সে মৃন্ময়ের দিকে। ঘুরে চলে গেছে। কিন্তু এই মুহূর্তটা রয়ে গেছে মৃন্ময়ের মনের মধ্যে। আর সে বারবার অন্ধকার তারাভরা রাতে গুনগুন করেছে তার গান। পদাবলী কীর্তন গাওয়ার এক অসম্ভব চেষ্টা করেছে মনে মনে। নিজের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে নিজেকে বলেছে, আমি রাধা। আমিই রাধা। আমি যাব অভিসারে। আমার সঙ্গে দেখা করতেই হবে। আমাকে শুনতেই হবে তার বাঁশি।
পারমিতাই কি তবে সেই কৃষ্ণ, যে একটি গাছের তলায় বসে বাঁশি বাজিয়ে চলেছে?
ঘুম এসে গেল মৃন্ময়ের। নিজেকে রাধা ভাবতে ভাবতে ঘুম আসে মৃন্ময়ের। ট্রেনের দুলুনিতে, হকারের অস্পষ্ট গুঞ্জনধ্বনিতে, মানুষের নিশ্চুপ কিন্তু বাঙ্ময় কথাবার্তার মধ্যে, ভিড়ের মধ্যে সম্পূর্ণ একা হয়ে যাওয়ার অনুভূতি মৃন্ময়ের একদিনের নয়। মৃন্ময়ের যত ঘুম পেল, তত একজন লোক,আবলুশ কাঠের মতো গায়ের রং, তাকে লক্ষ্য করতে শুরু করে দিল। লোকটা এতক্ষণ উল্টোদিকেই বসেছিল, কিন্ত গভীরভাবে কাগজের প্রতি মগ্ন হয়ে। মৃন্ময় তাকে লক্ষ্য করেনি। মৃন্ময়ের তাকে লক্ষ্য করার কথাও নয়। কারণ এই লোকটা মৃন্ময়কে মারতে এসেছে।
কেন মারতে এসেছে এই কথা যদি লোকটাকে জিজ্ঞেস করা হয়, তাহলে হয়তো সে বলতেও পারবে না। কারণ লোকটা তো নিজের ইচ্ছেতে মৃন্ময়কে মারতে আসেনি। মৃন্ময়ের মতোই এই লোকটা স্বপ্নে আদেশ পেয়েছে এই লোকটাকে মারতে। এই লোকটার সঙ্গে তবে একটু পরিচয়ের প্রয়োজনীয়তা আছে। লোকটির নাম শিবরাম। সে কোনও পুরনো সময়ের লোক না। কিন্তু লোকটার একটাই রোগ। সে প্রচুর স্বপ্ন দেখে। সে স্বপ্নে দেখে আরেক শিবরামকে। যাকে অনেকটাই তার মতো দেখতে। কিন্তু সে নয়।এক রাতে, স্বপ্নের শিবরাম তাকে বলে, শোন, তোকে দিয়ে আমাদের একটা কাজ করানোর আছে।
-কী কাজ?
-তুই যে গুন্ডামি করে মানুষ খুন করে টাকা পয়সা নিস, তা আমরা জানি। এবার আমাদের জন্য কাজ করতে হবে। আ না হলে বিপদ।
– শালা বলনা, কী কাজ করতে হবে।
– মৃন্ময়কে মারতে হবে বেটা আমাদের জগতে আসার চেষ্টা করছে।
– তোমাদের জগতে মানে? স্বপ্নের জগতে?
– দূর বাল। তোকে এসব জানতে হবে না। লোকটা আমাদের জগতে এসে গেলে বিপদ। তুই ওকে মেরে দে।
– কিন্তু তুমি বললেই আমি মারব কেন?
-আমার নাম যে শিবরাম তা তো জানিস। আমার নামে ছড়া আছে জানিস তো?
– ছড়া?
– গুরুত্যাগী শিবরাম রুদোঘরায় বাস।
বলা, লোহা দুই ভাই বদনপুরের দাস।।
সিদ্ধিপাশার সাত ভাই, চাঁপাঘাটের খেলা।
এক্তারপুরের দয়ারাম, নেহালপুরের বলা।।
ভাটলার ভটিলী বামুন আর কংসরাম।
স্বনামধন্য পুরুষ এরা কুলেশীলে নাম।।
– বুঝতে পারছি তুমি স্বনামধন্য পুরুষ। কিন্তু তুমি তো আমার স্বপ্নের মধ্যে আছ।
– শোন, স্বপ্নের মধ্য থেকেই তোকে আমি আদেশ করছি তোর বাস্তুবে মৃন্ময়কে মেরে ফেল। ও যদি স্বপ্নের জগতে বাস্তব থেকে চলে আসে, তাহলে একটা দরজা খুলে যাবে। যদি সেই দরজা খুলে যায়, তাহলে খুব বিপদ। স্বপ্নের লোক বাস্তবে চলে যাবে। বাস্তবের লোক স্বপ্নে চলে আসবে। তাই আমাদের রাজামশাই, মানে রাজা মানে বিধাতা মৃন্ময়কে মেরে দিতে বলেছেন। মৃন্ময়ের ক্ষমতা আছে চলে আসার।
– চলে এলে কীই বা এমন ক্ষতি হবে? আমিও তো পালিয়ে যেতে চাই আমার স্বপ্নের মধ্যে।
– আরে সে একমাত্র মৃত্যুর সময় কেউ যদি স্বপ্ন দেখতে গিয়ে মারা যায়,সে চলে আসতে পারে। কিন্তু অন্য কেউ না। তাহলে কেউ স্বপ্ন দেখল যে সে প্রধানমন্ত্রীকে মারছে। ব্যাস। স্বপ্নের মধ্যে এসে প্রধানমন্ত্রীকে মেরে তাকে বাস্তবে নিয়ে চলে আসবে। সে সব কী ঠিক হবে রে বেটা?
– না হবে না।
– তাহলে আমাদের জন্য কাজ কর। তোকে আমাদের স্বপ্নের মধ্যে নিয়ে আসব। আর ফেরত যেতে হবে না তোকে।
– সত্যি বলছ?
