তুলি একটি বিচিত্র বস্তু। এর চেহারা অনেকটা মানুষের আঙুলের মতো। একই রকম। এখানে তালুর সাথে আঙুল থাকে সেখানে তুলিতে নানা জন্তুর চুল। এখন অবশ্য কৃত্রিম চুলের আমদানি হয়েছে। পশু রক্ষা আইন, পশুকে রক্ষা কবচ দিয়েছে। সব সময় পশুর চুল পেতে তাকে হত্যা করতে হয়না। এটা একটা ভুল ধারণা। সে যাই হোক, তুলি কী কাজে লাগে? সাধারণত আঁকাআঁকির সুবিধার জন্য। এর বিশ্বব্যাপী নানা ঘরানা, নানা পদ্ধতি, নানা মান।।দামেও প্রচুর তফাত। জাপানে ১০ থেকে ৭৫ হাজারের ঘরে দাম ঘোরা ফেরা। শিল্পের দাম তার বা তাতে ব্যাবহার করার বস্তুর না না ঘরানা। আমার অত সার্মথ্য না থাকায় এক স্থানীয় চাযীর ডেরায় গেলাম।সেখানে নানা মাপের খড়ের ঝাঁটা পেলাম। অসাধারণ তার শৈল্পিক প্রকাশ। আসলে তুলির সাথে তার শ্রেণির সম্পর্ক আছে, এমনকি কারা তা সংগ্রহে রাখবে তাও। আমাদের মতো ছোটো লোকের তুলি দিয়ে ছোট্টো লোকের গল্প, বড় লোকরা কেন শুনবে? এটা জাতের সমস্যা। বড়লোক অট্টালিকায় থাকে। রাজ প্রাসাদে থাকে। ছবিকে তার মানানসই হওয়া প্রয়োজন। মাঝে মাঝে তাদের স্বাদ পাল্টাতে ইচ্ছে করতেই পারে!
শিল্পের নানা ঘরানার সাথে জড়িয়ে আছে এই তুলির ইতিহাস। কী দিয়ে বানানো হচ্ছে, তা দিয়ে কী আঁকা হবে, কেন আঁকা হবে, এসব প্রশ্নও জরুরি। আমার দুটো বিচিত্র তুলি আছে। একটা বাঁশের। শরীর বাঁশের তার তথাকথিত চুল গুলো সুক্ষ্ম বাঁশের, তার অপূর্ব ব্যাবহার। এছাড়াও তুলি নির্ধারণ করে দেয় কাজের প্রকাশ ভঙ্গি। সব তুলিতে যেমন সব কাজ হয়না তেমনি সবার জন্যও সব তুলি নয়। অর্থাৎ ছবির ঘরানা,ধারায় ঢুকতে গেলে প্রথমেই তুলির সাথে সখ্য তৈরি করতে হয়। তাই তুলিকে শরীরের অংশ বা বাড়তি ভাবার রেওয়াজ। পাঁচ আঙুলের পাশে ছয় আঙুল। তুলি নির্বাচন ঠিক করে দেয় আমি কোন গোলার্ধের মানুষ বা কী করতে চাই। পশ্চিম গোলার্ধের ভাষা আর পূর্বী গোলার্ধের ভাষা সম্পূর্ণ আলাদা শুধু নয় তার দর্শন তার জীবন বোধ তার যাপন বিপরীতধর্মী।
আমার দ্বিতীয় তুলি হাঁসের পালক থেকে বানানো। সে নিজেই একটি শিল্পকর্ম। তা দিয়ে যে আঁচড় উৎপন্ন হয় তা ওই পালকের মতো মোলায়েম, উড়ন্ত ও গতিশীল। আমার হাজারো তুলি আছে, তার কাহিনিও দীর্ঘ। প্রতিটির নিজস্ব পরিবার, ভুগোল ও ইতিহাস রোমহষর্ক। তা নিয়ে লিখতে বসলে শব্দের কোনো বাঁধ থাকবে না। আবার এদের ভুগোলও নির্দিষ্ট নয়। নিউইয়র্কে পেলাম এক গুচ্ছ চিনা কলম ও তুলি। আমি আমেরিকা, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড জার্মানী আফ্রিকা চিন জাপান মধ্য প্রাচ্য রাশিয়া ইত্যাদি আরও বহু দেশ ভ্রমণ কালে প্রচুর তুলি ও কলম সংগ্রহ করেছি। এঁকেওছি বহু। এরাই আমার শিক্ষক ও চালিকা শক্তি। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ব্রাশে দাম সাধারণত কম হয়। ঢালাও উৎপাদনের জন্য। এর পাশে পৃথিবীতে দশজন মহিলা আছেন যাঁরা বহু মূল্য তুলি নির্মাণে শুধু দক্ষ। তা দিয়ে সুক্ষাতিসুক্ষ শিল্প কর্ম হয়। আমার জিজ্ঞাসা তাঁরা কি আঁকতে পারেন? তুলি নির্মিত হয় ব্যাবহার করার জন্য, কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তার ফল কী হবে এ তো নির্মাণ কৌশলেই থাকা উচিত বা কাম্য।
