মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস, পর্ব – ৪


01
দ্য সিম্পলন ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস, স্টেশান বেলগ্রেড, রাত পৌনে ৯টা।

দ্য সিম্পলন ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস বেলগ্রেড পৌঁছালো রাত পৌনে ৯টায়, ছাড়বে সোয়া ৯টায়।  আধ ঘণ্টার বিরতি। এরকুল প্ল্যাটফর্মে নামলেন, হাত-পা গুলো একটু ছাড়ানো দরকার। ঠান্ডার চোটে বেশি ক্ষণ দাঁড়াতে পারলেন না, ট্রেনে উঠে পড়লেন। ট্রেনে ওঠার সময় লক্ষ্য করলেন কন্ডাক্টররা সব দলবেঁধে ক্যালে কোচের গেটে আড্ডা মারছে।

ইস্তাম্বুল?  ক্যালে কোচের কন্ডাক্টর পোয়ারোকে লক্ষ্য করে বললেন।

কন্ডাক্টর — মসিয়ে, আপনার মালপত্র সব ১নং কুপে পৌঁছে দিয়ে এসেছি। মসিয়ে বুঁ ওটা আপনার জন্য ছেড়ে দিয়েছেন।

পোয়ারো — কিন্তু মসিয়ে বুঁ তাহলে গেলেন কোনটায়?

কন্ডাক্টর — উনি এখানে নতুন যে এথেন্স কোচটা জুড়ল, সেটায় চলে গেলেন।

পোয়ারো — তাই? যাই গিয়ে দেখা করে আসি।

বুঁ – এর কুপে প্রবেশ করে পোয়ারো 

— আরে! আমার তেমন কিছু সমস্যাই হচ্ছিল না, খামোখা কেন চেঞ্জ করতে গেলেন? আপনি সরাসরি ইংল্যান্ড যাবেন, আপনার ঐ কোচটাতেই সুবিধা, আর আমি এমনিই মাঝে নেমে যাব, এই কোচটাতে আমার কোনো সমস্যাই হবে না। তাছাড়া এই কোচটা বেশ নিরিবিলিও। আমি আছি, আর আছেন একজন গ্রিক চিকিৎসক, ছোটখাটো, ছিমছাম চেহারার, বেশ ভদ্রসভ্য মানুষ।

বুঁ — ওসব ছাড়ুন, রাতে কি দাঁড়ায় দেখুন। যদিও লোকজন বলাবলি করছে এ বছর তেমন তুষারপাত হচ্ছে না, কিন্তু অবস্থা আমার বিশেষ ভালো ঠেকছে না। মাঝরাস্তায় আবার তুষারপাতে আটকে না পড়ি।

ট্রেন ঘড়ির কাঁটা ধরে সোয়া ৯ টাতেই ছাড়ল। পোয়ারো এথেন্স কোচ ছেড়ে নিজের কোচে ফিরে এলেন। লক্ষ্য করলেন, সহযাত্রীদের মধ্যে অপরিচয়ের আড়ষ্টতা ক্রমে কমছে। কর্নেল আবার্থনট নিজের কুপের দরজার সামনে ম্যাককুইনের সঙ্গে আড্ডা মারছিলেন। পোয়ারোকে দেখে সোল্লাসেই চিৎকার করে উঠলো ম্যাককুইন — আরে, কোথায় ছিলেন?

আমি তো ভাবলাম, আপনি নেমে গেছেন, আপনি বেলগ্রেড নামবেন বলেছিলেন না।

পোয়ারো — (মুখে হাসি নিয়ে) না না, আপনি বুঝতে ভুল করেছিলেন। আসলে ঐ সময়ই ট্রেনটা চলতে শুরু করল কিনা, তার আওয়াজেই বেলগ্রেড—পরের আমাদের কথাবার্তা আর তেমন এগোয় নি।

ম্যাককুইন — কিন্তু আপনার মালপত্র?

