দাগ

stain samit1

আলিপুর সেন্ট্রাল জেল— সন্ধ্যার আলো তখনো সম্পূর্ণ নামেনি, কিন্তু জেলের উঠোনে ঝুলে থাকা আয়রন ল্যাম্প গুলো যেন অনেক আগেই আত্মসমর্পণ করেছে। বাতাসে ধাতবের তিক্ত গন্ধ— পুরোনো বন্দুকের গুলির ধোঁয়ার সাথে কথা বলে মরচে। সেই গন্ধে মিশে আছে স্যাঁতস্যাঁতে দেওয়ালের নোনাধরা ভেজা, আর কোথাও যেন অল্প পুরোনো রক্তের অদ্ভুত নিঃশব্দ স্মৃতি।

বিকেল ৪:১৭।

লোহার বিশাল দরজাটা টনটন করে খুলে গেল। শব্দটা যেন কারও বুক-চূর্ণ করা আর্তনাদের মতো। ভেতরেই ছোট্ট জেরা কক্ষ; মাঝখানে একটা পুরোনো কাঠের টেবিল, দু’দিকের দুটো চেয়ার— একটা ফাইল ছড়িয়ে থাকা, স্যাঁতস্যাঁতে ঢাকা টেবিল।

চেয়ারে বসে আছে অনুষ্কা ঘোষ— চোখের কোণে জমে থাকা ক্লান্তির হিম, ভেতরে চাপা আগুনের নীরব ছায়া। মুখে মেক-আপ নেই, চোখে কোনো অলঙ্কার নয়— শুধু দুটি সম্পূর্ণ নিরাবরণ চোখের তীব্র সত্য, যা ভয়ও করতে পারে, আবার ভরসাও দিতে পারে।

ওপরে দাঁড়িয়ে আছে পুলিশ অফিসার অরিন্দম সেন— সদ্য কলকাতা থেকে সিআইডি-এ ট্রান্সফার। বয়স আনুমানিক তেত্রিশ-চৌত্রিশ, কালো শার্ট আর নির্লেপ ভঙ্গি, চোখে ঠান্ডা নিরপেক্ষতা। বাম হাতে কালো কভারের ছোট একটি নোটবুক— কোনো সাজসজ্জা নেই, কেবল তদন্তের ক্ষুধা।

চেয়ার টেনে বসে সে প্রথমেই নীচু স্বরে বলল—

“অনুষ্কা ঘোষ, তোমার বিরুদ্ধে আইপিসি ৩০২— স্বামীকে খুন। ১৪ই সেপ্টেম্বর রাত ২টা ৩২ মিনিট। তোমার বক্তব্য কী?”

অনুষ্কা খুব ধীরে, প্রায় অশ্রুতির মতো হাসল— ম্লান, শুষ্ক, ভাঙা।

“এতদিনে এই প্রশ্ন অনেকবার শুনেছি, অফিসার। সবাই ভেবেছে আমি নাটক করছি বা মিথ্যে বানাচ্ছি। আচ্ছা বলুন, আপনি বিশ্বাস করেন— একজন মানুষ সত্যিই তার সবচেয়ে আপন মানুষটাকেই শেষ করে দিতে পারে?”

অরিন্দমের মুখে কোনো ভাবান্তর নেই।

“হতে পারে। যখন ভালোবাসা ঘৃণায় বদলে যায়।”

অনুষ্কার কণ্ঠ ঠাণ্ডা, তীক্ষ্ণ, অথচ কাঁপা।

“আমাদের ঘরে ঘৃণা ছিল না। ছিল— ভয়। যা আপনারা কেউ দেখতে চাননি।”

অরিন্দম চোখ তুলে তাকাল।

জেরা শুরু হলো।

“ময়নাতদন্ত বলছে মাথায় ভারী বস্তু দিয়ে আঘাত।” অরিন্দম পড়ে শুনাল। “ঘরের মাঝখান থেকে রক্তের দাগ, তোমার শাড়িতে রক্ত, তোমার আঙুলের ছাপ। তুমি চাও আমি বিশ্বাস করি তুমি করনি?”

অনুষ্কার আঙুল শীতল টেবিলের উপর স্থির।

“আমার শাড়িতে রক্ত ছিল কারণ আমি ওকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম। আমি ওকে মারিনি। আপনি সত্য জানতে এসেছেন, তাই বলব— এই রাতের গল্পটা।”

“আমি গল্প শুনতে আসিনি, ক্লু খুঁজতে এসেছি”, বলল অরিন্দম। “তবু বলো।”

অনুষ্কার কণ্ঠ মৃদু অন্ধকারে ডুবে গেল।

“সেদিন রাতে ও খুব অস্থির ছিল। ফোনে কারও সাথে জোরে কথা বলছিল। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখেছিলাম— ওর হাত কাঁপছিল। ফোন রাখার সময় ও প্রায় থরথর করে বলেছি—‘তুমি থাকলে কেউ নিরাপদ নয়।’ তারপর ফোনটা ভেঙে ড্রয়ার-মধ্যে লুকিয়ে রাখল।”

“তোমাদের প্রচণ্ড ঝগড়া হয়েছিল”, প্রতিবেশীর রিপোর্টের কথা তুলল অরিন্দম।

“হয়েছিল, কারণ আমি জানতে চেয়েছিলাম কার সাথে ফোনে কথা বলছিল। কে ওকে এতটা আতঙ্কিত করে তুলেছিল।”

“কার?”

