এরকুল: (চোখ মটকে) এই এতক্ষণে মঁসিয়ে বুঁকের মনোবাসনা পূর্ণ হবে। এবার ইতালীয়টির পালা।
ডাক পেয়ে ইতালীয় মি. ফসকারেল্লী এসে হাজির হলেন। সুঠাম চেহারার, চোখেমুখে শিশুর সারল্য, সঙ্গে একমুখ উজ্জ্বল হাসি।
এরকুল: (পাসপোর্ট হাতে নিয়ে) আপনি আন্তোনিও ফসকারেল্লী?
ফসকারেল্লী: ইয়েস স্যার।
এরকুল: আপনি এখন আমেরিকান নাগরিক, তাই না?
ফসকারেল্লী: হ্যাঁ। ব্যবসাসূত্রেই আমেরিকায় থাকা এবং সেই সূত্রেই নাগরিকত্ব।
এরকুল: আপনি ফোর্ড মোটর কোম্পানির একজন সেলস এজেন্ট?
ফসকারেল্লী: হ্যাঁ, আমি সেলস-এর দিকটাই দেখি। এই ইউরোপ এবং এশিয়ার এই দিকটাই আমার এলাকা। একটু বেশি ঘুরতে হয়, কিন্তু বিরাট সাড়া পাচ্ছি। গাড়ির বাজারে এদিকটায় আমরাই একচেটিয়া। কোম্পানিরও লাভ হচ্ছে, সঙ্গে আমারও, বুঝলেন না (বকেই চলতেন হয়তো)।
এরকুল: বেশ বেশ, কত বছর হলো আপনার আমেরিকায়? বছর দশেক?
ফসকারেল্লী: হ্যাঁ, তা তো হবেই। বুঝলেন, সেদিনটা এখনো চোখে ভাসে, যেদিন ব্যবসার ধান্দায় নিজের দেশ ছেড়ে আমেরিকায় পাড়ি দিয়েছিলাম। সেদিন মা এবং ছোট বোনটা—–
এরকুল: ঠিকই, মনে পড়ারই কথা। যা বলছিলাম, খুন হওয়া আমেরিকান ভদ্রলোকের সাথে কখনও কি আপনার দেখা-সাক্ষাৎ আমেরিকায় হয়েছিল?
ফসকারেল্লী: না না, কখনও হয়েছে বলে তো মনে পড়ছে না। কিছু যদি মনে না করেন তো বলি, এই সেলসের পেশার কারণে এমন অনেক দামি ঝকঝকে পোশাক-আশাক পরা সাহেব-সুবোর সাথে মেলামেশার সুযোগ হয়েছে, তাদের অনেকেরই কিন্তু উপরে এক আর ভিতরে আর এক, এক-একজন ভণ্ডশিরোমণি। এই ভদ্রলোককে কিন্তু আমার খুব একটা সুবিধের মনে হয়নি।
এরকুল: আপনি হয়তো ঠিকই ধরেছিলেন। খুন হওয়া লোকটি হলেন কুখ্যাত খুনি ও অপহরণকারী কাসেট্রি।
ফসকারেল্লী: দেখছেন মশাই, এই শর্মার লোক চিনতে ভুল হয় না। হয় না বলেই মশাই সেলসের লাইনে এত কম্পিটিশনের বাজারেও এতদিন করে কর্মে খাচ্ছি।
এরকুল: আপনি কি বেশ কিছুদিন আগের গোটা আমেরিকা তোলপাড় করা আর্মস্ট্রং কেসের কথা শুনেছেন?
ফসকারেল্লী: হুঁ। উই। সঠিক মনে করতে পারছি না। আচ্ছা, ওই সেই একটি ছোট্ট মেয়ে অপহরণ হয়ে যাওয়া ওই কেসটার কথা কি বলছেন?
এরকুল: হ্যাঁ। ওই ট্রাজিক ঘটনাটার কথাই বলছি।
ফসকারেল্লী: আজব দেশ মশাই, আমেরিকা। এসব এখন আকছার হচ্ছে। সত্যিই ঘটনাটা খুব ট্রাজিকই।
এরকুল: আর্মস্ট্রং পরিবারের সাথে কি আপনার কখনও আলাপ-পরিচয়ের সুযোগ হয়েছিল?
ফসকারেল্লী: না না, তেমনটা মনে পড়ছে না। তবে এই গাড়ি বিক্রির সুবাদে কত পরিবারের সাথেই যোগাযোগ ঘটে। এই যেমন ধরুন না, গত বছর আমি একাই তো বেচেছিলাম প্রায়—–
এরকুল: মি. ফসকারেল্লী, দেখুন, আমাদের হাতে সময় বেশি নেই, যদি একটু কাজের কথায় আসেন।
ফসকারেল্লী: সরি, মাপ করবেন। হ্যাঁ, বলুন, কী জানতে চান?
এরকুল: কালরাত্রে ডিনারের পর ঠিক কী কী করেছিলেন?
