আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস : এক দিকভ্রান্তির ফাঁদে?

oral history tradition

সঞ্চালক শিক্ষকের ডাকে জনজাতি পরিবার থেকে উঠে আসা ক্লাস সিক্সের ছেলেটা গুটি গুটি মঞ্চে উঠে এসেছিল ক্লাসের প্রতিনিধি হয়ে। এক আঁজলা ফুল নিয়ে ভক্তিভরে শ্রদ্ধা জানিয়েছিল শহীদবেদীতে। তারপর সারাদিন বাংলাভাষা নিয়ে ও ভাষা আন্দোলন নিয়ে স্যরদের ভাষণ শুনেছিল বুঝতে পারা আর না-পারার মাঝে দাঁড়িয়ে। আবৃত্তি, গান, বক্তৃতায় গোটা স্কুল গর্বের সঙ্গে সেদিন স্মরণ করছিল বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ইতিহাস ও সমৃদ্ধিকে। দিনটা ছিল “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস”। পরের দিন ক্লাসে অনেক দ্বিধা নিয়ে সরলমতি ছেলেটা বাংলার শিক্ষককে জিজ্ঞেস করেছিল, স্যর, মাতৃভাষা মানে কী? আসলে চূড়ান্ত বিভ্রান্ত ছেলেটা তার মাকে কোনোদিন বইতে লেখা ঐ বাংলায় কথা বলতে শোনেনি যে!
আমরা কি ভেবে দেখেছি? একটা রাজবংশী বা টোটো বা সাঁওতালি ছেলে কেন এই প্রমিত শান্তিপুরী বাংলাকে তার মাতৃভাষা বলবে? সে জন্মের পর এক ভাষায় কথা বলতে শেখে বাড়িতে। আর স্কুলে গিয়ে যে প্রমিত ভাষায় লিখতে বাধ্য হয়, পড়তে বাধ্য হয়, উত্তর দিতে বাধ্য হয়, পরীক্ষা দিতে বাধ্য হয় তা যে একেবারে অন্য ভাষা! কেন? কারণ রাষ্ট্র ঐ প্রমিত ভাষাকেই লালন করেছে। বাংলা সাহিত্যের প্রায় সবটা ঐ বাংলা ভাষায়। সুযোগসুবিধা ঐ ভাষায় বেশি। রাষ্ট্র তার উপর একরকম চাপিয়েই দিয়েছে এই ভাষাকে। তার সত্যিকারের মাতৃভাষা কোথায়? ছেলেটা এই বাংলাকে মাতৃভাষা বলতে বাধ্য হচ্ছে। আর তার সত্যিকারের মাতৃভাষা আজ বিপন্ন।
পৃথিবীব্যাপী বহু বহু মাতৃভাষার এরকমই বিপন্নতা নিয়ে সচেতনতা আনতে একটা দিনকে স্মারক হিসেবে বাছতেই হত সম্মিলিত জাতিসংঘকে। ১৯৫২-র পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলনকে মনে রেখে বেছে নেওয়া হল ২১ ফেব্রুয়ারিকে। ২১ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচন কাঁটাতারের দুপাশের বাংলাভাষী মানুষকে গর্বিত করে নিশ্চয়ই। সেটা আলাদা কথা। বাংলাদেশ তাঁদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্যের আন্দোলনের সঙ্গে সংপৃক্ত এই দিনটাকে অন্য এক তাৎপর্যে উদযাপন করবেই। সেটাও তো স্বাভাবিক।
কিন্তু এ-বাংলাতেও ভারতবর্ষের বাঙালি হিসেবে আমরা গত কয়েক বছর ধরে কী করছি? আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস নয়, সুকৌশলে এই দিনটাকে আমরা বাংলাভাষা দিবসে পরিবর্তন করে নিয়েছি। অথচ বাংলা গান ও আবৃত্তির সাংস্কৃতিক দক্ষতা প্রদর্শনের আর ৫টা দিনের মতো ব্যবহার না করে বাঘাতি, হান্ডুরি, জারোয়া, মুরোট, লুরো, ওঙ্গে, মানডা, পার্জি, বঙ্গানি বা টোটোর মতো বিপন্ন মাতৃভাষাগুলোর বিপন্নতার কথাই তো ২১-এ ফেব্রুয়ারিতে বেশি করে তুলে আনা উচিত ছিল। আমাদের নিজেদের মাতৃভাষা, আমাদের বর্ণমালা নিয়ে আমাদের গর্ব তো থাকারই কথা। কিন্তু গতানুগতিক অতি-উচ্ছ্বাস আর আবেগের আতিশয্যে বাংলাভাষার গৌরবায়ন আর আমাদের বর্ণমালার প্রতি অতি-আবেগে আমাদের ছুঁয়ে থাকা আরও আরও বিপন্ন মাতৃভাষার কান্না চাপা পড়ে গেল না তো? তেমনটা হলে UNESCO-র মূল উদ্দেশ্যই কিন্তু ব্যর্থ হয়ে যাবে। এই প্রশ্নার্ত জিজ্ঞাসাটা আজ কিন্তু বেশি করে উঠে আসছে।
