সৃজনী দত্তের কয়েকটি কবিতা

serene riverside

বছরের শেষ সপ্তাহ

এইসময় টা দারুন । 

ভীষণ সুন্দর এক কিশোরীর মতো, ভীষণ শান্ত কোনো এক রোদের মতন, 

ভীষণ  নরম এক তুলোর মতন 

আর কোনো এক অজানা পাহাড়ি নদীর মতো খরস্রোতা।  

এই সময় টা বড়ই মনোরম। হাতে থাকে মাত্র কয়েকটা দিন। বছরের শেষ সাত দিন। 

কিভাবে যাবে, কি পড়ে কাটাব, কি খাব, কি করবো – 

এই ভেবেই সময় চলে যায়। 

সারা বছরের পাওয়া না পাওয়ার দুঃখ এই সময়ে মনের মধ্যে জটলার সৃষ্টি করে। 

মন হিসাবি হয়ে উঠে। কিন্তু অদ্ভুত এক দোলাচলের সৃষ্টি হয় হৃদমাঝারে। 

পৌষ আসে পিঠে, নলেন গুড়ের সন্দেশ নিয়ে, 

আর তার সাথে নিয়ে আসে  মরীচিকার মতন এক চিলতে সুখ, 

এই সুখে পরের নতুন বছরের জন্য উন্মাদনা লুকিয়ে থাকে।

ক্রিসমাস পালিত হয়। বড়দিনের কেক কাটা হয়। চার্চ আলো দিয়ে সাজানো হয়। 

কলকাতার পার্ক স্ট্রীট, রাস্তায় ভিড় জমে। 

দোকানিরা পসার নিয়ে বসে। 

এই সময়টা যেন নদীতে ছোটো ডিঙ্গি নিয়ে ভেসে চলার মতন, 

উত্তেজনায় পরিপূর্ণ। 

শেষ সপ্তাহ দু হাত ভরে নতুনকে আপন করে নেয়, 

একটা ট্রানজিশনের মধ্যে চলে 

ঠিক অনেকটা গোধূলি বেলার মতো, 

আকাশে কমলা, লাল, গোলাপী, হলুদের মেলা বসে 

তার মাঝে নীলের চাদর উঁকি দেয়, 

তমসা ঘনায়, 

ঝিঁঝিঁ ডাকে, 

এই সময়টায় গাছ থেকে পাতা ঝরে যায়, 

সত্য-অসত্যের, ভালো-মন্দের দ্বন্দ্ব ভুলে মানুষ গানে মেতে উঠে, 

কিন্তু কোথাও যেনো বেদনা লুকিয়ে থাকে, বিদায়ের বেদনা, 

শরতে দূর্গা মাকে বিদায় জানানোর সময় যেমন সময়টা হয়ে থাকে 

তেমনি এই সময়টা; 

বড়লোকরা পিকনিকে যায়, 

বুড়িভোজ করে মহানন্দে 

আর এক দল গরীব বাচ্চারা ফ্যালফ্যাল করে ওদের দেখে। 

কারোর দামী পোশাক জোটে 

আর কারোর জোটেনা, 

বিজ্ঞাপনে কারোর মুখ দেখে যায় 

আর কারোর ঢাকেনা। 

এই সময়টা ভীষণ অন্যরকমের হয়, 

মেজাজ কিছুটা আলাদা 

আবার কিছুটা বিষন্ন।

শেষ সাত দিন – 

বছরের শেষ সপ্তাহ

আমাদের চন্দননগরে বইমেলা দিয়ে  শেষ হয়।

বছর আসে, বছর যায়। 

ধীরে ধীরে জীবন বার্ধ্যকের দিকে এগোয়। 

ইন্টারভিউ, কল্পনা ও নয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী

প্রায়ই দেখি একজন মুখের সামনে মাইক ধরে আছেন আর কিছু বলছেন, 

আবার কিছুটা বিরামও নিচ্ছেন।

প্রশ্ন করছেন, 

অপরকে বলার সুযোগ দিচ্ছেন,

এনারা হলেন সেই সকল মানুষ যারা অন্য মানুষের কাছে বিষয় বস্তু পৌঁছে দেন, সংবাদ পৌঁছে দেন, 

