মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস – ​পর্ব-১৫

murder on the orient express15

পাসপোর্টগুলো নাড়াচড়া করতে করতেই এরকুল পোয়ারো ডেকে পাঠালেন কাউন্ট এবং কাউন্টেস আন্দ্রেনীকে। কাউন্ট কিন্তু একাই এলেন। চেহারা ও বেশভূষায় এক্কেবারে ইংরেজ। ছফুটের মতো হাইট, চওড়া কাঁধ।
​প্রারম্ভিক পারস্পরিক অভিবাদন বিনিময় শেষ হলো।
​কাউন্ট: বলুন, আপনাদের জন্য কী করতে পারি?
​এরকুল: আপনি শুনেছেন হয়তো গতকাল রাত্রে এই ট্রেনে একটা ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটে গেছে। রেল কর্তৃপক্ষের তরফে সেই হত্যাকাণ্ডের তদন্তের দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছে। সেই কারণেই—
​কাউন্ট: নিশ্চয়ই, তদন্ত তো করতেই হবে। কী নৃশংস হত্যা! তবে আমরা বোধ হয় তেমন কোনো সাহায্যই করতে পারব না। গতকাল রাত্রে আমি ও আমার স্ত্রী একটু তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
​এরকুল: আপনি কি নিহত ব্যক্তিটির আসল পরিচয় জানেন?
​কাউন্ট: (কোণের টেবিলের দিকে আঙুল বাড়িয়ে) গতকাল লাঞ্চের সময় ওই কোণের টেবিলে যে আমেরিকান ভদ্রলোক বসেছিলেন, তিনিই কি?
​এরকুল: হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, তিনিই গত রাতে খুন হয়েছেন। ওনার নামটা কি আপনি জানেন?
​কাউন্ট: নামটা? না, জানি না। তবে পাসপোর্টে খুঁজলে নির্ঘাত পাওয়া যাবে।
​এরকুল: নাম আমরা জেনেছি। পাসপোর্ট থেকে পেয়েছি ওনার নাম মিঃ রাশেট, কিন্তু আমরা জানতে পেরেছি ওনার আসল নাম কাসেটি, আমেরিকান—কুখ্যাত অপহরণকারী ও খুনি।
​(তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এরকুল কাউন্টের চোখ-মুখ লক্ষ্য করছিলেন, কিন্তু তেমন কোনো ভাবান্তর লক্ষ্য করলেন না)।
​কাউন্ট: তাই নাকি! Very interesting, সত্যিই আজব দেশ এই আমেরিকা।
​এরকুল: কখনো গেছেন নাকি আমেরিকায়?
​কাউন্ট: বছরখানেক আগে, ওয়াশিংটন।
​এরকুল: আর্মস্ট্রং ফ্যামিলির কাউকে চিনতেন?
​কাউন্ট: ওখানের কিছু লোকের সাথে আলাপ আছে, কিন্তু কাদের কথা বলছেন ঠিক বুঝতে পারছি না।
​এরকুল: (টেবিলে রাখা ইস্তাম্বুল ক্যালে কোচের কামরার স্কেচের দিকে তাকিয়ে) আপনারা দেখছি ১২ ও ১৩ নং কূপেতে আছেন। কাল কখন শুতে গিয়েছিলেন?
​কাউন্ট: কাল ডিনারের সময়ই কন্ডাক্টরকে দুটো কূপের বিছানা রেডি করে দিতে বলি। ডিনার থেকে ফিরে পাশের কামরায় কিছুক্ষণ তাস খেলি।
​এরকুল: কোন কামরায়?
​কাউন্ট: ১৩ নং এ। ওটাই আমার স্ত্রী কাউন্টেস এলেনার। এগারোটা নাগাদ এলেনা শুয়ে পড়লে আমি ১২ নং এ এসে শুয়ে পড়ি।
​এরকুল: কাল রাত্রে যে ট্রেন থেমেছিল সে সম্পর্কে—
​কাউন্ট: আমার বরাবরই একঘুমে সকাল। আজ সকালের আগে আমি কোনো কিছুরই টের পাইনি।
​এরকুল: আপনার স্ত্রী?
​কাউন্ট: ওর আবার এক বদ অভ্যেস। ট্রেনে ট্রাভেল করলে ঘুমের ওষুধ নেবেই, গতকালও নিয়েছিল। টের পাওয়ার কোনো संभावना আছে বলে তো মনে হয় না। আমি দুঃখিত, আপনাদের তদন্তে তেমন কোনো সাহায্য করতে পারলাম না।
​এরকুল: (এক টুকরো কাগজ ও পেন বাড়িয়ে) নিতান্তই ফরমালিটি—তবুও যদি নাম-ঠিকানাটা একটু… আর ম্যাডামকে একটু…।
​কাউন্ট: অবশ্যই। (নাম-ঠিকানা লিখে উঠে দাঁড়িয়ে) আমার মনে হয় না কাউন্টেসের আর আসার প্রয়োজন রয়েছে। তার নতুন কিছু তথ্য আর দেওয়ার নেই।
​এরকুল: ঠিকই, তবে দেখুন ফরমালিটি বলে তো একটা ব্যাপার আছে। একটা বয়ান রেকর্ড করাটা জরুরি, নইলে—
​কাউন্ট: আমার তো মনে হয় নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় (রাগত ভাবেই)। দেখুন, যা ভালো বোঝেন। (বেরিয়ে গেলেন)।