গোটাটাই আসলে কি সাংস্কৃতিক আধিপত্যের রাজনীতি নয়? অন্য ভাষার মতো বাংলাও অন্তরে সমৃদ্ধ হয়েছে অন্য ভাষা থেকে গ্রহণ করে। শব্দ, সিনট্যাক্স, সাহিত্যের প্রকরণ, আরও কত কিছুর আত্তীকরণ করে। আর বাইরে? তার সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে অন্য কোনও কোনও ছোট ভাষাকে কোনঠাসা করে। কোথাও কোথাও আত্তীকরণের নামে গ্রাসও করেছে। আধিপত্যের মেকানিজম অনুসরণ করে আমাদের আত্মম্ভরী ও আত্মকেন্দ্রিক নাগরিক বৌদ্ধিকতা অন্য ভাষার গায়ে দাগিয়ে দিয়েছে ‘উপভাষা’-র ছাপ! অন্যের সংস্কৃতিকে ‘লোক’ বলে চিহ্নিত করে পাঠিয়ে দিতে চেয়েছে মিউজিয়ামের আর্কাইভে! নয় কি?
আবার ট্রাজেডি হল, যে মেকানিজম ফলো করে বাংলা কোনঠাসা করছে সাঁওতালি, রাজবংশী বা কোকবরককে, সেই মেকানিজমের ফলশ্রুতিতেই সে বৃহত্তর পরিসরে গিয়ে হিন্দি বা ইংরেজির কাছে কোনঠাসা হচ্ছে।
বাংলা ভাষা নিজে কীভাবে বিপন্ন হচ্ছে? একটা মজার উদাহরণ দিই। নাগরিক বাঙালির আধুনিকতম প্রজন্ম মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের আমন্ত্রণ পেয়ে তার বন্ধুকে বলছে, “বিন্দাস প্রোগ্রাম! কিন্তু সরি। হরগিজ যেতে পারব না রে। কেন কী শরীরটা একটু পরেশান করছে। আমরা বন্ধু হচ্ছি। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা হচ্ছে। সো, ভাষাদিবস মানাতেই হবে ইয়ার। কেন কী এটা আমাদের মায়ের ভাষা। বাট, খুলকে বাতানা পড়েগা ইয়ার। সত্যি যেতাম তো মজা এসে যেত।”
এই খিচুড়ি শুনে আপনার নিশ্চয়ই মনে হচ্ছে বাংলা ভাষা নিজেও আজ বিপন্ন। ঠিকই। বাংলা বিপন্নই তো! আমরা বাংলার বিপন্নতার কথা ভাবছি। কিন্তু ভয় পাওয়ার মতো আসল ছবি উঠে এসেছিল UNESCO-র দেওয়া তথ্যে। গোটা পৃথিবীতে ৭০০০-এরও বেশি ভাষার ৪০% এর বেশি আজ বিপন্ন। আর এর বেশিরভাগই হল কোনও না কোনও ছোট ও আঞ্চলিক উপজাতিদের মাতৃভাষা।
ভারতে বেঁচে থাকা ভাষার সংখ্যা সাড়ে চারশোর বেশি। ডায়ালেক্ট ধরলে সংখ্যাটা আরও অনেক বেশি। মধ্য ভারত, উত্তরপূর্ব ভারত, পশ্চিমঘাট অঞ্চলের আদিবাসী বা জনজাতিদের মাতৃভাষাই সবচেয়ে বেশি বিপন্ন।
UNESCO ও ভাষাতাত্ত্বিক অন্যান্য সমীক্ষা থেকে জানা যাচ্ছে এই মুহূর্তে ভারতের ১৯৭ টা ভাষা বিপন্ন। যেমন মাহালি, কোরো, সিদি, দিমাসা ও সিকিমের ‘মাঝি’ ভাষা প্রায় মুমূর্ষু। গেন্ডি ও সাঁওতালি ভাষার বিপন্নতা এই মুহূর্তে এতটা না হলেও পরের প্রজন্মে তাদের ভাষার উত্তরাধিকার স্থানান্তরণের সমস্যা বিস্তর। অরুণাচল প্রদেশের খাম্বা, ঝাড়খণ্ড ও ছত্তিশগড়ের “অসুর” ভাষা, সিকিমের ল্যাপচাও বিপন্ন। কোথাও হিন্দি, কোথাও ইংরেজি, কোথাও রাজ্যের মুখ্য ভাষার আগ্রাসন এর জন্য দায়ী।
বিপন্নতার কারণ হিসেবে নিচের কারণগুলোকে চিহ্নিত করা যায়।