তথ্য পরিবেশন করেন, 

মনের মধ্যে থাকা অনেক জিজ্ঞাসার সমাধান ঘটান, 

আর যারা ইন্টারভিউ দেন তারা হলে ইন্টারভিউ দাতা 

এনারা জীবনের নানাবিধ সময়, সংগ্রাম, ভুল, সত্যি, অসত্য, দ্বন্দ্ব, সুখ আর দুঃখের কথা বলেন,

পোশাকি ভাষায় একে বলে ইন্টারভিউ। 

অনেক সময় ধরে চলে, 

আবার কখনও অল্পক্ষণ সময় চলে, 

কাদের ইন্টারভিউ নেওয়া হয়? 

এরা কারা? 

এনারা হলেন বিশেষ ব্যক্তিত্ব, 

নামকরা উজ্জ্বল তারকা, 

জীবনের আকাশে জ্বলজ্বল করছে এদের অস্তিত্ব। 

আপামর জনগণ এনাদের জীবন সম্পর্কে জানতে আগ্রহী।

সকলের জীবনে সংগ্রাম থাকে, 

সেই সংগ্রাম কে জানতে কিংবা তাঁরা সকল বাঁধা কে অতিক্রম করে কীকরে ওই জায়গায় পৌঁছালো 

তা জানতে কে না চায়, 

আমার পছন্দের তারকা হলেন নয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী, 

পেশায় অভিনেতা, 

বোম্বে তে থাকেন। 

শুনেছি অনেক কষ্টের পর সিনেমার আলো দেখতে পেয়েছিলেন।

ওনার কথা আমার মনে উৎসাহ দেয়, সৃষ্টি করে উদ্দীপনার, 

উনি খুব স্বাভাবিক ভাবে ডায়ালগ বলেন, 

সবাই হাততালি দেয়, 

সিনেমা হল উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে, 

সিটি দেয়, কোলাহল করে, 

সিনেমার যবনিকা পড়ে যায়। 

তবুও তাঁর আচরণের, ব্যক্তিত্বের রেশ থেকে যায়, 

এটি তাঁর অসাধারণত্ব 

আর সাধারণ তার বাহবা জানায়, 

তাঁর ইন্টারভিউ নেয়। 

একদিন ট্রেনে উঠেছি, 

জায়গা পাইনি, তাই দাঁড়িয়ে আছি, 

কি করব, সময় কিভাবে কাটাব 

এই মুহুর্তে মাথায় এলো 

আমার প্রিয় অভিনেতার কথা- 

সিদ্দিকির কথা, 

তাঁর একটা বই পড়তে শুরু করলাম 

আত্মজীবনী বলা যেতে পারে, 

বড়ই সাধারণ 

যেনো আমার জীবনের কথা বলে, 

আমাদের সকলের জীবনের, 

অনেকটা এক কিন্তু কোথাও গিয়ে আলাদা। 

তিনি স্বতন্ত্র, ভিড়ের থেকে পৃথক তার চাহুনি, ভঙ্গিমা- সবকিছু। 

বার বার মনে হয় 

একবার আমার সুযোগ আসুক 

তাঁর ইন্টারভিউ নেওয়ার, 

তার সাথে কথা বলার, 

অনেক কথা জমে আছে, 

লিস্ট অনেক লম্বা, 

কেটে ছেটে ছোট করতে হবে হয়তো 

কারণ সময় বড়ই মুল্যবান। 

কিন্তু দুর! 

আমি কে? 

আমার সুযোগ আসবে কেনো ? 

কেনই বা আমি ইন্টারভিউ নেবো? 