অনুষ্কার কণ্ঠ ফিসফিসে।

“আমি মাত্র একটাই নাম শুনেছিলাম— ‘বিশাল’। কেউ ফিসফিস করে বলছিল। আর পুলিশ যখন বাড়ি তল্লাশি করল— ফোন আর পাওয়া গেল না।”

অরিন্দম থেমে গেল, ঠোঁট শক্ত হলো।

“তোমার স্বামীর পরিচিতদের মধ্যে বিশাল নামে কেউ নেই।”

“কারণ সে বন্ধু ছিল না— শত্রু। ব্যবসার পার্টনার। দুমাস আগে বড় চুক্তিতে ভাঙন ঘটে। আর সেই দিনই ওদের মধ্যে ভয়ানক প্রসঙ্গ ওঠে— ধ্বংসের।”

ঘরের বাতাস ভারী হতে শুরু করল।

“রাত ২টার দিকে জল খেতে উঠেছিলাম।” অনুষ্কা বলল। “রান্নাঘরের আলো জ্বলছিল। টেবিলের পাশে লাইট জ্বলে। কেউ নেই। পর্দার নীচ দিয়ে একটা ছায়া সরে গেল বারান্দার দিক।”

“তুমি অ্যাম্বুলেন্স ডেকেছিলে?”

“হ্যাঁ। ১০০-এ ফোন করেছিলাম— ৩৮ সেকেন্ড নিঃশব্দ লাইন ছিল। সেই রেকর্ড আপনারা চাইলে পাবেন।”

অরিন্দম অবাক।

“ফোনটা ড্রয়ার থেকে বের করার জন্য তালা ভাঙা ছিল না। তাহলে কে চাবি ব্যবহার করেছিল?”

অনুষ্কার চোখ ধূসর কুয়াশার মতো অনড়।

“ঘটনার আগের দিন কমলা রঙের চাবির রিংটা হারিয়েছিলাম। বলেছিলাম— পুলিশ লিখল না। বলল— আমি নাটক করছি।”

এক মুহূর্তের নীরবতা।

দুজনেই মুখোমুখি, কিন্তু মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে মৃত্যুর অদৃশ্য ছায়া।

“বাইরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। কেউ ঢুকলে বেরোল কীভাবে?”

অনুষ্কার উত্তর ছিল প্রস্তুত, নিখুঁত।

“ফায়ার এস্কেপ দিয়ে। সেখানে দেয়ালে তাজা রক্তের দাগ ছিল। আমি দেখিয়েছিলাম— তারা বলেছিল মরচে।”

অরিন্দম সোজা হয়ে বসল।

তার চোখে প্রথমবার ভয়ের সূক্ষ্ম কাঁপুনি।

“ফায়ার এস্কেপে রক্ত পাওয়া গেলে পুরো মামলা বদলে যাবে।”

অনুষ্কার কণ্ঠ কঠিন।

“মানুষ নিজের স্বামীকে মেরে আবার সেই রক্তের দাগ দেখায়? আমি কি এতটা অভিনয় করতে পারি?”

অরিন্দম নরম গলায় জিজ্ঞেস করল—

“মরার সময় তুমি তার পাশে ছিলে?”

অনুষ্কার চোখ ভিজে উঠল।

“আমি ওর মাথা কোলে নিয়েছিলাম। শেষ মুহূর্তে ও বলেছিল—

‘বিশ্বাস কোরো না অনু— আমি এটা চাইনি।’

তারপর চোখ থমকে গেল।”

টেবিলের উপর ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু পড়ল।

“বলুন, মরার পাঁচ সেকেন্ড আগে মানুষ মিথ্যে বলে?”

অরিন্দমের ভিতর কিছু যেন ভেঙে গেল।

তার চোখে প্রথমবার সন্দেহের জায়গায় ঢুকল সত্যের আলো।

ধীরে উঠে দাঁড়াল অরিন্দম।

“আমি কেসটা আবার ওপেন করছি। ফায়ার এস্কেপ, মিসড কল, বিশাল— সব বের করব। তুমি যদি নির্দোষ হও— আমি তোমাকে মুক্ত করব।”

অনুষ্কা মাথা নত করল— একটা নিঃশব্দ প্রতিশ্রুতি টেবিলের ওপরে বসে রইল।

দরজার আড়ালে আবার টনটন শব্দ।

বাইরে হঠাৎ ঝড় উঠল— রোদ ঝাপসা হয়ে এল, বৃষ্টির গন্ধে বাতাস ভিজে গেল।

দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে অরিন্দম নিজের কাছেই বলল—

“রক্তের দাগ কখনও মুছে যায় না— মুছিয়ে দেওয়া হয়। আর আমি আজ ঠিক করেছি সেই মুছিয়ে ফেলা দাগ খুঁজে বের করব।”

বৃষ্টি জানলার কাঁচে বাজতে লাগল—

যেন অতীতের কণ্ঠস্বর।

এটাই গল্পের শেষ নয়—

এটাই শুরু।

তদন্ত মাত্র শুরু হয়েছে। আর প্রতিটি দাগই পথ দেখাবে।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top