দ্বন্দ্ব অন্তর্দ্বন্দ্ব – পর্ব-৪

misty village walk beneath blooming trees

শব্দগুলো ফিকে কালো রঙের খবরের কাগজে লেখার মতো পড়ে আছে। যে যার মতো কাজ করছে প্ল্যাটফর্মে। ঈষৎ ক্রোধ বলে কেউ কখনো যেন ছিলই না। ঈষৎ ক্রোধ বলে কেউ ছুরিকাঘাতে আহত হয়েছিল এমন ঘটনা কেউ জানেনা বা দেখেনি। কিছু শব্দ ফিকে হয়ে পড়ে আছে, কিছু শব্দ জলে ধুয়ে ভেসে গেছে, এমনি এমনিই।
প্ল্যাটফর্মে সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত। আয়ুর সাথে মৃত্যুর যেন কোনো ঝগড়া হয়নি। শুধু প্ল্যাটফর্মে সবাই কিছু খুঁজে চলেছে। কী খুঁজে চলেছে বলতে পারছে না
যৌনতা মনোহরা ত্রিভূজে কামড় দিয়ে ভাবছে কেমন বিস্বাদ। এই বিস্বাদ তো চাইনি। খিদের সাথে লেগে গেছে ঝগড়া। যৌনতাকে দু কথা শুনিয়ে দিল খিদে, স্বাদ পেতে মন লাগে, শুধু জিহ্বায় কাজ হয়না বুঝলা! তারপর ওরা দুজনে জলে ধোয়া ফিকে শব্দের দিকে তাকালো, যেন ওখানে কিছু নেই, আদপে কিছুই ঘটেনি। শুধু বিস্বাদ মনোহরা ত্রিভূজ ছাড়া আর কোনো সমস্যাই নেই, এই শান্ত সকালে, এই পাখি ডাকা সকালে কোনো খুন বা মৃত্যু ঘটেনি।
বিরহ চুপচাপ নখ খেয়ে যাচ্ছে, যেন আজন্মকাল ধরে তার নখ খাওয়ার কথা ছিল। প্রেমের দিকে সে একবার তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিল। অকারণে চোখে এল জল। ইচ্ছে উকুন বাছছে তো বাছছেই।
জল ধোয়া সকালে প্রেম পায়চারি করছে, আবোলতাবোলের দিকে অপরিসীম গভীরতা নিয়ে দেখছে। নিজেকে বিশ্বাস করাতে চেষ্টা করছে যে কিছু ঘটেনি কোথাও শুধু দ্বিধাহীন প্রেম ছাড়া। কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া গাছে ঝুলে আছে বিহ্বলতা। সেদিকে তাকিয়ে থাকাই ভালো। অপেক্ষা পরীর ঝিমানি এসেছে। আবোলতাবোলের হাতের ভায়োলিন ঝিমোচ্ছে। একটা চোরা স্রোতের মতো প্রবাহিত হচ্ছে ঝিমুনি লতা। হঠাৎ করেই প্রতিবাদ লাইন টপকে প্ল্যাটফর্মে চলে এল। ক্রোধ আর বিষাদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঈষৎ রাগ কোথায়? ও কি মৃত? ওকে মারলো কে?’
সবাই প্রতিবাদকে দেখলো আবার ঝিমোতে লাগলো। ক্রোধ দু-একবার এদিক-ওদিক করে বললো, ‘ঈষৎ রাগ বলে কাউকে চিনি না।’ এবার প্ল্যাটফর্ম জুড়ে সবাই বলছে ঈষৎ রাগ বলে কাউকে চিনি না।
শুধু প্রেম বললো, ‘মৃত্যু আর আয়ু টানাটানি করছিল। কেউ যেন ওনাকে ছুরি মেরেছে নাকি উনি নিজেই আত্মহত্যা করেছেন, জানা নেই।’ সমস্বরে সবাই যেন ঘুম থেকে জেগে উঠে বললো, ‘বোধহয় আত্মহত্যা। সোজাসাপ্টা আত্মহত্যা।’
‘আত্মহত্যা! তদন্তের আসা প্রয়োজন।’
প্রতিবাদ চিৎকার করে বললো। সবাই চুপ। শুধু রহস্য বলে উঠলো—‘তদন্তের আসা প্রয়োজন।’
প্রতিবাদ সবার কাছে একে একে গিয়ে বলছে ‘তদন্তের আসা প্রয়োজন।’