আমি তো মর্জিতে চলি, 

খালি আকাশ কুসুম কল্পনা আমার। 

কিন্তু ইন্টারভিউ মানে তো কথা বলা, 

ভাব বিনিময় করা, 

প্রশ্নের উত্তর দেওয়া। 

এদিকে আমি কত বৈদ্যুতিন চিঠির উত্তরের অপেক্ষায় থাকি, 

উত্তর আসেনা। 

কল্পনাবিলাসী মন নিয়ে আমি স্বপ্নে পারি দিই বোম্বের বিভিন্ন স্টুডিও, সিনেমার প্রোডাকশন হাউস, 

যদি তাঁর দেখা মেলে।

স্বপ্নের চাকা চলতে থাকুক 

আর আমি কল্পনা করতে থাকি 

কিভাবে একটা ফরমাল ইন্টারভিউ কে আমি আড্ডাতে পরিণত করতে পারি। 

যতই হোক, আমার তো হিরো, 

শিল্পী, জাদুকর আরো কত কিছু। 

একটা মায়াজাল তৈরি করেন 

যা আমার কল্পনাতে রং মেশায়। 

যাই ইন্টারভিউ এর প্রশ্নগুলি বানাই।

হাজার ব্যর্থতার পর

হাজার ব্যর্থতার পর আসে সফলতা

নিঃশব্দে আসে যেমন করে গাছে আসে পাতা 

শীতকালে গাছ ন্যাড়া হয়ে যাওয়ার পর 

মাটিতে ঠাঁই মেলে পাতাদের 

খসখস শব্দে চারপাশ ভরে উঠে 

অলিতে গলিতে শোনা যায় ব্যর্থতার কাহিনী 

শীতল বাতাস বহন করে ব্যর্থতার কান্না 

 চোখের পাতা পড়তে না পড়তেই বসন্ত আসে 

সাথে নিয়ে আসে দমকা হওয়া আর সুখের গন্ধওয়ালা গাছের পাতা।

সন্ধ্যে বেলায় দিগন্তে কে যেনো বাঁশি বাজায় 

বাঁশির আওয়াজ বলে দেয় 

কেউ অনেক চেষ্টার পর বাঁশিতে সুর তুলতে পেরেছে, সুর হয়ে গেছে গান 

এইভাবে হাজার চেষ্টার পর আসে সফলতা।

বেখেয়ালি আমি 

১. কাকভোরে  কে যেনো উঠে গলা ছেড়ে রেওয়াজ করছে, সাথে নিয়েছে বেখেয়ালি হারমোনিয়াম 

গলাতে নেই সুর, শব্দে নেই মায়া 

তবুও ভোরের নতুন আলোয় 

নতুন কিছু প্রচেষ্টা সে চালাচ্ছে। 

২. বাসনের শব্দে শর্মিলার ঘুম ভেঙে গেলো।

বাড়িতে কাজের লোক বাসন ঘষামাজা করছে

কাকগুলি পুরানো ভাত খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে।

৩. ট্র্যাকসুট পড়ে মালা বেরিয়ে পড়ল দৌড়াতে

আশঙ্কায় ভোগা বেখেয়ালি মন তার 

তাই মোবাইল সে সাথে নিয়েছে 

বিপদ ঘটলে যাতে বাড়িতে জানাতে পারে। 

আশঙ্কা কুড়ে কুড়ে গ্রাস করেছে তার মন। 

৪. উপরিউক্ত ঘটনাগুলি এমনি ছন্নছাড়া

সেরকমই আমি, বাউন্ডুলে ঘুড়ির মতো উড়ছি। 

ফোনের  অপেক্ষা 

এই যে অপেক্ষা এ বড় দুঃসহ ব্যাপার। 

প্রহর যেনো কাটতেই চায় না। 

অপেক্ষা হলো সময় কে টেনে টুনে লম্বা করা 

আর হিসেব মতো সময় কে বলা 

তোমার আর বেশি বেড়ে, লম্বা হয়ে কাজ নেই, এবার থামো। 

মনটা খুশ খুশ করে এই সময়টায় 

এই বুঝি ডাক এলো , 

এই বুঝি আমার পালা এলো ,

জীবন তো অপেক্ষার পর অপেক্ষায় গড়ে ওঠে 

এতে নতুনত্বের কি আছে 

শুধু সময় কে দোষ দিয়ে কি লাভ ? 

