গাওনা

aniruddha

২০০৮ সালে অনিরুদ্ধ যখন দিল্লি আইআইটির প্রফেসর গোয়েলের বায়োকেমিস্ট্রি রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে পিএইচডি করতে আসে তখন দিল্লি ছিল তার কাছে এক নতুন অজানা শহর। বালিগঞ্জ সাইন্স কলেজের আবহাওয়ার থেকে অনেক ভিন্ন এই দক্ষিণ দিল্লির হাউজ খাস এলাকার বোহেমিয়ান জীবনের সঙ্গে তার কোনো পরিচয় ছিল না। প্রথম দিকে অস্বস্তি হয়েছে প্রতি পদে পদে। একে তো তার বাঙালি হিন্দি এখানে একেবারে অচল, তার ওপর এলাকার বাস রুটগুলো তার দখলে ছিল না। কলেজের বন্ধু পরিতোষ তার দিল্লির মাসির বাড়ির কাছে ডিয়ার পার্ক রোড পাড়ায় এক সিন্ধী বুড়ির বাড়িতে অনিরুদ্ধর থাকার বন্দোবস্ত করে দেয়। কপাল গুণে দিল্লি মেট্রোর হলুদ লাইন তার ডেরার কাছে থাকায় কাজের জায়গায় যাতায়াতটা সহজ হয়ে যায়। প্রথম দিকে অনিরুদ্ধর চেনাজানা মানুষের সংখ্যা ছিল সীমিত, ল্যাবরেটরির জনা পাঁচেক ছেলেমেয়ে ছিল তার চেনা মুখ। তাদের মধ্যে দুজন, সুনীল পাণ্ডে আর রমেশ দ্বিবেদী আসত গুরগাঁও থেকে, দুজনেই ছিল বিবাহিত। নিজেদের জীবনের ঝামেলা নিয়ে দুজনাই ছিল ব্যস্ত, রিসার্চের কাজ সেরে বন্ধুদের সঙ্গে তারা কদাচিৎ আড্ডা মারত। বাকি তিনজন, রাজেন্দ্রপ্রসাদ, আনসারি আর করুণা ছিল অনিরুদ্ধর সঙ্গী।
শিলিগুড়ি থেকে অনিরুদ্ধ যখন কলকাতায় পড়তে চলে আসে, তখন শহরের হালচালের তার একটু অজানা হলেও নতুন শহরে ভাষা, খাওয়াদাওয়া বা সামাজিক চালচলন অনেকটাই তার রপ্ত ছিল। খুব তাড়াতাড়ি সে ভিড়ের বাসে ঠেলে উঠে পড়া, ক্যান্টিনে বন্ধুদের সঙ্গে চায়ের সঙ্গে আড্ডা মারা বা রাজনৈতিক তর্কে নিজের মতামত ঠেসে দেওয়াতে পোক্ত হয়ে যায়। কিন্তু মেয়েদের সঙ্গে কথা বলায় তার আড়ষ্টতা ছিল, বিশেষ করে তুই-তোকারি করে মেয়েদের সঙ্গে কথা সে কোনো দিনই বলতে পারেনি। সেই নিয়ে বন্ধুমহলে অনেকেই ঠাট্টা করেছে, অনিরুদ্ধ কান দেয়নি। তুলনামূলক ভাবে দিল্লি ছিল একেবারে আলাদা, স্থানীয় মানুষদের হালচালের সঙ্গে তার তেমন যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু অবাক কথা, প্রফেসর গোয়েলের বায়োকেমিস্ট্রি রিসার্চ ল্যাবরেটরি বছর ঘুরে যাওয়ার আগেই অনিরুদ্ধর রোজকার পৃথিবী হয়ে আসে। উত্তর ভারতের মানুষগুলো সোজাসুজি ভাবে মানুষের সঙ্গে মেশে, এদের মন খুলে কথা বলা আর হাসা অনিরুদ্ধর ভীষণ পছন্দ হয়ে যায়
সিন্ধী বুড়ির বাড়ি পুরনো দিনের ধাঁচে তৈরি। তিনতলা বাড়ি, নিচের তলায় এক কাপড়ের গুদাম। ঘরের দেওয়াল জুড়ে থান কাপড়ের ডাঁই, মালিক মনসুর আলি, চোখে সুর্মা লাগানো মধ্যবয়স্ক মানুষ, মুখে সর্বদা পান, আর সেই কারণে কথা অস্পষ্ট। অনিরুদ্ধকে সে বাঙালি বাবু বলে ডাকে। বাড়ির দোতলায় থাকেন আয়েঙ্গার দম্পতি, তাদের ছেলেমেয়ে বাইরে থাকে, বুড়ো-বুড়ি সারা দিন পুজো-আর্চা নিয়ে ব্যস্ত। বাড়ির দোতলা