– হ্যাঁ। আমরা কৃতজ্ঞ থাকি সবসময়। এর পর থেকে লোকে স্বপ্নে তোকে দেখবে। কিন্তু বাস্তবে খুঁজে পাবে না।
শিবরাম দেখতে লাগল মৃন্ময়কে। চলন্ত ট্রেনের মধ্যে শিবরাম একেবারে বাচ্চা ছেলের মতো ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু স্বপ্ন দেখছে কি? না, স্বপ্ন দেখছে বলে তো মনে হচ্ছে না। তাহলে এই সময়েই তাকে মেরে ফেলা ভাল। কারণ স্বপ্ন দেখার সময় যদি তাকে মেরে ফেলা হয়, তাহলে সে স্বপ্নের মধ্যে চিরকালের জন্য ঢুকে পড়বে। আর সেটা চাইছে না স্বপ্নের অনেকেই। তাহলে একে মেরে ফেলতে হবে স্বপ্ন দেখার অনেক আগেই।কিন্তু না। জেগে উঠল।
ঝাঁকানিতেই ঘুম ভেঙে গেল মৃন্ময়ের। ঘুমটা এসেছিল ভালই। সে ঘুমের মধ্যেই অপেক্ষা করছিল, কখন সে স্বপ্ন দেখাটা আবার শুরু করবে। কিন্তু স্বপ্ন দেখার আগেই ঘুমটা ভেঙে গেল। ট্রেনটা এমন একটা ঝাঁকুনি দিল। জানলার বাইরে সে তাকাতে চাইছে না, তবু বারবার চোখ চলে যাচ্ছে।
পাশে এসে বসল কেউ একজন।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও কী যেন একটা মনে হল, বাঁদিকে মুখ ফিরিয়ে দেখল মৃন্ময়।
এই লোকটাকে চেনা চেনা বলে মনে হল। অনেকক্ষণ ধরে দেখছে।
– কোথায় যাচ্ছেন?
ঘাড় ঘোরাল মৃন্ময়।
– আপনি কোথায় যাচ্ছেন?
– আপনি যেখানে যাচ্ছেন।
– মানে, আপনি আমাকে ফলো করছেন?
– কেন একথা বলছেন? ( বলেই দাঁত বের করে হাসতে লাগল শিবরাম।
– না, আপনাকে অনেক আগে থেকে দেখছি। তারপর একই কামরায়। এখন আবার আপনি আমার পাশে।
– হ্যাঁ। জীবন যে কাকে কার সহযাত্রী করে তোলে।
– তা বটে।
– আপনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ঘুম ভাঙল কেন?
– ঘুম ভেঙেছে কিনা তাই তো বুঝতে পারছি না
– আমারও এমনটা হয় জানেন?
– আপনার নামটা কী?
– আমার নাম শিবরাম।
– থাকেন কোথায়?
– বেলঘড়িয়া। সেই যেখানে বেলঘড়িয়া পোস্ট অফিস, সেখানে।
– ও।
– আপনি তো জগবন্ধু লেন
– ও মা, তাহলে বুঝুন আপনি আমাকে ফলো করছেন কেন বলছি।
– আমি আপনার বাড়ি চিনি।
– সে তো বুঝতেই পারছি। তা কী মতলবে?
– আপনি যে রাগ করলেন না দেখছি।
– রাগ করব কেন? এখন কোনওকিছুই আমার কাছে অবিশ্বাস্য নয়।
– আমিও অবিশ্বাস করতে ভুলে গেছি জানেন?
– কেন?
– আমি আয়নার সামনে যখন দাঁড়াই,তখন অন্য একটা শিবরাম আমার সঙ্গে কথা বলে।
– অন্য একটা শিবরাম?
– হ্যাঁ। আয়নায় আমি আমার ঘর দেখতে পাই না। দেখি একটা গ্রাম। একটা পুকুর। সেখানে কিছু মানুষ বসে আছে। দেখি আকাশটা অসম্ভব নীল। কখনো কখনো নাম না জানা পাখিও ওড়ে।
– আর সেই শিবরাম আপনাকে কী বলে?
– বলে, আয়নার মধ্যে ঢুকে আসতে।
– আপনি যাবেন না?
– যাব বলেই তার আজ্ঞা পালন করছি এখন।
– মানে, আমাকে ফলো করছেন।
– বলতে পারেন অনেকটা তেমনই। একটা কথা বলি?
– বলুন।
– আপনি ঘুমোবেন না। আপনি স্বপ্ন দেখতে শুরু করবেন না। স্বপ্ন দেখলেই ওরা জানতে পারবে। তখন আমার বিপদ হবে।কারণ আমার উপর নির্দেশ আছে, আপনি স্বপ্ন দেখা শুরু করার আগেই আপনাকে মারতে।
কথাটা বলেই শিবরাম চারিদিকে তাকাতে লাগল। না কথাটা কেউ শোনেনি বলেই মনে হচ্ছে। আসলে, মৃন্ময়কে না বলেও পারছিল না শিবরাম। কারণ মৃন্ময়ের মুখ দেখেই মনে হচ্ছিল, এই লোকটাকে মারতে পারবে না শিবরাম। যদি এমন হয়, লোকটাকে স্বপ্ন দেখতে বাধা দিল সে। যদি সে স্বপ্নই আর না দেখে, তাহলে তো আর বাস্তব থেকে সে স্বপ্নের বাস্তবে পাড়ি দিতেই পারবে না।
– কিন্তু আমাকে আপনি না মেরে আমাকে বাস্তবেই থাকতে বলছেন কেন?
– কারণ আপনাকে মারতে চাইছি না আমি।
– আমি তো স্বপ্নে গিয়ে নামতে চাই সেই স্টেশনে, যেখানে আমি যেতে চাই।
– আপনি বুঝতে পারছেন না, আপনি হয়তো যেতে চান, বা তারাও হয়ত আপনাকে চান, কিন্তু স্বপ্নের সেই শাসকরা আপনাকে স্বপ্নের জগতে চান না। তাঁরা চান না স্বপ্ন আর বাস্তবেই মধ্যে আপনি একটা সুড়ঙ্গ তৈরি করুন।
– আমি তো কোনও সুড়ঙ্গ তৈরি করছি না ভাই।
– আপনি তো নিজেই একটা সুড়ঙ্গ হয়ে উঠছেন। একথা ভুলে গেলে চলবে নাকি?
