ফুসফুসের কান্না-ভেজা সকালে ঈষৎ রাগেরা প্ল্যাটফর্মে জটলা পাকাচ্ছে। ঈষৎ রাগের পাশে বসে আছে ক্রোধ। বাসনাকে ওরা প্ল্যাটফর্ম থেকেই ঝাড়ি মারছে। বাসনা উদাসীন। প্ল্যাটফর্মের পাশে যে কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া আছে, তাদেরকে অপলক দেখে যাচ্ছে। বিষাদ আর বিরহ প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে বসে দূরের নীল টিলার দিকে তাকিয়ে আছে। পকেট খালি, দূর থেকে প্রেমকে দেখে বিরহ একবার পকেটে হাত দিল। সেখানে দুটো আক্ষেপ আর পাঁচটা কয়েনের মতো পড়ে আছে উষ্ণ নৈঃশব্দ্য; এই দিয়ে প্রেমকে কিছুই দিতে পারবে না। বিষাদের দিকে একবার তাকাল বিরহ। বিষাদ চোখে জল নিয়ে ট্রেনের অপেক্ষায়।
সবাই অনিশ্চয় নগরীর প্ল্যাটফর্মে বসে আছে ট্রেন ধরবে বলে। কৃত্রিম মেধা প্ল্যাটফর্মের কোনায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতে খেতে পর্যবেক্ষণ করছিল সবাইকে। প্ল্যাটফর্মের উপরে ছোট দোকানঘরে খিদে মনোহারি ত্রিভুজ বিক্রি করছে। যৌনতা এসে চারটে মনোহারি ত্রিভুজ নেবার পর বচসা শুরু হয়েছে। যৌনতা আনন্দ দিয়ে কিনবে, কিন্তু খিদে তৃপ্তি ছাড়া কোনো কিছুই নেবে না।
—আপনি বলতে পারতেন আপনার কাছে তৃপ্তি কয়েন নেই। আমি বেচতাম না।
খিদেকে রেগে উঠতে দেখে যৌনতা একটু অপ্রতিভ হয়ে যায়। পকেট হাতড়ে দেখে দু-চারটে উদ্দীপনা রয়েছে। সৃষ্টির একটা বড় নোট রয়েছে ঠিকই, কিন্তু এই মুহূর্তে শুধু মনোহারি ত্রিভুজের জন্য ওটা ভাঙাতে ইচ্ছে করছে না। তৃপ্তির কয়েনের থেকে আনন্দের কয়েনের দাম তো অনেক বেশি হওয়া উচিত। অবশ্য এখানে দাম কম-বেশির ব্যাপার নেই। যার যেমন দরকার, সেরকম বিনিময়ে দিতে হয়। কিন্তু খিদে বহুত লাফরা করছে। মটকা গরম হয়ে যাচ্ছে। ক্রোধকে ডেকে মনে হচ্ছে ওকে দিয়ে দেওয়ায় দু’ঘা। তবু যৌনতা মিষ্টি হেসে বলল,
—আজকে আনন্দের কয়েন পেয়েছি দু’জন নতুন প্রেমিক-প্রেমিকার কাছ থেকে। তৃপ্তি কয়েন বহুদিন পাইনি। তোমাকে কীভাবে দেব?
—তোমার কাছে নোট নেই কোনো? আগে তো অনেক সৃষ্টি নোট রেখে দিতে। সেটা ভাঙালেই তো তৃপ্তি, আনন্দ, ভালোবাসা কতকিছু পাওয়া যেত।
—সৃষ্টির নোট এখন দুর্লভ। এখন সেই দিনকাল নেই। প্রচুর উদ্দীপনা কয়েন জমা হয়েছে, নতুন কারেন্সি ডার্ক ফ্যান্টাসিও কিছু আছে আমার কাছে, কিন্তু সেগুলো পকেটে নিয়ে ঘুরি না। কখন আবার লোভ এসে সেগুলো কেড়ে নিয়ে যায়!
