আজ স্কুল থেকে ফেরার সময় ভয়ঙ্কর বৃষ্টি নামল। আমি ছিলাম মনজিত সিংয়ের বাইকে, রাস্তার দুপাশে পাকুড় গাছ, মাঝখান দিয়ে রুক্ষ পাথুরে পথ, মনজিত ওই রাস্তায় যতটা সম্ভব জোরে চালিয়েও শেষ রক্ষা করতে পারল না। ওই পাকুড় গাছের সারিতে বড় বড় ফোঁটার বৃষ্টি শুরু হয়ে ফাঁকা জায়গায় আসতেই একেবারে চান করে গেলাম। আমার ভালোই লাগছিল, দিগন্তে কালো হয়ে আছে মেঘ, নীচে সবুজ ক্ষেত, মাঝেমাঝে বিদ্যুৎ চমকে উঠছে।
মনজিতের বৃষ্টি পছন্দ না, ভিজে গিয়ে বিরক্ত, এবং তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে চাইছিল। কিন্তু প্রচণ্ড বৃষ্টিতে ও বাইকটা একটা পরিত্যক্ত বাড়ির নীচে দাঁড় করিয়েছিল। আমার মনে হয়েছিল এটাই উধাও হওয়ার প্রকৃষ্ট সময়, কিন্তু ওর সামনে থেকে উধাও হওয়ার উপায় নেই। বাড়ি ফেরার জন্য ঝোলাঝুলি করবে। তারপর লোকজন নিয়ে এসে খুঁজে বেড়াবে।
আমার ভীষণভাবে মনে হয় প্রকৃতির কাছে একা যেতে হয়, হয়ত সমধর্মী একজনকে সঙ্গী করে নেওয়া যায়, কিন্তু সমধর্মী পাওয়াটাই খুব মুশকিল। সহ্যাদ্রির পথে আমি কাউকে পাইনি। এখানেও এখনো কাউকে চোখে পড়েনি। উচ্চকিত ভ্রমণে প্রকৃতি কথা বলে না, প্রকৃতি এক মোহময়ী রমনী, তাকে সময় দিলে সে আবরণ উন্মোচিত করে, কথা বলে, আলিঙ্গনাবদ্ধও হয়।
বিস্তীর্ণ প্রান্তর জুড়ে বৃষ্টি পড়েই চলল, আর আমি মনজিতকে ফেরার তাড়া দিতে থাকলাম। কারণ ফিরলে তবেই সবার চোখ এড়িয়ে বেরিয়ে পড়া যাবে। অবশেষে ও বাইকে স্টার্ট দিল, আর আমি পথের পাশেই একটা দোকানে নেমে পড়লাম। ওখান থেকে বাড়ি পায়ে হেঁটে পাঁচ থেকে সাত মিনিট। বললাম কয়েকটা জিনিস কিনতে হবে, কিনেই আমি ফিরছি। বৃষ্টিও ধরে যাবে মনে হচ্ছে। ততক্ষণ আমি এখানেই বসে থাকব। এই মিথ্যেটা বলা ছাড়া উপায় ছিল না।
ও আমাকে নামিয়ে দিতেই আমি দূরের বনের পথ ধরলাম। লালমাটির একটা পথ দূরে “দরমিয়া” নামের একটা গ্রামকে রেখে সোজা হেঁটে গিয়ে আরো দূরের গ্রামে চলে গেছে, তবে পথ নেই যেখানে, সেই পথটাই আমার লক্ষ্য, তাই ওই পথ থেকে নেমে একটা প্রান্তর পেরিয়ে বনের ভেতরে ঢুকলাম। বৃষ্টি পড়ে চলেছে, চারিদিক সবুজ, বড় বড় জলের ফোঁটা গাছের পাতা থেকে ঝরে পড়ছে। এটা পড়লে আবার শ্রাবণী আমাকে বকাবকি করবে জানি, যে নতুন জায়গা, ভিজিস না, জলবায়ু সয়ে যেতে সময় লাগবে, কিন্তু ওই সময়টা আমার দিতে ইচ্ছা করে না কখনো, সইবে, এভাবেই রোদে জলে ঘুরতে ঘুরতেই সয়ে যাবে, কিন্তু ঘরে বসে সওয়াতে গেলে এই মুহূর্তগুলো আর পাবো না। আর জ্বর হলে হোক না হয়, কতদিন যে জ্বর আসেনি, জ্বরের একটা ঘোর আছে, সেটা ভীষণ ভালো লাগে।

এই বনটায় আগে আসিনি, দূর থেকে দেখতাম, ঢুকে দেখলাম, প্রচুর শিশু আর পাকুড় গাছ, বর্ষার জল পেয়ে ঝোপগুলো বেড়ে উঠেছে, আর পথ ক্রমশ উঁচু হয়ে সামনে এগিয়ে গেছে, আমিও ওই উঁচু হয়ে ওঠা পথ ধরেই এগিয়ে চললাম। বৃষ্টি পড়ছে বলে নির্জনতা নেই, বৃষ্টি আর হাওয়ার আওয়াজ। পাখির ডাকও বন্ধ। ওই পথে যেতে যেতে একটা ছোট্ট টিলার ওপর পৌঁছালাম। ওপরে উঠে দেখি বহুদূর বিস্তৃত বন ক্রমশ দিগন্তে এগিয়ে গেছে। টিলা থেকে নীচে নেমেই কিছু নীল সাদা রঙের অজানা ফুল, ফুলের ওপর বৃষ্টি ঝরে পড়ছে, আর মনে হচ্ছে যেন নৃত্যরত নক্ষত্রসভা। এই বৃষ্টি যেন এটা দেখাবে বলেই আমাকে হাত ধরে এখানে ডেকে এনেছে।
ওখানে দাঁড়িয়েছিলাম বহুক্ষণ, বৃষ্টি ধরে এল, আলো কমে আসতে শুরু করলে ফেরার পথ ধরেছিলাম। ওই দোকানটার কাছে এসে দেখি নগেন্দ্র সিং আর মনজিত দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে মনজিত বলল, “আপ কো ছোড়কে জানাহি মেরা ভুল থা।” বাইকে উঠে বাড়ির পথে রওনা দিলাম।
( ক্রমশ )
মুজঃফরপুরের দিনগুলো ( পর্ব ১০ )



