দ্বন্দ্ব -অন্তর্দ্বন্দ্ব – পর্ব ১০

dwando antardwando2

গা গুলানো আধময়লা অন্ধকারের ভিতর দিয়ে ধীরে গতিতে সুবিধাবাদ এগিয়ে এল।
ভ্রুভঙ্গে বিদ্রূপের ছোঁয়া, টানা চোখদুটোর বড় বড় আঁখি পল্লবে জেগে আছে স্বার্থপরতার তীব্র নিক্ষেপ। সুবিধাবাদ দেখতে বড় সুন্দর। সুবিধাবাদ দেখতে বড় কুৎসিত। তবু তার মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লো গোটা প্ল্যাটফর্ম। ঈষৎ রাগের উগড়ে ফেলা অক্ষর সংখ্যার সামনে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়ালো। তার ঈষৎ কুঁজো অবয়ব, তার ধবধবে সাদা পোশাক ,তার ধারালো নিস্তব্ধ
নিষ্করুণ মুখ কৃত্রিম মেধাকে চঞ্চল করে তুললো।
কৃত্রিম মেধা মুখ শনাক্ত করা শুরু করলো
ম্যাচিং…
ত্রুটি…
ডেটা বিকৃতি…
পরিচয় নিশ্চিত করা যাচ্ছে না…

একটা দাঁড় কাক কা-কা-কাঁ-কঁক করতে করতে উড়ে গেল কৃষ্ঞ চূড়ার‌ ডালে। ঘাড় বেঁকিয়ে দেখতে লাগলো প্ল্যাটফর্মের উপর ঘটে যাওয়া কার্যকলাপ।
সুবিধাবাদ বলে উঠলো ‘হাম দিল‌ দে চুকে সনম’
ক্রূর হাসি হেসে উঠলো, তারপর গাইলো
সুরেলা গলায়,-‘তেরে হো গ্যায়ে হ্যায় হম্।তেরি কসম’।
প্ল্যাটফর্মের প্রান্তিক অঞ্চল সুরের তরঙ্গে
আবিষ্ট,মধ্যভাগ হতচকিত।
প্রেম সুবিধাবাদকে চা খাওয়াতে চাইছে। আর প্রতিবাদ ঝালমুড়ি। প্রেমের কাছে বিরহের কয়েন ছাড়া কিছুই নেই। খিদে বললো,’ বিরহের কয়েন অচল। চলবে না কিছুতেই। একটা তৃপ্তি বা আনন্দ‌ কয়েন
না থাকলে আমি দিতে পারবো না চা। প্রতিবাদ তাড়াতাড়ি ঝালমুড়ি কিনে নিল
ভাসা দৃষ্টি কয়েন দিয়ে। সুবিধাবাদ ঝালমুড়ি খেতে খেতে বললো,’ সমস্ত আলোকে সুর আর সুরকে ডিজে করে দিয়েছি। প্রেম পর্যন্ত আমায় চা খাওয়াতে চাইছে, বুঝতে পারছো আমার ক্ষমতা। তোমাদের সবার অন্তরে আমার অবাধ প্রবেশ।’ আবার সুবিধাবাদ গুনগুন করে
উঠলো,’হাম দিল দে চুকে সনম…’
প্রেম তার একমাত্র তৃপ্তি কয়েন দিয়ে সুবিধাবাদের জন্যে চা এনে দিল।
বহু বছর আগে পাওয়া একমাত্র তৃপ্তি
কয়েন চা এর জন্য দিয়ে দিল। দিয়ে দিল মানে না দিয়ে পারলো না।
চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া নয় মুখোশ উড়ে উড়ে সুবিধাবাদের মুখে গিয়ে বসছে। নীতি,আদর্শ, ত্যাগ,ভক্তি,বিপ্লব সব মুখোশ সুবিধাবাদের মুখে বসে যাচ্ছে। একদম বেমানান মনে হচ্ছে না।

