১
সকালে পথটায় আলো ছিল। এখন মিহি সন্ধে। এ রকমই একটা রাস্তার ধারে ঠিক পাঁচ দিনের মাথায় একজন উর্দি পরা লোক হঠাৎ তারস্বরে চিল্লাতে লাগল, ‘১৪ নম্বর বেডের বাড়ির লোক কে আছে—১৪ নম্বর?’
তিনবারের বার একটা লোক হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল। মেরুন কালারের প্যান্ট, উপরে স্ট্রাইপ দেওয়া সাদা গেঞ্জি ইস্ত্রি করে পরা, কাঁধে অফিস ব্যাগ। এসেই বলল—‘কী হয়েছে… কী হয়েছে! হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি—আমি ১৪ নম্বর।’
—রেণুবালা মুখার্জির বাড়ির লোক?
—হ্যাঁ।
—কে হয়?
—মা।
—পেশেন্ট সিরিয়াস। ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করুন।
ডাক্তার তেতলায়। ফিমেল ওয়ার্ডের সামনে। একটা কেবিনের ভেতর চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসে আছে। দরজার মুখে লম্বা লাইন। পরপর দাঁড়িয়ে আছে পেশেন্ট পার্টির বাড়ির লোকজন। এক-একজন করে দেখা করছে। কথা বলছে। সরে যাচ্ছে। কাউকে কোনো টেস্ট লিখলেই বাইরের একটা লোক সঙ্গে সঙ্গে টেনে আনছে তাকে। ফিশফিশিয়ে কী বলছে। নামধাম নিয়ে নিচ্ছে। লোকটিও লাইনে দাঁড়াল। চুপ করে ডাক্তারের সব কথা শুনল। তারপর হাঁটতে হাঁটতে পেশেন্টের বেডের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
পেশেন্ট কাতরাচ্ছে।
ছেলেটি ডাকল—মা?
পেশেন্ট তাকাল। কোনো ক্রমে একটা রোগা হাত ছেলেটার পায়ের কাছটা সাগ্রহে জড়িয়ে ধরল। সেই হাত! যা দিয়ে একদিন তাদের ভাত মেখে খাইয়েছে, দুষ্টুমিতে মেরেছে। জ্বর হলে সারারাত শিয়রে বসে জলপটি দিয়েছে। জড়িত স্বরে বলল—ডাক্তার… কী বলছিল। আজ খুব কষ্ট। কোথায় যেতে বলছে… একটু নিয়ে চল, অরু।
অরু উত্তর করল—আচ্ছা। এখন ঘুমাও।
—বুকের কাছটা কেমন ব্যথা-ব্যথা করছে।
—ঠিক আছে। একটু ঠাকুরের নাম করো।
—না, তাই বলছি, আজ খুব—
—ওঃ, শুনলাম তো। আর কতবার বলবে! একটু গলা উঠে গেল ছেলেটির। ঘড়ি দেখল। সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এল।
নামতে বেশি সময় লাগে না। কষ্ট হয় না। নেমেই সামনে সেই সরু পিচের রাস্তা। দু-ধারে সার সার দেবদারু গাছ। কালো কালো মাথা গুলোয় নিবিড় সন্ধ্যা নেমেছে। আষাঢ়ের শেষ। দিনগুলোয় এখন এক শ্রাবণ মেঘ ভেসে বেড়ায়। খানিক আগেই তা থেকে ঝিরঝির বৃষ্টি হয়েছে। পাতা গুলো বেয়ে টুপটাপ জল পড়ছে। মানুষের চোখের পাতাতেও কি এমন মেঘ করে? নিঃশব্দ জল গড়ায়?
লোকটা এখন হাঁটছে। দু-ধারে সন্ধে মাখা গাছ। হাঁটতে হাঁটতে এবার বাইরে এল। দেখল, গেটের বাইরে আরও দুটো লোক দাঁড়িয়ে আছে। তখন ছিল না। না, ছিল। একজন ছিল। আরেকজন এসে এখন দুজন হয়েছে। লোকটা গুটিগুটি পায়ে তাদের কাছে গেল। গোপন শলার মতো তিনটে মাথা এক হল।
ছোটো এক পাড়ায় থাকে। সেখানেই বাস করা নিত্য অধিকারী নামে এক মানুষ বলত—এরকম চুপিচুপি তিনমাথা ঠেকানো নাকি ভয়ের। ভালোবাসা খুন হয়ে যায়। তো বাকি দুজন তার দাদা। লোকটি ফিশফিশিয়ে তাদের জানাল, ‘ডাক্তার রেফার করেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কলকাতার কোনো বড়ো হাসপাতাল বা নার্সিংহোমে নিয়ে যেতে বলেছে। নইলে…’
তিনটে মাথা চুপ করে গেল।
আশেপাশে আরও অনেক লোকজন। একটা ছাউনির নীচে পরপর বিছানা পাতা। এরা রাতে থাকবে। দিনের পর দিন পালা করে থাকে। কেউ কেউ একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে মাটির ভাঁড়ে চা খাচ্ছে। একজন পেশেন্ট পার্টি হঠাৎই মাথা গলালেন, ‘কে আছেন, মা?’
