কাছের দূরত্ব

silent distance

এক.

আজ চার মাস পর আবার স্বামী-স্ত্রীর একসঙ্গে বিছানা হয়েছে। মাঝখানে শুয়ে আছে ইহান। আট বছর সংসার করার পর চার মাসের বিচ্ছেদ মনে হচ্ছে চল্লিশ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। মনের মধ্যে এক ধরনের সংকোচ না জড়তা না ভীরুতা নাকি ঘৃণা যেন অনেকটাই দূরত্ব নির্দেশ করছে। হাত বাড়ালেই তাকে কাছে টেনে নেওয়া যায় আগের মতোই, কিন্তু সেটাও করার ইচ্ছে জাগছে না। প্রতিটি পুরুষ মানুষের কি এরকমই হয়? এতদিন সে জেনে এসেছে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের আবরণ মাত্র। যে আবরণ পরস্পরের লজ্জা নিবারণ করে পবিত্রতা রক্ষা করে। যে আবরণ সম্পর্ক দৃঢ় করে। তা কখন কেমন করে শিথিল হয়ে গেছে আজ সে ভাবতে পারছে না। শুধু তার সন্তান ইহানের মুখ চেয়েই সবকিছু মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। ভুলে যেতে চেয়েছে এতদিনের দূরত্ব। কিন্তু মন কিছুতেই এই দূরত্বকে সংক্ষিপ্ত করে উঠতে পারছে না। কিছুতেই অতিক্রম করতে পারছে না আগের মতোই নিজস্ব অধিকারের অমোঘ আকর্ষণে। দীর্ঘশ্বাস পড়তে চাইছে, কিন্তু তাকেও জোর করে নিঃশব্দে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে। প্রথমে কী কথা বলবে তাও কথা আসছে না। নিঃশব্দে কেটে যাচ্ছে রাত। শুধু ইহানের নিঃশ্বাস পতনের শব্দ কানে আসছে। বাইরের তালের গাছে পাখির ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ। দূরে একটি শিয়াল বারবার ডাকছে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে কতগুলি কুকুর।

একটি ছোট গ্রাম। শ্রমিক আর চাষি মানুষেরই বসবাস বেশি। সামান্য জমি থাকা সত্ত্বেও যেটুকু ফসল ফলে তাতে মেরে কেটে বছরের মধ্যে দুই-তিন মাসই চলে। বাকি দিনগুলি পরের ক্ষেতে মজুর খেটেই উপার্জন করতে হয় সংসার চালানোর জন্য। বৃদ্ধ বাবা-মা ছাড়া বউ আর চার বছরের সন্তান নিয়েই মিনহাজের সংসার। এই করে দিব্যি চলেও যায় কোনো অসুবিধে হয় না। ইহানের জন্মের পর অসুখ-বিসুখের কারণে সংসারে টানাপোড়েন বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু মিনহাজ কোনোদিন বসে থেকে দিন গুজরান করেনি। মাঠঘাটের কাটকুঠো সংগ্রহ থেকে মাছধরা এবং শাকপাতা সংগ্রহ করাও তার কাজের মধ্যেই পড়ে। সংসারের সুখ আনার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে। একদিন ভাগ্নির বাড়ি ঘুরতে গিয়েই দেখতে পায় আশিফাকে। সবে সে নবম শ্রেণির ছাত্রী। কিন্তু এক ঝলক দেখেই তার পছন্দ হয়ে যায়। ভাগ্নিকে বলেই বিয়ের প্রস্তাবও পাঠায় তাদের বাড়িতে। হ্যাঁ, গরিব বাড়ি বটে। বিনাপণে বিয়ে করলে তারা দিতেও রাজি। সেই আট বছর আগের ফাল্গুন মাসের চোদ্দ তারিখে শুভ বিবাহের কাজটি সম্পন্ন করে ফেলে। পণ কিছুই নেয়নি। গরিব ঘরে একটি সুন্দরী মেয়ে চাঁদের আলো করেই এসেছে এটাই কী কম! গাঁয়ের লোকে দেখে বলেছে, হ্যাঁ, একখানা বউ এসেছে বটে! টাকাপয়সা অলংকারপাতি কেউ দেখতে যাবে না, শুধু বউটাকেই দেখবে।

