—দাদা। ওর সঙ্গে পার্টির লোকজনের বেশ দহরম মহরম আছে। ওকে একবার তুমি বললেই হবে। ও এখনও তোমাকে খুব মানে। মনে আছে, আমার পড়ার জন্য ও তোমাকেই বলেছিল।
তা আবার মনে থাকবে না দেবাশিষের! খুব মনে আছে। সুমনাকে বলল—সব মনে আছে। কিন্তু ওকে পাব কোথায়?
সুমনা দেবাশিষকে হাসপাতাল মোড়ে সোমেনের দোকানের ঠিকানা দিল। দেবাশিষ সুমনাকে একবারও জিজ্ঞাসা করল না, সোমেনের কাজের ব্যাপারে। সুমনাও কিছু বলল না।
দেবাশিষের মা একটা প্লেটে কিছু মিষ্টি নিয়ে এসে সেন্টার টেবিলটায় রাখল। সুমনা প্রণাম করতে যেতে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে মা বলল—এখনও সেই একইরকম মিষ্টি আছিস।
—তুমিও তো জেম্মা একটুও বদলাও নি।

সোফায় বসে শুরু হল দেবাশিষের মায়ের সঙ্গে সুমনার কথা। কত পুরোনো কথা বেরিয়ে আসতে লাগল! কখনও দুজনের মুখেই হাসি, কখনও দুজনেই গম্ভীর। দেবাশিষ দুজনকে চুপ করে দেখে যাচ্ছিল। দেখছিল, বাড়ি কেমন করে ঘর হয়ে ওঠে।
সব শুনে সোমেন দেবাশিষকে বলল—তোমাদের যেটা ভাল মনে হবে, ঐ জায়গায় সেটাই করবে দেবাদা। আমি প্যাটেলকে বুঝে নেব।
—তোর কোনো অসুবিধে হবে না তো?
—আমার কী অসুবিধে হবে? ওর নাড়ি আমার হাতে ধরা আছে। আমি ওর সব দু-নম্বরি ধান্দার খবর রাখি। তাছাড়া ঐ যে লোক লাগিয়ে রাতের অন্ধকারে বাড়িটার ভিত আলগা করে দিত, তার প্রমাণ আমার কাছে আছে। সুমনা সব জানে।
দেবাশিষ এতক্ষণে বুঝতে পারল, কী করে সুমনা জোর দিয়ে বাড়ি ভেঙে পড়ার পিছনে প্যাটেলের হাত থাকার কথা বলে এসেছে। সে বলল—সৌর ফিরে আসুক। ও এলেই সবাই মিলে বসে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নেব।
—একটা কথা বলব দেবাদা?
—নিশ্চয়ই বলবি।
—যেদিন তোমরা বসবে, সম্ভব হলে আমাকে আর সুমনাকে ডেকো। ঐ বাড়িটা আমাদের কাছে কম আবেগের ছিল না!
—বেশ, তোরাও থাকবি। এবারে তবে আমিও একটা কথা বলি তোকে?
—বাড়িতে ফিরে আয়। কাকু-কাকিমার বয়স হচ্ছে। এই বয়সে তাদের কষ্ট দিস না।
—যেতে খুব ইচ্ছে করে। বিশ্বাস করো। কিন্তু ওরা আমাদের মেনে নেবে না দেবাদা।
—নিতে বাধ্য। তোদের মেয়ের জন্যেই তোদের মেনে নেবে। মেয়েটাকে নিয়ে আজ সন্ধেবেলায় বাড়িতে আয়। আমিও থাকব।
—দেবাদা, ভেবে চিন্তে বলছ? হিতে বিপরীত হয়ে যাবে না তো?
—তুই আয় তো আগে। তারপর যেমন বলে দেব, তেমন করবি।
মাকে আর সুমনাকে আগে থেকেই সব বলে রেখেছিল দেবাশিষ। সন্ধেবেলায় সুমনাদের বাড়িতে গিয়ে ওরা যখন সবাই গল্পগুজব করছে, তখনই সোমেন তার স্ত্রী, কাবেরি আর মেয়েকে নিয়ে এল। ওদের দেখেই সুমনার মা, বাবা ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। তাড়াতাড়ি ওখান থেকে চলে যাওয়ার চেষ্টা করতেই দেবাশিষের মা বলল—না, তোমরা এখান থেকে কোথাও যাবে না। সমস্যা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকলে, সমাধান আশা করা যায় না। এতদিন তো পেরিয়ে গেল। আর কেন? এমন একটা মিষ্টি নাতনিকে ছেড়ে আছ কী করে তোমরা?
সোমেনের মেয়েকে কাছে টেনে নিয়ে দেবাশিষের মা বলল—তোর নাম কী রে মা?
—শ্রীতমা। বাবা, মা তমা বলে ডাকে।
—আমরা কিন্তু মিষ্টি বলে ডাকব। কী পড়ছিস?
