ভারতবর্ষকে নদীর দেশ বলা হয়। এই উপমহাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, ধর্ম, সাহিত্য এবং লোকজ স্মৃতির গভীরে প্রবাহিত হয়ে চলেছে অসংখ্য নদীর জল। সিন্ধু, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, নর্মদা, গোদাবরী, কৃষ্ণা, কাবেরী কিংবা মহানদী—প্রতিটি নদী শুধু একটি জলধারা নয়, একটি দীর্ঘ সভ্যতার বাহক। মানুষের বসতি গড়ে উঠেছে নদীর তীরে, কৃষি নির্ভর করেছে নদীর উপর, বাণিজ্যের পথ খুলে দিয়েছে নদী, এমনকি মানুষের কল্পনা ও বিশ্বাসেরও আশ্রয় হয়ে উঠেছে নদী। ভারতীয় সাহিত্য ও পুরাণে নদীকে মাতৃরূপে কল্পনা করা হয়েছে, কারণ মানুষ জানত, নদী না থাকলে জীবনও থাকবে না। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর ভারতবর্ষে দাঁড়িয়ে এই কথাগুলি যেন ক্রমশ অতীতের স্মৃতিচিহ্ন হয়ে উঠছে। নদী আজও আছে, কিন্তু নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বদলে গেছে। যে নদী একদিন জীবনের কেন্দ্র ছিল, আজ তা প্রশাসনিক নথিতে একটি সম্পদ, শিল্পপতির কাছে একটি কাঁচামাল, প্রকৌশলীর কাছে একটি প্রকল্প, আর শহুরে মানুষের কাছে একটি সেতুর নীচ দিয়ে বয়ে যাওয়া জলরেখা মাত্র। নদী যে একটি জীবন্ত পরিবেশতন্ত্র, একটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং একটি সামাজিক অস্তিত্ব, সেই উপলব্ধি ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।
এই হারিয়ে যাওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের সময়ের এক গভীর সংকট। ভারতের অসংখ্য নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। বহু নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কমে এসেছে। ভূগর্ভস্থ জলের স্তর ক্রমাগত নীচে নেমে যাচ্ছে। বর্ষার সময় হঠাৎ বন্যা, আবার গ্রীষ্মে চরম জলসংকট—এই দুই চরম অবস্থার মধ্যে দুলছে দেশের বৃহৎ অংশ। জলবায়ু পরিবর্তন, নির্বিচার বালিখনন, বনভূমি ধ্বংস, বাঁধ নির্মাণ, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, শিল্পদূষণ এবং নগরায়ণের সম্মিলিত অভিঘাতে ভারতের নদীগুলি এক ভয়াবহ অস্তিত্বসংকটের মুখোমুখি। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, এই সংকট আমাদের জনজীবনে তেমন কোনও আলোড়ন সৃষ্টি করছে না। সংবাদমাধ্যমে রাজনৈতিক সংঘর্ষ, ধর্মীয় মেরুকরণ, নির্বাচনী সমীকরণ কিংবা ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিতর্ক যতখানি জায়গা পায়, নদীর মৃত্যু ততখানি জায়গা পায় না। একটি নদী হারিয়ে গেলে কোনও জাতীয় শোকের পরিবেশ তৈরি হয় না। একটি জলাভূমি ভরাট হয়ে গেলে জনমানসে তার কোনও দীর্ঘস্থায়ী অভিঘাত দেখা যায় না। আমরা যেন ধরে নিয়েছি, নদী চিরকাল থাকবে, জল চিরকাল পাওয়া যাবে। এই আত্মপ্রবঞ্চনাই আজকের ভারতীয় সমাজের অন্যতম বড় বিপদ।
এখানেই নদীর প্রশ্নটি পরিবেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজনীতির প্রশ্ন হয়ে ওঠে। কারণ রাজনীতি কেবল নির্বাচন, সরকার বা ক্ষমতার লড়াই নয়; রাজনীতি হল অগ্রাধিকার নির্ধারণের প্রক্রিয়া। কোন বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হবে, কোন সম্পদ কার হাতে যাবে, কোন প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দ হবে এবং কোন সমস্যাকে উপেক্ষা করা হবে—এসবই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অংশ। যখন একটি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষা করার চেয়ে তার উপর একটি নতুন