মৃন্ময় লোকটার থেকে মুখ ফিরিয়ে এবার জানলার বাইরে তাকালেন। বাংলার সেই সবুজ ক্ষেত। এমন অপূর্ব সবুজ আর সে অন্য কোথাও দেখেনি। বাংলার সবুজ অনেকটা ভ্যান গঘের নিজস্ব হলুদ রঙের মতো স্বতন্ত্র। ভ্যান গঘ যদি বাংলার সবুজ দেখতেন, তাহলে নিশ্চয় বাংলার সবুজ রংটাকেই ব্যবহার করতেন তাঁর ছবিতে। এই সবুজ রঙের মধ্যে এমন এক মনখারাপ লুকিয়ে আছে বলার নয়। এই সবুজ যেন বা মায়ের আঁচলের মতো সুন্দর। যে দেশে সে যাবে বলে স্থির করেছে, সেখানেও নিশ্চয় এমন মায়ের আঁচলের মতো সুন্দর বাংলা রয়েছে। তা তো রয়েছেই। কারণ যে বাংলা আস্তে আস্তে বাংলা থেকেই মুছে যাচ্ছে, সেই বাংলার কাছে যদি যেতে পারা যায়, তাহলে তা আশ্রয়ই হয়ে উঠতে পারে।
পাশেই শিবরাম। সেও মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে আছে রেললাইনের ধারেই দিগন্তবিস্তৃত এই শস্যক্ষেতের দিকে। শস্যক্ষেত না ধানক্ষেত? কী বলা উচিত? যতদূর দেখা যায় শুধু ধানক্ষেতের সবুজ। মাঝেমাঝে দু একজন কৃষকের শরীর। দূরে দূরে এক একটি জলটুঙ্গির মতো ঘর। স্তরের পর স্তর মাঠ। ঘন সবুজ মাঠ। এই মাঠ বিস্তৃত হতে হতেই দিগন্ত হয়ে গেছে। আমার বাংলা। আমার নিজের বাংলা। শিবরামও তাহলে খারাপ লোক না। আড়চোখে মৃন্ময় দেখল ট্রেনের জানলা দিয়ে বাইরের সবুজ প্রকৃতিকে দেখে কেমন দুচোখ জলে ভরে উঠেছে শিবরামের।
– আচ্ছা শিবরাম, ধরুন আমি স্বপ্ন দেখলাম, তাহলে কি আমার স্বপ্নের মধ্যে আপনি ঢুকে যাবেন?
সত্যই বাংলার এই অপূর্ব সৌন্দর্যে একটা ঘোর এসে গিয়েছিল শিবরামের মনে। তার যেন চটকা ভাঙল।
– কিন্তু আমি কী করে আপনার স্বপ্নের মধ্যে ঢুকব? আমি তো আমার স্বপ্নের পথে যাই আর আপনি আপনার স্বপ্নের মধ্যে। প্রতিটি মানুষের স্বপ্ন আর মৃত্যু তো আলাদা।
– কিন্তু ধরুন আমি আপনাকে স্বপ্নে দেখলাম।
– তা আমাকে দেখবেন না। দেখবেন সেই শিবরামকে, যিনি আমাকে এই কাজটা করতে দিয়েছেন।
– তিনি কোথায় থাকেন?
– খুলনায়।
– খুলনায়? সে তো বাংলাদেশ।
– আরে দূর, স্বপ্নের আর বাংলাদেশ ভারত
– তবে?
– তিনি থাকেন খুলনার রুদোঘরায়।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
– আপনি আসলে স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে কোথায় যেতে চান?
– পোড়ামাটির গ্রামে।
– পোড়ামাটির গ্রামে?
– হ্যাঁ পোড়ামাটির গ্রামে। কেন যেতে চাই জানি না। একটা কাজ আছে, সেটা করতে হবে।
– আচ্ছা, আপনার কখনো মনে হয় মৃত্যুর গন্ধ পাচ্ছেন?
– মানে?
– এই ধরুন মৃত মানুষকে নিয়ে যাওয়ার সময় অপরাজিতা,অগরু ধূপ মিলে যেমন গন্ধ পাওয়া যায়, তেমন?
– না, তেমন গন্ধ পাই না।
– আমি পাই। আমার মাঝেমাঝে নাকে এই গন্ধটা ভেসে আসে। পোড়ামাটির গ্রাম যখনই বললেন, আমার নাকে এই গন্ধটা ভেসে এল। মনে হল, কেউ মারা গেছে।
– সে তো আমার সন্ধেবেলায় মনে হয়।
– আমার সবসময় মনে হয়। আমার আয়নার সামনে দাঁড়ালে মনে হয়।
– আপনি তবু এমন সব কাজ করেন কেন?
এই প্রশ্নটা শুনে আরও কিছুক্ষণ চুপ করে গেল শিবরাম। মনের মধ্যে কেমন যেন একটা তোলপাড় চলছে। মৃন্ময়ের এই প্রশ্নের উত্তর সহজে দেওয়া সম্ভব নয়। শিবরাম কেন মানুষ খুন করার কাজ করে, তার উত্তর কীভাবে সে মৃন্ময়কে দেবে? সে কি নিজেই জানে, কেন সে এমন কাজ করে? সে শুধু শুনেছে তার পূর্বপুরুষ এক সমৃদ্ধ গ্রামের বাসিন্দা। তার রক্তে বইছে চোঙঘুরালি গ্রামের ঐতিহ্য। সে অনেক পুরোনো দিনের কথা। হাওড়া জেলার জগৎবল্লভপুরে রয়েছে দুটি গ্রাম। একটি গ্রামের নাম মাড়ঘুরালি, আরেকটির নাম চোঙঘুরালি। সেখানে রয়েছে একয়া শতাব্দী প্রাচীন মহাকাল মন্দির। কিন্তু সেই মহাকাল মন্দিরেই রক্ষিত আছে বারো শতকের এক প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি। চোঙঘুরালি গ্রামে বকুল গাছের নিচে আছে আর একটি প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি। সেই বিষ্ণুমূর্তিও পুজিত হয়। লোকে এসবই জানত চোঙঘুরালি গ্রাম সম্পর্কে। কিন্তু ১৯৭৬ সাল লাগাদ শিবরামের বাবার হাত ধরেই হয় এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। তখন শিবরামের বয়স ১। তার কিছু মনে নেই। চোঙঘুরালি গ্রামে একটা ব্যায়ামের আখড়া ছিল। শিবরামের বাবা রূপরাম ছিলেন সেই আখড়ার একজন বিখ্যাত ব্যায়ামবিদ। সেই আখড়ায় বহুদিন ধরেই একটি বস্তু নিয়ে ওয়েট লিফটিং-এর কাজ করা হত। কিন্তু শিবরামের বাবা রূপরাম একদিন লক্ষ্য করেন এই ওয়েটলিফটিং-এর জন্য যে ওয়েট ব্যবহার করা হচ্ছে, তা দেখতেও অন্যরকম। কেমন এক মূর্তির মতো দেখতে। আখড়া থেকে এই সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আসে দূর কলকাতা থেকে কিছু লোক। তারা পরীক্ষা করে জানায়, এটি একটি পুরাকীর্তি। এটি একটি সূর্যমূর্তি। সেই সূর্যমূর্তি নাকি বহুবছরের পুরোনো। ঠিক কত বছরের পুরোনো, তা কেউ বলতে পারে না। কিন্তু এটুকু বোঝা যায়, যে রূপরাম একটা নতুন অধ্যায় খুঁজে পেয়েছিলেন।
শিবরামের এসব জানার কথা ছিল না। কিন্তু চোঙঘুরালি গ্রামে থাকতে থাকতে এবং সেখানকার হাইস্কুলে পড়তে পড়তে জানতে পারে সে রূপরাম কত বড় এক ইতিহাসের সন্ধান করে গেছেন। কী সেই সন্ধান?
