উপেনমামা মরে গেল। অপঘাতে, অকালে মৃত্যু। উপেন্দ্রনারায়ণ একটি গাছের নাম। সে আজ অনেক বছর আগের কথা। সামাজিক বনসৃজনের তখন চল হয়নি, প্লানটেশন ফিক্সড্ ডিপোজিট স্কীম তো নয়ই। তবুও ঘটা করে বৃক্ষরোপন হয়েছিল। প্রতিষ্ঠাত্রী যে মহিলা, তিনি আমার দিদিমা। তাঁর ভাষায় ‘গাছ পিতিষ্ঠে’ করা। আমার মায়ের মুখে শুনেছিলাম, এই গাছ প্রতিষ্ঠার বছর গ্রামের ছোটলোক, ভদ্রলোক সবাইকে পাত পেড়ে খাওয়ান হয়েছিল। লোক যে ছোট, বড় হয় সেকথাও সেই প্রথম শুনি।
এই দিদিমা শুধু আমার কাছেই নয়, চেনা জানা সকলের কাছেই ছিল এক ‘চরিত্র’ বিশেষ। জীবন ছিল বৈচিত্রময়। নাম নয়ন, বাল্যবিধবা। তাঁর একমাত্র মনুষ্য সন্তান আমার মা ‘মণি’। কন্যা মণির জন্ম হওয়ার পরই স্বামীকে হারাতে হয়। শ্বশুরের ভিটেয় কোন উপদ্রব ছিল না, কিন্তু বৈধব্যের পর আর সেখানে থাকতে চায়নি। শ্বশুরবাড়ি ছাড়ার আরও একটা কারণ ছিল, তার দাদার আদর। দাদা বৌদি সসম্মানে তাঁকে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করেছিল বাপের বাড়িতে। দিদিমার এই দাদা অর্থাৎ আমাদের সম্পর্কের এই দাদু’টি ছিলেন প্রাইমারী স্কুলের হেডমাষ্টার। তাঁর স্নেহের এই বোনটি বাল্যবিধবা বলে কোনরকম হীনমন্যতায় যাতে না ভোগে তারজন্য তিনি ছিলেন সদাই সচেষ্ট।
সে আমলে পাণ্ডাদের সঙ্গে সব বৃদ্ধারা যখন দল বেঁধে তীর্থে যেতেন বয়স কম হলেও বোনকে তাঁদের সঙ্গে পাঠাতেন। বলতেন, যা ঘুরে আয়। দেশভ্রমণে মন উদার হয়। একবার বোন অন্য বয়স্কাদের চাপে পড়ে প্রয়াগ থেকে ছোটচুল কেটে ফিরল, তখন তিনি নাকি খুব রেগে গিয়েছিলেন। মায়ের কাছে শোনা সে সব কথা। সবসময়ই বোনকে কোনও না কোনও কাজে ব্যস্ত রাখতেন। অনেক কাল পরেও আমি যখন মামার বাড়ি গেছি কুলুঙ্গিতে ‘নারীর মূল্য’ বা কুমুদিনীকে আবিষ্কার করেছি। বিশাল কলের গানে কে. এল. সায়গল-কৃষ্ণচন্দ্রের গান শুনেছি। আর এই দাদুরই উৎসাহে দিদিমা সেই কবে গাছ পুঁতে ঘোষণা করেছিল এই তাঁর পুত্র সন্তান, উপেন্দ্রনারায়ণ। আমি যখন ছোট, তখনই গাছ মামার বয়স কুড়ি। দিদিমা যেখানেই থাকুক, তীর্থে অথবা মেয়ের কাছে, বোশেখ মাসে গ্রামে থাকবেই। প্রচণ্ড খরায় যখন মাটি ফেটে চৌচির হত, দিদিমা সারা মাস ধরে সকাল আর সন্ধ্যেয় একবার করে জল ঢালত। পার্বনটির নাম ছিল ‘গাছে জল দেওয়া’, রেকাবীতে থাকত বাতাসা, সাঁঝে জ্বলন্ত প্রদীপ। আমরা ছোটরা দাঁড়িয়ে থাকতাম প্রসাদের জন্য।