ঝালমুড়ি চিবাচ্ছে মুখোশের মুখ। কড়মড় কড়মড় শব্দে চিবিয়ে চলেছে গণতন্ত্রের প্রারব্ধ।
প্রতিটি চিবুনির সঙ্গে প্ল্যাটফর্মের লাউডস্পিকার একটু একটু করে কর্কশ হয়ে উঠছে। ঘোষণা আর সত্যের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। শব্দ পৌঁছচ্ছে, অর্থ পৌঁছচ্ছে না।
কৃত্রিম মেধা শেষবারের মতো সুবিধাবাদের চোখের মণিতে জুম করল।
বিশ্লেষণ চলছে…
চোখের ভেতর আর-এক জোড়া চোখ।
তারও ভেতরে আরও এক জোড়া।
অসংখ্য প্রতিবিম্ব।
প্রতিটি চোখে আলাদা নীতি, আলাদা বিশ্বাস, আলাদা পতাকা।
কিন্তু সব ক’টি মণির কেন্দ্রে একই বিন্দু—স্বার্থ।
কৃত্রিম মেধা থেমে গেল।
তার পর্দায় একটি মাত্র বাক্য জ্বলে উঠল—
“পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব নয়। কারণ এ নিজে কোনো পরিচয় নয়; অন্যের পরিচয় ব্যবহার করাই এর পরিচয়।’ ঈষৎ রাগের শরীর থেকে বের হওয়া অক্ষর সংখ্যা ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নিল। সে বুঝল, সুবিধাবাদের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মুখ নয়—তার ধার করা মুখগুলো।
আর কৃষ্ণচূড়ার ডালে বসে থাকা দাঁড়কাকটি যেন প্রথমবারের মতো হাসল। সেই হাসির শব্দ কাকের ডাক ছিল না; মনে হচ্ছিল, ইতিহাস নিজের ভুলগুলো আবার শুনছে।
সুবিধাবাদ বললো,’ একটু পান হলে ভালো হতো।’ তদন্ত হুড়মুড়িয়ে কিনতে গেল‌ পান।
যৌনতা একটু গা ঘেঁষে দাঁড়ালো সুবিধাবাদের। আজকাল‌ প্রেমের প্রতি সেই টান নেই। সুবিধাবাদের কাছাকাছি এসে মনে হলো কেমন যেন স্বস্তি,প্রেমের কাছে সেই স্বস্তি ছিল না। তবে প্রেমও সুবিধাবাদের কাছে ঘুরঘুর করছে বলে বেশ ভালোই লাগছে। মাঝে যেন‌ ওদের মধ্যে কেমন ভুল বোঝাবুঝি চলছিল।
যৌনতা একটু গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েই বুঝল, সে আর নিজের মতো নেই। তার শরীর থেকে ধীরে ধীরে উবে যাচ্ছে উন্মাদনা; তার জায়গায় জমাট বাঁধছে নিরাপত্তার লোভ। প্রেমের কাছে যে আত্মসমর্পণ ছিল, সুবিধাবাদের কাছে তা বদলে যাচ্ছে হিসাবের খাতায়।
সুবিধাবাদ পানের খিলি মুখে পুরে মৃদু হেসে বলল, —”প্রেম অপেক্ষা চায়, আমি ফল দিই। প্রেম প্রশ্ন করে, আমি সুযোগ দিই। মানুষ কাকে বেছে নেবে বলো?”
তদন্ত তখনও দৌড়ে বেড়াচ্ছে। আরো পানের খোঁজে। প্রত্যেক দোকানদার তাকে আলাদা আলাদা রঙের পান ধরিয়ে দিচ্ছে। কোথাও সত্যের চুন কম, কোথাও মিথ্যার জর্দা বেশি। তদন্তের আর বুঝে ওঠা হচ্ছে না, কোনটা আসল।
প্রেম দূর থেকে তাকিয়ে রইল। তার হাতে আর কোনো কয়েন নেই। শুধু বহু ব্যবহারে মসৃণ হয়ে যাওয়া একটি শূন্য মুঠো। সেই শূন্যতাও যেন আজ বিক্রির জন্য প্রস্তুত।
ঈষৎ রাগের শরীর থেকে আবার কয়েকটি অক্ষর খসে পড়ল। তারা মাটিতে পড়েই সংখ্যা হয়ে গেল। সংখ্যাগুলো মুহূর্তের মধ্যে জরিপ, ভোট, বাজারদর, জনপ্রিয়তার গ্রাফে পরিণত হলো। অক্ষর হারিয়ে ফেলল অর্থ; সংখ্যা হারিয়ে ফেলল বিবেক।
প্ল্যাটফর্মের ঘড়ি হঠাৎ উল্টো দিকে চলতে শুরু করল। কেউ অবাক হলো না। কারণ সময়ও বুঝে গেছে—সুবিধাবাদের কাছে অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ আলাদা কোনো বিষয় নয়; সবই দরকষাকষির মুদ্রা।
কৃত্রিম মেধা আবার শেষ চেষ্টা করল।
বিশ্লেষণ পুনরারম্ভ…
নৈতিকতার মানচিত্র লোড হচ্ছে…
ত্রুটি…
প্রতিটি সিদ্ধান্তে একাধিক সত্য শনাক্ত হয়েছে।
অ্যালগরিদম স্থগিত।
তার পর্দায় নতুন একটি বাক্য ফুটে উঠল—
“যেখানে নীতি বাজারদরের সঙ্গে ওঠানামা করে, সেখানে যুক্তিও নিরপেক্ষ থাকতে পারে না।”
এই ঘোষণার পর মুহূর্তের জন্য সমগ্র প্ল্যাটফর্মে নেমে এল এক অদ্ভুত নীরবতা। সেই নীরবতার শব্দ শুনতে পেল শুধু কৃষ্ণচূড়ার ডালে বসে থাকা দাঁড়কাক। সে একবার ডানা ঝাপটাল। লাল কয়েকটি ফুল ঝরে পড়ল রেললাইনের ওপর। দূর থেকে মনে হলো, রক্ত নয়—লজ্জা ঝরে পড়ছে।
আর সুবিধাবাদ? সে শুধু ঠোঁটের কোণে পানের লাল রং মেখে হাসল। সেই হাসিতে বিজয়ের উল্লাস ছিল না; ছিল এমন এক নিশ্চিত বিশ্বাস, যে মানুষ তাকে ঘৃণা করলেও, প্রয়োজনের মুহূর্তে শেষ পর্যন্ত তার কাছেই ফিরে আসবে।


(ক্রমশঃ:)

আগের পর্বঃ দ্বন্দ্ব-অন্তর্দ্বন্দ্ব (পর্ব ৯)


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top