—সামনের বার আইসিএসই দেব।
—ওরে বাবা! এ তো লেডি গো!
দেবাশিষ সুমনার মা, বাবাকে দেখে যাচ্ছিল। দেখছিল, নাতনির জন্য তাদের চোখ-মুখ দিয়ে কেমন স্নেহ, মায়া, মমতা ঝরে পড়ছিল। মা যে ইচ্ছা করেই সোমেনের মেয়েকে বেশি আদর করছিল, তাও বেশ বুঝতে পারছিল। সে সোমেনকে ইশারা করতেই সোমেন বৌকে নিয়ে বাবা, মায়ের পায়ের কাছে বসে পড়ল।
—আর পারছি না মা। তোমাদের থেকে দূরে অনেক থেকেছি। অনেক অভিমান, রাগ দেখিয়েছি। আর নয়। তোমাদের সঙ্গে এবারে থাকতে দাও বাবা। তোমাদের নাতনি সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হচ্ছে। ও তোমাদের আদর পাচ্ছে না।
আর কিছু বলতে হল না। সুমনার মা সবার আগে সোমেনের স্ত্রী, কাবেরিকে তুলে ধরে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল। সোমেন দেবাশিষের দিকে তাকাতেই, দেবাশিষ আবার ইশারা করল। সোমেন উঠে দাঁড়িয়ে তমাকে তার দাদুর কাছে নিয়ে গিয়ে বলল—দাদুকে প্রণাম করো।
সুমনার বাবা আর শক্ত হয়ে থাকতে পারল না। নাতনিকে জড়িয়ে ধরল। দুচোখে তার তখন জলের প্লাবন। দেবাশিষেরও চোখে জল এসে গেল। সে তাড়াতাড়ি উঠে বাইরে চলে এল। পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছতেই সুমনার গলা শুনতে পেল—নাটকের ভাল পরিচালক তুমি। তবে এই কাজটার জন্যে তোমার প্রতি শ্রদ্ধা আমার বাড়ে গেল দেবাদা।
—আমি কিছুই করিনি রে। সোমেনের আবেগটা লক্ষ্য করেছিলাম। কাকু-কাকিমার সঙ্গে কথা বলে তাদের উদাসীনতা বুঝেছিলাম। তাই এই চেষ্টাটা করার সাহস পেলাম।
সুমনা এরপর যে কথাটা বলল, তার জন্য তৈরি ছিল না দেবাশিষ। সুমনা বলল—শুধু একজনের উদাসীনতা যদি দেখতে পেতে, তাহলে দিল্লিও যেতে না, বাড়িটাও এমন করে ভেঙে পড়ত না।
সুমনার কথাগুলো কি দ্ব্যর্থবোধক? দেবাশিষের অন্তত তাই মনে হল।

সৌরাশিষ পরের সপ্তাহেই ফিরে এল। ওখান থেকে সে কিছুই আনেনি। শুধু কয়েকটা জামাকাপড় নিয়ে চলে এসেছে। দেবাশিষ আর নীলাদ্রি ওকে রিসিভ করতে এয়ারপোর্টে গিয়েছিল। ওকে অবশ্য আগে থেকে কিছুই জানানো হয়নি। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে দেবাশিষ আর নীলাদ্রিকে দেখে সৌরাশিষ আনন্দে আত্মহারা। কিছুতেই কান্না থামাতে পারল না। দেবাশিষকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। ভাইয়ের চোখ মুছিয়ে দেবাশিষ বলল—এই দেখ! এত বড় একজন ডাক্তার, কেমন বাচ্চা ছেলের মতো কাঁদছে। ও নীলু সামলাও সৌরকে।
নীলাদ্রি দেখল দেবাশিষেরও চোখে জল। সে হেসে বলল—কাকে সামলাব সেটাই তো বুঝতে পারছি না দাদা। যাই হোক, তাড়াতাড়ি গাড়িতে ওঠ সৌর। এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি এখনই ফাইন করতে চলে আসবে। এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়ানো যাবে না।
বাড়িতে ফিরতেই আর একপ্রস্থ কান্নাকাটি চলল। দেবাশিষ ছোটকা আর কাকিমাকে বোঝানোর চেষ্টা করল—ছেলেটা এতদিন পরে ঘরে ফিরল। ওকে একটু দম নিতে দাও। এত কান্নাকাটি করলে চলে? ওর এখন অনেক কাজ।
কিন্তু কে কার কথা শোনে? সৌর নিজেও বাবা-মার কাছ থেকে যেন উঠতে চাইছিল না। নীলাদ্রিই শেষে এগিয়ে এল।