প্রকল্প নির্মাণ অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন সেটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। যখন একটি বনভূমিকে ধ্বংস করে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হয়, তখন সেটিও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। যখন একটি শহরের জলচাহিদা পূরণ করতে গিয়ে দূরবর্তী গ্রামের জলসম্পদ শুষে নেওয়া হয়, তখনও তার ভিতরে কাজ করে ক্ষমতার রাজনীতি। ফলে নদীর সংকটকে কেবল পরিবেশগত সংকট হিসেবে ব্যাখ্যা করলে তার পূর্ণ সত্য ধরা পড়ে না। এটি মূলত একটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং নৈতিক সংকট।
বাংলা ভাষায় নদী ও পরিবেশ নিয়ে সাম্প্রতিক যে কজন লেখক গভীরভাবে চিন্তা করেছেন, তাঁদের মধ্যে সুপ্রতিম কর্মকারের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর লেখায় নদীকে কোনও রোমান্টিক প্রকৃতিচিত্র হিসেবে দেখা হয় না; বরং নদী সেখানে সমাজ, রাষ্ট্র, উন্নয়ন এবং ক্ষমতার জটিল সম্পর্কের একটি কেন্দ্রীয় উপাদান। তিনি দেখিয়েছেন, নদীকে ধ্বংস করা মানে কেবল একটি জলধারাকে ধ্বংস করা নয়; এর অর্থ একটি অঞ্চলের স্মৃতি, সংস্কৃতি, জীবিকা এবং ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করা। তাঁর লেখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, নদীকে তিনি রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে দেখেন। কে জল পাবে, কে পাবে না; কোন অঞ্চলে সেচ পৌঁছবে, কোন অঞ্চল অনাবাদি হয়ে পড়বে; কোন শিল্পপ্রকল্পের জন্য নদীকে বেঁধে ফেলা হবে, আর কোন গ্রামকে জলহীনতার সঙ্গে লড়তে হবে—এসব প্রশ্নের মধ্যে নিহিত থাকে ক্ষমতার নির্মম বিন্যাস। নদী তাই প্রকৃতির বিষয় যেমন, তেমনই রাজনীতির বিষয়।
আধুনিক উন্নয়নের ধারণার মধ্যেও একটি বিপজ্জনক প্রবণতা কাজ করে। আমরা উন্নয়নকে প্রায়শই কংক্রিট, ইস্পাত, সেতু, উড়ালপুল, বহুতল ভবন কিংবা শিল্পাঞ্চলের পরিমাণ দিয়ে মাপতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। একটি নদী কতটা সুস্থ, একটি বন কতটা জীবন্ত, একটি জলাভূমি কতটা কার্যকর—এসব প্রশ্ন উন্নয়নের সূচকে খুব কমই স্থান পায়। ফলে নদী ধীরে ধীরে দৃশ্যমানতা হারায়। প্রথমে সে হারিয়ে যায় প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে, তারপর হারিয়ে যায় মানুষের স্মৃতি থেকে, এবং শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যায় বাস্তব ভূগোল থেকে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এই ঘটনাই আজ ঘটছে। বহু ছোট নদী ইতিমধ্যেই মানচিত্র থেকে মুছে গেছে। যে নদীগুলি একসময় স্থানীয় মানুষের জীবনরেখা ছিল, সেগুলি আজ হয় নর্দমায় পরিণত হয়েছে, নয়তো বছরের অধিকাংশ সময় শুকনো পড়ে থাকে। পশ্চিমবঙ্গে আদিগঙ্গা, সরস্বতী, বিদ্যাধরী কিংবা চূর্ণীর মতো নদীগুলি সংকটের মুখে। উত্তর ভারতে শিল্পদূষণে বিপর্যস্ত বহু নদী। দক্ষিণ ভারতে নদীর জল নিয়ে রাজ্যগুলির মধ্যে সংঘাত ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। মধ্যভারতে বৃহৎ বাঁধ প্রকল্প নদীর স্বাভাবিক চরিত্র বদলে দিয়েছে। কিন্তু এই সমস্ত সংকট সত্ত্বেও নদী আজও আমাদের রাজনৈতিক কল্পনার কেন্দ্রে জায়গা করে নিতে পারেনি।
