‘আমার উদ্বেগে আসক্তি হয়েছে, আমার কথা বলতে ভালো লাগছে না’ তরঙ্গের মতো স্মৃতির স্বীকারোক্তি ভেসে চললো ট্রেনের কামরায়। দূরে আধমরা গাছটার ডালে সবাই দেখছে দোলনা দুলছে। পরিসংখ্যান বিদ চশমাটা তুলে বলে উঠলেন ‘অসম্ভব! একই টাইম ল্যুপে ভিন্ন ভিন্ন জিনিষ আসতে পারে না। কোথাও ভুল হচ্ছে।’
এনট্রপি বৃদ্ধ পরিসংখ্যান বিদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন, ‘হয়, হয় বইকি! তুমি কী সব জান?’
‘হতে পারে না। একই টাইম ল্যুপে ভিন্ন দৃশ্য আসবে কীভাবে? স্যাঁতসেঁতে পুরোনো স্টেশনের গন্ধ সমস্ত কামরা জুড়ে, এনট্রপি বৃদ্ধের দৃষ্টি সুদূরে ‘এই মহাবিশ্বে কোনো কিছুই স্থিতিশীল নয়, টাইমল্যুপ ও নয়। একটা ল্যূপের মধ্যে ঢুকে পড়ছে অন্য একটা ল্যূপ।’
—’আমরা অনিশ্চয় নগরীতে যাচ্ছি নাকি মগ্ন চৈতন্যের প্ল্যাটফর্মে ‘
স্মৃতির দিকে একটু লজ্জা লজ্জা চোখে তাকিয়ে উদ্বেগ বললো,
—’দুটো একই। এই যেমন স্মৃতি আর উদ্বেগ এক?’
সমবেত স্বরে সবাই বলে উঠলো, —’মানে?’
পরিসংখ্যানবিদ বলে উঠলেন, —’আমার সব গুলিয়ে যাচ্ছে।’
—’তোমার মৃত সংখ্যার পরিমাপ জীবন্ত সংখ্যাদের থেকে আলাদা।
এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে ছড়িয়ে থাকা শৃঙ্খলার সূত্র নতুন পরিসংখ্যানের জন্ম দেবে। তাকে যে ধরতে হবে। তোমাদের মত ইয়ং ম্যানদের কাজ তো এটাই।’
স্মৃতি উঠে এসে উদ্বেগের কাঁধে মাথা দিয়ে বসল। উদ্বেগ স্মৃতির চুলের মধ্যে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।
স্মৃতি বললো— ‘তুমি আর আমি এক?’
উদ্বেগ হেসে বললো— ‘একই তো। মানুষ যত স্মৃতিকে রাখবে, তত তার হারিয়ে ফেলার উদ্বেগ থাকবে। তুমি তো এক অদ্ভুত জমে থাকা সোঁদা ফেনা, যা আনন্দ —শোক—উৎসাহের ইতিহাস খনন করে উদ্বেগ নিয়ে আসো। স্মৃতি থেকে উৎসারিত হয় প্রেম আর গভীর আবেগ। প্রেম স্থিতধী, কিন্তু আবেগের সাথে ভালোবাসার হয় ভয়ের, তারপর আমি আসি ফিরে ফিরে.তোমার তো এখন আমার প্রতিই আসক্তি,তাই না?’
আক্রোশ দাঁত কিড়মিড় করে বলে, —তাহলে ভুলে গেলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।
স্মৃতিকে তুলে নিয়ে গিয়ে ঐ গাছের তলায়… ‘তারপর মুখ দিয়ে একটা অশ্লীল শব্দ করে। স্মৃতি উদ্বেগের গা ঘেঁষে বসে এমন অস্থির সপ্রতিভ মানুষটির আকর্ষণ করার ক্ষমতা আছে। যেন একটা নেশার মতো।
আক্রোশের চোখে চোখ রেখে যন্ত্রণা বলে, —’না, ভুলে গেলেই সব ল্যাঠা চুকে যায় না। স্মৃতিকে ঐ গাছ তলায়.বলছিলে না?