আমি তুলি ব্যাবহারে বড়ই নির্মম। প্যাবলো পিকাসোর কোনো সহকারী ছিলো না। উনি নাকি পছন্দ করতেন না। নিজেই নিজের তুলি, কাজের পর পরিস্কার করে রাখতেন। নিজেই স্টুডিওর আলো নেভাতেন।
আমার স্বভার বেয়াড়া। আমি ছবির উপর যেমন অত্যাচার করি তেমন বেচারা তুলির উপর। আমি সবসময় যেকোনো কর্মশালায় নিজের তুলিই বহন করি। যেহেতু তার সাথে, আমার সখ্য বেশি।
আমার সংগ্রহে তিন চার ছয় মুখো না না ইতালিয় তুলি আছে। কোলকাতা থেকে একধরনের বিশেষ চুল জার্মানীতে সরবরাহ করা হয়, তা কোলকাতার নামে বিদেশে বিক্রি হয় এখনো।মাধ্যম তুলি নির্ধারণ করে। জলরঙ, তেলরঙ, গোয়াশ আজকের এক্রালিক। সবার জন্য অস্ত্র আলাদা। তুলির চলনও একটা বিষয়। পাখা তুলি বা ফ্যান ব্রাশ ছবিতে বিশেষ কারণে ব্যাবহার করা হয়। আমি তার খুব ভক্ত। এবং ঠিক তাকে বিপরীতে ব্যাবহার করি।
আমার ক্যালিগ্রাফীর কাজে এই পাখা তুলি না না গল্প বলে। খুব দ্রুত কাজ করা যায়। তুলির ডাঁটি সাধারণ ১০/১২ ইঞ্চি হয়। শরীর গোলচে। যার ফলে একে ক্রমাগত ঘোরানো সম্ভব হয়। তুলি ঘুরলে তুলি ভিন্ন ভাষা নির্মাণ করে। তা প্রচন্ড ডাযনামিক হয়। গতিশীল।
হুষেন সাহেবের তুলি ২/৩ ফুট লম্বা হতো।।বিশেষ বিশেষ প্রেমিকাকে উপহার দিতেন। এ শহরেও দিয়েছেন।
অবন ঠাকুর বিদেশি তুলি ব্যাবহার করতেন ও একই সাথে বিদেশের বিরুদ্ধে বেঙ্গল স্কুল প্রবর্তন করেন। আমার একটা ১২ ইঞ্চি চওড়া তুলি আছে। খুবই শক্তির প্রয়োজন পড়ে তার প্রয়োগে।
বেশ কিছু কোরীয় তুলি আছে তা নারকেল। দড়ি দিয়ে বোনা। অপুর্ব দেখতে। তুলির শরীর আমার কাছে রমণী শরীরের মতো উপলব্ধি হয়। তার শরীরে হাত রাখতে, তাকে মুখরিত করে তুলতে, তার ডগায় রঙ মাখাতে বড় প্রেম জাগে। শরীরে উত্তেজনা আসে। এমনিতেই চিত্র নির্মাণ একটা প্রবাহ, একটা যাপন, শ্বাস প্রশ্বাসের মতো একটা ক্রিয়া। যেন দুই লিঙ্গের মিলন।।তুলি একটা মাধ্যম ও বটে।।আমি অগ্রজ শিল্পী বিকাশ ভট্টাচার্যের মতো বলতে পারবো না, কাজ করার আগে তাকে প্রণাম করো সে আমার শরীরের অংশ। সেও আমি যে মূহুর্তে প্রণাম করলাম সে অগ্রজ হয়ে উঠলো। সহযোগী রইলো না। সখ্য হলো না। আমার সম্পর্ক যৌন সম্পর্ক। সে সন্তান উৎপাদন করে।
তুলি কথা বলতে চায়। কী কথা? শীতকাল কবে আসবে সূর্পণা? অথবা এতদিন কোথায় ছিলেন? আপনি বনলতা সেন। হয়ত হ্যাঁ হয়ত না। আমি যখন হাজারো তুলির দিকে হাত বাড়াই প্রেমিকার নগ্ন শরীর যেন আহ্বান করছে, তখন কে নির্বাচিত হবে? মূহুর্তে বিদ্যুৎ খেলে যায় চরাচরে আমি বিস্মিত হই। কোনো প্রশ্ন করিনা। স্বাভাবিক ছন্দে সে নির্মিত হয়ে ওঠে। এটাই আমার চিত্রের প্রাণ ভোমরা। এটাই গোড়ার কথা।



