দুর্বল রাজনৈতিক সংস্কৃতি উপেক্ষিত মানবাধিকার

probondho

আমাদের সংবিধান বিশ্বের দীর্ঘতম লিখিত সংবিধান। অসাধারণ তার প্রস্তাবনা। প্রস্তাবনা অনুসারে দেশকে “সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, সাধারণতন্ত্ররূপে গড়ে” তোলার দায় প্রত্যক্ষ আমাদের। ভারতকে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে আমরা গড়ে তুলেছি। কিন্তু গণতন্ত্রের বিকাশ ‘সমাজতান্ত্রিক-ধর্মনিরপেক্ষ’ দৃষ্টিকোণ থেকে আশানুরূপ হয়নি বলে তাকে ‘দুর্বল গণতন্ত্রের দেশ’ আখ্যাও দেওয়া হচ্ছে। এতে দেশপ্রেমিক মানুষের আঁত আহত হতে পারে। কিন্তু তাঁর দেশপ্রেম যদি সংবিধানের প্রস্তাবনাকে কার্যকর করার ক্ষেত্রের দিকে দৃষ্টি দেয়, তিনি দেখবেন, শক্তিশালী রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভাবে ‘অবাধ নির্বাচনের পরিবেশ’ গড়ে তোলা যায়নি, ‘নাগরিক স্বাধীনতা’র অভাব রয়েছে, ঘোষিত ‘মানবাধিকার’ও বিপন্ন। আর এই বিষয়গুলিকে (যা উন্নত গণতন্ত্রের মানদণ্ড) যদি তিনি মান্যতা দেন, তাহলে একজন গণতান্ত্রিক মানুষ হিসাবে, একজন ভোটার হিসাবে তিনি সরকারের কাছে জবাব চাইবেন প্রত্যক্ষত এই মর্মে যে, সরকার অসাংবিধানিক রাজনীতি করছে কেন? অথবা সরকার আইনের শাসন দিতে ব্যর্থ হচ্ছে কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুব সহজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। কেবল সংবিধানের প্রস্তাবনা মতে সকল নাগরিককে ‘সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়’ দেওয়া শাসকশ্রেণীর পক্ষে সম্ভব না। নাগরিকের স্তরভেদে সমস্ত রকমের অসাম্য বজায় রাখাই তার ‘ট্র্যাডিশনাল পলিটিক্স’। ব্রিটিশের কাছ থেকে পাওয়া উত্তরাধিকার। বিশেষ করে পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও রাজনীতি তাদের স্বার্থেই এই কাজটি করে চলেছে!  এটা জানার পর একজন দেশপ্রেমিক মানুষ নিশ্চয়ই অসাংবিধানিক রাজনীতির ধরণ, অন্তত ‘সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়’ দিতে না-পারার কার্যকারণ জানতে-বুঝতে চাইবেন। যদি চান, দেখতে পাবেন, এই কাজের দুটি ধরন, অর্থনীতির দিক থেকে মানুষকে ‘বঞ্চনা’ করা ও রাজনীতির দিক থেকে মানুষকে ‘যুদ্ধবাজ’ তৈরি করা। এই বঞ্চনা ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে আমেরিকার ‘স্বাধীনতার যুদ্ধ’ থেকে ভারতের ‘স্বাধীনতাযুদ্ধ’ (উভয় যুদ্ধ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে) পর্যন্ত যে ইতিহাস, তা মনে রেখে ও দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধের (‘রক্তাক্ত রাজনীতি’র) যে ‘সাহিত্য’ আমাদের সামনে তুলে ধরেছে, যা দলিল হয়ে আছে (U N Charter, 1945 ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ)— দলিল দুটির পাঠ থেকে তিনি দেখবেন, আমরাও দেখব যে, যুদ্ধবিরোধী ও মানবাধিকার-ধারণা, দু-ই ভারতের সংবিধান  ধারণ  করেছে। কিন্তু অসাংবিধানিক রাজনীতির কর্মসূচি ঘোষিত মানবাধিকার (মানুষের সহজাত মর্যাদা ও সমান অধিকার) ও সাংবিধানিক (= গণতান্ত্রিক) অধিকার থেকে মানুষকে বঞ্চিত করে চলেছে…

অন্তত তিনটি ধর্মের বিশ্বাসী মানুষেরা জানেন, ‘বঞ্চনা হত্যার অধিক’ ! ‘বঞ্চনা করা পাপ’ ! এই ‘বিশ্বসীরাই’ বিশ্ব অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করছেন, যেমন আমেরিকা, তাদের ডলারে ঈশ্বরে  আস্থা ঘোষণা  করা হয়েছে যেন ঈশ্বরে নিহিত শক্তির আধার ডলার…

তবু মানবজাতির ইতিহাস বঞ্চনার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়ে চলেছে। বিগত বিশ্বযুদ্ধ দুটির কার্যকারণ বিচার বিশ্লেষণ করে ‘রাজনৈতিক প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরা’ এই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, “মানবাধিকার সমূহের অসম্মান ও অবজ্ঞার ফলেই পৃথিবীতে বর্বরোচিত কার্যকলাপ সংঘটিত  হয়ে চলেছে…”-এর অর্থ, তখনকার কার্যকারণ আজও ‘অ্যাক্টিভ’। উনিশ শতকে সাধারণ মানুষের মনে যে আকাঙ্ক্ষা গড়ে উঠেছিল, —বিদ্রোহের পথে ভয়-অভাবমুক্ত স্বাধীন এক বিশ্বের অভ্যুদয় ঘটানো সম্ভব; বঞ্চনার নিরিখে সেই আকাঙ্ক্ষা, অতএব, এই একুশ শতকেও ‘এগজিস্ট’ করছে… এবং পৃথিবী আজ অঘোষিতভাবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ-র  কবলে। একই সঙ্গে  বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানবাধিকার– এক কথায় ‘রাইট টু লাইফ’ বিপন্ন— দেশ-দেশ (যুদ্ধরত দেশগুলি), দেশের অভ্যন্তরে, যেমন আমাদের দেশে— এই আবহমান যুদ্ধ-পরিবেশে ‘মানবাধিকার সমূহের অসম্মান ও অবজ্ঞার ফলে’ প্রান্তিক মানুষের যে বিদ্রোহ তা রাজনৈতিক, শর্ত সাপেক্ষে অধিকারও বটে, আইনি অধিকার। “আইনের শাসন দ্বারা মানবাধিকার সমূহ সুরক্ষিত হওয়া প্রয়োজন”— এই জরুরি কাজটি না করতে পারায় মানুষ বিদ্রোহের পথ বেছে নিয়েছে, সেই পথই “শেষ পন্থা” হয়ে উঠেছে বার বার।

রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে লঙ্ঘিত হয়েছে আইনের শর্ত। ‘রাষ্ট্র’ নিজেকে আক্রান্ত মনে করে বিদ্রোহীদের দেশের অভ্যন্তরীণ “থ্রেট” ঘোষণা করে মোকাবিলা করছে ‘সন্ত্রাসবাদী’ আখ্যা দিয়ে… বঞ্চিত জনগণের ‘অধিকার আন্দোলন’কে সরকার-বিরোধী ‘রাজনীতি’ ধরে নিয়ে নানান আইন প্রয়োগ করা হয়। এর বিরুদ্ধে ‘গণতান্ত্রিক অধিকার’ রক্ষার জন্য নানা সংগঠন গড়ে উঠেছে। (উদাহরণ : এ পি ডি আর, সেভ ডেমোক্রেসি ইত্যাদি)। কিন্তু গণতান্ত্রিক অধিকার উপভোগ করার পরিবেশ তৈরির সদিচ্ছা সরকারের নেই, এমনকি দেশপ্রেমিক মানুষেরও আছে বলে মনে হয় না। খুব সাম্প্রতিক উদাহরণ নির্বাচন কমিশনের S I R উদ্যোগ। বিষয়টি ‘নাগরিত্ব নির্ধারণের’ উদ্দেশ্য ‘ভোটার’ তালিকা প্রস্তুত করা। এ ব্যাপারের কোনও সংশয় নেই। কিন্তু প্রক্রিয়া-প্রকরণ এমন হয়েছে যাতে ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়িয়েছে  নাগরিকত্ব প্রমাণের। এইখানে ‘ভয়’ রয়েছে। বেনাগরিক হওয়ার ভয়।

‘নাগরিক’ মননকে হিন্দু-মুসলমানে ভাগ করা হয়েছে। ভয়ের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ব্যবহার মানবাধিকার হরণের পরিবেশ তৈরি করেছে। বিশেষ করে মুসলমান বেনাগরিকের মানবাধিকার বিপন্ন। মিডিয়াপ্রচার— ‘তারা পালিয়ে যাচ্ছে’,  তাদের বের করে দেওয়া হবে’; ‘বাংলাদেশীরা হুমকি দিচ্ছে’, ‘যদি মুসলমান হও ফিরে যাও নইলে তুলে ফেলার ব্যবস্থা হবে’– এটা আতঙ্ক তৈরি করার রাজনৈতিক প্রচার…

একজন দেশপ্রেমিক মানুষ তিনিও মানবাধিকার-বিরোধী অবস্থান নিতে পারেন, বেনাগরিক মুসলমান তখন তাঁর শত্রু— এই দৃষ্টিভঙ্গি মানবাধিকার ধারণা, এমনকি যথার্থ গণতান্ত্রিক অধিকার সম্পর্কে যথেষ্ট ‘শিক্ষিত’ না হওয়ার ফলে যে গড়ে উঠেছে,  এ ব্যাপারে  কোনও সংশয় নেই। এবং এও বলা যায় যে, তিনি মানবজাতি সম্বন্ধে ভারতের আবহমান আদর্শ “বসুধৈব কুটুম্বকম” বিস্মৃত হয়েছেন। যদি না হতেন, তা হলে তিনি অবগত থাকতেন, যে কোনও দেশে বসবাসকারী ব্যক্তির বেঁচে থাকার অধিকার আছে, তা সে নাগরিক হোক বা না হোক। বেনাগরিকের সঙ্গে শোষণ ও বৈষম্যমূলক আচরণ করা যাবে না (ডিটেনশন ক্যাম্পে যা হবে, প্রচার করা হচ্ছে)—এ সবই মানবাধিকার-আইন মোতাবেক।

মানবাধিকারের বিষয়টি মনে না রেখে প্রত্যেক রাষ্ট্র বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক কার্যকলাপের পরিবেশ সৃষ্টির উদ্যোগ না নিলে তথাকথিত অনুপ্রবেশ সমস্যা গণতন্ত্রকে আরও দুর্বল করে তুলবে– উনিশ-বিশ শতকের ‘সাম্রাজ্যবাদী’ রাজনীতির কোনও নতুন ‘ইজম’ মূলত বিশ শতকের সমস্যাকে, যা এই একুশ শতকে সংকটের রূপ নিয়েছে, তা না মিটিয়ে উন্নত গণতান্ত্রিক মানুষ তৈরি করবে, এমন সম্ভাবনা বৈষম্য-বিদ্বেষহেতু কম, যদি না মানবাধিকার-শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ সাংবিধানিকভাবে মানবাধিকার-সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারেন ! এ দায়িত্ব আমাদের “WE THE PEOPLE OF INDIA”-র সকল মানুষের…

আসুন  কথা বলা যাক !


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top