কৃষ্ণপুত্র শাম্ব কুষ্ঠরোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সূর্যপূজা করেছিলেন এবং তাঁর দ্বারাই ভারতবর্ষে সূর্যপূজার প্রচলন হয়। রূপরামকে বলেছিল কেউ, সূর্যবিগ্রহের ধারণা বিদেশ থেকে এসেছে; শকস্থান বা শকদ্বীপ থেকে। সে বহুদিন আগের কথা। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে, যে পারসিক মিহির-মিথ পূজা উত্তর-ভারতে প্রথম অনুপ্রবেশ করে। পরবর্তীকালে ভারতে, ওই ধারাই সূর্যবিগ্রহ তৈরির মাধ্যম হয়ে ওঠে। যুগপৎ ভারতীয় সূর্য উপাসনার ধারা ও বৈদেশিক লক্ষণযুক্ত সূর্যবিগ্রহের পূজা, আনুমানিক খ্রিস্টীয় প্রথম শতক থেকে উত্তরভারতে প্রচলিত হয়। বৈদেশিক লক্ষণযুক্ত সূর্যবিগ্রহ প্রচলনের জন্য কুষাণ সম্রাট কণিষ্ক ও হুবিস্ক প্রমুখ বিদেশাগত রাজন্যবর্গের পৃষ্ঠপোষকতা এক্ষেত্রে বিশেষভাবে স্মরণীয়। গুপ্ত, উত্তর-গুপ্ত এবং গুপ্ত পরবর্তীকালে উত্তর ভারতে প্রচলিত সূর্যবিগ্রহে নানা ধরনের বৈশিষ্ট্য সংযোজিত হয়। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পরবর্তীকালে সূর্যের সপ্তাশ্ববাহিত একচক্র যুক্ত রথ পরিচালনার জন্য সারথি অরুণ (মতান্তরে অনরু-যার উরুর নিম্নভাগ বা পদদ্বয় নাই) এবং উভয় পার্শ্বে মহাশ্বেতা বা পৃথিবী, রাজ্ঞী সংজ্ঞা, ছায়া, নিক্ষুভা ও সুবচসা নামধেয় পত্নীবৃন্দ, তৎসহ দণ্ডী ও পিঙ্গল প্রমুখ অনুচরগণ, সর্বোপরি অন্ধকার বিনাশকারী ধনুর্ধারী দেবীদ্বয় ঊষা ও প্রত্যুষার উপস্থিতি। অনেক সময়, সপ্তঅশ্বের পরিবর্তে সপ্তমুণ্ডযুক্ত অশ্বও প্রদর্শিত হয়েছে।
বৃহৎসংহিতা গ্রন্থের প্রতিমালক্ষণম অধ্যায়ে সূর্যবিগ্রহের একটি সুন্দর – বর্ণনা রয়েছে এবং সম্ভবত এই বর্ণনাটিই প্রাচীনতম :
“নাসাললাটজঙ্ঘোরু গণ্ডবক্ষাংসি চোন্নতানি রবেঃ।
কুর্যাদুদীচ্যবেশং গূঢ়ং পাদাদুয়ো যাবৎ। বিভ্রাণঃ স্বকররুহে পাণিভ্যাং পঙ্কজে মুকুটধারী।
কুণ্ডলভূষিতবদনঃ প্রলম্বহারী বিয়দগঙ্গবৃতঃ।
এর অর্থ হচ্ছে-সূর্য বিগ্রহের নাসা, ললাট, জঙ্ঘা, ঊরু, গণ্ড ও বক্ষ উন্নত হবে; বিগ্রহ উদীচ্যবেশে সজ্জিত হবেন, তাঁর উভয় পদই আবৃত থাকবে। এছাড়া, বিগ্রহের দুটি হাত থেকেই সনাল পদ্ম নির্গমনশীল হবে, তাঁর মাথায় থাকবে কিরীটমুকুট, কণ্ঠে হার, কর্ণে কুণ্ডল এবং কটিদেশে ‘অব্যঙ্গ’ নামক মেখলা বা পরিধেয় বস্ত্রাদি থাকবে।
বিষ্ণুধর্মোত্তরম্ গ্রন্থেও সূর্য বিগ্রহের বর্ণনা প্রসঙ্গে উদীচ্যবেশের কথা উল্লেখিত হয়েছে।
মৎস্যপুরাণ গ্রন্থে, সূর্যবিগ্রহ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে: “চোলকচ্ছন্ন বপুষং কচিচ্চিত্রেষু দর্শয়েৎ।
বস্ত্রযুগ্ম সমোপেতং চরণো তেজসাবৃত।”
বিগ্রহের দেহকাণ্ড কোথাও কোথাও বস্ত্র সহযোগে ভাবার্থ হচ্ছে, বিগ্রহের দেহকাণ্ড কোথাও কোথাও বস্ত্র সহযোগে আবৃত থাকবে এবং উহার পদদ্বয় তেজোরাশির দ্বারা সমাচ্ছন্ন থাকবে।
সূর্যবিগ্রহের উদীচ্যবেশ সম্পর্কে বলা যায়, শক বা কুষাণ শাসকবর্গ যে ধরনের আজানুলম্বিত বেশবাস পরিধানে অভ্যস্ত ছিলেন তারই নাম ‘উদীচ্যবেশ’। মথুরা মিউজিয়মে প্রদর্শিত প্রথম কণিষ্কের প্রতিমূর্তির গাত্রাবরণ ‘উদীচ্যবেশ’-এর চাক্ষুষ উদাহরণ, তবে গুপ্ত, বিশেষত গুপ্তোত্তর যুগে, ভারতে নির্মিত সূর্যবিগ্রহসমূহে আজানুলম্বিত গাত্রাবরণ দেখতে না পাওয়া গেলেও, উচ্চ পদাবরণ উদীচ্যবেশের প্রতীকরূপে প্রচলিত থাকে। কটিদেশে ‘অব্যঙ্গ’ কোথাও স্পষ্ট, আবার কোথাও অস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয়। সূর্যবিগ্রহের উভয় হস্তে সনাল পদ্ম, মস্তকে কিরীট-মুকুট, কর্ণে কুণ্ডল, সপ্তাশ্বযোজিত রথ ইত্যাদি বিবিধ প্রকারের ভারতীয় বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ‘উদীচ্যবেশ’ কালক্রমে সাঙ্গীভূত হয়ে গেলেও, শকদ্বীপীয় প্রভাবের পরিচয় একেবারে মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি, উচ্চ পদাবরণযুক্ত পদদ্বয়ই তার প্রমাণ।