এর কারণ সম্ভবত এই যে আমরা নদীকে আর জীবনের অংশ বলে অনুভব করি না। কল খুললেই জল আসবে—এই ধারণা আমাদের নদীর বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। শহুরে মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে নদী একটি দূরবর্তী বিষয়। কিন্তু এই দূরত্ব আসলে ভ্রম ছাড়া আর কিছু নয়। যে ভূগর্ভস্থ জল প্রতিদিন ব্যবহার করা হচ্ছে, তার সঙ্গে নদীর সম্পর্ক রয়েছে। যে কৃষক খাদ্য উৎপাদন করছেন, তাঁর জীবনের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক রয়েছে। যে বৃষ্টিপাত ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, তার সঙ্গেও নদী এবং জলচক্রের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। নদীর মৃত্যু কখনও শুধু নদীর মৃত্যু নয়; নদীর মৃত্যু মানে কৃষির সংকট, খাদ্য নিরাপত্তার সংকট, জীববৈচিত্র্যের সংকট, সামাজিক বৈষম্যের বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বসংকট। তবুও আমরা নীরব। এই নীরবতারও একটি রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে। যে সমাজ প্রতিনিয়ত পরিচয়ের নানা সংঘাতে বিভক্ত হয়ে পড়ে, সেখানে পরিবেশের প্রশ্ন ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে যায়। রাজনৈতিক দলগুলি জানে, একটি শুকিয়ে যাওয়া নদী হয়তো তত সহজে ভোটে পরিণত হবে না, কিন্তু ধর্মীয় উত্তেজনা বা পরিচয়ের রাজনীতি দ্রুত জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে নদী ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যায় জনপরিসরের আলোচনায়। আর কোনও কিছুকে ধ্বংস করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় সম্ভবত তাকে ভুলে যাওয়া। আমরা নদীকে ভুলে যাচ্ছি। আমরা জলকে ভুলে যাচ্ছি। আমরা ভুলে যাচ্ছি যে মানবসভ্যতার জন্ম হয়েছিল নদীর তীরে। এই বিস্মৃতির মধ্যেই এগিয়ে আসছে এমন এক পরিবেশগত বিপর্যয়, যা কোনও ধর্ম, ভাষা, জাতি কিংবা রাজনৈতিক সীমারেখা মানবে না। কারণ জল যখন ফুরিয়ে যায়, তখন সমস্ত পরিচয় শেষ পর্যন্ত তৃষ্ণার কাছেই আত্মসমর্পণ করে।
ভারতীয় নদীগুলির বর্তমান সংকটকে বুঝতে হলে কেবল বর্তমানের দিকে তাকালেই হবে না; ফিরে যেতে হবে ইতিহাসের দিকে। কারণ নদীর উপর মানুষের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার যে প্রকল্প আজ আমাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়, তার শিকড় বহু দূর অতীতে প্রোথিত। প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা নদীকেন্দ্রিক ছিল ঠিকই, কিন্তু সেই সম্পর্কের মধ্যে নিয়ন্ত্রণের চেয়ে সহাবস্থানের প্রবণতাই বেশি ছিল। নদীকে দেবীরূপে কল্পনা করার পেছনে কেবল ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল না; ছিল এক ধরনের সামাজিক উপলব্ধি যে নদী মানুষের সম্পত্তি নয়, বরং মানুষ নদীর বৃহত্তর পরিবেশতন্ত্রের একটি অংশমাত্র। নদী তার নিজের গতিতে চলবে, বর্ষায় ফুলে উঠবে, কোথাও ভাঙন ঘটাবে, কোথাও নতুন পলি জমাবে—এই স্বাভাবিক পরিবর্তনকে মানুষ জীবনের অংশ হিসেবেই গ্রহণ করত। নদীকে সম্পূর্ণভাবে বশীভূত করার প্রযুক্তি তখন ছিল না, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, সেই মানসিকতাও ছিল না।