পোয়ারো — আসলে আমি অন্য একটা কুপে চেঞ্জ করেছি।

ম্যাককুইন — ও, তাই।

এরপর ম্যাককুইন আর্বাথনটের সঙ্গে আবারো আড্ডায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পোয়ারো তাদের পাশ কাটিয়ে করিডর ধরে নিজের কুপের দিকে এগিয়ে চললেন।

পোয়ারোর দুটো কুপের আগে সেই আমেরিকান মহিলা মিসেস হুবার্ডের কুপ। তার দরজায় দাঁড়িয়ে মিসেস হুবার্ড শান্ত-শিষ্ট সুইডিশ মহিলাটির সঙ্গে কথাবার্তা বলছিলেন এবং তার হাতে একটা ম্যাগাজিন জোর করে গুঁজে দিতে চাইছিলেন।

আমেরিকান মহিলা — এরকম ম্যাগাজিন অনেক গুলোই নিয়ে আমি ট্রেনে উঠেছি, তোমার লাগলে রেখে দাও। ঠান্ডাটাও যা মারাত্মক পড়েছে!

সুইডিশ মহিলা — অনেক ধন্যবাদ।

হুবার্ড — ঠিক আছে, এর জন্য ধন্যবাদের কী আছে। রাত্রে ভালো করে ঘুমোও, মাথাব্যথা সেরে যাবে।

সুইডিশ মহিলা — আমারও মনে হচ্ছে, প্রচণ্ড ঠান্ডাতেই মাথাটা ধরেছে, দেখি এক কাপ চা নিয়ে যদি কিছুটা কমে।

হুবার্ড — আর একটা কথা — সঙ্গে অ্যাসপিরিন আছে তো? দেখে নিয়ো। না থাকলে বলো, আমার কাছে আছে, নিয়ে যেও। এসো তাহলে, শুভরাত্রি।

ভদ্রমহিলাকে বিদায় জানাতে জানাতে পোয়ারোর দিকে ফিরে বকবক করতে শুরু করলেন।

হুবার্ড — খুব ভালো, শান্ত—নম্র, শিক্ষকতা করেন। খুব ভালো মূল্যবোধ নিয়ে চলেন। আমার মেয়ের কথা উঠলে তো থামতেই চায় না, উৎসাহ নিয়ে শুনেই চলে।

শুধু ঐ মহিলাই নয়, পোয়ারো থেকে কোচের প্রায় সবাই মিসেস হুবার্ডের মেয়ে—জামাইয়ের নাড়িনক্ষত্র সম্পর্কে প্রায় সব কিছুই গত ২৪ ঘণ্টায় জেনে গেছেন, বলা ভালো জানতে বাধ্য হয়েছেন — এমনই ওনার বলার উৎসাহ। সিমরানায় ভদ্রমহিলার মেয়ে ও জামাই অধ্যাপনার কাজে যুক্ত, সেই সূত্রেই ওনার এই প্রথমবার প্রাচ্যে বেড়াতে আসা এবং তুরস্কের লজগজে পথঘাটের যা অবস্থা; তার সবই এখন বিন্দুমাত্র ইংরেজি না জানা এই কোচের যাত্রীদের প্রায় মুখস্থ হয়ে গেছে।

সেই সময়ই ওদের সামনের কুপের দরজা খুলে গেল, একজন পরিচারক শ্রেণির লোককে বেরিয়েও আসতে দেখা গেল। খোলা দরজার ফাঁক দিয়ে কুপের স্লিপারে বসে থাকা রাশেটের সঙ্গে পোয়ারোর চোখাচুখিও হয়ে গেল। রাশেটের মুখের ভাব দ্রুত পরিবর্তন ঘটে, রাগে টকটকে হয়ে দাঁড়াল।

jpg 2

এই সময় মিসেস হুবার্ড হাতের ইশারায় পোয়ারোকে পাশে ডেকে নিলেন। ফিসফিস করে বললেন

— ঐ লোকটাকে আমার একেবারেই সুবিধার ঠেকছে না। না না, আমি চাকরটার কথা বলছি না, ওর মনিবের কথাই বলছি। আমার মেয়ে কী বলে জানেন তো? ‘মায়ের যখন একবার সন্দেহ হয়েছে, কিছু একটা না হয়ে যায় না।’

