ক্রসরোডে বাংলা: তত্ত্ব বনাম বাস্তবতা

abstract2

১৯৪৭ সালের গোড়ার দিক। দেশভাগ তখন দরজায় কড়া নাড়ছে। ব্রিটিশরা বিদায় নেবে এটা নিশ্চিত। কিন্তু বাংলা কি অবিভক্ত থাকবে, নাকি টুকরো হবে? এই প্রশ্নে কলকাতার রাজনৈতিক অলিন্দ উত্তপ্ত।ঠিক এই সময়ে সামনে আসে একটি অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সমীকরণ। মুসলিম লীগের হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং কংগ্রেসের শরৎচন্দ্র বসু এপ্রিল-মে ১৯৪৭-এ হাত মেলান। তাঁরা চাইলেন ‘স্বাধীন অবিভক্ত বাংলা’ (United Independent Bengal)। অর্থাৎ বাংলা ভারতের সাথে যাবে না, পাকিস্তানের সাথেও যাবে না — সে হবে এক সার্বভৌম রাষ্ট্র।

এখানেই শুরু হলো আসল সংঘাত। এই সংঘাতের দুই মেরুতে ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং তৎকালীন বামপন্থী রাজনীতি।

বামপন্থীদের অবস্থান: তত্ত্ব ও বাস্তবতার ফাঁক

সেদিনের অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (CPI) এক জটিল দোলাচলের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। তবে প্রথমেই স্পষ্ট করা দরকার: পার্টির ভেতরে মতভেদ ছিল তীব্র। P.C. জোশি-র নেতৃত্বাধীন লাইন এবং অন্যান্য অংশের মধ্যে রণনীতি নিয়ে বিরোধ ছিল। তাই CPI-কে একটিমাত্র সমজাতীয় সত্তা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

তাঁদের তাত্ত্বিক অবস্থানের মূল স্তম্ভগুলি ছিল:

১.আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার তত্ত্ব:

লেনিনের ‘জাতীয় আত্ম নিয়ন্ত্রণের অধিকার’ তত্ত্বকে ভারতের মাটিতে প্রয়োগ করার চেষ্টা। এই তত্ত্ব অনুযায়ী বিভিন্ন ভাষাতাত্ত্বিক জাতি গোষ্ঠীর নিজস্ব সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের অধিকার আছে।

২.মুসলিম লীগের প্রতি মূল্যায়ন:

কমিউনিস্টদের একাংশ মুসলিম লীগকে মুসলিম কৃষকদের শোষণের বিরুদ্ধে এক গণ-আন্দোলনের প্রতিনিধি মনে করতেন। এই বিশ্লেষণ পরে ভুল প্রমাণিত হয়েছিল।

অবিভক্ত বাংলার সমর্থন:

সোহরাওয়ার্দী-শরৎ বসুর স্বাধীন বাংলার পরিকল্পনাকে বামপন্থীদের একাংশ প্রাথমিক ভাবে স্বাগত জানিয়ে ছিলেন। তাঁদের মনে হয়েছিল, এর ফলে বাংলা ভাগ আটকানো যাবে এবং সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ঐক্য গড়ে উঠবে।

কিন্তু এই তাত্ত্বিক অবস্থানের একটি বড় অন্ধবিন্দু ছিল। ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্টের ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ এবং নোয়াখালীর দাঙ্গা কলকাতার হিন্দু সম্প্রদায়ের মনে গভীর মানসিক আঘাত তৈরি করেছিল। তাত্ত্বিক ধর্ম নির পেক্ষতা সেই তীব্র নিরাপত্তা হীনতার বাস্তব সমাধান দিতে পারছিল না — এই সত্যটা বামপন্থীদের একটা বড় অংশ তখন অনুধাবন করতে পারেননি।

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়: বাস্তববাদী রাজনীতি ও হিন্দু মধ্যবিত্তের মনস্তত্ত্ব

