হেমন্তের অরণ্যে
আমরা আমাদের দেশে বসন্তের জয়গান করি। গল্পে, কবিতায় গানে কতরকম ভাবে চলে বসন্ত বন্দনা। পলাশ, কুসুম, কৃষ্ণচূড়া, জারুল যেন আকাশকে নানা রঙে রাঙিয়ে দিয়ে যায। আমাদের দেশে শীতের শেষে আগমন হয় বসন্তের আর আমেরিকায় এসে দেখলাম শীতের আগেই যেন বসন্তের রং লেগেছে প্রকৃতির গায়ে।
আমরা যাকে বলি হেমন্ত এ দেশে তাকে বলে ফল সীজন। এই হেমন্তে বসন্ত নেমে এসেছে আটলান্টা জুড়ে। চোখ মেলে চারদিকে তাকালেই রঙের হোরিখেলা দেখা যাচ্ছে গাছগাছালির শাখায় পাতায়। কত যে রং! সবুজের ফাঁকে ফাঁকে লাল, হলুদ, কমলা, তামাটে, বাদামী রংয়ের গাছেরা উঁকি দিচ্ছে! অপূর্ব সে দৃশ্য! এতদিন বিদেশের ‘ফল'(Fall) এর ছবি দেখেছি নানা জায়গায়, বর্ণনা পড়েছি অজস্র। মনে পড়ে যাচ্ছিল Albert Camus এর লেখা লাইনগুলো,
Autumn is a second spring
When every leaf is a flower.”
Albert Camus
সত্যি তাই। প্রতিটি পাতা যেন ফুলের মত উজ্জ্বল রং ধরেছে। নিজের চোখে এই অপরূপ সাজে প্রকৃতিকে দেখার অনুভূতিটাই আলাদা।
লেগ্যাসি কম্যুনিটির ভেতরের রাস্তা ধরে একটু হাঁটলেই দেখছি ম্যাপল ওক, পপলার, অ্যাসপেন, বার্চ, অ্যাশ গাছগুলোতে কত রকম রং! চুপ করে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকি অনেকক্ষণ। দেখে দেখে আর আশ মেটে না। গাড়িতে যেতে যেতেও রাস্তার ধারে, বাড়ির লনে চোখে পড়ে রংয়ের মেলা। সত্যি সত্যিই প্রত্যেকটা পাতাই যেন ফুল হয়ে ফুটে আছে।
আটলান্টার সবুজকে ভালোবেসে ফেলেছি আমি। রাস্তায় বেরোলেই কত যে গাছ দেখতে পাই। শহরের সামান্য বাইরের দিকে গেলেই মনে হয় যেন কোনো বিস্তীর্ণ বনভূমির ভেতর একটা ছবির মত শহর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আর সেই বনভূমি এখন রাজরানির মত উজ্জ্বল রঙের পোশাকে অপরূপ সাজে সেজে উঠেছে। ক্যামেরার শাটার টিপি অবিরত। কিন্তু চোখে যা দেখি, ছবিতে তার কিছুই ধরতে পারি না বলে বড় আফসোস হয়।
শীতের দিন গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে। ঝরে পড়ার আগে তাই সেজে উঠেছে পাতারা। পাতার সবুজ ক্লোরোফিল জায়গা ছেড়ে দিয়েছে ক্যারোটিনয়েডস,জ্যান্থোফিল,অ্যান্থোসায়ানিন পিগমেন্টকে। তাই ওদের এত রংয়ের বাহার। এত রঙিন ভাবেও যে বুড়িয়ে যাওয়া যায়, শেষ হয়ে যাওয়া যায়- তা কে জানত?
তবে সব সৌন্দর্যই বড় ক্ষণস্থায়ী। দেখ্ না দেখ্ এই রঙিন সাজও খসিয়ে দেবে গাছেরা। মাটিতে,রাস্তায়, ঘাসের লনে কিছুদিন পড়ে থাকবে রঙিন পাতারা। হাওয়ার তালে নেচে নেচে ওড়াউড়ি করবে এদিক ওদিক। তারপর একেবারে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে থাকবে মাটির বুকে।
তখন নিষ্পত্র গাছগুলো নগ্ন শাখা প্রশাখা নিয়ে উর্দ্ধবাহু হয়ে যোগীর মত শীতের সাধনা করবে আগামী চার পাঁচ মাস। ঝরা পাতারা মাটির পুষ্টি যোগাবে, মাটির জলকে ধরে রাখবে। নিঃশব্দে ওরা নতুন প্রাণকে আহ্বান জানাতে থাকবে। নবজীবন সঞ্চারের তুমুল আলোড়ন চলবে ভেতরে ভেতরে। আমরা কেউ খোঁজ রাখব না ওদের নীরব কর্মব্যস্ততার।
তারপর হঠাৎ একদিন গ্রীষ্মের পদধ্বনি শোনা যাবে। তখন আবার “নব অঙ্কুর জয় পতাকায় ধরাতল সমাকীর্ণ” হয়ে উঠবে। কচি ঘাসেরা মাথা তুলবে, ঝকঝকে সবুজ কচি পাতারা নরম উষ্ণ রোদ্দুর গায়ে মেখে শাখাপ্রশাখায় করতালি বাজিয়ে হেসে উঠবে। মৃদু বাতাসের দোলায় হেসে লুটিয়ে পড়বে এ ওর গায়ে।
প্রকৃতির মত এত সুন্দর আর কী আছে?















ক্রমশ