সর্বদা ধূপের গন্ধে ভারী, মাঝে মধ্যেই মিসেস আয়েঙ্গার অনিরুদ্ধকে প্রসাদ পাঠিয়ে দেন। তিনতলায় বাড়ির মালকিন মিসেস আদভানি, বিধবা বুড়ি সেই কবে তার পৈতৃক বাড়িতে এসে পড়েছিলেন, বাড়ির সবাই চলে গেছে, তিনি পড়ে আছেন এই তেত্রিশের বি রামকিঙ্কর লেনে। নিজের তিনটি ঘরের একটি তিনি ছেড়ে দিয়েছেন অনিরুদ্ধকে। ছেলেমেয়ে নেই, বুড়ি অনিরুদ্ধকে একজন সাথি পেয়েছেন। সকালে দুধে চা আর পরোটা বানিয়ে দেন তার ভাড়াটেকে। প্রথম দিন অনিরুদ্ধ আপত্তি করেছিল, মিসেস আদভানি তুড়ি মেরে সেই প্রতিবাদ উড়িয়ে দিয়ে মায়ের গলায় বকুনি দিয়েছিলেন, “মুঝে তো খানা হ্যায়, সাথ দেনেমে তুঝে ক্যায়া পরেশানি?” বাড়ির খাওয়া অনেক দিন জোটেনি, অনিরুদ্ধ তাই হেসে মেনে নেয় বুড়ির মিষ্টি শাসানি। দুপুরে আইআইটির ক্যান্টিন, আর রাতের বেলা অনিরুদ্ধর রুটি-তরকারি ঢাকা দেওয়া থাকে টেবিলে। বুড়ির আফিমের নেশা, সকাল সকাল সে বিছানার আশ্রয় নেয়।
এভাবেই এক বছরের মধ্যে অনিরুদ্ধ দিল্লির এক বাসিন্দা হয়ে গিয়েছিল। সেল ফোনে প্রথম দিকে কলকাতার বন্ধুদের ফোন আসত, ক্রমে তার সংখ্যা কমে এল। সপ্তাহে এক দিন শিলিগুড়িতে মার সঙ্গে কথা হয়, দাদা-বৌদি মাঝে মধ্যে যোগ দেয়। এ ছাড়া অনিরুদ্ধর দিনরাতের বেশি সময়টাই কাটত ল্যাবরেটরিতে। প্রথম বছর তার রিসার্চ প্রজেক্ট ঠিকমতো এগোয়নি, তারপর প্রফেসর গোয়েল করুণাকে অনিরুদ্ধর সঙ্গে জুড়ে দিলেন। করুণা সেল কালচারে পটু আর অনিরুদ্ধর কাজ তার বিভিন্ন নতুন ওষুধের সেই ক্যান্সার সেলের ওপর প্রয়োগ এবং তার প্রভাব মেপে দেখা। এই প্রজেক্টের মাধ্যমেই করুণা অনিরুদ্ধর খুব কাছে চলে এল। আস্তে আস্তে তারা একে অপরকে জানতে শুরু করল।
কাজের মধ্যে করুণা খুব কম অন্য কথা বলত। আর অনিরুদ্ধ ব্যস্ত থাকত ক্যান্সার সেল নিধনের মাত্রা নির্ধারণে। কথা হত দুপুরে ক্যান্টিনে। ঘুগনি আর পাউরুটি নিয়ে করুণা এসে বসত টেবিলে, সে নিরামিষাশী। অনিরুদ্ধর প্লেটে রুটি আর ডিমের ঝোল। রাজেন্দ্রপ্রসাদ প্রায়ই এসে বসত এক টেবিলে, আনসারি নমাজ পড়ে অনেক পরে এসে বসত তাদের সঙ্গে। ল্যাবরেটরি-জনিত টুকিটাকি কথাবার্তা, গোয়েলের অগোছালো স্টাইলে সর্বদা কাগজ খুঁজে না পাওয়া, ডিপার্টমেন্টের পলিটিক্স এসব ছাড়াও নিজেদের জীবনের গল্প হত তাদের টেবিলে।
রাজেন্দ্রপ্রসাদ কানপুরের কাছের এক গ্রামের ছেলে। তার বাড়িতে সেই প্রথম কলেজে গেছে। তার দুই দাদা জমিজমা দেখাশোনা করে। বুড়ি মা চোখে ভালো দেখতে পান না, রাজেন্দ্রপ্রসাদ প্রতি মাসে তার চোখের ড্রপ কিনে পাঠায়। সে স্বপ্ন দেখে এক দিন সে এক ওষুধের কোম্পানির ম্যানেজার হবে, তাই নিয়মিত টাই বেঁধে সে কাজে আসে। করুণা খোঁচা দেয়, “পহেলে জব তো মিলনে দে”, রাজেন্দ্রপ্রসাদ সহজসরল হাসি হাসে। আনসারি তার হিমাচল প্রদেশের গল্প বলে, সেখানে তার আব্বার ছাগলের খোঁয়াড় আছে, বাড়ির