জনগণের বুদ্ধি, বিবেচনাবোধ আর সম্মিলিত প্রজ্ঞাকে কেন্দ্র করে এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবল মোহ কাজ করে। তাঁরা “জনগণ” শব্দটা এমন ভঙ্গিতে উচ্চারণ করেন, যেন এই শব্দের ভিতরেই লুকিয়ে আছে নৈতিকতার শেষ আদালত। আমি এই ভক্তিভাব বা একদর্শিতাকে মানি না। বরং আমি দেখেছি, জনগণও ভুল করে। জনগণ যেমন প্রতারিত হয়, তেমনি জনগণই অনেক সময় জেনেশুনে অপদর্থকে মাথায় তোলে। তাই “জনগণ যা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নিশ্চয়ই ভেবে চিন্তে নিয়েছে” অথবা “জনগণ কখনও ভুল করতে পারে না”— এই কথাগুলোকে আমি আর সত্য বলে মানতে পারি না। এগুলোকে আমি চিন্তার ভাষা বলি না; বলি আত্মপ্রবঞ্চনার ভাষা।
খুব সহজ একটা উদাহরণ দিই। মাথার বাইরে যে চুল আমরা দেখি, তা মূলত মৃত, কেরাটিনে-ভরা কোষের তৈরি। তবু সেই চুলের “পুষ্টি”-র নামে বাজারে বিস্ময়-বিক্রির হাট বসে। আবার রাশি, পাথর, তাবিজ, ভাগ্য— এই সব কিছুর সাফল্যের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। জ্যোতিষকে বিজ্ঞান হিসেবে মানার পক্ষে শক্ত প্রমাণ আজও মেলেনি। তবু মানুষ সেগুলোকেই আশ্রয় বলে মানে। অর্থাৎ মানুষ বারবার এমন সব জিনিসের ওপর ভরসা রাখে, যা তার বুদ্ধিকে নয়, তার উদ্বেগকে সান্ত্বনা দেয়। এখানেই আমার প্রশ্ন: যে সমাজ দৈনন্দিন জীবনে কুসংস্কারকে এত সহজে সত্য বলে মেনে নেয়, সেই সমাজের ভোট-সিদ্ধান্তকে আমরা এত পবিত্র বলে মানব কেন?
ভোটের বাক্সের সামনে দাঁড়ালেই এই প্রশ্ন আরও নির্মম সত্য হয়ে ওঠে। সেখানে আমরা বারবার দেখি, সৎ, সংযত, শিক্ষিত, রুচিবান, পরিশ্রমী মানুষ ভোটযুদ্ধে হেরে যান; আর দাপুটে, দুর্নীতিগ্রস্ত, চিৎকারবাজ, অসভ্য, ক্ষমতালোভী লোকজন জিতে যায়। কেন জেতে? কারণ ভোটাররা সব সময় নৈতিকতার মাপকাঠি নিয়ে বুথে যান না। কেউ ভয় নিয়ে যান। কেউ অভ্যাস নিয়ে যান। কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থ নিয়ে যান। কেউ প্রতিশোধ নিয়ে যান। কেউ শুধু এই হিসাব নিয়ে যান— “আমার কাজটা কে করে দেবে?” কাজেই জনগণকে একরঙা নৈতিক সত্তা বলে দেখা রাজনৈতিক অলসতা।