ফসকারেল্লী: ডিনার শেষে ডাইনিং হলেই যতক্ষণ সম্ভব সময় কাটালাম। ডিনার টেবিলে আমেরিকান ভদ্রলোকটির সাথে গল্পগুজব করছিলাম। উনিও সেলসটাই দেখেন, টাইপরাইটারের রিবন। এরপর নিজের কামরায় ফিরলাম, দেখলাম কামরা ফাঁকা। আমার সঙ্গী ইংরেজ ভদ্রলোকটি বোধ হয় ওর মনিবের খিদমতে গিয়েছিল। ঘরে ফিরল দেখলাম, তোম্বা মুখ নিয়ে। আজব জাত মশাই এই ইংরেজগুলো, একদমই আলাপী নয়। হ্যাঁ, চেনাজানার বাইরে মুখই খোলে না। ও এসে দেখলাম আড়ষ্ট হয়ে একটা বই হাতে সিটে বসে পড়ল। আর কী, এরপর কন্ডাক্টর এসে দুজনের বিছানা পেতে দিল।
এরকুল: ৪ নং আর ৫ নং, তাই না?
ফসকারেল্লী: ঠিক তাই। আমার উপরের বার্থটা আর ওর নিচেরটা। আমি নিজের বার্থে গিয়ে কিছুক্ষণ ধূমপান করলাম, তারপর একটা বই নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলাম। নিচের লোকটির বোধ হয় দাঁত ব্যথা হচ্ছিল। একটা বোতল থেকে ঝাঁঝালো জিনিস মুখে দিয়ে শুয়ে পড়ল। আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লাম। তবে ওই বেচারি বোধ হয় সারারাতই যন্ত্রণা ভোগ করেছে। যতবার ঘুম ভেঙেছে, ওর কাতরানোর আওয়াজ পেয়েছি।
এরকুল: ওই ভদ্রলোকটি কখনও কামরা ছেড়ে বেরিয়েছিলেন বলে আপনার মনে হয়?
ফসকারেল্লী: মনে হয় না। দরজা খুলে বেরোলে তো করিডরের আলো কামরায় ঢুকবে, সেক্ষেত্রে আমার ঘুম ভেঙে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। আমার ঘুম বেশ পাতলা, তাছাড়া আন্তর্জাতিক সীমানা। কাস্টমস চেকিং, এসব একটা ব্যাপার আছে না, সজাগ থাকতেই হয়—
এরকুল: ওর মনিব সম্পর্কে আপনার সাথে কি কোনো আলোচনা—–?
ফসকারেল্লী: বললাম না, এরা আড্ডা মারতেই জানে না, কী গল্প করবে?
এরকুল: আপনি ধূমপান করেন? পাইপ? না সিগার বা সিগারেট—?
ফসকারেল্লী: না না, আমার শুধু সিগারেটই চলে।
এরকুল: (ওর দিকে একটা সিগারেট বাড়িয়ে) আপনি কি কখনও শিকাগো গেছেন?
ফসকারেল্লী: বহুবার। ফ্যান্টাস্টিক সিটি। তবে নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন বা ডেট্রয়েট এগুলোর ধারেকাছে আসে না। আপনি কি কখনও ওদেশে গেছেন? চলে আসুন একবার, বেশ লাগবে।
এরকুল: (ওর দিকে একটা কাগজ বাড়িয়ে) দয়া করে যদি এখানে আপনার নাম-ঠিকানা ইত্যাদি লিখে দেন।
ফসকারেল্লী: আমি তা হলে আসি, আশা করি আমাকে আর প্রয়োজন নেই। ট্রেন যে আবার কখন চলতে শুরু করবে। ওদিকে ইতালির মিলানে একটা বড় অর্ডারের চান্স আছে। সেটা না আবার ফস্কায়! (বেরিয়ে গেলেন)
এরকুল মঁসিয়ে বুঁকের দিকে তাকাতেই—
বুঁ: লোকটা প্রায় দশ বছর আমেরিকায় আছে। তাছাড়া এই ইতালীয়গুলো দেখছেন? কেমন ষণ্ডামার্কা এবং একই সঙ্গে রগচটা, অল্পতেই ছুরি-বন্দুক চালায়। তাছাড়া বানিয়ে মিথ্যা বলতেও এরা ওস্তাদ।
এরকুল: হয়তো আপনি সবই ঠিক বলছেন, কিন্তু মঁসিয়ে, আমি এখনো এই লোকটির বিরুদ্ধে যাওয়ার মতো একটাও সাক্ষ্য পাইনি।
বুঁ: আরে রাখুন মশাই আপনার সাক্ষ্য। আপনার মন কী বলছে সেটাই বলুন? খুনের পিছনে মনস্তত্ত্বের একটা বড় ভূমিকা আছে, ঠিক কি না?
এরকুল: দেখুন, আমি একমত যে মাথাগরম হয়ে গেলে ইতালীয়রা একটু হাত-পা চালিয়ে থাকে। কিন্তু এই হত্যা হঠাৎ নয়। ঝোঁকের বশে এই মার্ডার করা হয়নি। এই খুন অত্যন্ত পরিকল্পিত। দীর্ঘমেয়াদি পাকা মাথার পরিকল্পনা আছে এই খুনের পিছনে। এটা কোনো ইতালীয় বা ল্যাটিন আমেরিকান টাইপের দাঙ্গা-ফরিয়াদের খুন নয়। আমার তো মনে হচ্ছে, এই খুনের পিছনে আছে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কোনো একটি অ্যাংলো-স্যাকসন মাথা।
(ক্রমশ)
আগের পর্বের লিঙ্ক মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস- পর্ব – ১৭