কিন্তু চোঙঘুরালি গ্রামে যে সূর্যমূর্তি পাওয়া গিয়েছিল, সেটা জানতে গিয়ে শিবরাম জানতে পেরেছিল হাওড়া জেলায়, ইতিপূর্বে, বাগনান থানার অন্তর্গত বাইনান গ্রামে খ্রিস্টীয় এগারো-বারো শতকে নির্মিত একটি ভগ্ন সূর্যমূর্তির বিবরণ ‘হাওড়া জেলার পুরাকীর্তি’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়েছে। চোঙঘুরালি গ্রামে প্রাপ্ত সূর্যমূর্তিটিও ভাঙা। এতদিন ধরে, আখড়ায় ব্যবহ্রত হচ্ছে বলেই হয়তো, সূর্যমূর্তিটি মস্তকবিহীন মূর্তিটির মাপ ২ ফুট ×১২ ফুট। পঞ্চরথপগযুক্ত পাদপীঠের উপর সমপদস্থানক ভঙ্গিতে মূর্তিটি দণ্ডায়মান। মূর্তির উভয় হাতেই সনাল পদ্মের অংশবিশেষ দৃশ্যমান। মূর্তির পাদদেশে সপ্তাশ্ববাহিত রথ চালনরত অরুণ বা অনরু। অশ্বসমূহের বল্লাদি সুস্পষ্টভাবে খোদিত। মূর্তির উভয়পার্শ্বে যথাক্রমে ডানে দণ্ডী এবং বামে পিঙ্গল-এঁরা উভয়েই প্রস্ফুটিত পদ্মের উপর আভঙ্গঠামে দণ্ডায়মান। এছাড়া, দুই পাশেই ধনুর্ধারী দেবী ঊষা ও প্রত্যুষার মূর্তিও খোদিত আছে। বিগ্রহের কটিদেশ ‘অব্যঙ্গ’ বা মেখলার দ্বারা আবৃত এবং পদদ্বয় উচ্চ আবরণের দ্বারা আবৃত রয়েছে। সমগ্র ভাস্কর্যটি একটি ‘হাই-রিলিফ’যুক্ত ফ্রেমের মধ্যে অবস্থিত। মূল বিগ্রহটির মধ্যভাগ ‘স্কালপচার-ইন-দ্য-রাউণ্ড’ পদ্ধতিতে খোদিত হলেও ঊর্ধ্বাংশ এবং নিম্নাংশ ‘হাই-রিলিফ’ পদ্ধতিতে গঠিত। কণ্ঠদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন বলে জানা গেল না শিরোদেশ বা শীর্ষভাগ ইত্যাদির গঠনপ্রকৃতি কী ধরনের ছিল। ফ্রেমের বাইরে, মূর্তির উভয় দিকেই উল্লম্বভাবে তিনটি করে মোট ছটি উপবিষ্ট নারীমূর্তি লো-রিলিফ পদ্ধতিতে খোদিত রয়েছে। ভাস্কর্যটি কালো কষ্টিপাথর (ব্ল্যাক ব্যাসাল্ট) দ্বারা নির্মিত, তবে কালের করাল চিহ্ন নানাস্থানেই বিদ্যমান। এটির সুঠাম গঠনভঙ্গিমা, যুগপৎ লাবণ্যময় ব্যঞ্জনা ও সারল্য দেখে অনুমিত হয় দশম-একাদশ শতকে, মূর্তিশাস্ত্র অনুসারেই নির্মিত হয়েছিল। ইতিপূর্বে বর্ণিত বিদেশাগত ভাবধারা ও ভারতীয় প্রতিমাশাস্ত্রের লক্ষণাদি যুগপৎ আলোচ্য বিগ্রহটিতে বর্তমান।

এটিকে সম্ভবত ‘নবাবিষ্কৃত সূর্যমূর্তি’ বলতে পারা যায়। কিন্তু এই নতুন একটি সূর্যমূর্তি আবিষ্কার যিনি করেছিলেন, সেই রূপরাম নিজে ছিলেন খুব ভীত এ সম্পর্কে। কারণ জিজ্ঞেস করলেই বলতেন, এই সূর্যমূর্তি আমাকে খেয়ে ফেলবে।
খেয়ে ফেলেওছিল। ক্রমশ এবং ক্রমশ রূপরাম ক্ষয়ে গেলেন বলা যায়। তাঁর ওজন কমতে শুরু করে দিয়েছিল। এমন এক রোগ হল, যা আর সারল না।কিন্তু জলের মতো টাকাপয়সা খরচ হল। একদিকে চোঙঘুরালি গ্রাম বিখ্যাত হয়ে গেল নব আবিষ্কৃত সূর্যমূর্তির জন্য, অন্যদিকে রূপরাম ও তার পরিবার হয়ে পড়ল বিধ্বস্ত। জমি গেল, বাড়ি গেল, পুকুর গেল। রূপরাম এবং তাঁর স্ত্রীও একে একে মারা গেলেন।
শিবরাম তার বোনকে নিয়ে চলে এলেন কলকাতা শহরে। চোঙঘুরালি গ্রামে আর তারপর তিনি যাননি।
অনেকক্ষণ ধরে মৃন্ময় দেখছিল শিবরাম আনমনা হয়ে কীসব ভেবেই চলেছে।
এবার বলল, আমি কি আপনাকে এমন কিছু বলে ফেললাম যা আপনাকে আঘাত করল?
– না, না তা নয়। আমার আসলে মনে পড়ে গেল।
– কার কথা?
– একটা সূর্যমূর্তির কথা।
– সূর্যমূর্তি?
– হ্যাঁ। সেই সূর্যমূর্তি পাওয়ার পরেই আমরা সব হারিয়ে ফেললাম। আচ্ছা সূর্য যেমন আমাদের সবকিছু দেয়, তেমন সবকিছু ছিনিয়েও নেয়?
– নিতে পারে।
– যা ছিনিয়ে নেয়, তা কি আবার ফেরত দেয়?