এই প্রসঙ্গে আম্বেডকর আমাদের বহু আগেই সতর্ক করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল স্পষ্ট: রাজনীতিতে ভক্তি বা নায়কপূজা অবক্ষয়ের পথ; শেষ পর্যন্ত তা একনায়কতন্ত্রকেই ডেকে আনে। এই কথাগুলো আজও আমাকে ভাবায়। কারণ ভোটের রাজনীতিতে আমরা বারবার দেখি, মানুষ প্রার্থীকে বিচার করছে না, চরিত্র যাচাই করছে না, প্রার্থীর নীতি-নৈতিকতা নিয়ে ভাবছে না। মানুষ বরং নেতার প্রতি ভক্তি, মুখের প্রতি ভক্তি, পতাকার প্রতি ভক্তি আর দলের প্রতি মোহের কাছে নিজের বিচারবোধকে জমা রাখছে। সুতরাং যে সমাজ প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, সেই সমাজ খুব সহজেই এবং খুব দ্রুত তার জনগণকে ভক্তদলে পরিণত করে ফেলে। তখন সেই সমাজ আর তার ভক্তদল গণতন্ত্রকে বাঁচাতে পারে না; বরং সেই ভক্তদল কেবল ক্ষমতাকে নিরাপদ করে।
এখন প্রশ্ন হল, কোন জনগণ তৃণমূলকে ভোট দেয়? তৃণমূলকে ভোট দেয় সেই সব মানুষ, যারা রাজনীতিকে নীতির লড়াই হিসেবে দেখে না; বরং শাসকের সঙ্গে সম্পর্কের বাস্তব কৌশল হিসেবে দেখে। তারা ভাবে, “শাসকের সঙ্গে সেতু রেখে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।” যারা ভাতা, প্রকল্প, সুপারিশ, স্থানীয় প্রভাব, পঞ্চায়েত, ক্লাব আর প্রশাসনিক সুবিধার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকে চিনতে চায় বা অনুভব করে, তাদেরই একটা বৃহৎ অংশ তৃণমূলের ভোটার। আবার অনেকে দুর্নীতি জেনেও তাকেই ভোট দেয় এই ভেবে— “চুরি করেছে ঠিকই, তবু তো কিছু দেয়।” অর্থাৎ এখানে আদর্শের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় প্রয়োজন, নির্ভরতা, ভয় এবং অভ্যাস।
এইখানে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে, বিজেপিকে ভোট দেয় কারা? বিজেপিকে ভোট দেয় সেই সব মানুষ, যাদের দীর্ঘদিন ধরে বোঝানো হয়েছে— “ধর্ম বিপন্ন”, “সংস্কৃতি বিপন্ন”, “দেশ বিপন্ন”, “সংখ্যাগরিষ্ঠ বিপন্ন।” তাদের মধ্যে রাগ সঞ্চারিত হয়। তারা অপমান বোধ করে। তখন তারা এমন এক শক্তি খোঁজে, যে শক্তি চিৎকার করে, ভয় দেখায়, শত্রুকে চিহ্নিত করে, রাগকে সংগঠিত করে। ফলে বিজেপির ভোটও কেবল মতাদর্শের ভিত্তিতে আসে না। অনেক সময় তার ভিতরে লুকিয়ে থাকে আক্রোশের ভোট, প্রতিশোধের ভোট, পরিচয়ের ভোট, কিংবা দিশেহারা মধ্যবিত্তের নিরাপত্তা-মনস্তত্ত্বের ভোট।
বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের ভোটার সমাজের মধ্যেও একটি ছোট অংশ আছে, যারা বামপন্থীদের ভোট দেয়। তাহলে প্রশ্ন আসে, কারা বামপন্থীদের ভোট দেয়? বামপন্থীদের ভোট দেয় সেই সব মানুষ, যারা এখনও রাজনীতিকে কেবল সরকার-বদলের খেলা হিসেবে দেখে না। যারা কাজ, মজুরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জমি, কৃষি, শ্রম, ধর্মনিরপেক্ষতা, সাংবিধানিক অধিকার আর সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নকে ভোটের কেন্দ্রে রাখতে চায়। সংগঠিত শ্রমিকের একাংশ, অসংগঠিত শ্রমজীবী মানুষের একাংশ, কৃষিজীবী মানুষের একাংশ, ছাত্র-যুবদের একাংশ, আর সেই সব নাগরিক-বুদ্ধিজীবী, যারা তৃণমূলের পৃষ্ঠপোষকতাবাদ এবং বিজেপির সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ— দুটোকেই প্রত্যাখ্যান করতে চান, তাঁরাই আজ বামপন্থীদের দিকে তাকান। কিন্তু এখানেও একটা জটিল সমস্যা আছে। মনে রাখতে হবে, নৈতিক অবস্থান সব সময় রাজনৈতিক শক্তিতে অনুবাদিত হয় না। ক্ষোভ থাকে, যুক্তি থাকে, নৈতিক দৃঢ়তা থাকে; কিন্তু সংগঠন দুর্বল হলে ভোটের অঙ্কে তার প্রতিফলন পড়ে কম।
সুতরাং গ্রামশির কথাই এখানে সত্য হয়ে দাঁড়ায়। বুদ্ধিজীবীর দায় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, সব মানুষই বুদ্ধিবৃত্তির অধিকারী; কিন্তু সমাজে সবাই বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা পালন করে না। এই কথার ভিতরেই আসল রহস্য। কারণ “বুদ্ধিজীবী” হওয়া মানেই সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো নয়। বরং সমাজে এক শ্রেণির লোক আছে, যারা ভাবনার ব্যবসা করে, শব্দের ব্যবসা করে, নৈতিকতার ব্যবসা করে, অথচ ক্ষমতার বিরুদ্ধে সত্যিকারের লড়াই করে না। তারা দেখায় যেন জনগণের জন্য ভাবছে, জনগণের নামেই কথা বলছে; কিন্তু জনগণের বিচারশক্তিকে ধারালো করতে বা যুক্তিবাদী করে তুলতে চায় না।
এই সুবিধাবাদী আধুনিক বুদ্ধিজীবীরাই সবচেয়ে ধূর্ত ও বিপজ্জনক। তারা সরাসরি দরবারি ভাষা ব্যবহার করে না। তারা সংস্কৃতির ভাষা ধার নেয়। মানবতার ভাষা নেয়। ফ্যাসিবাদ-বিরোধিতার ভাষাকে উপজীব্য করে। উন্নয়নের ভাষা নেয়। বারবার বোঝায়— “এখন প্রশ্ন তোলার সময় নয়।” কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, তাদের সব যুক্তির রাস্তা গিয়ে মেশে ক্ষমতার উঠোনে। তারাও চায় না প্রগতিশীল নাগরিক তৈরি হোক। তারা চায় অনুগত দর্শক। কারণ অনুগত দর্শক মঞ্চ ভরায়, হাততালি দেয়, পোস্ট শেয়ার করে, শাসকের পক্ষে নৈতিক পরিবেশ তৈরি করে। আর চিন্তাশীল নাগরিক? সে প্রশ্ন করে। সে অস্বস্তি তৈরি করে। সে হিসাব চায়। নাট্যকার ব্রেখটের ভাষায়—
প্রশ্ন করতে ভয় পেয়ো না, ভাই
অন্যের কথা নিয়ে না মেনে
নিজেকেই দেখতে হবে সব।
নিজে যা জানো না
তা তুমি জানোই না।
যোগ করে হিসাব-নিকাশ
তোমাকেই দিতে হবে দাম।
আঙুল বসাও সব কিছুতেই—
প্রশ্ন করো, কী করেই বা এলো এটা?