সময় এরকমই গুটি গুটি পায়ে পার হয়ে যায়। দিদিমার বয়স বাড়ে। এক সময় তাঁর সকল কাজের কান্ডারী প্রিয় দাদা এবং পরে বৌদি মারা যায়। গ্রামে থাকে তাঁর একমাত্র ভাইপো এবং তাঁর স্ত্রী এবং তাদের ছেলেমেয়ে। অর্থাৎ আমার মামা, মামি ও মামাতো ভাইবোনেরা। ‘মা’ চিরকাল শহরেই থাকত। তাই দিদিমা তাঁর গাছ সম্পর্কিত ইতিকর্তব্যের ভার ভাইপো বৌকেই দিয়ে যায়। বলত, দেখ ‘বৌ’, মণি তো ফি বছর বোশেখ মাসে আসবে না, আমি চলে গেলে তুই যেন ঐ সময় উপেন্দ্রকে জল দিস। মাকে কড়ার করে নিয়েছিল, দিদিমা যদি আগে মরে যায় তাহলে ছরাদের চিঠিতে প্রথমেই যেন ভাগ্যহীন পুত্র ‘উপেন্দ্রনারায়ণ’ নাম লেখা হয়। আর দ্বিতীয় শর্ত ছিল, তাঁর অবর্তমানে উপেনেরও যদি অকালে মৃত্যু হয় তাহলে যেন গাঁয়ের সব ঘরের একজন করে পাকা খাবার খাওয়ান হয়। দিদিমার স্থির বিশ্বাস ছিল, যদি গাছ মামার মৃত্যু হয় তাঁর আগে, ইহলোকে না হোক পরলোকে তাঁর সন্তান ক্রিয়াকর্ম্মাদি করবে।
বয়সকালে শ্রাদ্ধ, লোক খাওয়ানো নিয়েই বেশি চিন্তা করত দিদিমা। গ্রামের ছেলে ছোকরারা রাগাত ‘ও’ নয়নবুড়ি তোমার উপেন মরলে ছেরাদ্দ করবে কে?’ লাঠি নিয়ে তেড়ে যেত বুড়ি। ‘মরবে তোর বাপ’। গ্রামের বড়রা ছোটদের সরিয়ে নিয়ে বলত, ‘ও মা রাগ কর কেন?’ বুড়ি বলত, ‘দেখনা বাছা, অলুক্ষুণে কথা কেবল, আমি থাকতে উপেনের মরার কথা বলে’। শুধু মৃত্যু কেন সামান্য কিছু গাছের ক্ষতি হলেও ক্ষেপে যেত সে। একবার কয়েকজন ছেলে গাছে উঠে ছোট ছোট ডাল কাটছিল। পাশেরই দুলে পাড়ার তারা। বোধহয় ছাগল-টাগলকে খাওয়ানোর জন্য। খবর পেয়েই দৌড়ে গিয়েছিল নয়ন মা। গালে উচ্ছন্ন করে দিয়েছিল তাদের। বড়দের শাসিয়ে বলে এসেছিল, তারা যদি ভবিষ্যতে উপেন্দ্রনারায়ণের অঙ্গচ্ছেদ করতে তাদের ছেলেদের না মানা করে তাহলে ওখানেই সে গলায় দড়ি দেবে। এই শাসানিতে কাজও হয়েছিল।
এবার বৈশাখে প্রায়ই অদ্ভুত ধরনের ঝড় উঠছিল। সাধারণতঃ বৈশাখের কয়েকটা দিন আমরা মামার বাড়ির গ্রামেই থাকি। যেন বাৎসরিক উৎসব। মায়ের বয়স হওয়া সত্বেও যায়। কারণ দিদিমা বেঁচে থাকাকালীন যাবেই। এরকমই এবারের এক দুর্যোগে উপেন মামা সমূলে উৎপাটিত হল। সবাই দৌড়লো পুকুর ঘাটের কাছে। দিদিমা ইদানিংকালে চলঃশক্তিহীন। মা তার মায়ের কানে মুখ রেখে জোড়গলায় শোনাল ভায়ের মৃত্যু সংবাদ। বৃদ্ধা পাষাণবত। একপাশে দুলে পাড়া, অন্যপাশে মসজিদের পাঁচিল একধারে পুকুর ঘাট ঘাট অন্যধারে রাস্তা। পুকুর ঘাট ক্ষয়ে যাওয়ায় এবং হঠাৎ দুর্যোগেই বোধহয় এই অকাল মৃত্যু। অশ্বত্থ গাছ হত। গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ পুরোহিত মশাইকে ডাকা হল, তিনি বিধান দিলেন অপঘাতে মৃত্যু, মঙ্গলবার দোষ পেয়েছে। অতএব ক্রিয়াকর্মে খরচা যৎকিঞ্চিৎ বেশিই হবে। সবাইকারই ধারণা বুড়ির টাকা পয়সা আছে, পুত্রের অমঙ্গল ইহকাল বা পরকালে কোনও ব্যাপারেই তা হোক সে চাইবে না। প্রাজ্ঞ মোল্লাদের একজন দাবী করলেন গাছের ভারে পাঁচিলটা ভেঙ্গে পড়েছে সারিয়ে দেওয়া