 কী সমস্যায় পড়েছি ভাবুন দেখি, ঐ লোকটার পাশেরটাই আমার। আমি সব সময়ই দুটো কুপের মাঝের দরজা বন্ধ রাখি, বলা তো যায় না, হঠাৎ যদি ঢুকে পড়ে। আগের রাতেই দরজাটায় ওই দিক থেকে খুটখাট আওয়াজ পাচ্ছিলাম, খোলার চেষ্টা করছিল কি না কে জানে? লোকটার যা চোখমুখ, খুনিটুনি হতেই পারে, ব্যাংক—ডাকাত টাকাত হলেও আশ্চর্য হব না। আমার মেয়ে বেরোনোর সময় বারে বারে বলল, ‘মা, একদম চিন্তা করো না, ট্রেনে তোমার কোনো সমস্যাই হবে না।’ আমার মন বলছে কিছু একটা ঘটবেই। লোকটাকে আমার একেবারেই সুবিধার মনে হচ্ছে না। শুধু একটা ব্যাপারই মাথায় ঢুকছে না, ঐ (ম্যাককুইনকে দেখিয়ে) রকম একটা তরতাজা ছেলে ঐ লোকটার আপ্তসহায়কের কাজ করে কী করে?

ইতিমধ্যে ম্যাককুইন এবং আর্বাথনটকে গল্প করতে করতে ওদের দিকে আসতে দেখা গেল।

ম্যাককুইন — রাত তো বেশি নয়, চলুন আমার কুপেই খানিক আড্ডা মারা যাক। আপনাদের ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের ইন্ডিয়া পলিসি নিয়ে আমার কিছু জানার আছে, সে নিয়েই না  হয়—

হুবার্ড — গুড নাইট, মঁসিয়ে। আমার মনে হয় রাত্রে আপনার পড়ার অভ্যেস আছে, তাই না?

পোয়ারো — গুড নাইট। তেমন কিছু নয়, ঐ নাড়াচাড়া করি, এই আর কী।

এরকুল পোয়ারো নিজের কুপে ফিরে এলেন।

পোয়ারো নিজের কুপে ফিরে পোশাক পরিবর্তন করে বিছানায় গেলেন। আধঘন্টা একটু বই নাড়াচাড়া করে আলো নিভিয়ে ঘুমিয়েও পড়লেন।

হঠাৎই একটা অস্বস্তি নিয়ে পোয়ারোর ঘুম ভেঙে গেল। ঘুমের মধ্যেই মনে হল কেউ যেন কাছেই প্রচণ্ড জোরে আর্তনাদ করে উঠল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বেজে উঠল টিং করে একটা কলিংবেলও। পোয়ারো উঠে বসলেন, বেডসুইচ অন করে কুপে আলোও জ্বালালেন। ট্রেনটি দাঁড়িয়ে, তবে কি স্টেশন এলো?

ঘুম ভেঙে মাথার জড়তা কাটতে শুরু করেছে, মনে পড়ল পাশেরটাই রাশেটের কুপ। বিছানা ছেড়ে উঠে দরজা খুললেন, উঁকি মেরে দেখলেন কন্ডাক্টর একপ্রকার দৌড়ে এসে রাশেটের দরজায় টোকা মারলেন। কোনো উত্তর না আসায় দ্বিতীয় টোকাও মারলেন। এই সময় অন্য একটি কুপ থেকে কলিংবেলের আওয়াজ পাওয়া গেল এবং কন্ডাক্টর সেটা লক্ষ্য করলেন।

এই সময়ই রাশেটের কুপ থেকে বিশুদ্ধ ফরাসি ভাষায় শোনা গেল, ‘সে নেস্ট রেইন, জ্যঁ মি সুই ট্রম্পে’ অর্থাৎ ‘প্রয়োজন নেই, ভুল করে বেল বাজানো হয়ে গেছে।’

‘ধন্যবাদ, মঁসিয়ে’ বলে কন্ডাক্টর নতুন যে কুপ থেকে কল হয়েছিল, সে দিকে রওনা দিলেন। পোয়ারো দরজা বন্ধ করে বিছানায় ফিরে এলেন। হঠাৎ করে জমে তৈরি হওয়া চাপটা খানিক কেটেও গেল। লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়লেন, হাত ঘড়ি সময় দেখলেন ১টা বাজতে ২৩ মিনিট।

কন্ডাক্টরের পায়ের শব্দ শোনা গেল, একটু পরেই দরজা খোলার শব্দ এবং মিসেস হুবার্ডের ফরিয়াদি তীক্ষ্ণ গলা।

এরকুল আপনমনেই হাসলেন, ‘এই রে, আবার অনর্থ ঘটল?’