—আজকাল আনন্দ নিলে সমস্যা হয়। ডাইজেস্ট হয় না। তৃপ্তি নিলে শরীরে লাগে, গায়ে-গতরে ঠিক থাকি। তা তোমার যখন আনন্দ কয়েনই আছে, তাই দাও বাপু। আর কথা বাড়িয়ে কাজ নেই।
এই সময় আবোল-তাবোল উস্কোখুস্কো চুল নিয়ে প্ল্যাটফর্মে ঢোকে। সবার কাছে হাত পেতে সময় ভিক্ষা করে। অনিশ্চয় প্ল্যাটফর্মে এক একজনের কাছে এক এক সময়।
সবাই আবোলতাবোলকে গাল দিয়ে সরিয়ে দেয়। সময়! সময় কী মাগনা নাকি! তাকে নিজের মতো করে মাপে-জোখে আনাতে জীবন পার হয়ে যায়! উনি সময় ভিক্ষা নেবেন। ফোট এখান থেকে। আবোলতাবোল রাগ করে না। হেসে সরে যায় তারপর ভায়োলিন বাজাতে শুরু করে। ভায়োলিনের সেই সুর ঢেউয়ের মতো, প্রলাপের মতো, স্বর্গের মৃদু সৌরভের মতো প্ল্যাটফর্মের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ে। ইচ্ছে প্ল্যাটফর্মের এক কোণে চটের ওপর বসে উকুন বাছছে আর মাঝে মাঝে আকুল দৃষ্টিতে আবোলতাবোলকে দেখছে। আবোলতাবোলের যিশুর মতো দাড়ি, ভায়োলিনের অপার্থিব সুর—সবকিছু এতই আকর্ষণীয় যে প্রেম, যৌনতা, ইচ্ছে সবাই নির্ণিমেষ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে।
প্রত্যেকে পকেট থেকে বের করে অশ্রু সময়। আবোলতাবোলের সামনে খোলা কৌটোয় অশ্রু সময় দিয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে ঈষৎ রাগ, ক্রোধ, বিরহ, বিষাদ, বাসনা। যৌনতার কাছে ঘোলা সময় দু-একটা পড়ে আছে। সজল সময় আছে, কিন্তু সেটুকু দিয়ে দিলে প্রয়োজনে পরে শূন্য শূন্য বিন্দু বিন্দু বিন্দুমাত্র সময় থাকবে। মিলনে সজল সময় প্রয়োজন হয় কখনো কখনো, যখন হোয়াইট ফ্যান্টাসি ডার্ক ফ্যান্টাসিতে প্রবেশ করে। প্রেম আর ইচ্ছের সময় নয়, ভিতর থেকে সমর্পণ আসছে, শুধু সমর্পণ। বিস্ময় সমস্ত কিছু দেখছে আর দেখছে রহস্য। রহস্যের সিক্সথ সেন্স বলছে অবিলম্বে একটা খুন হবে অথবা দুর্ঘটনা ঘটবে আপাত-শান্ত অনিশ্চয় প্ল্যাটফর্মে। গাছে গাছে সুখ নিশ্চয় পাখিরা উড়ে বেড়াচ্ছে, শুদ্ধ ও পবিত্র হত্যা অথবা ধিকিধিকি দুর্ঘটনার সূচনা নির্দেশ করে গাছে গাছে সুখ নিশ্চয় পাখিদের নৈঃশব্দ্যিক উড়ান।
অনেক দূর থেকে হুইসেলের মতো নাকি দীর্ঘশ্বাসের মতো কিছু বাজল। সবাই তৎপর হয়ে উঠল। কিন্তু ট্রেনকে দেখা গেল না।
শুধু অপেক্ষা পরীদের মতো সেজেগুজে এল।
সবাই যখন ব্যস্ত ছিল, সেই ব্যস্ততার মধ্যেই কেউ ঈষৎ রাগকে ছুরি বিদ্ধ করে পালিয়েছে। বিষাদ আর ক্রোধ দৌড়ে গেল আততায়ীর খোঁজে। কেউ কোথাও নেই। আবোলতাবোলের কোনো হেলদোল নেই।
সবাই মিলে ঘিরে আছে ঈষৎ রাগকে। বিষাদ আর ক্রোধ প্ল্যাটফর্মের বাইরে ওকে শুশ্রূষার কাছে নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় করছে, এমন সময় আয়ু এসে ওর এক পাশে দাঁড়াল আর এক পাশে দাঁড়াল মৃত্যু। আয়ু বলল, ‘ওর হত্যাকারীকে শাস্তি দিতে হবে।’
মৃত্যু বলল, ‘হত্যাকারী? কে বা কারা?’