– না তা মনে হয় দেয় না। কারণ সূর্য যেমন আলো, তেমনই আগুন।
– এখানেই তো সমস্যা মৃন্ময়বাবু। আমরা ভাবি আলো, আমাদের প্রাণ। আবার আলো যেখান থেকে আসছে, সেই আগুন, আমাদের ভস্ম করে। আমাদের ছাই করে দেয়। আমাদের পঞ্চভূতে বিলীন করে দেয়।
– কিন্তু তার সঙ্গে আপনার আমাকে মারার কারণটা কী? কেনই বা আপনি মানুষকে মারার কাজে নেমে পড়েন বারবার?
– পেট। আমার পেট। আমার বোনের পেট। আমার বোনের অবশ্য বিয়ে দিতে হয়নি। সে নিজেই বিয়ে করে নিয়েছে। এখন সে ভালই আছে। কিন্তু আমার খবর আর সে নেয় না।
– মানে, আপনি সম্পূর্ণ একা?
– হ্যাঁ আমি সম্পূর্ণ একা। জানেন, আমার কী ইচ্ছা করে?
– কী?
– আমার ইচ্ছে করে ঐ সূর্যমূর্তিটা নিয়ে পালিয়ে যাই।
– মানে, চোঙঘুরালি গ্রামে গিয়ে সূর্যমূর্তিটা নিয়ে নিতে ইচ্ছে করে?
– হ্যাঁ।
– সেই মূর্তি কি মিউজিয়ামে নেই?
– না, সেখানেই একটা মিউজিয়াম করা হয়েছে। সেখানে বিষ্ণুমূর্তিও আছে আবার সূর্যমূর্তিও আছে।
– সূর্যমূর্তি তো একা একা থাকতে পারে না। তার মানে সেখানে একটা সূর্যমন্দির ছিল। যা এখন আর নেই।
– থাকতেই পারে।
– আপনি জানেন, ভারতে খুব কম জায়গায় সূর্যমন্দির আছে।
– জানি।
– তাহলে আপনার বোঝা উচিত চোঙঘুরালি জায়গাটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
– থামুন মশাই। আমি যেতে চাই চোঙঘুরালি গ্রামে। মানুষের মূর্তি নিয়ে আদিখ্যেতা গেল না। ওই মূর্তি আবিষ্কার করার আগে আমরা ছিলাম রাজার মতো। আমায় কি এভাবে মানুষ মেরে দিন কাটাতে হত না কি স্বপ্ন থেকে কেউ ভয় দেখাত? আমি আপনার চেয়েও ভাল ভাবে থাকতাম। আমার গ্রামে আমি থাকতাম সকলের চেয়ে ভাল। এখন ভিখিরি হয়ে গেছি সেই সূর্যমূর্তির কারণে।
মৃন্ময় আর এই সব কথার কোনও বিরোধিতা করে না। কারণ বিরোধিতা করলেই যে লোকটি বুঝবে সূর্যমূর্তির সঙ্গে তার সাংসারিক বিপন্নতার কোনও যোগসূত্র নেই, তা নাও হতে পারে। খামোকা একটা তর্কযুদ্ধ হবে। এই তর্কযুদ্ধ প্রয়োজনীয় নয়। একটা চোরের মতো শিবরাম মৃন্ময়ের পিছনে পিছনে ঘুরছে। ও কি বুঝবে কেন মৃন্ময় আসলে কোথাও যাচ্ছে না। কিন্তু শিবরাম, সে কেমন ঠিক? সে কি এমন- “‘‘সোনা, রূপা, কাঁসা চোর কি বাছে,চোরের কখন কি নিবৃত্তি আছে?’’ কবে যেন এই পদটা শুনেছিল মৃন্ময়। আজও কানে গুনগুন করে ওঠে।
শিবরামের দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। লোকটা কাঁদছে। কেন কাঁদছে?
– কাঁদছেন কেন?
– জানেন, আমার গাঁয়ের কথা খুব মনে পড়ে গেল। মনে পড়ে গেল আমরা সবাই মিলে গাঁয়ের পালা শুনতে যেতাম। নগরকীর্তন বেরোতো রাস্তা দিয়ে। তাদের গান এখনো আমার মনে পড়ে।
– গান না, তাহলে যদি ঘুম আসে আমার।
– কিন্তু আপনাকে ঘুম পাড়ালে আমার তো মুশকিল। আমি কীকরে এই ভরা ট্রেনের মধ্যে ঘুমোনোর আগে আপনাকে হত্যা করব?
– হত্যা করবেন কেন, তার আগে শোনান কী শুনতেন?
– আরে, তেমন ভাবে মনে আছে নাকি, চেষ্টা করতে পারি।
– চেষ্টাই করুন।
শিবরাম শুরু করলেন সেই নগরকীর্তন-
কেহ নাচে গায় কেহো বোলে হরি হরি।
কেহো গড়াগড়ি যায় আপনা পাসরি॥
কেহো কেহো নানামত বাদ্য বায় মুখে।
কেহো কারো কান্ধে উঠে পরমানন্দ সুখে।
কেহো কারো চরণ ধরিয়া পড়ি কান্দে।
কেহো কারো চরণ আপন কেশে বান্ধে।
কেহো দণ্ডবৎ হয় কাহারো চরণে।
কেহো কোলাকোলি বা করয়ে কারো সনে।
বৃক্ষের উপরে গিয়া কেহো কেহো চড়ে।
যুগে যুগে কেহো লাফ দিয়া পড়ে ॥
ভাবে আবেশে চোখদুটো বুজে এল মৃন্ময়ের। কিন্তু শিবরামই আবার তাকে ধাক্কা মেরে জাগিয়ে দিল।
-না না ঘুমোলে চলবে না।
এদিকে শিবরামের গানের গলা এত ভালো, যে তার নগরকীর্তন শুনে ট্রেনের বাকি লোকেরাও আশেপাশে জড়ো হয়েছে।
-দাদা, আরেকটা শোনান না।
একটা যেন বা হুল্লোড় উঠল চারিদিকে।
– আমি আর তো জানি না।
মৃন্ময় বলল, আরে মশাই, সব আপনার স্মৃতিতেই রয়েছে। আপনি বলে যান।
শিবরাম চোখ বুজল। মনের মধ্যে আর কোনও স্বপ্ন নয়। ভেসে আসছে মাড়ঘুরালি গ্রাম আর চোঙঘুরালি গ্রামের সেই সব অপরূপ দৃশ্য। যেখানে বিষ্ণুমূর্তি পূজা হচ্ছে আর তা নিয়ে চারিদিকে লোকসমাগম। সেখানে কিছু ব্যক্তি খোল করতাল মৃদঙ্গ বাজিয়ে গান গেয়ে চলেছেন-