কেউ তেমন পড়াশোনা করেনি। আনসারি পাহাড়ি উপত্যকায় ছাগল চরাতে রাজি হয়নি বলে আব্বা তাকে দিনরাত বকা দিত। জ্বালানির হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য সে সোলানে চলে আসে। সেখানে এক রেডিও সারাইয়ের দোকানে কাজ করার সময় শহরের এক এনজিওর মহিলা তাকে স্কুলে ভর্তি করে দেয়। আনসারির পড়াশোনায় নেশা ধরে যায়, স্কুল শেষ করার পর সেই মহিলাই তাকে নিয়ে যায় কলেজে। “সিমরণ দিদিকো খুদা নে মিলা দিয়া” আনসারি কথায় কথায় সেই মহিলাকে স্মরণ করে, যিনি তাকে পড়াশোনার জগতে নিয়ে এসেছেন, যে মহিলা নিয়মিত তার খোঁজ নেন। “মজা কি বাত, মেরা ঘরওয়ালোনে ছোড় দিয়া থা মুঝে”, আনসারি হেসে বলে, “মগর সিমরণ দিদি নে ছোড়া নহি”।
প্রথম কয়েক মাসেই অনিরুদ্ধ লক্ষ করেছিল যে করুণা তার নিজের কথা প্রায় বলেই না। তার কথাবার্তা রোজকার খবর, চাকরির বাজার এসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। এক বৃষ্টির দিনে ক্যান্টিনের টেবিলে অনিরুদ্ধ আর করুণা ছাড়া কেউই আসেনি। রাজেন্দ্রপ্রসাদ গেছে গ্রামের বাড়িতে তার মাকে দেখতে, মার চোখের অবস্থা খারাপ। আনসারি দু’দিন ধরে সর্দিতে কাত। কৌতূহল চাপতে না পেরে অনিরুদ্ধ প্রসঙ্গ উত্থাপন করল। একটু ইতস্তত করে করুণা বলেই ফেলল তার বিয়ের কথা। বিহারের সিলজোড়ি গ্রামে তার ছ’বছর বয়সে পরিবারের জানাশোনা আর এক চাষির ছেলে আনন্দের সঙ্গে বিয়ে হয়। গ্রামাঞ্চলের প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী এই রকম বাল্যবিবাহ হয়ে থাকে। করুণা হেসে বলে যে সে আর আনন্দ একই মাঠে ঘুড়ি উড়িয়েছে, একই পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ে হুল্লোড় করেছে, গাছ থেকে পেয়ারা পাড়া নিয়ে ঝগড়া করেছে। তাই যখন তার সেই ছেলেবেলাকার বন্ধুর সঙ্গেই বিয়ে হয়, তার মজাই লেগেছিল। প্রথা অনুযায়ী বিয়ের পর মেয়ে বাপের বাড়িতেই থাকে। ছেলে চলে যায় তার নিজের জীবনে। যৌবনের প্রারম্ভে এক সময় গাওনা পালন করা হয় যখন মেয়ে প্রথম ছেলের বাড়ি যায়, তার সঙ্গ লাভ করে এবং তাদের বিবাহিত জীবন শুরু হয়।
অনিরুদ্ধ এই গাওনার কথা একটু জানত, কিন্তু কখনো এমন কারো সঙ্গে পরিচয় হয়নি যে এই প্রথার মধ্যে দিয়ে গেছে। পশ্চিমবঙ্গে গাওনার প্রচলন নেই। টেবিলের খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, অনিরুদ্ধ নিঃশব্দে এক যুবতির আত্মকথা শুনছে মন্ত্রমুগ্ধের মতো। করুণার গভীর কালো চোখে বিষাদের ছাপ, কপাল থেকে চুল সরিয়ে এর পর সে বলল, “মেরা গাওনা কভি হুই নেহি”, অনিরুদ্ধ চমকে উঠল। “লেকিন কিউং” সে চেঁচিয়ে ওঠে, এমন পরীর মতো দেখতে এই যুবতির গাওনা আর হয়ে ওঠেনি কেন এই ভেবে অনিরুদ্ধ ছটফট করে উঠতেই করুণা আলতো গলায় উত্তর দিল, “আনন্দ শহর চলা গিয়া, কভি ওয়াপস নহি আয়া”।
