মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস- পর্ব-১৬

murderonorientexpressparbo16

এরকুল: মেসিয়ে বুঁ-র দিকে তাকিয়ে, মাই ডিয়ার ডিরেক্টর, একটু ধৈর্য ধরুন। আগে ফার্স্ট ক্লাসেরগুলো শেষ হোক, তারপর না হয়। এখন কর্নেল আর্বাথনটকে ডাকা যেতে পারে।
কিছুক্ষণ পরেই কর্নেল আর্বাথনট প্রবেশ করলেন ডাইনিং কোচে।
কর্নেল ফরাসি ভাষায় তেমন স্বচ্ছন্দ নন, ইংরেজিতেই কথাবার্তা শুরু হলো। নাম, ধাম, বয়স ইত্যাদির পর জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন।
এরকুল: ইন্ডিয়া থেকে দেশে ফিরছেন, ছুটিতে?
আর্বাথনট: হ্যাঁ।
এরকুল: জাহাজে না ফিরে এই পথে?
আর্বাথনট: দেখুন, সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।
এরকুল: ইন্ডিয়া থেকে সোজা এখানে আসছেন?
আর্বাথনট: বাগদাদ হয়ে, সেখানে একটা কাজ ছিল। (একটু বিরক্ত হয়ে) ব্যক্তিগত ব্যাপার তবু বলছি, বাগদাদে আমার এক পুরনো বন্ধুর কাছে দিন তিনেক কাটিয়ে আমি লন্ডন রওনা দিয়েছি।
এরকুল: বাগদাদে তিনদিন ছিলেন। ঐ ইংলিশ লেডি মিস্ ডেবেনহ্যামের সঙ্গে কি বাগদাদে আলাপ?
আর্বাথনট: না। ওনার সঙ্গে আমার আলাপ ট্রেনে। কিরকুক থেকে নিসবিন যাওয়ার পথে।
এরকুল: কিছু যদি মনে না করেন। মিস্ ডেবেনহ্যামের সম্পর্কে আপনার ধারণা কেমন?
আর্বাথনট: (একটু ক্ষুব্ধ হয়ে) হঠাৎ এ প্রশ্ন? এমন প্রশ্নের মানে বুঝলাম না। ওনার সম্পর্কে আমার ধারণা আপনার সঙ্গে শেয়ার করতে যাব কেন?
এরকুল: দেখুন আমাদের সকলেরই ধারণা এই খুনের পিছনে কোনো মহিলা আছেন। সেকারণেই ট্রেনের মহিলাযাত্রীদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া আমাদের কর্তব্য এর মধ্যেই পড়ে। মিস্ ডেবেনহ্যাম অন্যদের থেকে আলাদা, তার উপর ব্রিটিশ। আপনি নিজেও ব্রিটিশ, আর জানেনই তো ব্রিটিশ মহিলারা একটু রিজার্ভড হন। তাই আপনি যদি একটু সাহায্য—
আর্বাথনট: সত্যিকারের ভদ্রমহিলা বলতে যা বোঝায় মিস্ ডেবেনহ্যাম তাই-ই।
এরকুল: আপনার মতে এ ধরনের কাজের সঙ্গে ওনার যুক্ত থাকাটা একান্তই অসম্ভব?
আর্বাথনট: নিতান্তই অসম্ভব। আর তাছাড়া ওরকম একজন অপরিচিত ভদ্রলোককে খুন করে ওনার লাভটাই বা কী?
এরকুল: আপনাকে বুঝি তেমনটাই বলেছেন উনি।
আর্বাথনট: (উত্তেজিত হয়ে) খামোখা কার মৃত্যুতে কার লাভ এসব নিয়ে উনি আমার সঙ্গে আলোচনা করতে যাবেন কেন? ঐ নিহত আমেরিকান ভদ্রলোকের হাবভাব, বিশেষ করে মেয়েদের প্রতি নজর যে ভালো নয়, সে কথা উনি একবার আমাকে জানিয়েছিলেন। একটা কথা জেনে রাখুন মিস্ ডেবেনহ্যাম এ ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন না।
এরকুল: আহা। এত উত্তেজিত হয়ে পড়ার কী আছে।
বিস্ময়ের মুখে কর্নেল টেবিলে রাখা কাগজের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
এরকুল: যাই হোক, আমরা এখনো পর্যন্ত তদন্ত করে জানতে পেরেছি ভদ্রলোক রাত সোয়া একটা নাগাদ খুন হন। সেই সময় প্রতিটি প্যাসেঞ্জারের গতিবিধি সম্পর্কে আমাদের জানতে হচ্ছে। আপনি ঐ সময়—
আর্বাথনট: রাত্রি সোয়া একটা—আমি ঐ সময় নিহত ভদ্রলোকের সেক্রেটারি মিঃ ম্যাককুইনের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলাম।
