বাবা গাঁড়াপোতা (তখন তো মাইনর) জয়েন করার পর আমাদেরকে নবদ্বীপ থেকে নিয়ে এলেন, ওই স্কুলের শিক্ষক সিদ্ধেশ্বর মুখার্জি সেখানকার জমিদার হাজরাপদ রায়চৌধুরীকে বললেন আমাদের থাকবার একটা ব্যবস্থা করে দিতে, তারপর থেকে আমাদের থাকাটি বর্ণময় এবং গল্পের মতন হয়ে উঠেছিল। সেই পর্যায়টি বলব কিন্তু সেসব আমার স্মৃতিতে নেই। সব একটু বড় হয়ে শুনেছি কিন্তু এখনো মনে হয় সবই আমার স্বচক্ষে দেখা —
হাজরাপদ রায়চৌধুরীর জমিদার বাড়িটি ছিল গোবরাপুরে। তখনও কিন্তু রাজন্য প্রথা বিলুপ্ত হয়নি, সবাই জমিদারকে মান্যিগণ্যি করেন। মা বলেছেন… বাবা বলেছেন… হাজরাপদ রায়চৌধুরীর দু’জন প্রহরী ছিলেন, তাদের একজনের নাম আয়ারাম আরেকজনের নাম গয়ারাম। জমিদার তার ফিটন গাড়িতে চেপে মাঝেমধ্যে বনগাঁ কোর্টে যেতেন খাজনা দিতে, তখন ওই আয়ারাম এবং গয়ারাম দু’পাশে থাকতো বড় বল্লম নিয়ে। আমার দাদারও মনে ছিল হাজরাপদ রায়চৌধুরীর কথা।
এই জমিদার বাড়ির গেট দিয়ে প্রবেশ করলেই দু’পাশে পরপর অনেকগুলো ঘর। জমিদার পরিবারের অনেকেই সংসার নিয়ে থাকে। জমিদার বাড়িটি সম্পূর্ণ পাঁচিল দিয়ে ঘেরা, বাড়ির পেছনদিকে একটা বড় দরজা, সেই দরজা খুললেই বাঁওড়, সেখানে বড়ঘাট। বাড়ির মেয়েরা সেই পেছনের পথ দিয়ে ঘাটে নামে। স্নানপর্ব সারে।
জমিদার হাজরাপদ রায়চৌধুরী বসে থাকেন একটা বড় লম্বা বারান্দায়, চেয়ারে। আমি তখন হামাগুড়ি বেশ ভালই দিতে পারি । মা বলেছে, গল্প করতে করতে — আর বলিস নে তুই সেই বয়সে যেন খুবই দুরন্ত ছিলি, খুব জোরে হামাগুড়ি দেওয়া শিখেছিস- তুর তুর করে বারান্দা ধরে এগোস- আমার ভয় করে তুই যদি বারান্দা থেকে নিচে পড়ে যাস, আবার ওদের ঘরে যদি চলে যাস! উনি তো আমাদের থাকতে দিয়েছেন কেবল।
থাকতে থাকতে জমিদারের পরিবারের অন্য সব মহিলাদের সঙ্গে মায়ের পরিচয় হয়ে যায়। তারা এত ভালো যে মাকে কখনোই আশ্রিতা বলে ভাবেন না। বাবাকে সিদ্ধেশ্বর কাকা এই বাড়িতে থাকবার বন্দোবস্ত করে দেওয়ার সময় জমিদার হাজরাপদ রায়চৌধুরীর বিরাট গম্ভীর গলায় বলেছিলেন — পন্ডিতমশাই আমার বাড়িতে থাকবেন এ খুব ভালো কথা কিন্তু উনি যেন আমাদের পরিবারের সঙ্গে নিজের মতন করে মিশেই থাকেন। আমার বাড়িতেও বৌমারা থাকে তাদের সঙ্গে যেন_ এইটুকু বলেই সেই দীর্ঘদেহী টুকটুকে ফর্সা সটান চেহারার হাজরাপদ রায়চৌধুরী হঠাৎ বলে উঠেছিলেন, পন্ডিতমশাই-এর স্ত্রীকে আমি মা বলেই ডাকবো অতএব মা যেন আমার পরিবারের মেয়েদের মহলে নিজের মতো করেই থাকেন।
–হচ্ছিল আমার হামাগুরির কথা। আমার দাদা মিন্টু আমার চেয়ে আট বছরের বড়। তাকে স্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছে। সে বাবার সঙ্গে স্কুলে যায় আমি থাকি মার কাছে।