মিনহাজ কোনো উত্তর করেনি, মনে মনে সে খুশি হয়েই মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়েছে। বৃদ্ধ পিতামাতাও সন্তানের খুশিতে খুশি, তাদেরও কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। সংসারও কেটে যাচ্ছিল। মেয়ের বাড়ির লোকেরা এসে দু-চারদিন ঘুরেও যাচ্ছিল। এদিকে আশিফাও ইচ্ছা হলেই বাপের বাড়ি যাচ্ছিল ছেলেটিকে কোলে নিয়েই। মিনহাজ খাটুনে মানুষ, তাই সবসময় সঙ্গে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। যাক না, সে তো নিজেই যেতে পারবে। বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে বাস ধরে ঘণ্টাখানেকের রাস্তা। তারপর বাসস্ট্যান্ডে নেমে টোটো ধরলেই বাপের বাড়ি। সুতরাং অসুবিধা কী আছে!

অসুবিধে কী আছে তা পরে টের পায় মিনহাজ। তার পাড়ারই দোকানদার হাবলু মিঞা। উচ্চ মাধ্যমিক ফেল করে মুদির দোকান করেছে। চার বছরের ছেলে ইহান এই বয়সেই চিনে গেছে দোকান। যখন তখন দোকানে গিয়েই বলে : চকো দাও! আমাকে চকো দাও!

হাবলু মিঞা প্রথম প্রথম চকো দিয়ে বেশ লুব্ধ করে ফেলেছে। এটা একটা অভ্যাসেও পরিণত হয়েছে। একটা চকো হতে হতে দুটো চকো, এভাবে আবদারও বেড়ে গেছে। হাবলু মিঞা ইহানকে কোলে নিয়ে বলে, আমাকে আব্বা বল তবেই দেব!

ইহান বলে, আব্বা!

হাবলু মিঞা বলে, আবার বল।

তখন আবার বলে, আব্বা! আব্বা!

এভাবেই হাবলু মিঞা কখন তার আব্বাতে পরিণত হয়।

বাড়িতে ইহান কখনও কখনও তার মা’র কাছে আবদার করে, মা, চকো-আব্বা যাব, চকো-আব্বা নিয়ে চলো!

আশিফা তখন চকো-আব্বার কাছে নিয়ে যায় তাকে। একটা চকো, দুটো চকো আর আশিফার জন্য আরো দুটো এভাবেই বাড়তে থাকে চকোর সংখ্যা।

হাবলু মিঞা বাইশের যুবক। তখনও অবিবাহিত। তার দোকানে থরেবিথরে সাজানো আছে কত জিনিস। বাইকে করে সে দোকানের মালপত্র নিয়ে আসে। দু’বেলা তাকে যেতে হয় শহরের মূল কেন্দ্রে। কোনো খদ্দের গিয়ে ফিরে আসবে এমনটি নয়। বাড়িতে না থাকলে তার বাবা অথবা ছোট ভাই দোকান সামাল দেয়। কয়েকবার ইহানের ডাক্তারখানা যাবার প্রয়োজন হয়েছিল। গ্রাম থেকে শহরের এতটা দূরত্ব দ্রুত যাওয়ার কোনো ব্যবস্থাই নেই। হাবলু মিঞা নিজেই বলেছিল, এত চিন্তা কেন বড় ভাই, ভাবিকে নিয়ে আমিই দেখিয়ে আসব ডাক্তারখানায়! এইটুকু উপকার করব তাতে লজ্জার কী!