১) সাংস্কৃতিক আধিপত্য

ইংরেজি, মান্দারিন, স্প্যানিশ, হিন্দি এইসব প্রধান ভাষার আধিপত্য ও চাহিদায় গোটা পৃথিবীতে বেশ কিছু ভাষা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে। সামাজিক মিথস্ক্রিয়া, উচ্চতর শিক্ষা, কাজের জগতে ভাববিনিময়, জীবিকা ও অর্থনৈতিক জগত, নাগরিক চলন এইসব ক্ষেত্রে এই ভাষাগুলোর একাধিপত্য রয়েছে আন্তর্জাতিক জগতে ও বহুভাষিক দেশের জাতীয় ক্ষেত্রেও। এদের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় কোনঠাসা হয়ে পড়ছে বহু ভাষা যারা বহু বহু মানুষের মাতৃভাষা।

২) শিক্ষার মাধ্যম: আধিপত্যবাদের এক বীজতলা

বিশ্বায়নের রমরমার যুগে তো বটেই, তার বহু আগে থেকেই প্রথাগত শিক্ষায় আঞ্চলিক ভাষার পরিবর্তে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভাষাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। মাতৃভাষাগুলোকে অবহেলা করেই সেইসব ভাষার সাম্রাজ্যবাদী বিস্তার! বলাই বাহুল্য পাঠ্যবিষয় হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঐসব ভাষাও সাহিত্যের নির্বাচন বা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে তাদের নির্বাচন অন্যান্য মাতৃভাষার প্রাণময় গতিশীলতাকে রুদ্ধ করতে চেয়েছে।
শিক্ষার মাধ্যম তো শুধু প্রথাগত শিক্ষারই শুধু মাধ্যম নয়। তার থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু। শিখন যে মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতিতে ঘটে থাকে তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ শুধু ইন্দ্রিয়সংবেদনাই নয়; চিন্তা-পদ্ধতি ও মানসিক মিথস্ক্রিয়া। শিক্ষণীয় বিষয় যাই হোক, লার্নিং মেকানিজমে সমস্যা থেকে সমাধান ও অবশেষে শিক্ষার্থীর নলেজ কনস্ট্রাক্ট করা, এই রুট ম্যাপে ভাষার গুরুত্ব কিন্তু অপরিসীম। পিয়ার লার্নিং, গ্রুপ অ্যাক্টিভিটিজে মিথস্ক্রিয়া, শিক্ষণ-শিখনে পারস্পরিক যোগাযোগ সবক্ষেত্রে মাধ্যমভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। শিখনের সমান্তরালে শিক্ষার্থীর চিন্তাপদ্ধতি ও মনের লজিক্যাল ঝোঁকের বিকাশও হয়ে থাকে মাধ্যম-ভাষায়। তাই শিখন পদ্ধতিতে মাধ্যমেরও গুরুত্ব রয়েছে। এই কারণে বড় সংখ্যক বিদ্যালয়ে থট-প্রসেসটাকেও মাধ্যম-ভাষায় লালিত পালিত করা হয়। তারই সহযোগী উপায় হিসেবে সামাজিক মিথস্ক্রিয়াতেও কঠোরভাবে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বেছে নেওয়া আন্তর্জাতিক ভাষাটাকে অনুসরণ করতে বাধ্য করা হয়। ছেলেমেয়েরা ছোট থেকেই স্কুলের চৌহদ্দিতে ইংরেজিতে কথা বলতে বাধ্য হয়। বাড়িতে মা-বাবা ও অন্য পরিচিতদের সঙ্গেও। আর একটু একটু করে প্রজন্মান্তরে মাতৃভাষার প্রতি মমত্ব ও তার সমাজসাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের স্থানান্তরণের পথ রুদ্ধ হতে থাকে। বড় ভাষার আধিপত্যে মাতৃভাষাগুলোও মরতে থাকে একটু একটু করে।