তদন্ত কাঁধে হাত দিল। প্রতিবাদ আর তদন্ত কাঁধে কাঁধ রেখে দেখছে দূরে সমান্তরাল রেললাইনগুলো কেমন মিলে মিশে একাকার। তদন্ত ফিকে থেকে অধিক ফিকে হয়ে যাওয়া শব্দগুলোকে অপলক দেখছে।
আদৌ কি কিছু ঘটেছে নাকি শব্দগুলো ওখানেই ছিল প্ল্যাটফর্মের জন্মাবধি। রহস্য গলা খাঁকারি দিল। ভুরুটা কুঁচকে বললো, ‘আদৌ কি কোনো হত্যা বা আত্মহত্যা ঘটেছে?’
মানে? আদৌ ঈষৎ রাগ বলে কেউ ছিল নাকি সবটুকুই কল্পনা প্রসূত?
প্রেমের ক্লান্ত দুটো চোখ কিছু ইঙ্গিত দিল তদন্তকে? শিশিরসিক্ত রেললাইনকে দেখে মনে হচ্ছে ওর উপর বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে আছে আক্ষেপের, জমে আছে মিথ্যার ঘাম, এক অকুতোভয় দুর্গন্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। শব্দ থেকে উৎসারিত সেই দুর্গন্ধে নাক চাপা দিল প্রতিবাদ, তদন্ত, আর যৌনতা। প্রেম শুধু বলে চললো, ‘ঈষৎ রাগের খুব সংকোচ ছিল। পুরোপুরি রাগ না হয়ে ওঠার সংকোচ।’
ক্রোধ শুধু মিনমিন করে বলল, ‘ঈষৎ রাগ আদৌ কি ছিল? আমি থাকতে তার কি থাকা সম্ভব?’
হঠাৎ প্ল্যাটফর্ম জুড়ে ঝমঝম বৃষ্টি নামল। কোথাও কোনো মেঘের বলয় নেই, তবু আকাশ অঝোরে কেঁদে যাচ্ছে। অকৃত্রিম কান্নার মধ্যে, ধুয়ে যাওয়া শব্দের মধ্যে কেউ যেন কঁকিয়ে বলে উঠলো আমি আছি। শব্দে নেই অনেক সংখ্যার মধ্যে আমি আছি।
‘তাহলে তো কোনো মৃত্যু ঘটেনি। তদন্ত কিসের?’
ক্রোধ ঈষৎ হেসে বলল।
এখন মৃত্যুর তদন্ত না হলেও অস্তিত্ব পরিবর্তনের তদন্ত হবে, বলে উঠলো প্রতিবাদ, সায় দিল তদন্ত। তদন্ত ফিকে শব্দগুলোর গাঢ় লাল সংখ্যায় পরিণত হওয়া দেখছে। প্রেম, যৌনতা, খিদে সবাই ওখানে ভিড় করে দাঁড়াতে চাইছে। তদন্ত ওদের সবাইকে সরিয়ে দিল। প্রতিবাদকে বললো যে যেখানে বসে ছিল সে সেখানেই বসে থাক। একদম নড়াচড়া বন্ধ। অকুতোভয় দুর্গন্ধ, শব্দময় সংখ্যা আর সংখ্যাময় শব্দ প্রবল হয়ে উঠেছে প্ল্যাটফর্ম জুড়ে।
স্থির শব্দের গায়ে সংখ্যা কেঁপে উঠলো। প্রতিবাদ ধরতে গেলে তদন্ত বলে উঠলো, ‘ছুঁয়ো না, প্রমাণ নষ্ট হয়ে যাবে।’
রহস্য একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বললো, ‘আদৌ কি কোনো প্রমাণ ছিল? আসলে প্রমাণ কখনো কখনো গল্প বানায়। সবসময় সত্যি নয়।’
প্রেম বললো ঈষৎ রাগ এখন সংখ্যা হতে চায়, যাতে তাকে মাপা যায়। যাতে তার অস্তিত্ব স্বীকৃতি পায়। প্রতিবাদ আর তদন্তের জন্য ঈষৎ রাগ তার নাম বদলে ফেলবে, যৌনতা বলে উঠলো যেমন ধর্ষিতা মেয়ের বিচারের জন্য নাম বদলে যায়! তেমনি?
প্ল্যাটফর্মের উপর সবাই স্থির। আবোলতাবোল তার ভায়োলিন বন্ধ করে দিল।
সবাই সমস্বরে বলে উঠলো, ‘ধর্ষিতা মেয়ের বিচারের জন্য নাম বদলে যায় তেমনি।’
শুধু ক্রোধ চুপ রইল তারপর হা হা করে হেসে উঠলো।

(ক্রমশ)

দ্বন্দ্ব-অন্তর্দ্বন্দ্ব (পর্ব ৩)


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top