​এরকুল দুজনের পাসপোর্ট নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলেন। কাউন্টেসের নাম এলেনা মারিয়া, বিয়ের আগের পদবি গোল্ডেনবার্গ, বয়স কুড়ি। পাসপোর্টের কোণায় একটা দাগের দিকে এরকুল খুব মনোযোগ দিয়ে কী একটা দেখছিলেন। এটা হাঙ্গেরিয়ান ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্ট।
​বুঁ: দেখবেন মশাই, এরা সব উপরতলার মানুষ। দেখলেন তো কাউন্ট এই ডাকাডাকিটা ভালো ভাবে নিলেন না। কমপ্লেন করে দিলে আমার চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে।
​এরকুল: আরে না না, ঘাবড়াবেন না। দেখুন না কীভাবে ম্যানেজ করি—
​এসব কথাবার্তার মধ্যেই কাউন্টেস এলেনা এসে হাজির হলেন। তন্বী তরুণী, চলাফেরায় রাজহংসীর ছন্দ।
​এলেনা: আমায় ডেকেছেন?
​এরকুল: হ্যাঁ, ম্যাডাম। সবই ওই কর্তব্যের খাতিরে। একটু যদি বলেন কাল রাত্রে কোনো অস্বাভাবিক জিনিস আপনার নজরে এসেছিল বা কোনো অস্বাভাবিক শব্দ আপনি…
​এলেনা: কিছু না। আমি তো ঘুমিয়েই রাত কাবার করে দিলাম।
​এরকুল: আপনার পাশের কামরার ওই আমেরিকান ভদ্রমহিলা রাত্রে অত হট্টগোল বাঁধালেন, আপনার কোনো রকম ঘুমের ব্যাঘাত…
​এলেনা: না না। ট্রেনে ট্রাভেল করলেই আমাকে ঘুমের ওষুধ নিতে হয়, সেই কারণেই হয়তো—
​এরকুল: শুনলাম—আর আপনাকে বেশিক্ষণ আটকাব না। ম্যাডাম, একবার আপনার পাসপোর্টটায় চোখ বুলিয়ে নিন তো। আপনার নাম, ধাম, বয়স, পদবি ঠিকঠাক আছে তো?
​এলেনা: (চোখ বুলিয়ে) হ্যাঁ, সবই ঠিক আছে।
​এরকুল: (একটা কাগজ বাড়িয়ে) ফরমালিটি ম্যাডাম, নিতান্তই ফরমালিটি। এই কাগজে নাম, ধাম ইত্যাদি লিখে একটা সই করে দিন।
​এলেনা নাম-ধাম লিখে একটা সই করে দিলেন ‘এলেনা আন্দ্রেনী’।
​এরকুল: আপনি কি কখনো আমেরিকা গিয়েছিলেন?
​এলেনা: না না। আমাদের বিয়েই তো হলো সবে এক বছর, তার আগে যাওয়ার সুযোগ কোথায়?
​এরকুল: আর একটা প্রশ্ন, কাউন্ট কি ধূমপান করেন?
​এলেনা: হ্যাঁ।
​এরকুল: পাইপ?
​এলেনা: না না, সিগার অথবা সিগারেট। হঠাৎ এ প্রশ্ন? (উত্তর দিতে দিতেই কাউন্টেস আಂದ್ರেনী উঠে দাঁড়ালেন)
​এরকুল: গোয়েন্দাদের স্বভাবটাই এমন। উদ্ভট প্রশ্ন করাটাই তাদের ধর্ম। ম্যাডাম, আর একটা প্রশ্ন, আপনার ড্রেসিং গাউনের রংটা?
​এলেনা: (মুক্তোর মতো সাদা দাঁত বের করে হেসে) কর্ন গোল্ডেন। তদন্তের জন্য সত্যিই কি এই সব তথ্যগুলো দরকারি?
​এরকুল: অবশ্যই।
​এলেনা: আপনি কোন দেশের গোয়েন্দা? যুগোস্লাভিয়ার কোনো গোয়েন্দা এই ট্রেনে আছেন বলে তো আমার জানা ছিল না।
​এরকুল: যুগোস্লাভিয়ার কেন? আমার কাজের জায়গা গোটা পৃথিবী। আমি লন্ডনে থাকি। কর্মসূত্রে গোটা পৃথিবী ঘুরতে হয়। ইংরেজি ভাষাটার উপর আপনার—
​এলেনা: এই কাজ-চলনগোছের, একটু-আধটু।
​এরকুল: ওকে ম্যাডাম, আর আপনাকে আটকাব না। আপনার সহযোগিতার জন্য অনেক ধন্যবাদ。
​এলেনা মাথা ঝাঁকিয়ে বাই করে মরালীর ছন্দে বেরিয়ে গেলেন।
​বুঁ: কী চোখ-ধাঁধানো রূপ মশাই! সে সব থাক, আপনার কাজ কত দূর এগোল?
​এরকুল: কাজ আর কী এগোবে, দেখলেনই তো তেমন কিছু উদ্ধারই হলো না। এই জোড়াটা ঘুমিয়েই রাত কাবার করেছে।
​বুঁ: এবার তবে ইতালিয়ানটাকে ডাকা যাক।
​এরকুল: ইঃ! (অন্যমনস্ক ভাবে এলেনার পাসপোর্টের দাগ লাগার জায়গা পরীক্ষা করতে করতে) ক্ল্যারিক্যাল স্টাফদের নিয়ে আর পারা যায় না। মোক্ষম জায়গায় এমন সব কালি ধেবড়ে ফেলে!

(ক্রমশ)

আগের পর্বের লিঙ্কঃ মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস – পর্ব-১৪


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top