ঔপনিবেশিক যুগে এই সম্পর্কের চরিত্র বদলাতে শুরু করে। ব্রিটিশ শাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল প্রকৃতিকে একটি অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখা। নদী, বন, খনিজ—সবকিছুকে তারা মূল্যায়ন করেছিল রাজস্ব, উৎপাদন এবং সাম্রাজ্যিক স্বার্থের নিরিখে। নদী আর কেবল নদী রইল না; তা হয়ে উঠল পরিবহনব্যবস্থা, সেচব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক অবকাঠামোর অংশ। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে শুরু করে ব্রিটিশ প্রশাসন বিভিন্ন অঞ্চলে খাল, ব্যারেজ এবং সেচপ্রকল্প নির্মাণে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশগত ভারসাম্যের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে শুরু করে। নদীকে প্রথমবারের মতো বৃহৎ প্রশাসনিক পরিকল্পনার আওতায় এনে পরিমাপ করা হল, শ্রেণিবদ্ধ করা হল, নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হল। প্রকৃতির উপর আধিপত্য বিস্তারকে আধুনিকতার লক্ষণ হিসেবে দেখা শুরু হল। এই সময় থেকেই নদীকে একটি ‘রিসোর্স’ বা সম্পদ হিসেবে ভাবার ধারণা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই শব্দটি আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ হলেও এর মধ্যে একটি গভীর রাজনৈতিক দর্শন লুকিয়ে আছে। যখন কোনও নদীকে সম্পদ বলা হয়, তখন তার অস্তিত্বের মূল্য নির্ধারিত হয় মানুষের প্রয়োজনের ভিত্তিতে। নদীর নিজের কোনও অধিকার থাকে না, তার নিজস্ব জীববৈচিত্র্য, তার নিজস্ব গতিশীলতা, তার নিজস্ব অস্তিত্বের মূল্য গুরুত্ব হারায়। নদীকে তখন বিচার করা হয় কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে, কত হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া যাবে, কত কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে—এই হিসাবের ভিত্তিতে। এই দৃষ্টিভঙ্গিই পরবর্তীকালে স্বাধীন ভারতের জলনীতিকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
স্বাধীনতার পর ভারত রাষ্ট্রের সামনে ছিল উন্নয়নের বিরাট চ্যালেঞ্জ। দারিদ্র্য, খাদ্যাভাব, শিল্পোন্নয়নের প্রয়োজন এবং দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে পরিকল্পনাকারীরা বৃহৎ প্রকল্পগুলিকে জাতীয় অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে দেখতে শুরু করেন। সেই সময়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে বাঁধ ছিল আধুনিক ভারতের মন্দির। এই ধারণার মধ্যে উন্নয়নের এক ধরনের রোমান্টিক স্বপ্ন কাজ করছিল। মনে করা হয়েছিল, নদীগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বন্যা রোধ করা যাবে, সেচের বিস্তার ঘটবে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়বে এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসবে। ফলে স্বাধীনতার পর একের পর এক বৃহৎ বাঁধ নির্মাণ শুরু হয়। ভাকরা-নাঙ্গাল, হিরাকুদ, টেহরি, সরদার সরোবর—এই সব প্রকল্পকে জাতীয় গর্বের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হতে থাকে যে উন্নয়নের এই ধারণার একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে। একটি বৃহৎ বাঁধ কেবল একটি কংক্রিটের কাঠামো নয়; তার পেছনে লুকিয়ে থাকে বিপুল পরিবেশগত ও সামাজিক মূল্য। হাজার হাজার মানুষকে উচ্ছেদ হতে হয়, বনভূমি ডুবে যায়, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়, মাছের প্রজননচক্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পলি পরিবহণের স্বাভাবিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। নদীকে যখন একাধিক বাঁধ ও ব্যারেজের মাধ্যমে খণ্ডিত করা হয়, তখন তার চরিত্রই বদলে যায়। নদী আর একটি জীবন্ত সত্তা থাকে না; তা পরিণত হয় একাধিক জলাধার এবং নিয়ন্ত্রিত প্রবাহের সমষ্টিতে। প্রকৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে এটি সাফল্য হতে পারে, কিন্তু পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকে এটি প্রায়শই একটি বিপর্যয়। এই প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বৃহৎ বাঁধের রাজনীতি সবসময় কেবল প্রযুক্তির রাজনীতি নয়; এটি ক্ষমতার রাজনীতি। যে সিদ্ধান্তে একটি নদীর গতিপথ বদলে দেওয়া হয়, সেই সিদ্ধান্ত সাধারণত নেয় রাষ্ট্র, বিশেষজ্ঞ এবং প্রশাসনিক কাঠামো। কিন্তু তার প্রভাব বহন করে স্থানীয় মানুষ, কৃষক, মৎস্যজীবী, আদিবাসী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তার ফলভোগের মধ্যে একটি গভীর অসমতা কাজ করে। যে মানুষ নদীর সঙ্গে প্রতিদিনের সম্পর্কের মধ্যে বেঁচে থাকে, তার মতামত অনেক সময়ই অগ্রাহ্য করা হয়। উন্নয়নের ভাষ্য নির্মিত হয় উপর থেকে, কিন্তু তার মূল্য দিতে হয় নীচের স্তরের মানুষকে। এই বৈপরীত্য স্বাধীনোত্তর ভারতের জল-রাজনীতির অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য। নদীকে নিয়ন্ত্রণ করার এই প্রবণতা শুধু বাঁধ নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গত কয়েক দশকে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প, নদী খনন, নদীতীর উন্নয়ন, নগর পুনর্গঠন এবং শিল্পপ্রকল্পের মাধ্যমে নদীর উপর মানুষের হস্তক্ষেপ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। নদীকে একটি জটিল পরিবেশতন্ত্র হিসেবে না দেখে একটি প্রকৌশলগত সমস্যার সমাধানযোগ্য বস্তু হিসেবে দেখার প্রবণতা এখনও প্রবল। এর ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, ঋতুভিত্তিক পরিবর্তন এবং পরিবেশগত প্রয়োজনকে প্রায়শই উপেক্ষা করা হয়। অথচ আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞান আমাদের স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে যে একটি নদীর অস্তিত্ব কেবল তার জলের পরিমাণের উপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে তার প্রবাহের ছন্দ, তার পলিবহন ক্ষমতা, তার জলাভূমি, তার উপনদী, তার আশপাশের বনভূমি এবং তার জীববৈচিত্র্যের উপর।
সমস্যাটি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন জলকে বাজারের যুক্তির মধ্যে আনা হয়। পৃথিবীর বহু দেশের মতো ভারতেও জল ধীরে ধীরে একটি অর্থনৈতিক পণ্যে পরিণত হচ্ছে। বোতলজাত পানীয় জল, বেসরকারি জল সরবরাহ, শিল্পক্ষেত্রে বিপুল জলব্যবহার এবং ভূগর্ভস্থ জলের বাণিজ্যিক শোষণ—এসবের মধ্যে একটি নতুন ধরনের জল-রাজনীতি কাজ করছে। যে জল একসময় একটি সাধারণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হত, তা ক্রমশ ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে পড়ছে। ফলে জলসংকট কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, সামাজিক ন্যায়বিচারের সমস্যাও হয়ে উঠছে। যে মানুষ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী, সে জল কিনতে পারে; কিন্তু দরিদ্র মানুষকে নির্ভর করতে হয় ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসা প্রাকৃতিক উৎসের উপর।
