আন্দামানের কবিতাগুচ্ছ
১
তুমি বললে আকাশটাকে লেখ
এই যে দেখ লিখছি জলকথা
তুমি বললে পাহাড়টাকে আঁকো
এই তো দেখ এঁকেছি মুগ্ধতা
তুমি বললে দাঁড়াও এসে আবার
এই যে আমি নেমেছি রাস্তায়
তুমি বললে জ্বালিয়ে দাও প্রেম
এই যে দেখ জ্বেলেছি কবিতায়
তুমি বললে নষ্ট হও এবার
এই দেখ না খুলেছি সম্ভ্রম
তুমি বললে মৃত্যুকে নাও ডেকে
এই যে নিলাম অনন্ত চুম্বন
২
আমাকে পাহারা দাও ভিক্ষু,
গাও শাক্যসঙ্গীত
ত্রিনয়ন-তিলকে দাও হিমানীকিরীট
তুমিও কি আমার সঙ্গে
শঙ্খ নিয়ে হাতে
বেলা গেলে নাইতে যাবে
বাউলানীর ঘাটে?
তখনও কি নির্বাক ভূমি
করবে না তিনটি কবুল?
ঘামরঙ সোয়েটারে বোনা
নিরব নিথর বুলবুল —
কী ছিল বলার কথা,
কতটুকু বলা গেছে তার
বাকিটুকু যদি না-ই বলবার–
হয়, তবে থাক এখানেই,
এইটুকু নিয়ে তথাগত খুলে দিন দ্বার
চলে যাব আচমকা
যেদিকে যায় চোখ বর্ষার সূত্রটি ধরে
দূর থেকে দূরে তাপসীপ্রহরে
আমাকে সঙ্ঘ দাও ভিক্ষু,
সঙ্গ দাও মহাকালীর
আমাকে শরণ দাও পদ্মের
আনন্দরুহানির
৩
পায়ের নিচে মাটি নেই
শুধু জল আর অথৈ অর্ণব
বেলাশেষের নক্সা আঁকা প্রাচীন বৈভব
কোন বাঁশি বেজে ওঠে
উদাসীন প্রাচীন সুরে তার ঝিরিঝিরি
দুলে ওঠে ঘর, দুলে ওঠে কবেকার সিঁড়ি
কাঠের সিঁড়ি, বারান্দায় টানা ঘূর্ণিবলয়
রঙিন বাতাস আসে
এ ওর গায়ে হেসে হেসে পড়ে পর্দাদ্বয়
পায়ের নিচে মাটি নেই
ভীষণ পিছল কারিগরি… অলৌকিক ছাই
চাঁদের পিছনে নষ্ট হতে ছুটে ছুটে যাই
যদি ধরতে পারি তাকে
দুরন্ত ঢেউ আর লাল কাঁকরে কেটে যায় পা
তবুও থামি না। থামতে পারি না।
ঝড়জল একাকার রুগ্ন ঝাউবনে
নাম ধরে ডাকি, যে নাম তাকে ভুলে গেছি দিতে
সে বুঝি ঘুমিয়েছে এক্ষুনি, এই রাত্রিনিষুতে—
পালকে আঙুল বুলাই, কপালে চুম্বন
সে-ও দ্রুত সেরে উঠে শিবকথাগানে
চিতলরোদ ভাঙে কার্তিক অঘ্রাণে
৪
বাতাস প্রবল হলে সামান্য নুয়ে পড়া ভালো
খুব বেশি দিন তো নয়, খুব বেশি দূরও নয়
বাতাসের আসা-যাওয়া যেন উলের বল
খুলতে খুলতে গড়াতে গড়াতেই শেষ
এই যে দুটো দেশ পাশাপাশি থেকেও কেউ কারো নয়
কেউ না কেউ পিছিয়ে পড়ছেই প্রতিযোগিতায়
কেউ না কেউ এগিয়ে যাচ্ছে অপরিনামদর্শী
এ তো শুধু ঘর সাজানোর দোষ নয়
কোথাও না কোথাও খানিকটা ঘুনও ধরে আছে
যথেষ্ট অবসর যদি থাকে
চট করে একবার নিজের দিকে তাকাও
ঠিক আছো তো? তোমার মেঘ দুরুদুরু উঠোন?
ঘুমের ঘোরে যে চন্দ্রিল রোজ রোজ ছাদে যায়
ঠিক সময়ে নেমে এসে ঘুমিয়ে পড়ে পাশে
কাল রাতে কি তাকে জাদুটোনা করতে দেখেছ ?
তবে কি ঘুমোওনি সারারাত? তবে কি সারারাত…
জেগে থাকা মানুষের কাছে কোনো জাদুকর আসে না
জেনেও সারারাত কি তবে?
এর চেয়ে যদি খানিকটা হিংস্র হতে পারতে
যদি পারতে গুছিয়ে হত্যা করতে
তাহলে অন্তত মালকিন হয়ে বসতে পারতে
অলৌকিক আরামকেদারার
৫
রাতের গল্পগুলো ভারি মোলায়েম
কখনো সুর তুলে, কখনো চাপা স্বরে
পুতুল পুতুল খেলে
হোটেলের জানলায় রোজ এক আগুনপাখি
খানিকটা আতর মিশিয়ে চলে যায়
পুতুলগুলো গেয়ে ওঠে আশাবরী ঘরের গান
পুতুলের ঘোর কৃষ্ণ শরীর, রক্তাম্বরাবৃত
প্রাগৈতিহাসিক বনভোজনে বেরিয়ে
ফেলে রেখেছে শান্ত পায়ের ছাপ
যেন স্বয়ং জগতলক্ষ্মী উঠে এসে মহার্ণব থেকে
আপন বাছাদের হাত ধরে শেখাচ্ছেন হাঁটি হাঁটি পা পা
মাঝরাতে সাগরসোহাগিনী আমি
গাছ অথবা একটা পাথরবৎ
মা আর সন্তানের অপরূপ বাৎসল্য দেখি
দেখি রাতের স্তনাগ্র থেকে ঝরে পড়া জ্যোৎস্নার দুধ
৬
যতদূর গেছে চোখ পিছু পিছু গেছি
কুশাগ্রে স্থাপিত নীল সাগর দেখেছি
অর্ধশায়িত বুদ্ধ বাসুকিশয্যায়
দেখেছি টেলিস্কোপে তারাদের গায়–
গল্পে আছেন রত, রাত ধীরে ধীরে
ঢেউয়ের দামাল শিশু আছড়ে পড়ে তীরে
সে গল্পই শোনাতে চায় ব্যগ্র, ব্যকুল
আন্দামানে ফুটে ওঠে ম্যানগ্রোভ ফুল
আমি তার কিয়দংশ কানে গুঁজে হাঁটি
কিছুটা বালিতে ছড়িয়ে পরিপাটি
নীল ধুয়ে উঠে আসে সবুজ সাগর
সবুজে অকস্মাৎ দেখি নীল উজাগর
এ-ও এক বিভ্রম, মায়া ইন্দ্রজাল
কারা যেন বিছিয়েছে উচাটন চাল
মন্ত্রবীজে ফনা তোলে শিব শিব ধ্বনি
লীলামণি নিয়ে হাতে সাগরভিক্ষুনী
প্রথমেই ঢুকে পড়ে আমার ভিতর
অতঃপর বহুজন্ম সংসার চর
অবশেষে মাথা তোলে শত শত দ্বীপ
শত শত ঢেউ ওঠে জলবন্দীর