এই এইটুকু উপকার চলতে চলতেই একসময় তা অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। ডাক্তারখানা যাওয়ার প্রয়োজন হলেই আশিফার একটি ইঙ্গিতেই হাবলু মিঞা বেরিয়ে পড়ে। আশিফাও তার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়ে ধীরে ধীরে। এদিকে আশিফার উপরও হাবলু মিঞার একটা অধিকার জন্মায়।

—ভাবি, আমার সঙ্গে যদি তোমার বিয়ে হতো তাহলে কী মজাটাই না হতো বলো!

—তখন তুমি কি এতটা ভালবাসতে? তোমার ভাইও বলেছিল, আমাকে সুখে রাখবে! কিন্তু সারাদিন খেটেও সংসারে সেই সুখ কোথায়!

—আমি কি তাহলে সুখ দিতে পারতাম না ভাবছ?

—তা ভাবব কেন? নিশ্চয়ই পারতে। তোমার তো কিছুরই অভাব নেই। ধন-সম্পদ সবই আছে। একটা ভালো মেয়ে বিয়ে করতে পার!

—বিয়ে করলে তোমার মতো মেয়েকেই করব!

—আমার মতো কেন?

—তোমাকে আমার খুব ভালো লেগেছে। কেন বলতে পারব না।

আশিফা আর কোনো উত্তর করে না, শুধু একটা হাসি উপহার দেয় তাকে। আর সেই হাসিতেই যেন একটা অদৃশ্য তির বিদ্ধ হয় হাবলুর বুকে। হাবলু ছটফট করতে থাকে, মদন বাণে বিদ্ধ হয় তার হৃদয়। স্কুল জীবনে একজনকেই তার ভালো লেগেছিল, তার নাম ছিল ডলি। কিন্তু পড়াশোনায় অসম্ভব মেধাবী ছাত্রী ডলি তাকে পাত্তা দেয়নি। মাঝপথেই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে সে রোজগারের জন্যই দোকান দিয়ে বসে। আশিফা ভাবিকে নিয়েই তার মনের মধ্যে যেন অনেকটাই তৃষ্ণা অনুভূত হতে থাকে। সেদিন দোকানে কেউ ছিল না। আশিফা ভাবিও কী কিনতে এসেছিল। হাবলু নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি। তার ফর্সা দুই গালে দুই হাত চেপে ধরে বলেছিল, একটা চাঁদকে হাতের মুঠোয় ধরেছি। আজ আর চাঁদটি পালাতে পারবে না!

আশিফা বলেছিল, চাঁদ যতই হাতের মুঠোয় ধরো, তা তো আকাশেই আছে, আকাশ থেকে পেড়ে নেওয়া অত সহজ নয়!

হাবলু বলেছিল, আমি আকাশেও উড়তে জানি!

আশিফা বলেছিল, সে সাহস থাকে তো করে দেখাও!