এরকুল: ওর ঘরে না আপনার নিজের ঘরে?
আর্বাথনট: মিঃ ম্যাককুইনের ঘরেই আমি গিয়েছিলাম।
এরকুল: উনি কি আপনার পূর্বপরিচিত?
আর্বাথনট: না। এই ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসে ওনার সঙ্গে আলাপ। ইন্ডিয়া সেকেন্ডার ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট ইত্যাদি নিয়ে ওনার কিছু ভুলভাল ধারণা আছে, সে সম্পর্কেই কথা হচ্ছিল। এমনিতে আমি আমেরিকানদের খুব একটা পছন্দ করি না। তবে ম্যাককুইন বেশ আড্ডাবাজ। ইউরোপের বর্তমান রাজনীতি নিয়েও আমাদের কথাবার্তা চলছিল। হঠাৎ ঘড়ির দিকে আমার চোখ পড়ে, দেখি প্রায় পৌনে দুটো। অগত্যা আড্ডা শেষ করে দিতে বাধ্য হই।
এরকুল: আড্ডা থামিয়ে কী করলেন?
আর্বাথনট: কী আর করব? নিজের কামরায় ফিরে শুয়ে পড়লাম।
এরকুল: বিছানা কি রেডিই ছিল?
আর্বাথনট: হ্যাঁ।
এরকুল: আপনারটা ১৫ নং না? ডাইনিং কোচের দিক থেকে ধরলে শেষের আগেরটা তাই না।
আর্বাথনট: হ্যাঁ।
এরকুল: আপনি যখন নিজের কামরায় গেলেন তখন কন্ডাক্টরকে লক্ষ্য করেছিলেন?
আর্বাথনট: হ্যাঁ, কোনার একটা টেবিলে বসে কাজ করছিলেন। তবে আমি কামরা ছেড়ে বেরিয়ে আসার পরই মিঃ ম্যাককুইন ওকে ডেকে পাঠান।
এরকুল: কেন বলতে পারবেন?
আর্বাথনট: সম্ভবত বিছানা রেডি করার জন্যই।
এরকুল: মিঃ ম্যাককুইন আর আপনি যখন আড্ডা মারছিলেন তখন করিডোর দিয়ে কি কাউকে যাতায়াত করতে দেখেছিলেন। একটু ভেবে বলুন—
আর্বাথনট: হুঁ। যাতায়াত করছিলেন অনেকেই কিন্তু তারা কারা সেটা তো লক্ষ্য করিনি।
এরকুল: একটু মনে করার চেষ্টা করুন প্লিজ। আমি বলতে চাই আপনাদের আড্ডার শেষ ঘণ্টা দেড়েকের কথা। আপনারা ভিনভোকিতে নেমেছিলেন না?
আর্বাথনট: হ্যাঁ। তবে ঐ মিনিট খানেকের জন্য। যা ঠান্ডা! জমে যাওয়ার মতো অবস্থা।
এরকুল: একটু মনে করার চেষ্টা করুন। তখন বেশ রাত হয়েছে, বাইরে তীব্র ঠান্ডা, ভিতরে আবার আপনারা আড্ডায় ফিরে এসেছেন। আপনি হয়তো তখন হাতের—আচ্ছা, আপনি কি পছন্দ করেন, পাইপ না সিগার—?
আর্বাথনট: পাইপ, পাইপই আমার পছন্দের।
এরকুল: বাঃ যা বলছিলাম। ট্রেন চলতে শুরু করেছে। পৃথিবীর নানান রাজনৈতিক ওঠাপড়া নিয়ে আপনারা আলোচনায় মগ্ন। সে সময় কি—
আর্বাথনট: না না, সত্যিই আমি কাউকে আলাদা করে লক্ষ্য করিনি।
এরকুল: কর্নেল আপনি সেনাবাহিনীর লোক। সাধারণের থেকে পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা আপনার বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক। একটু যদি—
আর্বাথনট: (ভ্রু কুঁচকে) তেমন তো কিছু মনে পড়ছে না। একজন বোধ হয় করিডোর ধরে গেলেন। তারপর (একটু চিন্তাবিষ্ট হয়ে) একজন মহিলার মৃদু রিনরিন আওয়াজ পেলাম, জামাকাপড়ের ঘষাঘষির আওয়াজও, সঙ্গে এক ঝলক মিষ্টি গন্ধ—
এরকুল: দামি পারফিউম? বয়স্কা না তরুণী? আন্দাজ সময়টা?
আর্বাথনট: দামি পারফিউমেরই হবে। তবে দেখিনি, বলতে পারব না বয়স্কা না তরুণী। সময়টা—সময়টা। একটু রাতের দিকেই হবে। ট্রেন ভিনভোকি ছাড়ার পরই।
এরকুল: সময়টা নিয়ে এত নিশ্চিত হচ্ছেন কী করে?
আর্বাথনট: রাতের দিকে আমরা রাশিয়া নিয়ে আলোচনা করছিলাম। সম্ভবত সে সময়ই—
এরকুল: আপনি কখনো আমেরিকা গেছেন?