নেতৃত্ব নিতে হবে তোমাকেই।
এই কথাগুলো শুধু নৈতিক উপদেশ নয়; নাগরিকতারও ভিত। কারণ প্রশ্নহীন মানুষ প্রজা হতে পারে, সমর্থক হতে পারে, ভিড় হতে পারে; কিন্তু নাগরিক হতে পারে না। আর তাই চিন্তাশীল নাগরিককে সব শাসকই ভয় পায়।
বাংলার বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থাকে আমি গ্রামশির আর-একটি ভাবনার আলোয় দেখতে চাই। তাঁর বক্তব্য ছিল, সংকট তখনই তীব্র হয়, যখন পুরোনো মরছে, কিন্তু নতুন এখনও জন্মাতে পারছে না। এই কথাটা আজও ভয়ংকরভাবে সত্য। মানুষ শাসকের ওপর ক্ষুব্ধ, কিন্তু বিকল্পের ওপর পুরো বিশ্বাস করতে পারছে না। মানুষ প্রধান বিরোধীদলের সাম্প্রদায়িকতাকে দেখে সরে যায়, আবার শাসকের দুর্নীতি দেখে তার প্রতি জন্মায় বিতৃষ্ণা। মানুষ বাম বিকল্পের নৈতিকতা মেনে নেয়, কিন্তু সর্বত্র তাকে জেতার শক্তি হিসেবে কল্পনা করতে পারে না। আর এই ফাঁকেই জন্ম নেয় হতাশা, আপস, আর ভণ্ড বুদ্ধিজীবিতা।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় তাই শুনি— “দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া”, “কেবল শুনি রাতের কড়ানাড়া”, “অবনী, বাড়ি আছো?” এই লাইনগুলো এখন আর শুধু কবিতার আবহ নয়; এ যেন আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতারও প্রতিকৃতি। বাইরে সতর্কবার্তা আছে, অস্বস্তি আছে, ইতিহাসের কড়া নাড়া আছে; কিন্তু ভিতর থেকে সাড়া নেই। সমাজ যেন দরজা এঁটে ঘুমিয়ে আছে। তাই “অবনী” এখানে আর কোনো ব্যক্তি নন; তিনি নাগরিক বিবেকের রূপক। প্রশ্ন তাই অবনীকে নয়, আমাদের বিচারশক্তিকেই— আমরা এখনও জেগে আছি তো, না কি আধেকলীন হৃদয়ের ব্যথা নিয়ে ইতিমধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছি?
দক্ষিণপন্থী রাজনীতির এই নতুন বিকাশকে নতুন করে বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন আছে। এই প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে, ফ্যাসিবাদ জনতাকে সংগঠিত করতে চায়, কিন্তু সেই সম্পত্তি-ব্যবস্থাকে অক্ষত রাখে, যেটা জনতা বদলাতে চায়। আমি এই কথাকে আরও বিস্তৃত অর্থে পড়ি। শাসক মানুষকে অধিকার দেয় না; শাসক মানুষকে উত্তেজনা দেয়। শাসক ন্যায্য অংশীদারি দেয় না; শাসক শত্রু দেয়। শাসক কাজ দেয় না; শাসক মিছিল দেয়। শাসক মর্যাদা দেয় না; শাসক পরিচয়ের নেশা দেয়; প্রয়োজনমতো ভাতাও দেয়। ফলে জনতা খুব সক্রিয়, কিন্তু সেই সক্রিয়তা অনেক সময় নিজের মুক্তির জন্য নয়; শাসকের খেলায় নিজের ব্যবহারের সক্রিয়তা। এখানে এসে আমার সেই বিষণ্ণতা কাজ করে। মনে হয়, আধেকলীন হৃদয়ে দূরগামী ব্যথার মধ্যেই আমরা ঘুমিয়ে পড়ছি, আর সহসা শুনছি রাতের কড়া নাড়া।