—হ্যাঁ, বয়েস হয়েছে।’ মাঝেরজন উত্তর করল। মেজো ছেলে।
—কত?
—ওই, আশি-টাশি মতো।
—উরেব্বাবা, আশি!
অন্যজন বড়ো ছেলে। একগাল হাসল—নিন, সিগারেট খান। বলে এক প্যাকেট ফিল্টার-উলস এগিয়ে দিল। কলকাতার দিকেই এক সরকারি চাকরি করে। অফিস থেকে ফিরছে। কথাটার ফের খেই ধরল—হ্যাঁ, অবশ্যই। বেশিরভাগ বাঙালিই ইমপ্র্যাকটিক্যাল। বাস্তববাদী হতে শেখেনি। বয়েসটা তো মানতে হবে। মানুষ তো চিরকাল থাকে না, কী বলেন?
ছোটো ছেলে ফুট কাটল—ইয়ে, মা বলছিল আজ খুব—
মেজো ছেলে চোখ তুলে তাকাল। চোখে তাত। কোনো উত্তর করল না। মুখ ফিরিয়ে ফের লোকটার দিকে তাকিয়ে গদগদ হাসল, ‘তা আপনারও মা নাকি? অনেক বয়েস হয়েছে?’
—হ্যাঁ। অবস্থা ভালো না। গতকালও সবার সঙ্গে বসে টিভি দেখেছে। গল্প করেছে। খুব দাপুটে ছিল, জানেন! ছোটোবেলায় পড়া না-পারলে পাখার ডাঁট দিয়ে মারত। তারপর কোলে বসিয়ে ঘুম পাড়াত। সেই মা! সব কিছুর কি বয়েস হয়, বলুন?
তিনটে মাথা একটু সরে এল। ফের কাছাকাছি হল।
চোখে চোখ। নামা গলা।
বাকি দুজনও চাকরি করে। বিবাহিত। ছেলেমেয়ে আছে। বাড়ি এক, হাড়ি আলাদা। একই বাসায় আলাদা আলাদা বাস। বড়ো ছেলে হঠাৎ বাড়িতে বউকে ফোন করল—অ্যাই শোনো, টুকাই পড়ছে তো? অংক গুলো করেছে? কী, পারছে না? সে কী! ওঃ। আচ্ছা আচ্ছা, এই তো হয়ে গেছে। আসছি, এক্ষুনি আসছি। বলে মোবাইলটা অফ করতেই মেজো ছেলে মুখ খুলল—ইয়ে, ব্যাপারটা তাহলে—
ছোটো ছেলে জানাল—অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যাবে।
—কত লাগে-টাগে?
বড়ো ছেলে সিগারেট ধরাল। একমুখ ধোঁয়া ওড়াল। বলল—হ্যাঁ, নিশ্চয়ই! লাগলে তো নিতেই হবে। আমরা এতগুলো ভাই, প্রত্যেকেই এখন সক্ষম, মায়ের জন্য এটুকু করব না! করতে পারব না! তবে আগে চ না। দেখা যাক না গিয়ে। নাও তো লাগতে পারে। ব্যাপারটা আগে ভালো করে শুনি, বুঝি…
২
রাত দশটায় তীব্র ব্যথা বাড়ল।
নার্স ছুটে এল। ডাকল—ও মাসিমা? মাসিমা? খুব কষ্ট হচ্ছে?
মাসিমা চোখমুখ কুঁচকে তাকাল।
না, মেয়ে নেই। মোট তিন ছেলে। তিন জনই সরকারি চাকরি করে। একতলা ছিল। এখন দোতলা বাড়ি। উপর-নীচ মিলিয়ে মোটামুটি তিন জনের তিনটে ভাগ করে নেওয়া হয়েছে। মা থাকে একতলার একটা ছোটো পুরনো ঘরে। সব ক-টা ঘরেই এখন পাথর বসানো, পট্টি করা। বাড়িঘর কীসে কী ভালো হয়, কোন পাথর টেকসই, দরজার মাপ কতটা হবে, এ ব্যাপারে তিন ছেলেই ভারি পটু।
জানে, সকালে উঠেই এখন সুখ লাগে। নতুন নতুন, বাজারে আসা। তার জন্য আরও অর্থ চাই, আরও সঞ্চয়। এভাবেই ছোটো ছেলেটি এবার একটা ওয়াশিং মেশিন নেবে। বড়ো ছেলের অবশ্য ওসব না। সে শুধু জমিয়ে জমিয়ে পোস্ট অফিসে এমআইএস করে। তবে মেজো ছেলেটার টার্গেট, সামনের গ্রীষ্মে এ-সি’টা নিয়ে আসবে। সে জন্য ছাদ ঘেঁষে ওঠা বাবার লাগানো নিম গাছটা কেটে ফেলবে। কোনো ছায়া-টায়ার দরকার নেই। ঠা-ঠা রোদ এসে পড়বে ছাদটায়। শুকানো জামাকাপড়ের মতো সুখটাকে ভাঁজ করে তুলে রাখতে পারবে আলমারিতে।
তবে মা’র প্রতি যে কর্তব্যে কেউ অবহেলা করে, না। কেউ বলতে পারবে না। রোজই সবাই অফিস করে হাসপাতালে আসে। দেখা করে। বিকেলে চা দেয়। ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে। মা’কেও সান্ত্বনা দেয়। ভালো ভালো কথা বলে রোগ নিয়ে, জীবন নিয়ে। শুধু ব্যথার তারটি যেন নীরব। বাজে কি না বোঝা যায় না।
তো তারাই আজ আসবে। একটু বাদে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ঢুকবে। ডাক্তারের কথামতো মা-কে ছুটি করে কলকাতার কোনো ভালো হাসপাতাল বা নার্সিংহোমে নিয়ে যাবে। কিন্তু এখনও কেউ আসেনি। আসছে না। কী হল সবার! এত দেরি হচ্ছে কেন! দেখে নার্স এবার মুখের সামনে একটু ঝুঁকে পড়ে বলল, ‘ও মাসিমা… মাসিমা? শুনতে পাচ্ছেন?’
একটা গোঙানির শব্দ এল, ‘হুঁ?’
—বলছি, আপনার ছেলেরা তো এখনও কেউ এল না! কখন নিয়ে যাবে? মোবাইল নাম্বার জানেন?
মাসিমা হাত নাড়ল। ব্যস্ত হতে বারণ করল। কোনো ক্রমে জানাল—না না, কোনো চিন্তা করতে হবে না। তারা ঠিক ব্যবস্থা করতে গেছে। এখনই সব হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসবে।
৩
তো তারা তখন বাড়িতে। টিভি দেখছে।
খানিক আগে খেয়ে উঠেছে। এখন রাত এগারোটা পঞ্চাশ। টিভির সুইচটা বন্ধ করে তিনজনা একটা মিটিং-এ বসল।
মানে, মাকে যদি কলকাতার কোনো একটা বড়ো হাসপাতাল বা নার্সিংহোমে নিয়ে যেতেই হয় তবে প্রত্যেকের ভাগে কত টাকা করে পড়বে তার একটা হিসেব-নিকেশ। অনেক আলাপ-আলোচনার পর একটা সিদ্ধান্ত হল। মোটামুটি একটা মীমাংসায় আসা গেল। ঠিক হল, কে কত করে দেবে।
আর ঠিক এমন সময় কারেন্ট অফ!
ভয়ানক এক ঝড় উঠল বাইরে। নিকষ ঘন অন্ধকারের ভেতর জানলার সাদা পর্দাটা হঠাৎ ঢেউ খেলিয়ে ফুলে উঠল। ফরফর করে উড়তে লাগল। দেখে তিনজনই শিউরে উঠল। ঘাড় ফিরিয়ে দেখল, জানলায় কার ছায়া!
বড়ো ছেলে চমকে উঠে বলল, ‘মা তুমি!’
মা হাসল। বলল, ‘চলি রে। তোরা সবাই ভালো থাকিস।’
—সে কী, কোথায় যাচ্ছ তুমি!
—বহু দূর।
—মানে? কোথায়?
—দেখি।’ বলে ফের একটু হাসল। ঘরটার দিকে খানিক তাকিয়ে থাকল। তারপর উধাও হয়ে গেল জানলাটা থেকে।
হাওয়াটা ফের থেমে এল। জানলার পর্দাটা স্থির। বাড়ির মহিলারা ইনভার্টার চালিয়েছে। আর তার ঠিক দু-মিনিট বাদেই হাসপাতাল থেকে একটা ফোন এল, মা আর নেই। এইমাত্র চলে গেছে।
প্রত্যেকে চুপ। যার যার টাকাটা তুলে নিয়ে ফের লকারে রেখে দিল। তারপর কিছু দিন বাদে এক ছেলে তা ব্যাঙ্কে ডিপোজিট করতে গিয়ে শুনল, ‘নোটগুলো পালটে দিন। ভেজা।’