ঠিক এই শূন্যস্থানে দাঁড়িয়ে হিন্দু মহাসভার তৎকালীন নেতা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তাঁর রাজনৈতিক কৌশল নির্মাণ করলেন। তিনি কোনো দীর্ঘমেয়াদি তত্ত্বের ওপর নির্ভর করেননি — সরাসরি মাটির বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে রাজনীতি করেছিলেন।

. শ্যামাপ্রসাদের মূল যুক্তি ছিল সহজ কিন্তু শক্তিশালী:

জিন্নাহর পাকিস্তান দাবি মেনে নেওয়া হলে বা সোহরাওয়ার্দীর স্বাধীন বাংলা গঠিত হলে, উভয় ক্ষেত্রেই বাংলার জনতাত্ত্বিক বাস্তবতা অনুযায়ী মুসলিম লীগের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। আর ১৯৪৬-এর দাঙ্গার পর হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে সেই পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা অজানা ছিল না।

শ্যামাপ্রসাদ এক ঐতিহাসিক দাবি তুললেন:

“ভারত যদি ভাগ হয়, তবে বাংলাও ভাগ হবে।” তিনি চাইলেন বাংলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হোক। কংগ্রেসের নেহরু-প্যাটেল লাইনকে নিজের দিকে আনতে এবং কলকাতার মধ্যবিত্ত সমাজে জনমত তৈরিতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখলেন।

তবে এখানেও একটি জরুরি প্রশ্ন থেকে যায়:

এই বিভাজনের মূল্য কি শুধু রাজনৈতিক সাফল্যের মাপকাঠিতে বিচার করা যায়? দেশভাগের ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষের উদ্বাস্তু সংকট পশ্চিমবঙ্গকে দশকের পর দশক জর্জরিত করেছে। সেই মানবিক মূল্যটিও ইতিহাসের হিসাবের খাতায় থাকা দরকার।

ঐতিহাসিক পরিহাস: যখন দুই মেরু একই বিন্দুতে

যে বামপন্থীরা তাত্ত্বিকভাবে দেশভাগের বিরোধিতা করছিলেন, ১৯৪৭-এর জুনে পরিস্থিতি তাঁদের এক বড় অবস্থান পরিবর্তনের দিকে নিয়ে গেল। মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা ঘোষিত হওয়ার পর যখন স্পষ্ট হয়ে গেল যে দেশভাগ রুখবার আর উপায় নেই, তখন বামপন্থী নেতৃত্বের বড় অংশও বুঝলেন যে পুরো বাংলা পাকিস্তানের অংশ হলে পরিস্থিতি বিপজ্জনক হবে।

২০ জুন ১৯৪৭। বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে দুটি পর্যায়ে ভোট হলো — প্রথমে যৌথ অধিবেশনে, তারপর হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকার বিধায়কদের পৃথক ভোটে। সেখানে বিপুল ভোটে বাংলা ভাগের পক্ষে, অর্থাৎ ভারতের সাথে থাকার পক্ষে রায় দেওয়া হলো।

জ্যোতি বসুর মতো কমিউনিস্ট নেতারাও শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ গঠনের পক্ষেই অবস্থান নেন। তবে এটি নিছক চাপের মুখে নতি স্বীকার নয় — বরং ক্রমবর্তমান পরিস্থিতির নিরিখে তাঁদের রাজনৈতিক মূল্যায়নের পরিবর্তন।

একটি অনুপস্থিত দৃষ্টিভঙ্গি: পূর্ববঙ্গের কথা

এই গোটা আলোচনার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো — এটি মূলত পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু মধ্যবিত্তের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা। কিন্তু দেশভাগ ছিল সমগ্র বাংলার ট্র্যাজেডি।
পূর্ববঙ্গের কোটি কোটি বাঙালি মুসলমানের কাছে দেশভাগের অর্থ কী ছিল? তাঁদের স্বপ্ন, ভয় এবং প্রত্যাশা এই বিশ্লেষণে প্রায় অনুপস্থিত। শুধু পশ্চিম বঙ্গের দৃষ্টিকোণ থেকে ‘সাফল্য’ বা ‘ব্যর্থতা’ মাপলে ইতিহাসের অর্ধেকটা অদেখাই থেকে যায়।