হাবলু মিঞার সাহস এভাবেই বাড়তে থাকে।

বামন হয়ে চাঁদে হাত কথাটি সবসময়ই সত্য হয় না। বামন কোনো কোনো সময় চাঁদও পেড়ে নিতে পারে। হাবলু মিঞার সেই প্রয়াস সফল হয়ে গেল। কখন কিভাবে আশিফার সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে উঠল সে খবর মিনহাজও জানত না। পাড়ার ছেলে ভাই হিসেবেই তাকে দেখে আসত। সম্পর্কে দেবর তা ভাবি বলে রসিকতা করলে ক্ষতি কী! সেভাবেই মনে করত তাকে। কিন্তু নারী-পুরুষের সম্পর্ক জটিল। যতই বয়সের অসমতা থাকুক, যতই পরিবেশ ও পরিস্থিতি আলাদা হোক। যৌবনের আকর্ষণ যে কোনো সময় বৈধ অবৈধ সীমানা অতিক্রম করতে পারে। সেই সম্পর্ক যদি পরকীয়ায় গড়ায় তাহলে তার আকর্ষণ আরও বেশি। ডাকপুরুষের মুখেই শোনা যায় ‘পর নারীতে যার মন, লক্ষ্মী ছাড়ে তার ধন।’ তখন এই লক্ষ্মীকেও ভুলে যায়। দোকানের আনাজপাতি থেকে শুরু করে দরকারি জিনিসপত্রও আশিফাকে দিতে থাকে। না তার জন্য পয়সা দিতে হয় না। বিনিময়ে কী দিতে হয় তা অনুমান করা কঠিন নয়। মিনহাজ এসবের হিসেব করে না, খোঁজও রাখে না। ভাবে আশিফা গুণবতী নারী। তার গুণেই সংসার দিব্যি চলে যাচ্ছে। সারাদিন কাজ করে রাত্রে ঘুমিয়ে পড়ে। শরীর ঠিকমতো সাড়াও দিতে পারে না। ক্লান্তিতে সারারাত ঘুমই ভাঙে না। আশিফা এপাশ-ওপাশ করে। কামনা করে রাত্রেও যদি হাবলুকে পাওয়া যেত! দিনের বেলা সব সময় চোখের আড়াল হওয়া যায় না। কেউ না কেউ হয়তো দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে পারে। তাই মনের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকেই। নির্ভয়ে নির্ভাবনায় সেই কাজ করার অবকাশ কোথায়? আট বছরের সংসার জীবনে কিবা সে পেয়েছে! দু’বেলা দু’মুঠো ভাত-কাপড় ছাড়া আর কিছু নয়। তার নানি ছোটবেলায় বলত, ‘কিবা হামার ভাতারের সুখ/ অঘ্রান মাসে ভাতের দুখ!’ যদিও ভাতের দুখ সহ্য করা যায়, কিন্তু শরীরের দুখ সহ্য করা যায় না। মিনহাজ বরাবরই দুর্বল পুরুষ। নারীর চাহিদা অনুভব করার ক্ষমতা তার নেই । আবার সারাদিনের পরিশ্রমে তার আর কোনো আগ্রহও থাকে না। যে আশিফার শরীরে যৌবনের প্লাবন বইছে, তীর ভূমিকে ভেঙেচুরে প্লাবিত করতে চাইছে, সেই স্রোতে নৌকা পারাপার করার মাঝি কোথায়? সে ভাবতে থাকে একমাত্র হাবলুই পারে এই স্রোতকে অতিক্রম করতে। সেদিন সে তো কথায় কথায় বলেই দিয়েছিল, বহু মেয়ে দেখেছি, কিন্তু তোমার মতো একটাও আমাকে আর কাছে টানতে পারেনি। তোমাকে না দেখলে বুঝতেই পারতাম না নারী কত মধুর, কত আনন্দের, কত স্বপ্নের, কত সুন্দরী হয়!

আশিফা হেসে উঠেছিল এই প্রশংসা শুনে। আনন্দে সে তার ঠোঁটে ঠোঁট দিয়ে একটি চুমু খেয়েছিল। বুঝিয়ে দিয়েছিল তুমিই আমার স্বপ্নের পুরুষ। তুমিই আমার সব।

দুই.

সেদিন মিনহাজ বাজার থেকে ফিরেই ঘরে আর আশিফাকে দেখতে পেল না। কোথায় গেল আশিফা? কোথায় গেল? চারিদিকেই সুর হলো খোঁজাখুঁজি, কিন্তু কোথাও পাওয়া গেল না। এদিকে হাবলুর দোকানও বন্ধ। তাহলে কি হাবলুর সঙ্গে গেছে? হাবলুর বাড়িতে খোঁজ নিয়ে জানতে পারল, হাবলু গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেছে এখন ক’দিন ফিরবে না বলে গেছে বাড়িতে। তাহলে কি তার সঙ্গে গেছে? কিন্তু কাউকেই বলে গেল না কেন?

বাড়িতে বৃদ্ধা মা-বাবা ছাড়া আর কেউ নেই। তারাই জানাল, বৌমা বলে গেছে, আমার যেন খোঁজ না করে। আমি এমন জায়গায় যাচ্ছি কেউ আমাকে খুঁজেও পাবে না!

