মাঝেমাঝে দিগন্তে একটা ধুলো পাক খেয়ে উড়ে ঘূর্ণির মতো এগিয়ে আসে, আর মুজঃফরপুর থেকে মোতিহারির রাস্তার মাঝখানে কচিকাঁচার দল, কোনো কোনো বৃদ্ধ চোখের ওপর হাতের আড়াল করে ওই ঘূর্ণি দেখতে থাকে। বৃদ্ধরা বলাবলি করে এরপর ভয়ঙ্কর শুখা মরসুম আসতে চলেছে। এ নাকি তারই পূর্বলক্ষণ।
আমি ওই ঘূর্ণি মাঠের ওপর খুব কাছ থেকে দেখেছি। শুকনো বাতাস ধুলো উড়িয়ে উঠে যায় ওপরে। বাতাসের ঘূর্ণিতে উড়তে থাকে ঘাস পাতা, আর মনে হতে থাকে এক অতিকায় লাট্টু পাক খেতে খেতে এগিয়ে চলেছে।
ওই পথের মাঝখানে এক চায়ের দোকান। বিড়ি, সিগেরেট, খৈনি ইত্যাদি পাওয়া যায়। আমি গিয়ে বাঁশের বাতার বেঞ্চের ওপর বসলে খাতির করে গুড়ের চা এগিয়ে দেয়। মন্দ লাগে না।
কথায় কথায় জেনেছিলাম চায়ের দোকানির নাম রামবাবু রায়। এদিকে রায় মানে গোয়ালা। এরা বলে “আহির।” একটা বিখ্যাত রাগের নাম “আহির ভৈরব।” ভোর তিনটের রাগ। যতদূর জানি গোয়ালারা দুধ দুইতে দুইতে এই সুর গুনগুন করত, সেখান থেকেই এই রাগের উৎপত্তি। ওস্তাদ আলি আকবর খাঁ সাহেবের আহির ভৈরব শুনে বেগম আখতার বলেছিলেন “উসে শুননেকে বাদ সাত রোজ মেরে আঁখোকা পানি বন্ধ নহি হুয়াথা।”
রামবাবু শীর্ণ, কালো রং, চুল নেই, পাঁজর বের করা চেহারায় একটা ছেঁড়া খোড়া গেঞ্জি আর হাঁটু পর্যন্ত ময়লা ধুতি। আর তার স্ত্রী, চিবুক ওব্দি ঘোমটা, লাল, ফুল ফুল শাড়ি, সেও শীর্ণা। শুনেছিলাম ভাগ্যান্বেষণে এখানে এসে ডেরা বেঁধে আছে। জমিটা শিবজী সিংয়ের। শিবজী সিং ওদের উচ্ছেদ করেনি। বলেছিল, ভাগ্যবিতাড়িত মানুষ, থাক। ভগবান নানাভাবেই আসেন।
রামবাবু আমার পায়ের কাছে মাটিতে উবু হয়ে বসে। খৈনি ডলতে ডলতে নানা গল্প করে। কিভাবে গয়া থেকে জমিজমা উচ্ছেদ হয়ে পথে বেরিয়ে পড়েছিল। পাটনায় শেষ সম্বলটুকুও খোয়া যায়, তারপর এক চায়ের দোকানে কাজ, মাঝরাতে পুলিশ ছুটকো গাঁজা বিক্রেতা বলে ধরে নিয়ে যায়, এইসব।
এখানে এসেও দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়েনি। গত বছর এরকম সময় ছয় বছরের মেয়েটা সাপের কামড়ে মারা যায়। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে, ওদের সে উপায় কই? তার আগেই সব শেষ। আরো চার ছেলে মেয়ে আছে। মেয়েরা চার পাঁচ বছর বয়স থেকেই ঘর ঝাঁট দিতে শেখে, ছেলেরা উড়নচণ্ডী।
আমি গিয়ে বসলে একবার একটু ছাতু মাখা আর জল দিয়েছিল। দেওয়ার কায়দাটা নিবেদন করার মতো। ডান হাতের কনুইয়ে বাঁ হাত ঠেকিয়ে। আর আমি মহানন্দে তাকে প্রসাদ জ্ঞানে খেলাম। ভালোবাসার প্রসাদ, যত্ন করে বেড়ে দেওয়া বিদূরের ক্ষুদকুঁড়ো। নানা ছলে ওকে এক দুশো টাকা দিই। ওর চোখে জল আসে। মাথা নীচু করে কৃতজ্ঞতায় নুয়ে থাকে।
আমি ওর ঝুপড়িতে বসে সিগেরেট খাই। দূরের দিগন্তে তাকিয়ে দেখি পাকা রাস্তা, ছোটো ছোটো গাড়ি চলছে। ওদিকে অন্য গ্রাম। আরো দূরে একটা হাইওয়ের দিকে রাস্তা চলে গেছে।
রামবাবু শুনেছে আমি বনে জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে বেড়াই। ওর প্রবল আপত্তি। ওই সাপে কাটা মেয়েটা নাকি ওর কাছে মাঝেমাঝে গভীর রাতে ফিরে আসে। ও সেই দংশনে হাত বুলিয়ে দেয়। বুকে করে শুয়ে থাকে। বলে “বচ্চি বা, অকেলে নেইখে রহত।” বাচ্চা তো, একা থাকতে পারে না।
আমি ওই মাচায় বসে দেখি এক পিতৃহৃদয় সেই হারিয়ে যাওয়া মেয়েটাকে হারিয়ে যেতে দিতে চায় না। মৃত্যুর পরেও তার জন্য চিন্তায় কাতর হয়। মাঝেমাঝে ডেকে ওঠে “মুন্নি রে, আরে হোওও মুনিয়া।”
আমি দেখি হৃদয়ের গভীরে এক স্বচ্ছ সরোবর, তার পাশে দেবালয়, সেই দেবালয়ে মানুষের বিগ্রহ।
( ক্রমশ )
আগের পর্বের লিঙ্কঃ mujjaffarpur 13



