গত শতাব্দীর এক ঝড়ের গল্প
ভাবা যায়, ছাব্বিশ বছর বয়সী এক ভদ্রমহিলা পায়ের ব্যথায় কাবু হয়ে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেন। সে তো অনেককেই দিতে হয়, এ আর নতুন কী? আছে, আছে— নতুনত্ব আছে। সে কথাই তো বলতে বসেছি আজ। তবে শুনুন, ঘরে বসে থাকতে থাকতে তিনি আটলান্টার এক লাইব্রেরির সব বই পড়ে শেষ করে ফেললেন। তারপর নতুন আর কিছু পড়ার নেই দেখে বিরক্ত হয়ে নিজেই একটা উপন্যাস লিখতে শুরু করে দিলেন। এতেই শেষ নয়, দশ বছর ধরে ওই একটা উপন্যাসই লিখে গেলেন তিনি। তারপর আরও আশ্চর্যের কথা হল, ওই একটি উপন্যাস লেখার পর সারা জীবনেও তিনি আর কোনো উপন্যাস লিখলেন না। আসলে প্রায় কিছুই আর লিখলেন না। তবু ওই একটিমাত্র উপন্যাসের দৌলতেই তিনি জগদ্বিখ্যাত হয়ে রইলেন। উপন্যাসটির নাম “গন উইথ দ্য উইন্ড” আর সেই লেখিকার নাম নিশ্চয়ই আর বলে দিতে হবে না! হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন— মার্গারেট মিচেল (Margaret Mitchell) মার্গারেট মিচেল যে বাড়িতে বসে উপন্যাসটা লিখেছিলেন, সেই বাড়ি আজও রয়েছে আটলান্টায়। প্রায় এক শতাব্দীতে বাড়ির বাইরের চেহারা কিছুটা বদলেছে, তবে বেশিরভাগটাই একই রকম আছে— এমনকি রংটাও।
১৯৩৬ সালে ম্যাকমিলান কোম্পানি ‘গন উইথ দ্য উইন্ড’ উপন্যাসটা প্রকাশ করার পরেই যেন একটা বিশাল ঝড় উঠেছিল। সেই ঝড়ে প্রকাশিত হওয়ার পর একদিনের মধ্যে বইটার পঞ্চাশ হাজার কপি জাস্ট উড়ে গিয়েছিল। ছ’মাসের মধ্যে দশ লক্ষ কপি ছাপাতে হয়েছিল। এক বছর পরেই, ১৯৩৭ সালে, পুলিৎজার পুরস্কার পেল উপন্যাসটা।
বই প্রকাশের ঠিক এক মাসের মাথায় ডেভিড সেলজনিক পঞ্চাশ হাজার ডলার দিয়ে বইটির মোশন পিকচার রাইট কিনে নিয়েছিলেন। Gone With the Wind নামের সেই সিনেমা রিলিজ হল ১৯৩৯ সালে। আর সেটাও হল ফাটাফাটি হিট। ১৯৪০ সালের অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড ফাংশানে ১৩টির মধ্যে ৮টা অস্কার ছিনিয়ে নিল Gone With the Wind। সেলজনিক কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আরও ৫০,০০০ ডলার স্বেচ্ছায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মার্গারেট মিচেলকে।
কী বলবেন একে? ভাগ্য? না প্রতিভা? নাকি দুটোই একসঙ্গে?
আমি কলেজে ওঠার পরপরই বইটা কিনেছিলাম নৈহাটি স্টেশনের তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মের হুইলার্স বুক স্টল থেকে। গোগ্রাসে পড়েছিলাম। ততদিনে তো সারা পৃথিবী জুড়ে বইটার তিরিশ মিলিয়ন কপি ছাপা হয়ে গেছে। তার বেশ কিছুদিন পর ডিভিডি কিনে দেখেছিলাম একই নামের সিনেমাটা। আটলান্টায় আসার পর এই সেদিনও আবার দেখলাম। ইউটিউবে আছে।
অরল্যান্ডো থেকে অমৃতা মুখার্জি জানিয়েছিলেন, মার্গারেট মিচেলের বাড়িটা এখনও আছে আটলান্টায়। শুনেই লাফিয়ে উঠেছিলাম। গুগল করে দেখলাম, বাড়িটা আমার বর্তমান বাসস্থান থেকে মাত্র পনেরো–কুড়ি মিনিটের দূরত্বে।
আমরা গিয়েছিলাম আটলান্টার মিডটাউনে সেই বাড়ি দেখতে। ৯৭৯, ক্রিসেন্ট অ্যাভিনিউর তিনতলা বাড়িটা পিচট্রি স্ট্রিট আর ক্রিসেন্ট অ্যাভিনিউর একেবারে মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯২৫ সালে জন মার্শকে বিয়ে করে পঁচিশ বছরের তরুণী মার্গারেট এসে উঠেছিলেন এই বাড়িতে। তার পরের বছরই পায়ের ব্যথায় কাবু হয়ে চাকরি ছেড়ে দিয়ে গৃহবন্দি হয়ে পড়েন। তারপর, যেমন বলছিলাম, একদিন নিজেই শুরু করেন একটা উপন্যাস লিখতে। তার পরের ঘটনা তো আজ ইতিহাস।
বাড়ির গ্রাউন্ড ফ্লোরের একটা অ্যাপার্টমেন্টে ভাড়া থাকতেন মার্গারেটরা। তখন খুব একটা মেইনটেইনড ছিল না এই বাড়ি। তাই ওঁরা মজা করে নিজেদের আস্তানাকে বলতেন “দ্য ডাম্প”। সাত বছর ছিলেন ওঁরা এই বাড়িতে। ততদিনে এক রেমিংটন টাইপরাইটারে টাইপ করে করে উপন্যাসের অনেকটাই লেখা হয়ে গেছে মার্গারেটের।
প্রতি রোমকূপে বেশ শিহরণ জাগছিল বাড়িটা দেখতে দেখতে। মনে হচ্ছিল, মার্গারেট হয়তো এই বারান্দায় কতবার এসে দাঁড়িয়েছেন। লিখতে লিখতে অন্যমনস্ক হয়ে ওই জানালাটা দিয়ে বাইরের রাস্তায় লোক চলাচল দেখেছেন। সামনের ছোট্ট লনে পা ডুবিয়ে হেঁটেছেন! এখন সবটাই কল্পনা, তবু কে জানে—একদিন হয়তো এমনটাই বাস্তব ছিল!
মার্গারেটের ব্যবহৃত জিনিসপত্র দিয়ে সাজিয়ে মিউজিয়াম করা হয়েছে ওঁর অ্যাপার্টমেন্টটাকে। কিন্তু এখন রেনোভেশন চলছে, তাই ২০২৪-এর জানুয়ারি পর্যন্ত বন্ধ আছে মিউজিয়াম।
আমরা অনেকটা সময় নিয়ে ঘুরে ঘুরে বাড়িটার ছবি তুলছিলাম। সেটা লক্ষ্য করেই সম্ভবত বাড়ির ভেতর থেকে অল্পবয়সী এক সুদর্শন যুবক বেরিয়ে এসে হাসিমুখে আমাদের দিকে তাকাল। ছেলেটি মিউজিয়ামের কর্মচারী। তার সঙ্গে গল্প করতে করতে অনেক তথ্য জানা গেল। ছেলেটি আবার আমাদের কর্তা-গিন্নি দুজনের একখানা ছবিও তুলে দিল। এখানকার লোকজনকে যত দেখছি, ততই ভালো লাগছে। সবাই ভীষণ ভদ্র, সহবতসম্পন্ন আর হাসিখুশি।


ক্রমশ



