বাড়ির অসংখ্য মানুষের মধ্যে এই নতুন মানুষটা কেমন করে যেন আমার মন একটু একটু করে দখল করতে শুরু করেছিল। শ্বশুর বাড়ির অপরিচিত সবার মধ্যে সেও যেন আমাকেই আঁকড়ে ধরেছিল। বড় লোকের মেয়ে বলে তাকে যে সবাই সমীহ করবে, তেমন তো নয়। কলকাতা শহরের মেয়ে, তায় লেখাপড়া জানা, গ্রামের অচেনা অজানা পরিবেশে নতুন সংসারে তার কাজে ভুল হতে লাগল। কাজে ভুল হলে কটু কথা শোনানো হবে না, তাও কি কখনো হয়! একবার ভুল করলে তাকে বেছে বেছে এমন কাজ দেওয়া হবে, যে কাজ তার সাধ্যের বাইরে।
বউটার বয়স একটু বেশি, চোদ্দো বছর। তাই তাকে গাঁয়ের অন্য মেয়ে-বউরাও ঠারে ঠারে কথা শোনাতে ছাড়ত না। কটু কথার কোনো উত্তর সে দিত না। কিন্তু দেখা গেল, ঘরকন্নার কাজ সে একেবারে পারে না, তা নয়। তবে যে কাজ সে করবে না ভাবে, সে কাজ তাকে দিয়ে জোর করে করানো যায় না। যেমন- বঁটি বাগিয়ে ধরে তিনখানা মোচা সে অনায়াসে মিহি করে কুটে ফেলল। তাই দেখে পরদিন তাকে কইমাছ কাটতে দেওয়া হলে পরিষ্কার জানিয়ে দিল, জ্যান্ত কোনো মাছ সে কখনোই কাটবে না।
– বলি ও বউ, কইমাছ খেতে ভালোবাস তো? রাঁধা হলে খাবে তো?
বড় ননদের এ কথার উত্তরে সে বলেছিল, অবশ্যই খাবে, কইমাছ খেতে সে বড়ই ভালোবাসে।
হেঁশেলের পাট উঠলে দুপুর বেলাটা অখণ্ড অবসর। সে সময় সে আমাকে ডেকে তার ঘরে নিয়ে যেত। বিয়ের আগে সে স্কুলে পড়তে যেত। সে-সব পড়া আমাকে ছাত্রীর মতো করে পড়াত। আমারও কিন্তু বেশ লাগত।
– ধর, একটা বড় বাতাবি লেবুর ওপর ছোট্ট একটা পিঁপড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ভাব একবার, ও কি পুরো লেবুটাকে দেখতে পাচ্ছে? ও তো ভাবছে, কতই না হাঁটছি, কিন্তু পথ তো শেষ হচ্ছে না। বাতাবি লেবুটাকে আমরা দেখতে পাচ্ছি, যারা ওর ওপর বসে নেই, তাই না? দেখ ঠাকুরঝি, আমাদের পৃথিবীটাও এমনি গোল, আর মানুষ-হাতি-ঘোড়া সব পিঁপড়ের মতো পৃথিবীর গা বেয়ে হাঁটা-চলা করছি। আর পৃথিবী সূর্যের চারধারে মহাশূন্যে পাক খাচ্ছে।
– কী যে বলিস বউ, তার ঠিক নেই! শূন্যের ওপর ঝুললে আমরা পড়ে যাব না পৃথিবীর গা থেকে?
– পড়ে যাচ্ছি না তার কারণ পৃথিবী আমাদের সর্বদা আকর্ষণ করছে, টেনে ধরে রেখেছে। এই টানটার নাম অভিকর্ষ।
কী সব বলে! নতুন বউ কিছুই বুঝি না। এক গাদা বই নিয়ে এসেছে। রোজ আমাকে ডেকে ঘরের দোর আটকে পড়ায়। এই নিয়ে কানাকানি-হাসাহাসি শুরু হয়ে গেছে। বাড়ির অন্য বউরা দুপুরে বসে ছাঁটা ফুলের আসন, চাদরে সুতোর কাজ, কাঁথা সেলাই এসব করে। কিছু না করলেও পরনিন্দা-পরচর্চা বা নিজেদের বাপের বাড়ির গপ্পো বাড়িয়ে-চড়িয়ে করে বাকিদের হাসির খোরাক হয়।
– তুমি কখনো ভেবে দেখেছো ঠাকুরঝি, গাছ থেকে ফল কেন মাটিতে পড়ে?
– ও মা, কী সে কী বউ! মাটিতে পড়বে না তো কী আকাশে উড়ে যাবে? যত মাথা খারাপের কথা!