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।
প্রভু বলে কহিলাঙ এই মহামন্ত্র।
ইহা গিয়া জপ সভে করিয়া নির্বন্ধ।
ইহা হইতে সর্বসিদ্ধি হইব সভার।
সর্বক্ষণ বোল ইথে বিধি নাহি আর।
দশ পাঁচ মিলি নিজ দুয়ারে বসিয়া।
কীর্তন করহ সভে হাতে তালি দিয়া৷
হরয়ে নমঃ কৃষ্ণ যাদবায় নমঃ।
গোপাল গোবিন্দ নাম শ্রীমধুসূদন ॥
কীর্তন কহিল এই তোমার সভাকারে।
স্ত্রীয়ে পুত্রে বাপে মিলি কর গিয়া ঘরে।
শিবরাম বিড়বিড় করে বলতে লাগলেন সেই সব। তারপর সেই বিড়বিড়ানি গান আস্তে আস্তে উঠে এল গলায়। সুরের হাত ধরে সেই গান ট্রেনের কামরার মধ্যে গুঞ্জরিত হতে শুরু করে দিল।
প্রভুর দেখিয়া আর্তি কান্দে সর্বজন।
কায়মনোবাক্যে লইলেন সংকীর্তন ॥
পরম আনন্দে সব নগরিয়াগণ।
হাথে তালি দিয়া বলে রামনারায়ণ।
মৃদঙ্গ মন্দিরা শঙ্খ আছে সর্বঘরে।
দুর্গোৎসবকালে বাদ্য বাজাবার তরে।
সেই সব বাদ্য এবে কীর্তন সময়ে।
গায়েন বায়েন সভে আনন্দ হৃদয়ে ৷৷
হরি ও রাম রাম হরি ও রাম রাম।
এই মত নগরে উঠিল ব্রহ্ম নাম।
শিবরামের চোখ দিয়ে দরদর করে জল পড়ছে। মৃন্ময়ের ঘুম তখন সত্যই পালিয়ে গেছে। কীভাবে এই লোকটি খুন করতে পারে, কীভাবে? শিবরাম কিছুক্ষণ পরে চোখ খুলল। ভাবের আবেশে ট্রেনের বাকি লোকগুলিকে মুগ্ধ করে দিয়ে শিবরাম এবার উদাস হয়ে গেছে। কীর্তন যেমন মৃন্ময়কেও উদাস করে দেয়, তেমন শিবরামকেও উদাস করে দেয়। আসলে তো দুজন একই।
– দেখুন শিবরাম, আপনি আমাকে হত্যা করতে এসেছেন, আমি নিহত হতে এসেছি। সেই মতো ভাবতে গেলে, আপনার আমার দেখা হওয়ার মতো এমন যোগ খুব কমই আছে। কিন্তু স্বীকার করতেই হবে আপনার আমার অনেক মিল।
– কীরকম মিল?
– এই দেখুন আপনি নিজের আয়নায় যাকে দেখেন, সে থাকে অন্য একটা জায়গায়। অন্য একটা সময়ে। আর আমিও স্বপ্নে এমন একটা মানুষকে দেখি, যার খোঁজে আমি বেরিয়েছি, যাকে বাস্তবে আমি দেখতে পাই না। তাহলে মিল নেই?
– আছে তো মিল।
– তাহলে কেন তুমি আমাকে হত্যা করতে চাও?
– শিবরাম আমাকে সেই নির্দেশই দিয়েছে।
– শিবরাম বনাম শিবরাম?
– আমি তো জানি না। সেই শিবরাম তো আমার মতো চোঙঘুরালি গ্রামে এসে থাকেনি কখনো। আমার মনে হয় তুমি যাকে দেখেছ সেও আসেনি তোমার মতো করে বাঁচতে।
– আমি জানি। এই দেখ কীভাবে আমরা আপনি থেকে তুমি হয়ে গেলাম। তুমিই ভাল।
– তাহলে?
– তাহলে কী?
– এই ট্রেন তো একটা সময়ে থেমে যাবে। কোথাও তো একটা যাচ্ছে। পথ থাকলে তো পথের শেষ হয় একদিন। কিন্তু সেটা আপাত শেষ হওয়া। কারণ সেখান থেকে ফেরার যে পথটা শুরু হয়ে যায়, সেটাও চিরকালীন। তার কোনও শেষ নেই।
– কোনও পথেরই কোনও শেষ নেই।
– তুমি কি আমাকে হত্যা করবে?
– আমাকে তোমাকে হত্যা করতে হবে, কোনো না কোনো একদিন।
– তাহলে আমার অনুরোধ আমাকে এখনই হত্যা কোর না। কয়েকদিন অপেক্ষা করো। আমাকে যেতে দাও। আমার জন্য সেই বৃদ্ধ লোকটা অপেক্ষা করে আছে।
– আমি কি যেতে পারি তোমার সঙ্গে?
– তা তো আমি জানি না।
– আমিও যদি তোমার সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ি, তবে কি আমি তোমার সঙ্গে সেখানে পৌঁছতে পারব?
– তা আমি জানি না শিবরাম। কিন্তু আমি ফিরে আসব। তোমার জন্যই আমি ফিরে আসব। বা, এমনও হতে পারে, আমি সেখানে গিয়েও স্বপ্ন দেখলাম একটা অন্য জগতের। সেই জগতে আবার আমি চলে গেলাম একদিন।
– স্বপ্ন থেকে স্বপ্নে, আবার স্বপ্ন থেকে স্বপ্নে। এ তো অনন্ত। অনন্ত এক যাত্রা। অসমাপ্ত এক যাত্রা।
– হ্যাঁ এ যাত্রা কখনো শেষ হয় না।
– ঠিক যেমন আমার আয়নার সামনে যদি আরেকটা আয়না রাখি, তাহলে আয়নার ভিতর আয়না, তার ভিতরে আয়না এমন ভাবে চলতে চলতে কোথায় যে যাই, মনে পড়ে না। মনে থাকে না। কিন্তু আমি তো অনন্তের মধ্যেই তো চলে যাই। আমার রাস্তা ফুরোয় না।
– কারো রাস্তাই ফুরোয় না শিবরাম। রাস্তা যদি ফুরিয়ে যেত, তাহলে তো হয়েই যেত।
– তাহলে?
– তাহলে তুমি এমন একটা গান গাও, যাতে আমি ঘুমিয়ে পড়ি।
– আর আমি? মারব না তোমায়? তোমায় ফলো করব না?