৩) গণমাধ্যম ও ডিজিটাল আধিপত্য

গণমাধ্যম, সিনেমা, সমাজ মাধ্যম, ইন্টারনেট অপারেট করে প্রধান কয়েকটা আন্তর্জাতিক ভাষার মাধ্যমে। ডিজিটাল কীবোর্ড, অনলাইন কনটেন্টে আঞ্চলিক গৌণ ভাষার প্রবেশাধিকার এখনও পর্যন্ত নেই। শিক্ষা-জীবিকা-যোগাযোগ-বিনোদন-এর জগতে গৌণভাষাগুলোর আজও প্রবেশাধিকার খুবই নগণ্য।

৪) মনস্তাত্ত্বিক কারণ ও ভাষার বর্ণবাদ

বহুক্ষেত্রে আমাদের সামাজিক উত্তরাধিকার থেকেও একধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিবন্ধকতা উঠে আসে। সমাজমনস্তত্ত্বে ভাষার বর্ণবাদ দীর্ঘলালিত! আভিজাত্যের বিচারে ভাষারও শ্রেণিভিত্তিক অবস্থান তৈরি হয়। নিজের মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে বহু মানুষের মনে হীনম্মন্যতা রয়ে গেছে।
গণমানসের এই মনস্তাত্ত্বিক প্রতিবন্ধকতা যে রাষ্ট্রের শক্তিপ্রয়োগ বা কোনও গায়ের জোর আরোপের ফল, তা নয়। বরং সিভিল সোসাইটির তথাকথিত ‘রুল বাই কনসেন্ট’ থেকেই এই ধারণা গণমানসে চেপে বসে। এই ভাষা-সাংস্কৃতিক আধিপত্য নিজেদের ঐতিহ্য ও অস্তিত্বের পরিপন্থী হলেও মানুষ কখন যেন সেটাকেই একসময় বিশ্বাস করতে শেখে স্বাভাবিক হিসেবে এবং আদর্শ হিসেবে। এমনকি তাকে জাস্টিফাই করে নিয়ে সেই প্রবাহেরই অংশীদার হয়ে পড়ে একসময়। ইংরেজি মাতৃভাষা না হওয়া সত্ত্বেও ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, ইংরেজি ভাষানির্ভর সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার প্রতি মানুষের দুর্মর টান অনেক সময়ে সেখান থেকেই উঠে আসে।

৫) বর্ণমালাহীন মাতৃভাষার অতি-সঙ্কট

জনজাতিদের বহু ভাষার উৎপত্তি, সমৃদ্ধি, প্রজন্মান্তরে সঞ্চালন সবটাই মৌখিক। কোনও বর্ণমালা নেই। অথচ ভাববিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে এবং মৌখিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরম্পরার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেই সব ভাষা। বর্ণমালাহীন ভাষার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য কোনও বিকল্প ব্যবস্থা করা আজও যায়নি!