মা জিজ্ঞেস করেছে, কেন যাচ্ছ বৌমা?

আশিফা উত্তর দিয়েছে, আমি কেন যাচ্ছি তা বলব না, তবে নিজের সুখের জন্য যাচ্ছি।

মা বলেছে, এখানে কি তুমি কোনো সুখ পাও না?

আশিফা উত্তর দিয়েছে, পাই না বলেই তো যাচ্ছি! আপনার ছেলেকে বলে দেবেন, আমার খোঁজ করে লাভ হবে না।

সব কথা শুনেই মিনহাজ ক্লান্ত বিষণ্ণ সন্ধের অন্ধকারে একাকী বসে পড়ল। একটি পুরুষ হৃদয় নিঃশব্দে ভেঙে যায়, তার শব্দ কেউ শুনতে পায় না। একটি পুরুষ হৃদয় নিরশ্রু কেঁদে যায়, তার কান্না কেউ দেখতে পায় না। চারিদিকে অন্ধকার নেমে এল। মা পাশের ঘর থেকে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, বাবা, আলোটা জ্বালো, অনেক রাত হয়েছে!

মিনহাজ কোনো উত্তর দিতে পারল না। আলো-জ্বালাবার তার ইচ্ছেও হলো না। নারী যে এরকম বিশ্বাসঘাতিনী হতে পারে তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। একটা গরিব ঘরের সন্তান হলেও নীতি-নৈতিকতার বাহিরে কখনও সে যায়নি। পিতার মতোই নিজেও যেমন লোভ সম্বরণ করেছে, তেমনি পরিশ্রম করেই সৎ ভাবে জীবন যাপন করতে চেয়েছে। একটি জুনিয়র স্কুল থেকেই সে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিল। তারপর নেমে পড়ে মাঠের কাজে। দিদির মেয়ের বাড়ি গিয়েই আশিফাকে দেখেছিল। মুর্শিদাবাদ জেলার গঙ্গার ধার ঘেঁষে তাদের ওই গ্রামটি। অচেনা অজানা মানুষজন থাকলেও প্রাকৃতিক পরিবেশ তার ভালো লেগেছিল। ঘোড়া গাড়িতে উঠে যাচ্ছিল সবাই এদিক ওদিক। নদীতে নৌকাও বইছিল মাঝিরা। জেলেরা জাল ফেলে মাছও ধরছিল। গঙ্গার তীরের হাটেই সবজিপাতি বিক্রি হচ্ছিল তার সঙ্গে সাংসারিক নানা আসবাবপত্রও। সব দেখেশুনেই সে আকৃষ্ট হয়েছিল। ভেবেছিল এরকম এলাকার একটি মেয়েকে তার সংসারে নিয়ে গেলে সুখে-দুখে জীবন কাটাতে পারবে। কিন্তু তা হলো কই? এতদিন টেনেটুনে চললেও বড় কোনো ঝগড়াঝাঁটি সে করেনি। ঠিকমতো পোশাক-আশাক বা ভালো-মন্দ খাবার হয়তো সে জোটাতে পারেনি, কিন্তু শান্ত নিরীহ একটি জীবনের বেঁচে থাকার পরিবেশ তার ছিল। বাবা-মাও কখনো বউমার উপর খবরদারি করেনি। জোর করে কোনোদিন বলেওনি কিছু করার জন্য। তবুও বউটা এরকম করতে পারে? কিছুতেই ভাবতে পারছে না মিনহাজ। নিজেকেই সে দোষারোপ করে চলেছে, তলে তলে এসবের প্রস্তুতি সে একবারও টের পেল না? এতদিন একসঙ্গে থেকেও তাহলে কি ঠিকমতো তাকে সে বুঝতে চায়নি? দুই চোখ বেয়ে গড়াতে লাগল অশ্রু। মুখের চেহারাটা একবারে ম্লান হয়ে গেল। বুকটাও ধড়ফড় করতে লাগল। মনে পড়ল ইহানের মুখটাও। আব্বা আব্বা করে সে কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ত। ঘাড়ে চেপে সকালবেলায় ও বিকেলে সময় থাকলে সে একবার ঘুরে আসত। তার কোনো ক্ষতি হবে না তো? তার কথা ভাবতে ভাবতেই একবার ফুঁপিয়ে উঠল মিনহাজ। রাত বাড়তে লাগল। বাবা মা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কোনো সাড়া না পেয়ে নিঃশব্দে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ল সেদিন।