—সৌর, তুমি বরং ফ্রেশ হয়ে খোসবাগানে আমাদের বাড়িতে চলে এসো। আজই একটা আলোচনা করে নিতে হবে। দাদাকে আবার দিল্লি ফিরতে হবে তো! সুমনা আর সোমেনদাও আসবে।
সোমেন আসবে সেটা যেন জানত সৌরাশিষ। আশ্চর্য হল না। বলল—সোমেনকে যে দাদা তুমি আবার ফিরিয়ে এনেছ, এটা খুব ভাল হয়েছে। মানছি, বাড়ির কথা না শুনে বিয়ে তা করে তখন ও একটা ভুল করেছিল। তার জন্য ঘর, বাড়ি, বাবা, মা, পরিবার ছেড়ে এতদিন কষ্টও তো পেয়েছে। জানিস দাদা, ওর সঙ্গে আমার সব সময় যোগাযোগ ছিল। ওর কষ্টের কথা আমাকে বলত। তুই একটা দারুণ কাজ করেছিস।
—ঠিক আছে, আর দাদার গুণগান গাইতে হবে না। তাড়াতাড়ি আয়। আমরা এগোচ্ছি।
দেবাশিষ নীলাদ্রিকে নিয়ে ছোটকার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল।
সন্ধেবেলায় তুহিনাদের খোসবাগানের বাড়িতে শুরু হল বৈঠক। দেবাশিষ সবাইকে আসার কথা বললেও তার বড়কা আর ছোটকা আসেনি। বড়কার তো আসার মতো অবস্থাই নেই। বড়কাকিমা আর ছোটকাকিমা এসেছে। অবশ্য তারা মায়ের সঙ্গে ঘরের ভেতরেই আছে। বৈঠকে যোগ দেয়নি। প্রথমেই দেবাশিষ সবাইকে জানিয়ে দিল—জায়গাটার দলিল, পর্চা আমি দেখেছি। প্রায় কুড়ি কাঠা জায়গা আছে। বর্ধমান শহরের বুকে এক লপ্তে এতটা জায়গা নিশ্চয়ই খুব মূল্যবান। প্রমোটারদের চোখ থাকবে, এতে অস্বাভাবিকতা কিছু নেই। বাড়িটা ভেঙে পড়তে কোনো প্রমোটার সাহায্য করেছে বলে আমি শুনেছি। বাড়িটায় আমাদের আবেগ জড়িয়ে ছিল। তাই বাড়ি সমেত জায়গাটা আমরা কোনো প্রমোটারকে দিতে চাইব না, এই ধারণা থেকেই বাড়িটাকে ধূলিসাৎ করার পরিকল্পনা করা থাকতে পারে।
হঠাৎ সোমেন বলে উঠল—দেবাদা, এত ঘুরিয়ে বলার কোনো দরকার নেই। শ্যামদাস প্যাটেল এই কাজটা করেছে। আমি জানি। ওকে শাস্তি পেতে হবে।
তুহিনা ওকে ধমকাল।—শাস্তির কথা পরে হবে। আগে জায়গাটার কী হবে ভাব।
—ভাবাভাবির কিছু নেই তুহিনাদি। তোমরা যেটা ভাল বুঝবে, সেটাই হবে।
কিছুক্ষণের জন্য সবাই চুপ। সবাই ভাবছে। সৌরাশিষই প্রথম তার পরিকল্পনার কথা বলল—আমি ফিরে আসব ভেবে, একটা পরিকল্পনা করছিলাম। সবাই যদি অনুমতি দেয়, বলতে পারি।
সবাই ওর মুখের দিকে তাকাল। দেবাশিষ হেসে বলল—অনুমতি দেওয়ার কী আছে? সবাই বলবে বলেই তো এখানে এসেছি আমরা। বল তুই।
—পরিবারে আমরা তিন জন ডাক্তার আছি। আমরা তিনজনে মিলে যদি ওখানে একটা মাল্টি স্পেশালিটি হসপিটাল খুলি, কেমন হয়?
—তুই জেনারেল সার্জারি, আমি গায়নি আর নীলু নিউরো। বাকিগুলো?
তুহিনার কথার উত্তরে নীলাদ্রি বলল—সে ব্যবস্থা হয়ে যাবে। বর্ধমানে এতদিন প্র্যাকটিস করছি কীসের জন্য? আমার মতে এটা খুব ভাল প্রপোজাল। তবে, এর সঙ্গে আর একটা প্রপোজাল আছে আমার। একটা মেডিসিন শপও করতে হবে। শুধু ভাল চিকিৎসাতেই হবে না, পেশেন্টরা যাতে ঠিক ওষুধ ঠিক দামে পায়, সেটাও দেখতে হবে।
নীলাদ্রির কথাগুলো সবাই মন দিয়ে শুনল। দেবাশিষ সোমেনকে বলল—সোমেন, তুই একটা মেডিসিন শপ চালাতে পারবি না?
সোমেন চমকে গেল। সে ওখানে মেডিসিন শপ করবে? দেবাদা তাকে এতটা ভালবাসে? তার মুখে কোনো কথা নেই। সে দেবাশিষের দিকে তাকিয়ে রইল।
—কী রে, পারবি না?
ক্রমশ