৬) নগরমুখী অভিবাসন

বহু জনজাতি কাজের সূত্রে শহরমুখো হন। সেখানেই বাস করতে শুরু করেন। তাদের সন্তানরা বাধ্য হচ্ছে ইংরেজি, হিন্দি বা রাজ্যের মুখ্য ভাষায় লেখাপড়া করতে। তাদের যাপনে, আশা আকাঙ্ক্ষায়, চলনবলনে ও সাংস্কৃতিক বোধে হারিয়ে যেতে থাকে নিজস্ব ভাষা। জনজাতির পরের প্রজন্মের জীবনে তাঁদের নিজস্ব ভাষাকে গিলে নিতে থাকে ঐ আঞ্চলিক ভাষা বা হিন্দি বা ইংরেজি।

৭) সরকারি নিয়মের অসংবেদী কঠোরতা

একটা উদাহরণ। প্রশাসনিক ও সেন্সাস ব্যবস্থাপনার সুবিধার কারণে কিছু অদ্ভুত নিয়ম তৈরি হয়। যেমন ১৯৭১-এর জনগণনায় ন্যূনতম ১০০০০ জন মানুষ যেসব ভাষা ব্যবহার করেন না সেই সব ভাষাকে নিবন্ধীকৃত ভারতীয় ভাষার তালিকার বাইরে রাখা হয়। এতে বহু জনজাতি-ভাষা সরকারি পরিসংখ্যান ও পরিকল্পনা বিষয়ক নীতির কার্যকর সীমার বাইরে রয়ে যায়। যদিও বহু মানুষ সেসব ভাষা ব্যবহার করেন বলে সরকারী সংজ্ঞায় তারা “জীবন্ত” ভাষা। অথচ আজ তারা মুমূর্ষু!

এক দুরপনেয় শঙ্কা

একটা উপজাতি বা জাতির কৃষ্টিগত ঐতিহ্য, সঙ্গীত, সামাজিক ও ধর্মীয় আচার, গাছগাছালি-পোষ্যপ্রাণী-চাষাবাদে সংপৃক্ত গাহর্স্থ্য ও সমাজজীবন, মৌখিক ইতিহাস ও মৌখিক সাহিত্যের পরম্পরা এবং সুদীর্ঘকাল ধরে যৌথ ও কৌমজীবনে অর্জিত জীবনকেন্দ্রিক জ্ঞানের পরম্পরা, এসবের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহন হল ভাষা। আঞ্চলিক জনজীবনকেন্দ্রিক যে সমাজইতিহাস, তার সবচেয়ে বড় উপাদানও!
ভাষার মৃত্যু শুধু একটা ভাষারই মৃত্যু নয়। গোটা বিষয়টার সঙ্গে ভাষারাজনীতি, ক্ষমতাবন্টন, আধিপত্য, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক অস্তিত্বের প্রশ্ন জড়িত। তাই ভাষার মৃত্যুর সঙ্গে মানুষের সভ্যতার একটা জীবন্ত প্রবাহের মৃত্যু ঘটে। হারিয়ে যায় কত সাংস্কৃতিক অর্জন! সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি, ইতিহাসের দিকচিহ্ন ও কত নৃতাত্ত্বিক আকর! ভাষার সমৃদ্ধির মধ্যেই লোকজীবনের সংস্কৃতি সংপৃক্ত থাকে। বহুক্ষেত্রে ভাষার বিবর্তনের সমান্তরালেই চলে একটা লোকজীবনের বিবর্তনধারা। ভাষার মৃত্যুতে সংশ্লিষ্ট সবকিছুই হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।

আশার আলো:

নাহ্! সবটাই অন্ধকারময় আর হতাশার নয়। আশার আলোও আছে। আগ্রাসনের বাস্তবের সমান্তরালে কোথাও কোথাও শুরু হয়েছে পুনর্জীবনের সংবেদনশীল এক প্রতিস্পর্ধা। সরকার, সমাজ, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক চেতনার পক্ষ থেকে কোথাও কোথাও ইতিবাচক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বা হচ্ছে।
প্রায় প্রত্নশালার প্রায়ান্ধকার থেকে তুলে এনে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে হিব্রুকে। তার আগে বিংশ শতাব্দী জুড়ে হয়েছে তার আধুনিকীকরণ। শিক্ষা ব্যবস্থা ও জনজীবনের মিথস্ক্রিয়ায় হিব্রুর বাধ্যতামূলক ব্যবহার তো ইজরায়েলের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ! তার সমান্তরালে হিব্রুর পুনুরুজ্জীবনকে সমাজসাংস্কৃতিক আন্দোলনে পরিণত করা হয়েছে বেসরকারি ও নাগরিক উদ্যোগে।
নিউজিল্যান্ডে “মউরি” ভাষার পুনর্জীবনের উদ্যোগ বড় অভিনব। জাতীয় স্বাতন্ত্র্যের চিহ্নায়ক সমস্ত ধরনের ভাষ্যে এই ভাষাকে অংশীদার করে নেওয়া এবং বাচ্চাদের জন্য “ল্যাঙ্গুয়েজ নেস্ট” প্রোগ্রাম তো সরকারি! কিন্তু গণমাধ্যম ও সামাজিক অনুষ্ঠানে মউরি ভাষার ব্যবহার এসেছে স্বতঃস্ফূর্ত নাগরিক উদ্যোগে।
আমেরিকার “হাওয়াই” ভাষায় তিন দশক আগে কথা বলত অনধিক পঞ্চাশ জন। রাষ্ট্রভাষার অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি ও বিভিন্ন প্রকল্পের সার্থক রূপায়নের পর সেই সংখ্যা এখন কয়েক হাজার।
একইভাবে জাপানের “আইনু”, আয়ারল্যান্ডের “আইরিশ”, ইংল্যান্ডের “কর্নিশ” সহ আরও কিছু মৃতপ্রায় ভাষার পুনুরুজ্জীবন হয়েছে সার্থকভাবে।
ভারতবর্ষে ৮ম তফশিলে “সাঁওতালি” ভাষাকে স্থান দেওয়ার পর তার স্বাস্থ্য কিছুটা ফিরেছে। এই ভাষায় পড়াশোনা করা যাচ্ছে। অসমে “বোড়ো”, সিকিমে “লেপচা” ভাষার পুনুরুজ্জীবনে কিছু কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবু গোটা পৃথিবী জুড়ে বহু বহু মাতৃভাষা আজ বিপন্ন। আধুনিক পৃথিবীর চলন ও সময়ের রূঢ় বাস্তবতা সত্ত্বেও মুমূর্ষু ভাষাগুলোর পুনরুজ্জীবনের জন্য দরকার সামগ্রিক সচেতনতা আর মমত্ব। এই বিষয়ে গণসচেতনতা সমাজসাংস্কৃতিক আন্দোলনে রূপ নিলেই সরকারি উদ্যোগও শুরু হবে।
UNESCO-প্রস্তাবিত ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ উদযাপনের প্রধান উদ্দেশ্য হল গোটা পৃথিবী জুড়ে মুমূর্ষু মাতৃভাষা গুলোর পুনরুজ্জীবনের বিষয়ে গণসচেতনতা বৃদ্ধি। ২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষ্যে আলাপ, আলোচনা, লেখালিখি, সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা, প্রকল্পের প্রস্তাব, এইসব উদ্যোগে সেই চেতনা বাড়তে থাকুক স্কুল, কলেজ, সেমিনার, সাংস্কৃতিক সংস্থা, গণ ও সমাজ মাধ্যমসহ সর্বস্তরে। আর শুধু “প্রত্নমূল্য” স্বীকরণের কর্তব্যে নয়, শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে প্রয়োগের রাস্তাও উন্মোচিত হোক যেখানে সম্ভব, যতটুকু সম্ভব। এই দিনের উদযাপনে শুধু বাংলা কবিতা, আবৃত্তি ও গান নিয়ে নিছক সাংস্কৃতিক দক্ষতা প্রদর্শনের আতিশয্যে আসল উদ্দেশ্যটুকু যেন দিকভ্রান্ত না হয়ে পড়ে। প্রত্যাশা শুধু এটুকুই।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top