তিন.

চার মাস কী যন্ত্রণাই না ভোগ করেছে মিনহাজ। কাজকাম সবই প্রায় বন্ধ। বাবা রুকসারেরও মৃত্যু ঘটেছে। মা শয্যাশায়ী। আশিফাকে খুঁজে খুঁজে পেলেও ফিরিয়ে আনতে পারেনি। নিশ্চয়ই বাবার মৃত্যুর দিন সে খবর পেয়েছিল, কিন্তু এক ঝলক দেখতেও আসেনি। গ্রাম থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিমি দূরে একটি রেল স্টেশনের কাছে পরিত্যক্ত রেল কোয়ার্টারে হাবলুর পরিচিত কোনো গার্ডের পরামর্শে সে সেখানে থাকার বন্দোবস্ত করেছে। আশিফা তার স্ত্রী এই পরিচয়েই তারা স্বামী-স্ত্রীর মতো বসবাস করছে। মিনহাজ স্ত্রী হলেও কত অনুনয় বিনয় করেছে তার কাছে।

—ফিরে চলো আশিফা, তুমি যা করেছ তা করেছ, আমি সব মেনে নেব, আমার সন্তানকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না!

—আমি যাব না, আমি যাবার জন্য আসিনি। কে তোমার সন্তান? ইহান তো হাবলুকেই আব্বা বলে ডাকে। তার তো আব্বার অভাব নেই!

—তোমাকে বিশ্বাস করতাম আমি, তাই হাবলুর সঙ্গে পাঠাতাম ডাক্তারখানা। ওর দোকানও তোমাকে যেতে দিতাম। কিন্তু আমার কপালে যে এই লেখা ছিল তা জানতাম না।

—তুমি আর একটা বিয়ে করে নাও অনেক মেয়ে পাবে। আমার আশা ছেড়ে দাও। আমি অনেক সুখে আছি।

—তুমি যে আমার বিবাহিতা স্ত্রী! এখনও ডিভোর্স হয়নি। কী করে তুমি নিকা করতে পারলে?

—আমি ডিভোর্স দিয়ে দেব। ডিভোর্সের কাগজ তোমাকে পাঠিয়ে দেব।

—অমন করো না আশিফা! আমার সন্তান আর সন্তানের মা আমি কাউকেই ভুলতে পারছি না! আমি জানি, তুমি ভুল করেছ। তবু আমি সব ক্ষমা করে দিতে রাজি। তুমি ফিরে চলো। গাঁয়ের যে যা বলবে বলুক, আমি কিছুই মনে করব না।

