সব‍্যসাচী রায়ের কয়েকটি কবিতা

দোতলার বারান্দায় কফির মগ হাতে ব্রিজ খেলছে চারজন মানুষ, শহুরে জীবনের প্রতিচ্ছবি

কলকাতার কফি দেশ

এ শহরও এক প্ল্যান্টেশন। কফির মতো কালো শ্রম ঢালছে প্রতিদিন।
বাগানের বদলে ফ্ল্যাট, পাহাড়ের বদলে ছাদ। দেখুন— এক মহিলা শিশুকে ঘুম পাড়ায়—
গড়িয়াহাটের উড়ালপুলের নিচে, চুলে ধুলো, মুখে মাছি।
ক্যামেরা ক্লিক করে। আমি লজ্জা পাই। তবু ফ্রেমটা রাখি।
উল্টোদিকে—
দোতলার বারান্দায় ব্রিজ খেলছে সাদা হাতওয়ালা লোকেরা,
তাদের মগে ফেনা, কথা— সভ্যতা।
তারা কফির গন্ধে বাঁচে, কফির দাসে মরে।
একটা ট্রাক নামছে আড়বাঁকা ঢালে, ভেতরে কফি, বাইরে শোক।
আর তার ভেতর চাপা পড়ে আছে অক্ষর— “দেশ”।
একটা শিশুর মুখ তবুও কফির ধোঁয়ায় দেখি, এখনও জানে না তিতকুটে মানে কী।

ভূতের গাড়ির পাড়া

ল্যাম্পপোস্টগুলো টিমটিম করে যেন ভুলে রাখা সিমকার্ড—রাতের সফ্‌টওয়্যার আপডেটে আটকে আছে।
পাশের ফ্ল্যাটের দাদা এত রিভার্স দেন মনে হয় গাড়িটা নিজের আবেগের সার্ভার খুঁজছে।
দু’ঘর পরের মহিলা শুকনো পাতার ব্যাগ তুলে রাখেন চিলেকোঠায়— ঋতুর ব্যাকআপ ফাইল, কঠিন শীতে রিস্টোর করা যাবে।
বৃদ্ধ কাকুর লনমাওয়ার—জং ধরা, স্বভাবত অফলাইন—হঠাৎ দেখলেই মনে হয় শনিবারের স্মৃতি এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে।
ক্রিম-রঙা বাড়িটার ভেতর বিধবা থাকেন একা; তার স্বামী ল্যাবে কাজ করতেন—পরমাণু আর নীরবতা—
দু’টোকেই একই বেকারে মেশাতেন। একবার মাধ্যাকর্ষণের জন্য গোলাপি বাথটব বানিয়েছিলেন— সম্পূর্ণ কনসেপ্টুয়াল আর্ট, কিন্তু মজুরখরচ ছিল একেবারে বাস্তব।
বাসস্টপে মেয়ে ঠান্ডা জ্যাকেটে শরীর সরিয়ে ভাবতে থাকে—বসনিয়ার সেই বাবা তাকে সাইকেল
শেখাতেন একটাও শব্দ না বলে। নীরবতাই তখন ছিল নুড়িপাথরের অফিসিয়াল ভাষা।
পুরোনো প্রতিবেশীরা একে একে লগ-আউট হয়ে যায়। দরজার ধারে দাঁড়াই— গুনি সেই হেডলাইটগুলো যারা আর সাবস্ক্রাইব করে না এই ঠিকানাকে। বাড়ি হয়তো একটা নিক্ষিপ্ত লনমাওয়ার— গলির ধারে পড়ে থাকা এক অনিচ্ছাকৃত উপহার, যার কোনো ইনস্টলেশন ম্যানুয়াল নেই। বাস এখন আমাদের ফ্ল্যাটের সামনে স্কিপ করে চলে।
এই বারান্দা, এই গ্রিল, এই চোখ-এড়ানো সম্ভাষণগুলো—সবই ব্যক্তিগত আর্কাইভ, যেখানে সংরক্ষিত থাকে অনুচ্চারিত বাক্য, অসম্পাদিত দুঃখ, এবং স্বাভাবিক জং। তবু রাতে ভাত ধুই, জলের মধ্যে আলো পড়ে—ছোট একটা ঈশ্বর চুপচাপ বসে আছে। আমি ডাকি—“আয়,” আর বাটি উত্তর দেয়—“আমি আছি, ঠিক যতটুকু লাগে।”