ফলে ইদানীং আমি, বা আমার মতো অনেকেই, সংসদসর্বস্ব রাজনীতির প্রতি আর কোনো মুগ্ধতা দেখাতে পারছি না। ভোটব্যবস্থা থাকলেই যে গণতন্ত্র থাকে, তা নয়। ভোট থাকলেই বিবেক জাগ্রত হয় না। ভোট থাকলেই সমাজ যুক্তিবাদী হয় না। মানুষ যদি বারবার অপদর্থকে জেতায়, মানুষ যদি দুর্নীতিতে যুক্ত নেতাকে মেনে নেয়, মানুষ যদি ঘৃণাকে নৈতিকতার জায়গায় বসিয়ে ফেলে, মানুষ যদি শাসকের দয়ার বদলে নিজের অধিকারকে দাবি না করে— তা হলে সেই ভোট কেবল সংখ্যার ঘটনা হয়; সেটা কোনো নৈতিক জয়ের ঘটনা হয় না।
সুতরাং আপনি আপনার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করুন; তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু আমি সেই লাফালাফির অংশ হবই— এমন কোনো বাধ্যবাধকতা আমার নেই। আমারও অধিকার আছে দূরত্ব রাখার। আমারও অধিকার আছে ভোটব্যবস্থা থেকে নিজেকে পৃথক রাখার। আমারও অধিকার আছে বলার— “আমি ব্যালটবাক্সের ধর্মে দীক্ষিত নই।” কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ-ও হয়ে উঠতে পারে ব্যালটের ভিতরেই অস্বীকৃতির ভাষা— নোটার পক্ষে নীরব কিন্তু স্পষ্ট অবস্থান।
কিন্তু এখানেই এই লেখা শেষ হয় না। জনগণকে গালাগাল দিয়ে দায়িত্ব শেষ হয় না। আবার জনগণকে পূজা করেও কিছু হয় না। আসল কাজ হল মানুষকে নাগরিক করে তোলা। তাকে শেখাতে হবে— “ভাতা নাও, কিন্তু বিবেকটা বেচো না।” “ধর্ম মানো, কিন্তু ঘৃণাকে রাজনীতি বানিও না।” “দল করো, কিন্তু মাথা বন্ধ কোরো না।” “নেতাকে মানো, কিন্তু প্রশ্ন করা বন্ধ কোরো না।” আর বুদ্ধিজীবীদের জন্য খুব সোজা কথা: ক্ষমতার বারান্দায় দাঁড়িয়ে জনগণের নামে মিথ্যা বলবেন না।
পরিশেষে বৈপ্লবিক প্রশ্নটি “কে জিতল”— এতটুকু নয়; প্রশ্নটি হল, কোন ধরনের মানুষ বারবার জেতার উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়, এবং কেন হয়। নির্বাচন কেবল সরকারের রদবদল ঘটায় না; তা সমাজের নৈতিক রুচি, বুদ্ধিবৃত্তিক অভ্যাস আর সত্য-মিথ্যা বিচার করার ক্ষমতার মানচিত্রও তুলে ধরে। সেই অর্থে ভোট শুধু রাজনৈতিক ঘটনা নয়, জ্ঞানতাত্ত্বিক ঘটনাও— অর্থাৎ একটি সমাজ কোন ধরনের শক্তিকে সত্য বলে মানছে, সুবিধা পাওয়াকে কেন ন্যায়সঙ্গত বলে চালাচ্ছে, আর ভয়ের ভাষাকে কোন বাস্তববোধ হিসেবে গ্রহণ করছে, তারও প্রকাশ। যে সমাজে দাপট দক্ষতার জায়গা নেয়, দয়া অধিকারের জায়গা নেয়, পরিচয় বিচারবোধের জায়গা নেয়, সেখানে নির্বাচন গণতন্ত্রের উৎসব হয় না; তা সামাজিক অবক্ষয়ের নিয়মিত নিরীক্ষা। তাই আজ আসল প্রশ্ন দলবদল নয়; আসল প্রশ্ন হল, আমাদের রাজনৈতিক পছন্দ কি সত্যিই স্বাধীন বিবেচনার ফল, না কি তা ভয়, নির্ভরতা, অপমান, প্রচার আর সম্মোহনের যৌথ উৎপাদন। এই প্রশ্নের মুখোমুখি না হলে কোনো নির্বাচনই নতুন ইতিহাস লিখতে পারবে না; কেবল পুরোনো অসুখের ওপর নতুন পরিসংখ্যান তৈরি করে যাবে।




nice one