মূল্যায়নের ক্যানভাস: একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি

আজকের সময় দাঁড়িয়ে ঠান্ডা মাথায় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যেই সঙ্গতি এবং সীমাবদ্ধতা ছিল।

বামপন্থী রাজনীতির ক্ষেত্রে: সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির স্বপ্ন মহৎ ছিল, কিন্তু দাঙ্গাপরবর্তী বাস্তব মনস্তত্ত্বকে চেনার ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি ছিল। আন্তর্জাতিক তত্ত্ব দিয়ে স্থানীয় সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকে রোখা যায় না। যদিও দীর্ঘমেয়াদে — ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থী আন্দোলনের অবদান বা পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় তাঁদের ভূমিকা — সেটাও ইতিহাসের বিচারে উপেক্ষণীয় নয়।

শ্যামাপ্রসাদের কৌশলের ক্ষেত্রে: তাৎক্ষণিক অস্তিত্বের সংকটে তিনি বাস্তবধর্মী সমাধান দিয়েছিলেন। আজ পশ্চিমবঙ্গ যদি ভারতের মানচিত্রে থাকে এবং বাংলা ভাষার চর্চা অব্যাহত থাকে, সেই পটভূমিতে তাঁর ভূমিকা কে অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে হিন্দু মহাসভার সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং উদ্বাস্তু সংকটের ট্র্যাজেডি — এই মূল্যটিও ইতিহাসের পাতায় সমান গুরুত্ব নিয়ে আছে।

উপসংহার

ইতিহাস কাউকে পুরোপুরি খলনায়ক বানায় না, আবার কাউকে সম্পূর্ণ দেবতা করে না। ১৯৪৭-এর বাংলা ছিল এক ধরনের তীব্র ট্র্যাজেডি — যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিটে মাটি হারানোর মধ্য দিয়ে দুটি বাংলা তৈরি হলো যারা আজও ইতিহাসের একই শিকড় থেকে জন্মানো।

শ্যামাপ্রসাদ এবং বামপন্থীরা ছিলেন সেই ট্র্যাজেডির দুই ভিন্নধর্মী চিত্রনাট্যকার। একজন চেয়েছিলেন তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা, অপরদিকে বামপন্থীরা চেয়েছিল।দীর্ঘ মেয়াদি সম্প্রীতি। দুজনেই আংশিকভাবে সফল, দুজনেই আংশিকভাবে ব্যর্থ।সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘উটপাখি’ কবিতার এই পঙক্তিগুলো যেন সেই দুই মেরুর মানুষদের কে মুখোমুখি দাঁড় করায় এই বলে-
আমি জানি এই ধ্বংসের দায়ভাগে
আমরা দু-জনে সমান অংশীদার;
অপরে পাওনা আদায় করেছে আগে,
আমাদের ‘পরে দেনা শোধবার ভার।

শ্যামাপ্রসাদ এবং বামপন্থীরা — দুজনেই এই ধ্বংসের অংশীদার, দুজনেই এই দেনার ভাগীদার। একজন রক্ষা করতে গিয়ে বিভাজন ত্বরান্বিত করলেন, অপরজন ঐক্যের স্বপ্ন দেখতে গিয়ে বাস্তবের মাটি হারালেন। আর আজ আমরা — সেই পরের দিনের মানুষেরা —আজও সেই ভারই বহন করে চলেছি। দুই বাংলার মাঝখানে কাঁটাতারের বেড়া, আর বুকের ভেতরে এক অদৃশ্য দেশভাগ — যা আজও আমাদের মধ্যে তর্কে বিতর্কে বহমান।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top