আশিফা কোনো উত্তর দিতে পারল না। হাবলু মিনহাজকে জোর করে ধাক্কা মেরে দরজার বাহিরে বের করে দিল এবং দরজায় ছিটকিনি তুলে দিল। দীর্ঘক্ষণ ধুলোয় লুটিয়ে কাঁদতে লাগল মিনহাজ। সদ্য পিতাহারা মিনহাজ অসুস্থ মাকে বাড়িতে রেখে এসেছে। সকাল থেকেই কিছুই তার খাওয়া হয়নি। প্রায় পাগলের মতোই হয়ে গেছে সে। যে দেশে নারী অনেক সস্তা সেই দেশে একজন কুলটা রমণীর জন্য তার এত যন্ত্রণা কেন সে নিজেও জানে না। হয়তো সন্তানের মমতায় সে তাকেও পুনরায় ফিরিয়ে নিতে চাইছে। একজন সদ্য যুবকের একটি ছেলের মাকে নিয়ে পালানোর একটাই উদ্দেশ্য তাকে ভোগ করা, তার শরীরী মোহে আচ্ছন্ন হওয়া, সংসার করার জন্য নয়। একসময় এই শরীরও আর ভালো লাগবে না তখন তাকে পরিত্যাগ করতেই চাইবে এটাই জগতের নিয়ম। এই শরীরী ভোগের কোনো কর্তব্য বা নীতি-নৈতিকতা নেই। বিবাহ যেখানে একজন পুরুষকে লাইসেন্স দেয়, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক সেখানে লাইসেন্স বিহীন যানবাহনের মতো ইচ্ছেমতো তাকে ব্যবহার করা যায়। মিনহাজ জানে একসময় তাকে ফিরতেই হবে। তার কান্না, তার আর্তনাদ নিশ্চয়ই বৃথা যাবে না।

মিনহাজ বাড়ি ফিরে এসেছে। অসুস্থ মায়ের শয্যায় কেঁদে কেঁদে সবকিছু খুলে বলেছে। মা দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছে: হে আল্লাহু পরওয়ার দিগার, আমার ছেলেকে তুমি ধৈর্য দাও, সহ্য দাও, দুঃখ যন্ত্রণা থেকে মুক্ত করে দাও। যে এই কাজ করেছে তার উপযুক্ত বিচার তুমি করো।

আল্লাহর বিচার যে কখনও কখনও দেরিতেও হয় তা মিনহাজও জানে। তাই মায়ের পায়ে মাথা রেখেই সে দোয়া ভিক্ষা করেছে। সপ্তাহ দুয়েক যেতে না যেতেই ফিরে এসেছে আশিফা। না, এবার আর আনতে যেতে হয়নি, নিজে থেকেই এক রাতে এসে উপস্থিত হয়েছে। তাহলে কি হাবলু তাকে ছেড়ে দিয়েছে? সে কথা কি জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে মিনাজের? আপাতত থাক, কিছুই সে বলতে চায়নি। দুই হাত বাড়িয়ে ইহানকে কোলে তুলে নিয়ে শুধু চুমু খেয়েছে। আব্বা, তুমি কোথায় ছিলে? তুমি কেন আগে আসোনি? আমি যে কত কষ্ট পেলাম তোমার জন্য? তোমার দাদু আর বেঁচে নেই। কতবার দেখার জন্য ডাকছিল তারপর কেঁদে কেঁদে এই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেল।

ইহান শুধু আঙুল তুলে দেখাল হাবলুর বাড়ির দিকে। যেন সে বলতে চাইল, ওই আমাকে আসতে দেয়নি। ওই আমাকে জোর করে ধরে রেখেছিল।

আরেকবার অঝোর ধারায় কাঁদল মিনহাজ। নিস্তব্ধ ঘরে একটি শুধু কালি পড়া কাচের লণ্ঠন টিমটিম করে জ্বলছে। তেলচিটে ময়লা বিছানায় শুয়ে আছে মা। পাশের ঘরই তাদের শোবার ঘর। কথা বলতে বলতে ইহান ঘুমিয়ে পড়েছে। আশিফা মুখ খোলেনি। মিনহাজ কী বলবে তাকে শুধু ভেবেই চলেছে। হদস্পন্দনের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে পাশে থেকেই।মিনহাজ খুব আকাঙ্ক্ষিত হয়েই অপেক্ষা করছে আশিফা তাকে কাছে টেনে নিক, টেনে নিক নিজের বুকে। সে আজও ক্ষমা করার জন্য প্রস্তুত। শুধু একবার মুখে বলুক, আমি ভুল করেছি, ইহানের আব্বা, আমাকে ক্ষমা করে দাও!


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top