যন্ত্রণা কুঁকড়ে উঠে বললো, —স্মৃতি না থাকা মানে ভয়ের কারাগারে নিক্ষিপ্ত হওয়া। ভয়ঙ্কর কারাগার, চারপাশে অন্ধকারের জিভ আরও অন্ধকারকে চাটছে।’
পরিসংখ্যানবিদ খাতা কলম নিয়ে হিসেব কষে বলে যাচ্ছেন,
—’এরকম তো হওয়ার কথা নয়। একই মুহূর্ত বারবার ফিরে আসছে একটু একটু বদলে, ঠিক মিলছে না।’
এনট্রপি বৃদ্ধ দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে বলতে লাগলো,
—সময়েরও স্মৃতিভ্রম হয়,সেও কখনো কখনো হারিয়ে ফেলে তার অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ।
সপ্রতিভ অস্থির উদ্বেগ বলে উঠলো,
—বর্তমান বলে আলাদা কিছু নেই। অতীতের ক্ষত আর ভবিষ্যতের ভয়ের মাঝখানে সে একটা বিন্দুবৎ মুহূর্ত মাত্র।’
এনট্রপি বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,
—’সময় ক্লান্ত হয়।স্থান—কাল—পাত্রের ভিতর
প্রবেশ করে ঝিমায়, ঝিমিয়ে স্বপ্ন দেখে আর তখনই একটা সময়ের ল্যূপে আরেকটা সময় ঢুকে যায়।’
পরিসংখ্যান বিদ প্রশ্ন করলেন,
—’সময় যখন ঝিমোয় তখন কী হয়?’
এনট্রপি বৃদ্ধ বলে উঠলেন
—তখন জ্যামিতি ভেঙে যায়। বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে দেখেন এতো মাথা খাটিয়ে যে সূত্র, তত্ত্ব, নিয়ম বের করা হল,তারা কেমন হা—পিত্যেশ করে চেয়ে আছে মহাকালের দিকে, তাদের অস্তিত্ব সঙ্কটে,তাই নিয়ে দরবার করবে কোথায় ভেবেই পাচ্ছে না।’
পরিসংখ্যান বিদের ভিতর অবধি কেঁপে উঠলো,
—’তাহলে চুড়ান্ত সূত্র বলে কিছু নেই?’
মৃত নক্ষত্রের ধুলো যেন ছড়িয়ে পড়েছে ট্রেনের কামরায়। সেখান থেকেই ভেসে এল বৃদ্ধের কথা,
—চুড়ান্ত সূত্র থাকলে মহাবিশ্ব কবিতা হতো না হিসেব হতো।’
ট্রেন চলার ছন্দের মধ্যে কথাটা পাক খেতে থাকলো,পাক খেতে থাকলো কামরার আনাচে কানাচে। হঠাৎ যেন শীতল নীল আলো জ্বলে উঠেই নিভে গেল কামরার ভিতরে, নীল আলোর উৎস কোথায় কেউ বুঝতেই পারলো না। ভৈরবীর সুর কোথা থেকে এসে অপার্থিব দোলায় দুলিয়ে গেল সবাইকে ।
—’আচ্ছা, অতীতের তো উদযাপন হয়, ভবিষ্যতেরও তো সম্ভাবনা থাকে। শুধুমাত্র
”ক্ষত’ আর ‘ভয়’ তো থাকেনা ‘ অনেকক্ষণ পর সংশয়াকুল মুখ খুললেন।
সবাই হতচকিত হয়ে তাকিয়ে বললেন,
—’সহমত’ ‘সহমত’
মনে হল সহমত কথাটি গাছের দোলনায় দুলছে, কঁক…কঁক.. কঁক
হঠাৎ বাইরে শোঁ শোঁ আওয়াজ বৃষ্টির ফোঁটারা কেমন আকাশের দিকে উঠছে। পরিসংখ্যান বিদ বলে উঠলেন —’এতো অসম্ভব! মাধ্যাকর্ষণের বিপরীতে কাজ! আমরাও তো তাহলে উৎক্ষিপ্ত হতাম।হচ্ছি না কেন?’
(ক্রমশ)
দ্বন্দ্ব-অন্তর্দ্বন্দ্ব (পর্ব ৬)