মৃত্যুর প্রশ্নের পর সবাই ক্রোধের দিকে তাকাল। ঈষৎ রাগ ক্রোধের মার্কেট ধীরে ধীরে ক্যাপচার করছিল। ঈষৎ রাগের হালকা অশ্লীল ভঙ্গি মার্কেট নিচ্ছে ভালোভাবে। ক্রোধকে দিয়ে যে কাজগুলো আজকাল হয় না, ঈষৎ রাগ সেই কাজগুলো খুব ভালোভাবেই সামলাচ্ছিল। তাহলে কি ক্রোধ? ক্রোধই তো প্রথম শুশ্রূষার কাছে নিয়ে যেতে চাইছিল। ঝামেলা বাঁধাল মাঝখান থেকে আয়ু আর মৃত্যু। ঈষৎ রাগের স্ট্যাবড পেট থেকে ধূসর, গাঢ় ধূসর, ঈষৎ ধূসর শব্দ ক্রমাগত বের হয়ে যাচ্ছে। এইভাবে শব্দ বের হতে থাকলে ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়বে, মৃত্যুর চোখ অলরেডি চকচক করছে। সবাই একে একে ক্রোধের দিকে সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছে। ক্রোধ বিহ্বল। একই ঔরসজাত ভাইকে ও খুন করতে পারে—একথা সবাই ভাবছে কীভাবে!
রহস্যের ঠোঁটের কোণে চিলতে হাসি। গোয়েন্দাপ্রবরের মতো ভ্রু উত্থিত করে বলল—কোনো প্রমাণ নেই ক্রোধ খুন করেছে। আমি শুধু এটুকু বলব, ক্রোধ নিজে বা সুপারি কিলার দিয়ে খুন না করালেও ক্রোধকে সন্দেহের লিস্ট থেকে সরানো যাবে না। এই প্ল্যাটফর্মে যারা আছে, মৃত্যু আর আয়ু বাদে সবাই সন্দেহভাজন।
চারপাশে ভয় আর কান্নার বাতাবরণ। প্রেম শুধু চিৎকার করে বলছে, ‘এখনও তো প্রাণ আছে, শরীরের ভিতর থেকে সব শব্দ বের হয়ে যায়নি। শুশ্রূষার কাছে নিয়ে গেলে হয়তো এখনও বাঁচানো যেত। আপনারা সবাই খুনি। ওঁকে মরে যেতে দিচ্ছেন। আহা শব্দগুলো ফিকে হতে হতে কেমন ফেটে ফেটে যাচ্ছে।’ প্রেম ঈষৎ রাগের ঘাড়টা একটু উঁচু করে ধরে জল খাওয়াতে যায়। আয়ু হেরে যাচ্ছে, তবু প্রেমের পাশে দাঁড়িয়ে ঈষৎ রাগকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে যাচ্ছে। মৃত্যু পথ আটকে দাঁড়িয়ে—‘যাবার সময় ওর হয়ে গেছে, খুন, হত্যা, রোগ, যাই হোক ঈষৎ রাগকে যেতেই হবে।’
আয়ু ঠান্ডা চোখে মৃত্যুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এইসব থিওরি একদম কপচাবে না। অনেকগুলো সম্ভাবনা একত্রিত হয়ে নিশ্চিত কিছু ঘটে। তুমি ম্যানিপুলেট করে তোমার দিকে ঘটনাটা টেনে নিয়ে যাও। এটা ঠিক? তুমি আমাকে প্রান্তিক করে তুলে নিজেকে রাজা ভাবতে চাইছ। আমি তা হতে দেব না। আয়ু আর মৃত্যুর সমানে-সমানে লড়াইয়ের সুযোগ থাকা উচিত। সবসময় সময় হয়ে গেছে বলে ম্যানিপুলেশন ঠিক নয় মৃত্যু।’
(ক্রমশঃ)
দ্বন্দ্ব-অন্তর্দ্বন্দ্ব (পর্ব ২)