আর্বাথনট: না। আর যাওয়ার ইচ্ছেও নেই।
এরকুল: কর্নেল আর্মস্ট্রং নামে কাউকে চেনেন?
আর্বাথনট: আর্মস্ট্রং—আর্মস্ট্রং নামে দু-তিন জনকে চিনি। একজন উনি আর একজন সেলবি। কিন্তু সেলবি আর্মস্ট্রং তো মারা গেছেন।
এরকুল: আমি যে আর্মস্ট্রং-এর কথা বলছি তিনি একজন আমেরিকান মহিলাকে বিবাহ করেছিলেন। ওনাদের একমাত্র সন্তানকে অপহরণ করে খুন করা হয়েছিল।
আর্বাথনট: হ্যাঁ হ্যাঁ। পেপারে এমন একটা খবর পড়েছিলাম বটে! তবে ওনার সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল না। শুনেছি বাহিনীতে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন, ভিক্টোরিয়া ক্রসও পেয়েছিলেন।
এরকুল: কাল খুন হওয়া ব্যক্তিটি ঐ শিশুটির হত্যাকারী।
আর্বাথনট: (চিবুক কঠোর হয়ে উঠল) তবে তো আপদ গেছে। তবে এসব ক্ষেত্রে আইন আদালতের শরণাপন্ন হওয়াটাই ভালো।
এরকুল: আপনি কি বদলা বা প্রতিহিংসায় বিশ্বাস করেন না?
আর্বাথনট: একদমই না। ব্যক্তিগত প্রতিহিংসায় রক্তপাত আমার একদমই পছন্দ নয়।
এরকুল: আর আমার তেমন কিছু জিজ্ঞাস্য নেই। শুধু একটা প্রশ্ন, কালরাত্রে কি সন্দেহজনক কিছু আপনার নজরে এসেছিল।
আর্বাথনট: (দু-এক মুহূর্ত দ্বিধা করে) না তেমন কিছু নয়। তথ্যটা আপনার কাজে লাগবে কিনা আমি নিশ্চিত নই, তবুও জানিয়ে রাখা ভালো। আমি যখন নিজের কামরায় ফিরছিলাম তখন দেখলাম আমার পাশের কামরার অর্থাৎ ষোল নম্বরের ভদ্রলোক সন্দেহজনকভাবে উঁকিঝুঁকি মারছেন। আমাকে দেখেই অবশ্য উনি নিজের কামরায় ঢুকে যান।
এরকুল: ধন্যবাদ কর্নেল। আপনি এখন আসতে পারেন। আমার আর কিছু জিজ্ঞাস্য নেই।
আর্বাথনট: (চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে) তবে একটা কথা আমি আবারও জোর গলায় বলতে চাই যে মিস্ ডেবেনহ্যাম এই খুনের সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পর্কিত নন। উনি একজন খাঁটি ইংলিশ লেডি।
ডাঃ কনস্টানটাইন: (অনেকক্ষণ চুপ থেকে) ইংলিশের খাঁটি ভেজাল—ব্যাপারটা কী, ঠিক বুঝলাম না?
এরকুল: অন্যকিছু নয়। ব্রিটিশ জাত্যাভিমান। সাচ্চা ইংরেজরা কোনো অনৈতিক কাজের সঙ্গে কখনো যুক্ত থাকেন না, সেটা বোঝাতেই এই খাঁটি ইংলিশ। কিন্তু প্রশ্নটা হলো এভিডেন্স। নিহতের ঘর থেকে পাইপ ক্লিনার পাওয়া গেল, আবার কর্নেল নিজেই জানালেন উনি পাইপেই অভ্যস্ত।
বুঁ: আপনি কি বলতে চান? কর্নেলই কি—
এরকুল: না না। আমি কিছুই বলতে চাই না। কর্নেলই তো বললেন পাইপের ব্যাপারটা। তাছাড়া একমাত্র উনিই স্বীকার করলেন যে কর্নেল আর্মস্ট্রংকে উনি চিনতেন। শুধু কি চিনতেন?
বুঁ: হতেই পারে না। ওনার মতো একজন অভিজাত দক্ষ ফৌজি অফিসার কাউকে ওভাবে খুন করার জন্য এলোপাথাড়ি ছুরি চালাবে, তা হয় নাকি? একটা স্টাইল বলে ব্যাপার আছে না। খুনের পদ্ধতির মধ্যে খুনির মনস্তত্ত্বের ছাপ পাওয়া যায়। এটা কর্নেলের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। আমার তো মনে হয় এবার ঐ—
এরকুল: ইতালিয়ানটিকে তো। রোসো বন্ধু রোসো। একটু ধৈর্য ধরো। আগে ফার্স্ট ক্লাসেরগুলো শেষ করি।

(ক্রমশ)

আগের পর্ব : murder on the orient express15


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top