কপালের দোষ বলে ঝামেলা মেটালে তো আর জীবন যাবে না , 

লাগবে ধৈর্য্য, অধ্যাবসায়। 

কিন্তু কিসের জন্য ? 

জীবন থেকে কিছু পেতে লড়াই তো জারি রাখতেই হবে।

বেখেয়ালি মন আমার , 

মনে গুণ গুণ করে সুর বেজে উঠল – “কখন তোমার আসবে টেলিফোন …” 

শীতের সন্ধ্যে বেলা সহজে কাটতে চায়না 

পাড়ার মোড়ের চায়ের ঠেকে 

আগুন ধরানো হয়েছে 

চা-খোর মানুষরা জটলা করে আগুন পোহাচ্ছে , 

কারোর চোখে উৎকণ্ঠা, কারোর চোখে শীতের মায়া ও বিষণ্নতা, 

আমার শুধু অপেক্ষা 

একটি ফোন কলের। 

বড় জরুরি সেই ফোন। 

আসবে কিনা, 

জানা নেই। 

এ ডাক কিসের ডাক ? 

একটা অনামী পাখি শীতে ডাকছে,

বোধ হয় রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে। 

চারপাশের নিস্তব্ধতার মাঝে একটা গরম হওয়া গমগম করে রেখেছে ঘরটাকে, 

আমি এদিক ওদিক করে বেড়াচ্ছি,

মাঝে মাঝে ফোনের রিসিভার এর কাছে এসে বসে পড়ছি 

যদি ফোন আসে, 

আজ খবরের কাগজ সকাল থেকে ছুঁয়ে দেখা হয়নি 

দেশে কি ঘটেছে জানা হয়নি 

বা জানতে চাইনি 

কারণ মন বসছেনা কোনো কাজে। 

ফোন কি আসবে  ? 

নয় নয় করে বিরানব্বই বছর বয়স হলো আমার, 

ফোন এই এলো বলে। 

এবার বুঝি যাওয়ার পালা ? 

পৃথিবী, সময়  ও আমি 

ধরে নেওয়া হয় মুহুর্তেরা মুহূর্তের কাছে ঋনী,

সময় সময়ের কাছে চিরকৃতজ্ঞ, 

আর আমি ভগবানের কাছে 

কারণ তিনি দিয়েছেন দৃষ্টি, কন্ঠস্বর আর জীবন,

 পৃথিবীকে আপন করে নেওয়ার জন্য বাহু, 

পৃথিবী চষে বেড়ানোর জন্য পদযুগল, 

সব রকমের স্বাদ আস্বাদন করার জন্য একটা নরম জিভ

 যা থেকে সব সময় লালা গড়াচ্ছে , 

আগ্রাসী মন নিয়ে বেঁচে থাকা ,

 এটা খাবো, এটা দেখব 

এই করেই রোজনামচার চাকা ঘুরছে , 

নদীতে জোয়ারের জল বাড়ছে, 

শরীরে বাড়ছে মেদ, 

বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করছে নতুন নতুন তারা 

নাম দিচ্ছে যেমন তেমন , 

যাইহোক কিছু একটা হচ্ছে,

 কারণ পৃথিবী ঘুরছে 

আর মুহূর্ত পাল্টাচ্ছে। 

হাতঘড়ি, দেওয়াল ঘড়ি, ডিজিটাল ক্লিক সবই চলছে 

আপন গতিতে,

শুধু সব কিছু ছাপ রেখে যায় 

এটা বোঝাতে যে তাদের শরীরে প্রাণ আছে, 

নিস্তেজ নয় , 

পৃথিবী নিজেই একটা প্রাণী 

আর আমি অখ্যাত একটা জীব।

বর্তমান অতীতের কাছে ঋণী , 

কাল পরশুর কাছে ,

আর আমি ভগবানের কাছে ঋনী – 

ব্যাস , এইটুকু। 


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top