এবার হলো কী মা যখন জমিদার পরিবারের মহিলাদের সঙ্গে স্নান করতে কাপড় চোপড় পরিষ্কার করতে বাঁওড়ে যেত তখন তো আমি আর যেতে পারি না সঙ্গে। এ তো এক সমস্যা! এই পরিস্থিতিতে হাজরাপদ রায় চৌধুরী মাকে ডেকে পাঠালেন।
হাজরাপদ রায়চৌধুরীর অমন ডাক শুনে মা এক হাত ঘোমটা টেনে জমিদারের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই জমিদার বললেন বাবার সামনে মেয়েকে অত বড় ঘোমটা দিতে হবে না। আর শুনুন আপনি যখন স্নান করতে যাবেন বা কোন কাজে ব্যস্ত থাকবেন তখন মলয়কে আমি গার্ড দেব। আপনার চিন্তা করতে হবে না ওর মাজায় একটা দড়ি বেঁধে আমার পেছনের এই জানালার শিকে বেঁধে দেবেন, আমি বসে থাকবো ও হামাগুড়ি দিয়ে ঘুরবে আমার সামনে।
এইরকম বলতে গিয়ে মা বলে, জানিস সে কি লজ্জা আমার! কিন্তু তার কথা উপেক্ষা করার সামর্থ্য তো নেই তাই আমি স্নান করতে গেলে কিংবা মহিষমর্দিনীতলায় কখনো গেলে তোকে ওর চেয়ারের পাশেই জানালার শিকে বেঁধে রাখতাম। উনি দেখে রাখতেন। তুই তো খুব ছটফটে দুষ্টু ছিলি। হামাগুড়ি দিয়ে ওর পা বেয়ে উঠে যেতিস, আমি এসে যখন তোকে নিতাম, উনি বলতেন গমগমে গলায়, না ও কোনো বিরক্ত করেনি মাঝে মাঝে পা ধরে ধুতি ধরে টান দেয় আর শুধু হামাগুড়ি দেয়। কিন্তু আমি ওকে ঠিকঠাক গার্ড দিই।
মা বলতো আমাকে, দ্যাখ আমরা তো সামান্য ক’টা টাকার মাইনর স্কুলের শিক্ষকের পরিবার, তা একজন জমিদার বুঝতেই দেন না যে আমরা তার কাছে অতি নগণ্য।
এই বুড়ো বয়সে এসে আজো আমি নিজের বুকে টোক্কা দিয়ে মাঝে মাঝে কাউকে বলি ওরে শোন শোন আমাকে এক সময় একজন সত্যিকারের জমিদার গার্ড দিতেন হা: হা: হা: …
আমরা একটা ঘরে থাকতাম তার পাশে পরপর অনেকগুলো ঘর ছিল মাকে নিজের পছন্দের একটা ঘর নিতে বলেছিলেন হাজরাপদ রায়চৌধুরী। মা সেইমতো পছন্দ করেছিল। কিন্তু আরো বড় ঘর মা পছন্দ করতে পারতো, মা তা নেয়নি ।
এক্ষুনি একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে- সেইটা বলি– জমিদার বাড়ির বউরা মেয়েরা কোনদিন বাইরে গিয়ে কোনো কাপড়জামা বা গয়নাগাঁটি কিনতে যেত না। জামা কাপড় নিয়ে ব্যবসাদাররা জমিদার বাড়িতে আসতো, মেয়েরা তখন পছন্দ করতেন-
একবার হয়েছে কি মা বলে জানিস এক লজ্জার কথা পূজোর সামনে সেই সময় একদিন জমিদার বাড়ির দরজা দিয়ে… সেই দরজায় কিন্তু সর্বদা পাহারায় থাকে পাহারাদার… জামা কাপড়ের লাট নিয়ে প্রবেশ করল কয়েকজন লোক। আসলে ওরা কাপড়ের ব্যবসায়ী, জমিদার ওদের ডেকে পাঠিয়েছেন। তাই দূর শহর থেকে ব্যবসাদাররা এসেছে। আমি তো প্রথম এসব দেখছি। ভেতরের এক বারান্দায় সেই সমস্ত কাপড় জামা নামিয়ে রাখল লোকগুলো। এবার মহিলারা সব বেরিয়ে এসে জড়ো হলেন। আমি তো আমার ঘর থেকে বের হইনি, তখন জমিদার হাজরাপদ রায়চৌধুরী উল্টো দিকের বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাঁক পাড়লেন তার মেয়েদের উদ্দেশ্যে, তোমরা কাপড়ের গাঁটগুলো মা-র ঘরের বারান্দায় নামাতে বলো-