– না। তুমি আমার ঘুমন্ত দেহটাকে নিয়ে থাকবে। আমি যখন ফিরে আসব, তুমি আমাকে মেরে ফেলো।
– মনে রেখো, তোমাকে আমার হাতেই মরতে হবে। আর তাই তোমাকে ফিরে আসতেই হবে।
– জানি, আমি। নিজের দেহটাকে তোমার কাছে বন্ধক রেখেই আমাকে স্বপ্নের জগতে চলে যেতে দাও। আমি যত স্বপ্নের কাছেই ফিরে যাই না কেন, একদিন না একদিন আমি ফিরে আসবই আমার আসল দেহের কাছে। স্রেফ কথা দিয়েছি বলে। স্রেফ মরতে হবে বলে। কারণ অনন্ত স্বপ্নের দেশে বিদেশে আমার অনন্ত বেঁচে থাকার জীবন নয়।
– ঠিক আছে।
– কী ঠিক আছে?
– আমি তবে গান গাই।
শিবরাম আবার চোখ বুজল। চোখের সামনে ফুটে উঠল চোঙঘুরালি গ্রামের সেই পদাবলী মঞ্চ। সেখানে গান গাইছেন কজন। একজনের চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রু ঝরছে।
‘‘নীলাচল হৈতে, শচীরে দেখিতে,
আইসে জগদানন্দ।
রহি কত দূরে, দেখে নদীয়ারে,
গোকুল পুরের ছান্দ।
লতা-তরু যত, দেখে শত শত,
অকালে খসিছে পাতা।
রবির কিরণ না হয় স্ফূরণ,
মেঘগণ দেখে রাতা।
শাখে বসি পাখা, মুদি দুটি আঁখি,
ফল জল তেয়াগিয়া।
ধেনু বুথে বুথে, দাঁড়াইয়া পথে,
কার মুখে নাহি রা।
নগরে নাগরী, কাঁদরে গুমরি,
থাকয়ে বিরলে বসি।
না মেলে পসার না করে আহার
কারো মুখে নাহি হাসি।’’
‘‘শুনি শচী আই, সচকিতে চাই,
কহিলেন পণ্ডিতেরে।
কহে তাঁর ঠাঁই আমার নিমাই।
আসিয়াছে কত দূরে।’’
মৃন্ময়ের চোখ জুড়িয়ে আসছে। মৃন্ময় এবার ঘুমিয়ে পড়বে। শিবরামের গাওয়া কীর্তনের সুর এমন এক ভাবের তরঙ্গ ছড়িয়ে দেয়, যে আস্তে আস্তে দুচোখ জুড়িয়ে আসে। এক অসীম ভাল লাগা, বিষাদের মধ্যে ডুব দিল মৃন্ময়। শিবরাম গান গাইতেই লক্ষ্য করল তীব্র গতিতে ধাবমান ট্রেনের মধ্যে, ট্রেনের ভিড়ের মধ্যে একা একটা লোক ঘুমের মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছে। সে চাইছে স্বপ্নের মধ্যে এমন এক স্টেশনে নেমে যেতে, যেখান থেকে সে চলে যাবে, এক গ্রামে। এক লোকালয়ে। যেখানে এখনো আধুনিকতা এসে স্পর্শ করেনি। যেখানে নগর এসে স্পর্শ করেনি। সে চুপ করে রইল না। কারণ ট্রেনের খটাখট আওয়াজে বা যাত্রীদের গুঞ্জনে আবার তার ঘুম ভেঙে যেতে পারে। সে আবার গান ধরল-
‘‘গোরথ জাগাই শিঙা ধ্বনি শুনইতে
জটিলা ভিক্ আনি দেল।
মৌনী যোগেশ্বর মাথা হিলাইত,
বুঝল ভিক নাহি নেল।
জটিলা কহত তব কাহা তঁহু মাগত,
যোগী কহ ত বুঝই।
তেরি বধূ হাত ভিক্ হাম লওব,
তুরিতহি দেহ পঠাই।
পতিবরতা ভিক্ লেই যব যোগী বরত
না হোয় নাশ,
তাকর বচন শুনইতে তনু পুলকিত
ধাই কহে বধূ পাশ।
দ্বারে যোগীবর পরম মনোহর,
জ্ঞানী বুঝিনু অনুমানে।
বহত যতন করি, রতন ধারি ভরি,
ভিক্ দিহ তছু ঠামে।
শুনি ধনী রাই, ‘আই’ করি উঠল,
যোগী নিয়ড়ে নাহি যাব।
জটিলা কহত যোগী নহি আনমত,
দরশনে হয়ব লাভ।
গোধূম চূর্ণ পূর্ণ থারি পর কনক
কোটরি ভরি ঘিউ।
করজোড়ে রাই, লেহ করি ফুকরই
হেরি ঘর্ ঘর্ জীউ।
যোগী কহত হাম, ভিক্ নাহি লওব,
তুয়া বচন এক চাই।
নন্দ-নন্দন ’পর যো অভিমানসি,
মাপ করহ ঘরে যাই।
শুনি ধনী রাই চীরে মুখ কাঁপল,
ভেকধারী নটরাজ।
গোবিন্দ দাস কহ নটবর শেখর
সাধি চলল নিজ কাজ।”
মৃন্মুয় ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘুমিয়ে পড়লে মানুষের মুখ ঈশ্বরের মতো সুন্দর হয়ে যায়। শিবরাম জানে, অনেক মৃত মানুষের মুখেও সে এমন ঈশ্বরের মতো সুন্দর প্রশান্তি দেখেছে। এমনকি যেসব মানুষকে সে খুন করেছে, তাদের এই শান্ত সুন্দর প্রশান্ত মুখের দিকে সে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারেনি। কিন্তু সেই শান্ত মুখ দেখে তার বুকের ভিতরে যে দুঃখ পাক খেতে খেতে জমে উঠেছিল, সেই দুঃখের থেকে তার কোনও পরিত্রাণ নেই।
শিবরামের মনের মধ্যে অন্য একটা ভয় উঁকি দিল এবার। মৃন্ময় যাতে সেই জগতে পৌঁছতে না পারে, তার জন্যই কথা ছিল শিবরামকে মৃন্ময়কে বাধা দিতে হবে। চাইলে মারতে হবে। কিন্তু শিবরাম মৃন্ময়কে সাহায্য করল ঘুমিয়ে পড়তে। কিন্তু শিবরাম এখন শিবরামকেই বা কী জবাব দেবে? সেও কি তবে এবার পালিয়ে যাবে? কোথায় পালাবে সে? তার তো মৃন্ময়ের মতো কোনও স্বপ্ন নেই। মৃন্ময় যে স্টেশনে নামবে, সেখানে সে কোনোদিনই নামতে পারবে না।
ট্রেন ছুটছে। কোথাও হয়তো ট্রেনটা থেমে গেছে। কোথাও হয়তো ট্রেনটা কোনোদিনই থামবে না আর।
(ক্রমশ)
আগের পর্ব :poramatir gram 2nd