পরিষ্কার কিছু বোঝা গেল না। শুধু বাদানুবাদের একটা আওয়াজ কানে আসছিল। বাদানুবাদ বলা ভুল, মিসেস হুবার্ডের একতরফা বকাবকির শব্দই শোনা যাচ্ছিল। কিছুক্ষণ পরেই সেসব থেমে গেলে পোয়ারো কলিংবেল টিপলেন — টিং টং।

দ্রুতই দরজায় টোকা পড়ল।

দরজা খুলে পোয়ারো দেখলেন, কন্ডাক্টর এই ঠান্ডায় রীতিমতো উদ্বিগ্ন, ঘামছেন।

পোয়ারো — একটা জলের বোতল। কী ব্যাপার? খুব চাপ যাচ্ছে মনে হচ্ছে।

কন্ডাক্টর — আর বলবেন না! ঐ আমেরিকান মহিলাকে নিয়ে আর পারা যায় না (কপালের ঘাম মুছে)। বলে কী না, উনার ঘরে কেউ একজন ঢুকেছিল। কিছুতেই বোঝানো যায় না, এটা অসম্ভব। যদি ঢোকে তো সে যাবে কোথায়? ঘরের মধ্যে নেই, ঘরের দরজা ভিতর থেকে লাগানো। লোকটি কি কপূরের মতো উবে যাবে? বাইরের যাওয়ার কোনো উপায়ই নেই যে হারে তুষারপাত হচ্ছে —

পোয়ারো — তুষারপাত?

কন্ডাক্টর — হ্যাঁ। আপনি বুঝতে পারেন নি, ঐ জন্যই তো ট্রেন আটকে। প্রচণ্ড তুষারপাত চলছে, ভগবান জানেন কত ক্ষণ এখানে আটকে থাকতে হবে। একবার তো দিন সাতেক আটকে ছিলাম।

পোয়ারো — কোন জায়গায় আটকেছি?

কন্ডাক্টর — সম্ভবত ভিনকোভি আর ব্রডের মধ্যবর্তী কোনো জায়গায়।

পোয়ারো — বলেন কী? তাহলে তো সর্বনাশ!

দ্রুত কন্ডাক্টরটি একটি জলের বোতল নিয়ে ফিরে এলো।

কন্ডাক্টর — সমস্যা তো বটেই।

jpg 3

পোয়ারো দরজা লাগিয়ে প্রথমে এক গ্লাস জল খেলেন, এরপর শোয়ার উদ্যোগ করলেন। চোখের পাতা সবে লেগেছে, সেই সময় তাঁর দরজার কাছেই ভারী কিছু একটা পতনের শব্দ কানে এলো। এরকুল লাফিয়ে উঠে দরজা খুলে কিছুই দেখতে পেলেন না। দূরে তাকাতে নজরে পড়ল করিডর ধরে হেঁটে যাওয়া এক রক্তবর্ণ কিমোনো পরিহিতাকে। কোচের একেবারে শেষ প্রান্তে ছোট্ট একটা টেবিলে কোচ—কন্ডাক্টর বড় একটা কাগজের শিটে তখনো কী সব লেখালেখি করে চলেছেন। নিজের কুপে ফিরে, দরজা লাগিয়ে পোয়ারো আবারও বিছানায় এলেন। আপন মনে বলে উঠলেন, ‘না, বোঝা যাচ্ছে বয়স ক্রমশ বাড়ছে, ঘুম এত পাতলা হয়ে গেছে, ছোটখাটো আওয়াজেই ভেঙে যাচ্ছে।’

ক্রমশ – –

মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস- পর্ব ৩


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top