— তাই হল আমার ঘরের বারান্দায় ব্যবসায়ীরা জামা কাপড়ের গাঁট নামালো। এবার বাড়ির মহিলারা এলেন-
তখন হাজরাপদ রায়চৌধুরী আমার ঘরের বারান্দায় এসে আমাকে বললেন, – মা আপনি আগে আপনার শাড়ি পছন্দ করবেন। আপনার পরে বাড়ির অন্য মেয়েরা পছন্দ করবে। এই কথা শুনে আমি তো লজ্জায় লাল হয়ে পড়লাম। কিন্তু বাড়ির অন্য মহিলারা হইহই করে তাদের খুশি জানালো কিন্তু আমি কি করে আবার শাড়ি পছন্দ করি। জমিদার বাড়ির মেয়েদের আগে এরপর হাজরাপদ বাবুর নির্দেশ মেনে শাড়ির সামনে বসে পড়লাম শাড়িতে হাত দিলাম তখন দেখি হাজরাপদবাবু আমার এই বারান্দায় চলে এসেছেন। এসে বলছেন, তার বাড়ির মহিলারাও শুনছেন, বলছেন, মা আপনি আপনার শাড়ি পছন্দ করে নেবেন। আমি জেনেছি আপনি খুব ভালো গান গাইতে পারেন। হাতের কাজ খুব ভালো, পন্ডিতমশাইও গান জানেন, তিনি কবিতা উপন্যাসও লেখেন। অতএব এই পরিবারের মহিলা হয়ে আপনার পছন্দ খারাপ হয়না যেন- সত্যিকারের খুব ভালো শাড়িই পছন্দ করবেন। আমি দেখতে চাই আপনার সুন্দর চয়েজ-
জানিস এরপর সত্যিই সবথেকে ভালো শাড়ি যার অনেক দাম সেইটেই আমি বেছে নিই। বাড়ির অন্যান্য সব মেয়ে হাতে তালি দিয়ে ওঠে। হাজরাপদ বাবু গম্ভীর হয়েই বলেন আপনার পছন্দ দেখে আমি খুশি হয়েছি মা।
এই জমিদার বাড়িতে থাকতেই আমার জন্মদিন আসে। আমার সে সব কথা স্বভাবতই মনে নেই। মার কাছেই শোনা– সেই জন্মদিনের দিন এই বাড়িতে এসেছেন এই পরিবারেরই একজন। তাঁর নাম নির্মল রায়চৌধুরী । তাঁরও জমিদারী আছে। নির্মল রায়চৌধুরী তখন একেবারে ইয়াং চমৎকার দেখতে। তিনি আমার মাকে বৌদি বলে সম্বোধন করেন, মাকে তিনি প্রায়ই বলেন, বৌদি এই গোবরাপুরের সংস্কৃতির উন্নতিতে যদি একটু লক্ষ্য দেন তবে খুব ভালো হয়। আসলে গোবরাপুরের শিল্প সংস্কৃতি ছিল খুবই উচ্চমার্গের। এই রায়চৌধুরী জমিদার বাড়ির পাশেই প্রধান সড়ক দিয়ে বাঁওড়ে নামার পথেই দু’জন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক বাস করতেন তাদের নিজস্ব বাড়িতে। একজন সুধীর মুখোপাধ্যায় অন্যজন সুধীন চট্টোপাধ্যায়। তাঁরা তাঁদের প্রয়োজনে কলকাতাতে থাকলেও মাঝে মাঝেই আসতেন। ‘শাপমোচন’ সিনেমার পরিচালক যেহেতু সুধীরবাবু, সেই হেতু এই গোবরাপুরের বিরাট আমবাগানে, পাহাড়ি সান্যাল অভিনয়ের কারণে ঝড়ের দৃশ্যে দৌড়েছেন। গান – ‘ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস আজকের হলো সাথী’ বিখ্যাত এই গানটির শুটিং গোবড়াপুরের আমবাগানেই হয়েছে। পরে আমরা ওই সিদ্ধেশ্বর কাকার বাড়ির সামনে সামান্য জমিতে ঘর তৈরি করে বসবাস করতে আরম্ভ করেছিলাম। সেটা ছিল আমাদের নিজস্ব বাড়ি, রায়চৌধুরীদের জমিদার বাড়ি ছেড়ে বাবা যখন এই ছোট্ট কুটিরে সংসার নিয়ে রওনা দিয়েছিলেন, তখন জমিদার হাজরাপদ রায়চৌধুরী বাবার দু’হাত জড়িয়ে রেখে বলেছিলেন, পন্ডিতমশাই নিজের বাড়িতে যাওয়া প্রত্যেকেরই আনন্দের তবে আজ মা মিন্টু মলয়কে নিয়ে চলে যাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে আমার বুকটা ফাঁকা হয়ে গেল।
তা যাকগে ওই যে বলছিলাম, আমার জন্মদিনে নির্মল রায়চৌধুরী এসে মার সঙ্গে কথা বলতে বলতে জেনে ফেললেন যে, আমার জন্মদিন, তখন খুবই সংকোচ ভরে পাঞ্জাবির ঝুল পকেট থেকে একটা দু-টাকার কয়েন হামাগুড়ি বয়সের আমার হাতে দিয়ে মাকে বলেছিলেন বৌদি আমি তো জানতাম না যে আজ মলয়ের জন্মদিন এই দু’টাকা ওর হাতে দিলাম। সামনের দিন ওকে কিছু দেবো। যথারীতি মা ও না-না করেছিল, মা পরে বলেছিল জানিস তো তখন দু-টাকার মূল্যও ছিল অনেক।
এই নির্মল রায়চৌধুরীকে আমি অনেক বড় বয়সে বনগাঁয় দেখেছি। একবারে শুভ্র ধুতি পাঞ্জাবি পরা, সুদীর্ঘ সুপুরুষ হাতে একটা ছড়ি। ইনি হাঁটছেন শহরে। বসছেন কোথাও কোথাও। মাঝে মাঝে আমাদের কলেজপাড়ার বাড়িতেও এসেছেন, মাকে বৌদি বলে ডেকেছেন। দেখলেই সবাই বুঝতে পারবে যে ইনি নিশ্চয়ই বিরাট একজন মানুষ। মা ডেকেছে ‘ঠাকুরপো’ বলে, বনগাঁ শহরের নির্মল রায়চৌধুরীকে মানুষজন এবং সমাজ পরিচালকগণও ভালোবাসতো ভক্তি করত।
হাজরাপদ রায়চৌধুরীর জমিদার বাড়িতে আমি একটু একটু করে বড় হচ্ছিলাম তার কিসসু মনে নেই মা নাকি বাবাকে সব সময় বলতো চলো অন্য কোনো জায়গায়, এরা আমাকে ভালোবাসেন তবু ভালো লাগে না, বাবা নাকি বলেছিল– কেন?… ওঁরা তো তোমাকে সম্মান করেন ভালবাসেন। মা বলেছিল, তবু প্রতিটি মুহূর্ত মনে হয় যে জমিদার বাড়িতে থাকি।
এইবার বাবা ঠিক করলো যে, কিছু একটা ব্যবস্থা করে চলে যাব, সেখানে হবে আমাদের নিজের একটা বাড়ি। তা সে হয়েছিল ঠিকই, পাশেই ছিল সেই বিখ্যাত প্রচন্ড বড় আমবাগান বড়পুকুর, সেই গভীর বড়পুকুরে ছিল প্রচুর পানিফল।
তারপর একদিন পাহাড়ি সান্যাল দৌড়েছেন যে আমবাগান দিয়ে, সেই আমবাগানে একদল বেদে আমাকে চুরি করে নিয়ে পালাচ্ছিল, আমার আট বছরের বড় দাদার বুদ্ধির জোরে আমি বেঁচে গিয়েছিলাম। ভাবি, যদি বেদেরা আমাকে ধরে নিয়ে যেত তাহলে আবর্ত-এ এই ‘ভাঙা দিনের ঢেলা’ কে লিখত?
ক্রমশ




ভাঙা দিনের ঢেলা’র অপেক্ষায় থাকি দাদা
একদম, বেদেরা আপনাকে ধরে নিয়ে গেলে আমরা বনগাঁ ও তার মাতৃতুল্য গ্রামগুলির মধ্যে যে মূল্যবান ইতিহাস লুকিয়ে আছে, তা জানতে পারতাম না। লেখাগুলি দিন দিন আরো আকর্ষণ করছে। আপনি লিখুন। ভাষাদিবসে একসঙ্গে তিনটি পর্ব শেষ করলাম । পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম। ভালো থাকবেন।