সত্যবাদী মেঘ

বিকেলের গ্রহনটায় পাখিরা ডানা গুটিয়ে নিল ওরিগামি-পশ্চাৎাপের মতো— আকাশ মুখে টেনে নিল এক সাদা ওড়না, এবং বলল: তোমার নাম ভুলে গেছি। তখনই মনে পড়ল— আমি বহুদিন সূর্যাস্ত ঘুমিয়ে কাটাচ্ছিলাম। জ্ঞান এল এমনভাবে যেন প্যারাস্যুট খুলছে না— আর আমি নিচে নেমে যাচ্ছি ধীর, অপরিহার্য সৌন্দর্যে।
মুখে তখনও রয়ে গেছে গ্রাফাইটের স্বাদ, পুরোনো পাঠ্যবইয়ের গুঁড়ো। মনে সাজানো ছিল যে-ক’টা জানা-যায় এমন অজানা, কিন্তু যে অদৃশ্যটা দরকার— পালিয়েছে লাইব্রেরি ছেড়ে, লাইট জ্বালিয়ে রেখে।
স্যাটেলাইট একবার চোখ টিপল আমার দাঁতের হাইজেনিস্টকে, যখন তিনি আমাকে ফ্লস করাচ্ছিলেন। গম্ভীর গলায় বললেন— খরার জন্য দায়ী লেজার-রশ্মি আর সরকারের মনোযোগহীনতা।
মাথা নাড়লাম —বলে উঠলাম না যে মেঘ-পরীক্ষার ঘরটা আমিই ডিজাইন করেছিলাম। আমরা দু’জনেই জানতাম—দু’দাঁতের ফাঁকটা আসলে অনুপস্থিত নয়, উচ্চারণ থেকে বাদ পড়া এক নিঃশব্দ স্বরবর্ণ মাত্র। তাই কিছু বললাম না। চাঁদকে তার ভুল রাগে গাইতে দিলাম, পাখিদের ঘুমোতে দিলাম।
এখন তুমি যদি জিজ্ঞেস করো—অরোরা তৈরি করে সূর্য, না নিজেদের আগুন? —কেবল কাঁধ ঝাঁকাব, আর ফোনে আবহাওয়ার অ্যাপ দেখব— আজ যদি সত্যবাদী হয় মেঘ।

চুলের মানচিত্র

বিকেল। দেরি। খুলে ফেলতে শুরু করি—ব্লেড, কাঁচি, আয়নার ঠোঁট-টানা হাসি। প্রতিটা চুল পড়ে যাওয়া মনে করায়— শহরের দিগন্তও আসলে পশ্চাৎাপের রঙে আঁকা গ্রাফ। তখন ত্বক হয়ে ওঠে মানচিত্র—যেখানে চিহ্নিত আছে যেগুলো কখনও হব না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, অনেক পুরোনো বিজলী বাতির নিচে।
আয়না সামনে অস্ত্র হাতে নারী— এক আদিম দৃশ্য। তবু আয়নাই হেসে ওঠে, অস্ত্রটা তারই দেওয়া হেয়ারস্টাইল। আকাশ নিজেকে গুটিয়ে নেয়—লাল চাঁদ, বকপক্ষী, নিয়নের ভোঁতা গুঞ্জন—সব একসঙ্গে রোল-প্লে করছে কোনো অনুশীলিত অপেরা।
ঘরের ভেতর কাঁধ-দেখানো ডকুমেন্টারি— অঙ্গভঙ্গির ইতিহাস, কান-দুলির পাশে কোন কোন চুল বাড়তি হয়ে ওঠে— ওর সবই নথিভুক্ত। ওর হাতে দিই ফেলে রাখা চুল—ভয়ের ক্ষুদ্র ক্লিপিংস, হাফ-ড্রিমের মিহি সুইপ— কোনো অন্য গল্পের শেষে দেওয়া নরম মর্মর।
ঘুম ভাঙে সকালে। একই দরজা, সীমান্তরেখা। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে সেই নারী— ভেতর আর বাইরে’র মাঝখানে, মন্তব্য আর নীরবতার মাঝখানে, একমাত্র সিসমিক অঞ্চল। কারণ সীমান্তরেখা কাউকে নিরাপদ রাখে না— শুধু জিজ্ঞেস করে: প্রস্তুত? আর উত্তর একই, সবসময়— জানি না। তবু এসে গেছি।

মার্কারির দাঁত

সকালকে খুলে ফেলো মুড়ির মতো—আলো-জড়ানো এক বরিতো। কফির স্বাদ আসে তোমার প্রথম সাইকেলপাত থেকে— সেই পড়ে যাওয়া, যেখানে স্পোকগুলো ব্লেডের মতো গান গেয়েছিল।
রিয়ার-ভিউতে হঠাৎ দেখা যায় এক গ্রহ—যার কক্ষপথে যেতে তোমার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে ছিল না। হাসে—মুখে ভাঙা দাঁত; পুরোটাই মার্কারি, মোলার-পর্যায় বিষাদ।
পায়ের পেশী মনে রাখে দোলনা, অ্যাসফল্টের পুরোনো দাগ। এখন অফিসে ব্রিফকেস—দাগ লুকোনো আছে আইডি-কার্ডের পিছনে। কেউ বলেছিল, বড় হওয়া নাকি সরলরৈখিক। হা।
কিউবিকলের কোণে হঠাৎ একটা পাশচালা ফুল— অর্ধেক পাপড়ি, অর্ধেক মেমো। শৈশব-বিশ্ব: ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায় মিটিং-নোটের ভাষায়।
রাতে মগে ভরো নিজের ভুলে যাওয়া মাটির একটু অংশ, ল্যাপটপের পাশে। জল দাও—ক্ষোভ মিশিয়ে, একটু আশাও। যদি কিছু গজায়— ফুলের ছলে।
একদিন পুরোপুরি ঘুরে আসবে নিজের সেই গ্রহের চারদিকে। অথবা, হয়তো স্রেফ গ্রহটা ছেড়ে চলে যাবে—আর হেসে বলবে“তোর ওই মার্কারি-দাঁত নিজের কাছেই রাখ।”


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top