এই প্রেক্ষাপটে সুপ্রতিম কর্মকারের মতো লেখকদের গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করা যায়। কারণ তাঁরা আমাদের মনে করিয়ে দেন যে নদীর প্রশ্ন কেবল প্রকৃতির প্রশ্ন নয়; এটি স্মৃতির প্রশ্ন, ইতিহাসের প্রশ্ন, ক্ষমতার প্রশ্ন এবং ভবিষ্যতের প্রশ্ন। নদীকে বাঁচানোর লড়াই আসলে মানুষের নিজের অস্তিত্বকে বাঁচানোর লড়াই। কিন্তু সেই লড়াই শুরু হওয়ার আগে প্রয়োজন নদীকে নতুন করে দেখা, নদীকে কেবল একটি সম্পদ নয়, একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে বোঝা। আধুনিকতার দীর্ঘ ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে নদীকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়; এখন হয়তো আমাদের নতুন করে শিখতে হবে কীভাবে নদীর সঙ্গে সহাবস্থান করতে হয়। কারণ ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে প্রকৃতির উপর মানুষের চূড়ান্ত বিজয়ের স্বপ্ন আসলে এক গভীর ভ্রম। নদীকে জোর করে বশীভূত করা যায়, তার গতিপথ বদলানো যায়, তাকে বাঁধ দিয়ে আটকে রাখা যায়, কিন্তু তার পরিবেশগত প্রতিক্রিয়া থেকে শেষ পর্যন্ত কেউই মুক্ত থাকতে পারে না। আজকের জলসংকট সেই সত্যকেই ক্রমশ নগ্ন করে তুলছে। এই সমগ্র আলোচনার প্রেক্ষাপটে সুপ্রতিম কর্মকার এবং ডেভিড অ্যাটেনবরো-র কাজ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভৌগোলিক অবস্থান, ভাষা, সংস্কৃতি এবং কাজের পরিসর সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও তাঁদের ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি অভিন্ন উদ্বেগ—মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্ককে ভুলে যাচ্ছে, এবং সেই বিস্মৃতির ফলস্বরূপ পৃথিবী দ্রুত এক পরিবেশগত সংকটের দিকে এগিয়ে চলেছে। তবে এই দুই চিন্তকের কাজের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রয়েছে। অ্যাটেনবরো মূলত বিশ্বপরিসরে জীববৈচিত্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ ধ্বংসের দীর্ঘ ইতিহাসকে তুলে ধরেছেন; অন্যদিকে সুপ্রতিম কর্মকার বাংলার মাটি, নদী, গ্রাম, কৃষি, জলাভূমি এবং স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার ভিতর দিয়ে সেই একই সংকটের আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক রূপটি বিশ্লেষণ করেছেন।
অ্যাটেনবরোর দীর্ঘ কর্মজীবনকে যদি একটি বাক্যে সংজ্ঞায়িত করতে হয়, তবে বলা যায় তিনি আধুনিক সভ্যতার সামনে প্রকৃতির আয়না তুলে ধরেছেন। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে তিনি যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তা কেবল বন্যপ্রাণীর জীবনচিত্র নয়; তা আসলে পৃথিবীর দ্রুত পরিবর্তনের দলিল। তাঁর তথ্যচিত্রগুলিতে আমরা দেখি বন উজাড় হচ্ছে, হিমবাহ গলছে, সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে, নদীগুলি দূষিত হচ্ছে, মরুভূমি বিস্তৃত হচ্ছে। কিন্তু অ্যাটেনবরোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান সম্ভবত এই যে তিনি পরিবেশ ধ্বংসকে কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখেন না। তিনি দেখান, শিল্পসভ্যতার অপ্রতিরোধ্য ভোগবাদ, সীমাহীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা এবং প্রকৃতিকে নিছক সম্পদ হিসেবে দেখার মানসিকতাই এই বিপর্যয়ের মূল কারণ। তাঁর বক্তব্যে বারবার ফিরে আসে একটি প্রশ্ন—মানুষ কি নিজেকে প্রকৃতির বাইরে কোনও সত্তা বলে ভাবতে শুরু করেছে? যদি তাই হয়ে থাকে, তবে সেই অহংকারই আমাদের সবচেয়ে বড় বিপদ।