হোক। মপেডে চেপে শহরে ওকালতি করতে যাচ্ছিল ছোকরা ইয়াসিন আলি। সে বলল, ঝড়ে গাছ পড়ে যাওয়া গাছের মালিকের কোনও ‘গুনাহ’ নয়। যে গাছ এতদিন ছায়া দিয়েছে-প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করেছে তার দায়িত্ব আমাদের সবারই। শুধু বাড়ির লোকই খরচা বহন করবে কেন? আমরা চাঁদা তুলে পাঁচিল সারাব। এদিকে, কেউ বলল গাছ কাটা যাবে না, পোড়াতে হবে। কেউ বলল পুঁতে দিতে হবে। অনেক বিতন্ডার পর যখন স্থির হল শেষ মতামত গাছের মা-ই দেবে, তখন মামিমা বা মায়ের ওপর ভার পড়ল দিদিমার সঙ্গে কথা বলার। পুত্রশোকে বৃদ্ধার বধিরত্ব যেন আরও বেড়েছে। সমগ্র পরিস্থিতি, মতামত, তাঁর কর্ণগোচর করাতে এবং বিধান জানতে অনেক চিৎকার চেঁচামেডির প্রয়োজন হল। সবাইকে অবাক করে উপেন্দ্রনারায়ণের মা জানাল, মানুষ মরে গেলে যেমন ডাক্তারদের কাজে লাগে সেরকম উপেনের দেহ কাজে লাগুক। ছেলেরা বসে বাঁচবে। গাঁয়ের দু-একটা টেবিল বেঞ্চি করে দেওয়া হোক।
সবাইকার কথাটা মনঃপুত হল না। তবুও গাছের মালিকের কথা রাখতে হল। মনুষ্যবৎ পালিত, তায় দোষ পাওয়া গাছ। ঘটা করে শ্রাদ্ধ শান্তি করে দোষ কাটানো হল। গোড়াটা রেখে মাটি চাপা দিয়ে বাকিটা কেটে নেওয়া হল। সারা বাড়িময় দু’দিন ধরে লুচি ভাজার মৌ মৌ গন্ধ। দু’দিন উপোষ করে জুল ভুল চোখে বৃদ্ধা মা তার পুত্রের অন্তিম ক্রিয়াকর্ম দেখল।
শ্রাদ্ধ শেষ হতে যে দু’একদিন। আবার প্রবল ঝড়-বৃষ্টি শুরু হল। হঠাৎ হঠাৎ দমকা হাওয়া আর বিদ্যুতের ঝলকানি। যেন গ্রহান্তর থেকে ছিটকে আসা ঝড় আবার কিছুক্ষণ পরেই শুনশান। আবার ঝড় আবার বৃষ্টি। সেদিনও সারারাত্রি ঝড়ের পর সকালে আকাশ পরিষ্কার। হালকা হাওয়ার মাতন। লক্ষণ কৈবর্ত্যও দৌড়ে এল সাত সকালে। পুকুরে জাল ফেলতে গিয়েছিল। উঠোনে এসে চিৎকার শুরু করল, ‘নয়ন পিসি কৈ গো, তোমার নাতি এসেছে দেখবে এস্।’ সবাই আমরা অবাক হলাম তার কথায়। লক্ষণ হাঁপাতে হাঁপাতে জানাল, দু-দিনের বৃষ্টিতে যেখানে উপেন্দ্রনারায়ণের বাঁধান বেদী ছিল সেখানে ফুটফুটে একটা চারাগাছ হয়েছে। দেখতে গেলাম যারা পারলাম। অপূর্ব সে দৃশ্য। বট অশ্বত্থ তো কতই গজায় কিন্তু এ যেন এক প্রাণের মাতন। ফিনফিনে হাওয়ায় একাকী দুলছে সে। কচি পাতায় দিনের প্রথম সূর্যের আলো। গোড়ের জলে হাঁসের স্বচ্ছন্দ বিচরণ, কোথায় যেন পাখির ডাক। এ সুখবর দিতেই হবে নয়ন মাকে। ছুটে যাওয়া হল তাঁর ঘরে। বয়স হয়ে যাওয়ায় ঘরের আগল থাকত না। দরজা ঠেলতেই পুরনো পুরু দরজা ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে খুলে গেল। বিছানা খালি। কাষ্ঠবত মেঝেয় পরে আছে ঠিক উপেন্দ্রনারায়ণের মতনই তার মা।
অভিযান সাময়িকী, নভেম্বর ১৯৯৭ সংখ্যায় প্রকাশিত