এক বৃষ্টির বিকেলে আইআইটির ক্যান্টিনের টেবিলে অনিরুদ্ধ বসে আছে এক অপরূপার মুখোমুখি, অবাক হয়ে সে শুনছে এক রূপকথা। বিহারের এক দূর গ্রামে এক ছোট্ট মেয়ের বিয়ে হয় তার বাল্যবন্ধুর সঙ্গে। খেলার ছলে তারা সেই বিয়ে করে, কোনো প্রথার নিয়ম তারা বোঝেনি। বাল্যবিবাহের এই প্রথা অনুযায়ী বয়স বাড়লে সেই মেয়ের প্রথম শ্বশুরবাড়ি যাওয়া নিয়ে গাওনার আয়োজন করা হয়। প্রায় বিয়ের মতোই ধুমধাম করে গাওনা পালন করার পর মেয়ে প্রথম শ্বশুরবাড়ি যায় আর তার বিবাহিত জীবন শুরু করে। প্রথম বিয়ের সময় বর-বউ দুজনেই ছোট বলে প্রধানত তাদের দুই পরিবারের মধ্যে বোঝাপড়ায় বিয়েটা হয়, কিন্তু এই প্রথায় এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই যে ছেলে বয়স বাড়লে সে তার সেই বউকে নিয়ে নিজের ঘরে তুলবে। এমনকি যুবক বয়সে সে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারে, তাতে আইনের কোনো বাধা নেই। অনিরুদ্ধর সামনে যে যুবতি বসে আছে সে তার স্বামী আনন্দ তাকে নিয়ে যাবে তার সঙ্গে এই আশায় ছিল অনেক বছর, কিন্তু আনন্দ আসেনি, করুণার গাওনা হয়নি।
অনিরুদ্ধ এই মুহূর্তে কী বলবে সে জানে না। করুণাই খেই ধরল। মৃদু হেসে বলল, “লড়কি হু না, মাননা পড়তা হ্যায়”। হাত তুলে দু’কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে সে শক্ত গলায় আবার তার গল্প শুরু করল। যখন তার বারো বছর বয়স, গ্রামের লোকেদের সমালোচনা অসহ্য হয়ে উঠল। সবার মতে করুণার কোনো গণ্ডগোল আছে। পরিবারের মুখ রক্ষার জন্য তার দাদা তাকে নিয়ে রাঁচিতে এক স্কুলে ভর্তি করে দিল, সেই করুণার বনবাসের শুরু। এর পর নিজের জেদে গ্রামের সেই ছোট্ট মেয়ে স্কুলের পড়া শেষ করে রাঁচির কলেজে চলে যায়, এক দূর সম্পর্কের মামা তার ভরণপোষণ করেন সেই সময়। আজ করুণা তার গাওনার অপেক্ষায় আর নেই। অনিরুদ্ধ আস্তে করে জানতে চাইল আনন্দ কোথায় গেছে সে জানে কিনা। করুণা ম্লান হেসে উত্তর দিল যে সে জানতেও চায় না, “লড়কি হু, বেচারি নহি”।
দিল্লি মেট্রোর হলুদ লাইনের ট্রেনে বসে অনিরুদ্ধ করুণার কথা ভাবছিল। সুদূর বিহারের গ্রামের সেই মেয়ে এখন আইআইটির বায়োকেমিস্ট্রি রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে ক্যান্সারের ওষুধের খোঁজে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। তার গাওনা হয়নি, বিবাহিত জীবন শুরুর আগেই এক বিশাল পূর্ণছেদ পড়ে গেছে তার জীবনে। যদিও বর্তমান ভারতবর্ষে করুণা অনায়াসেই আবার তার জীবন শুরু করতে পারত, অনিরুদ্ধ বুঝতে পারে যে ছেলেবেলার ওই প্রত্যাখ্যান করুণাকে ভীষণ ধাক্কা দিয়েছে, এখন সে বিবাহিত জীবন নিয়ে কিছু ভাবতে চায় না। তপস্বিনী এখন বিজ্ঞানের সাধনায় রত, সে নিজেকে গড়ে তুলছে এক জেদের বশে। সে শুধু বলে “লড়কি হু, বেচারি নহি”।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top