সুপ্রতিম কর্মকারের লেখালেখির মধ্যেও একই ধরনের উদ্বেগ লক্ষ করা যায়, যদিও তাঁর ভাষা ও পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্র অনেক বেশি স্থানীয়। তিনি আমাদের দেখান যে নদীর মৃত্যু কোনও বিমূর্ত পরিবেশগত ঘটনা নয়; তা মানুষের প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। একটি নদী শুকিয়ে গেলে কৃষক তার জমি হারায়, জেলে তার জীবিকা হারায়, গ্রাম তার জল হারায়, পাখি তার আবাস হারায়। নদীর সংকট তাই কেবল প্রকৃতির সংকট নয়, সমাজের সংকট। তাঁর লেখার বিশেষত্ব এখানেই যে তিনি পরিবেশের প্রশ্নকে রাজনীতির প্রশ্ন থেকে আলাদা করেন না। উন্নয়নের নামে যখন নদী ভরাট হয়, জলাভূমি নষ্ট হয়, কৃষিজমি শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয়, তখন তিনি কেবল পরিবেশগত ক্ষতির হিসাব করেন না; তিনি খোঁজেন সেই ক্ষমতার কাঠামোকে, যা এই ধ্বংসকে সম্ভব করে তোলে। তাঁর কাছে নদী একটি রাজনৈতিক পাঠ্য, যেখানে জলপ্রবাহের পাশাপাশি প্রবাহিত হয় ক্ষমতা, পুঁজি এবং রাষ্ট্রনীতির ইতিহাস। আসলে সুপ্রতিম কর্মকার এবং অ্যাটেনবরোর কাজকে পাশাপাশি রেখে পড়লে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পৃথিবীর পরিবেশগত সংকট কোনও একক দেশের সংকট নয়, আবার কেবল বৈশ্বিক সংকট বললেও তা সম্পূর্ণ বোঝা যায় না। বৈশ্বিক সংকটের স্থানীয় রূপ রয়েছে, এবং স্থানীয় সংকটের সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতির সম্পর্ক রয়েছে। অ্যাটেনবরো আমাদের দেখান আমাজনের বন ধ্বংস হলে তার প্রভাব সমগ্র পৃথিবীর উপর পড়ে; সুপ্রতিম কর্মকার আমাদের দেখান একটি ছোট নদী বা জলাভূমি হারিয়ে গেলে একটি গ্রামের ইতিহাস বদলে যায়। একজন বৃহৎ পৃথিবীর ইতিহাস লিখছেন, অন্যজন লিখছেন সেই ইতিহাসের স্থানীয় অধ্যায়। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই মূল বক্তব্য একই—প্রকৃতিকে জয় করার যে স্বপ্ন আধুনিক সভ্যতা লালন করেছে, তার মূল্য আজ প্রকৃতি এবং মানুষ উভয়কেই দিতে হচ্ছে।
আরও গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, এই দুই চিন্তকের কাজ আসলে পরিবেশবিষয়ক নৈতিকতার পুনর্নির্মাণের চেষ্টা। তাঁরা উভয়েই আমাদের শেখান যে প্রকৃতিকে রক্ষা করা কোনও দয়া বা মানবিক সহানুভূতির বিষয় নয়; এটি আত্মরক্ষার প্রশ্ন। নদী, বন, পাহাড় কিংবা সমুদ্রকে বাঁচানো মানে প্রকৃতিকে বাঁচানো নয়, মানুষকেই বাঁচানো। কারণ মানুষ প্রকৃতির মালিক নয়; প্রকৃতির জটিল সম্পর্কব্যবস্থার একটি অংশমাত্র। আধুনিক সভ্যতা দীর্ঘদিন ধরে এই সত্যটি ভুলে থেকেছে। ফলে নদীকে বাঁধা হয়েছে, বন কাটা হয়েছে, জলাভূমি ভরাট করা হয়েছে, ভূগর্ভস্থ জল নির্বিচারে তুলে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতি শেষ পর্যন্ত তার নিজস্ব ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানায়—খরা, বন্যা, জলসংকট, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং জলবায়ু বিপর্যয়ের মাধ্যমে। এই কারণেই সুপ্রতিম কর্মকারের নদী-ভাবনা এবং অ্যাটেনবরোর বৈশ্বিক পরিবেশচিন্তা পরস্পরের পরিপূরক। একজন আমাদের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ধ্বংসকে চিনতে শেখান, অন্যজন সেই ধ্বংসের বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করেন। একজন গ্রামের পুকুর, খাল, বিল এবং নদীর কথা বলেন; অন্যজন সমুদ্র, বনভূমি এবং সমগ্র জীবমণ্ডলের কথা বলেন। কিন্তু উভয়ের কণ্ঠস্বর মিলিত হয় একটি সতর্কবার্তায়—মানুষ যদি প্রকৃতির সঙ্গে তার সম্পর্ক নতুন করে সংজ্ঞায়িত না করে, তবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা সামাজিক সংকটের নাম হবে জল এবং পরিবেশ। তখন নদীর প্রশ্ন আর পরিবেশবিদদের আলোচ্য বিষয় হয়ে থাকবে না; তা হয়ে উঠবে সভ্যতার অস্তিত্বের প্রশ্ন।
ব্যবহৃত ও আলোচিত গ্রন্থ – সুপ্রতিম কর্মকারের ‘নদী জল রাজনীতি’