ও এবার হেসে ফেলল – না গো, মাথা খারাপ নয়। একটু ভাব দেখি, শূন্যে যা ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে তাই-ই মাটিতে পড়ছে।
– তা কেন, সব তো মাটিতে পড়ছে না। এই দেখ, এই বালিশটা তুলে আবার তোর পালঙ্কে ফেলছি, পালঙ্কেই তো…
কথা থেমে গেল আমার। ওর বালিশের নীচে একটা খোলা চিঠি, পড়তে পড়তে হয়তো আমার সাড়া পেয়ে লুকিয়ে ফেলেছিল। হেসে ফেললাম – ওলো, চিঠিটা ভাঁজ করে যত্ন করে রেখে দে। বেলা পড়ে এসেছে, সন্ধে দিতে হবে, আজ যাই। কাল আবার তোর কাছে পড়তে আসব।
– শোন না ঠাকুরঝি, আমি বলেছিলাম শূন্য থেকে সব কিছুই নিচের দিকে পড়ে।
চেয়ে দেখলাম, ওর ফর্সা মুখখানাতে কেউ যেন সিঁদুর মাখিয়ে দিয়েছে।
সেদিন ফিরে এসে ঠাকুরঘরে ঢোকার সঙ্গেই পিসি-ঠাকমার জেরার মুখে পড়েছিলাম।
– নতুন বউয়ের সঙ্গে তোর অত মাখামাখি কিসের লো? ও সধবা হল মানুষ, নতুন বউ হয়েছে। আর তুই হলি কাঁচা বয়সের রাঁড়। তোদের এত ভাব-ভালোবাসা কিসের? সারাটা দুপুর কোনো কাজ-কম্ম নেই, দুজনের খুব রসের আলোচনা হয় বুঝি?
পিসি-ঠাকমার প্রশ্নে যেন তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলাম।
– ভাগ্যিস রসের গপ্পো করতে যাই, নইলে কী জানতে পারতাম ‘পরের ধনে পোদ্দারি’ কথাটার মানে কী!
– মানে? কী বলছিস তুই?
– বেশ দামি গয়না দিয়েই তো নতুন বউয়ের মুখ দেখেছো দেখছি।
পিসি-ঠাকমার মুখখানা সাদা হয়ে গেল।
– তা আমি সপক্ষে দিদি-শাশুড়ি দামি কিছু না দিয়ে মুখ দেখি কী করে?
– ও, তাই বুঝি! তা নিজের গয়না দিলেই পারতে, আমার গয়নায় হাত দিলে কেন শুনি? এখন না হয় তোমাদের সংসারে-ঘরে খেটে খাচ্ছি, কাল বয়স হলে যখন গতর থাকবে না, তখন আমায় কে দেখবে শুনি? কে বসিয়ে খাওয়াবে? কপাল দোষে গয়না পরতে পারি না সে কথা আলাদা, কিন্তু ওগুলো আমার ইষ্টির ধন, তা জানো নে?
বিনির সব উপদেশ পিসি-ঠাকমার কাছে উগরে দিলাম।
বুড়ি মাথা নাড়লো – তা বটে, তা বটে, বয়স হলে কে দেখবে! তা তুই যেমন আমাকে দেখছিস, তোর বাপ-জ্যাঠা যেমন দেখছে, তেমনি তোর ভাই-দাদারা দেখবে। বদলে বাকি গয়নাগুলো কেড়ে নেবে। তবে শুনে রাখ লো, পরের ধনে পোদ্দারি আমি কখনো করি নি। যা দিয়েছি নিজের জিনিসই দিয়েছি, বিশ্বাস না হলে বাপ-মাকে জিগেস করে আয়।
স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। বুড়ি তখন ঠাকুরঘরে মাজা বাসনগুলো গুছিয়ে তুলছে, বোঝা যাচ্ছে কোমর বেঁকে যাচ্ছে। হয়তো আর বেশি দিন নেই, অভিকর্ষের টানে মাটিতে পড়বে, মাটিতেই ছাই হয়ে মিশে যাবে।
ভাবতে বসলে অনেক পুরোনো কথা মনে আসে। বায়োস্কোপ বলে একটা জিনিস এসেছিল কলকাতায়। সে নাকি যাত্রার ছবি অন্য খানে তুলে, সেই ছবি নানা জায়গায় বড় বড় ফাঁকা ঘরে দেখানো হয়। সে ছবি নাকি হাত-পা নেড়ে চলাফেরা করে। আমার জীবনের ঘটনা গুলোও বায়োস্কোপের মতোই আমার বুঁজ চোখের সামনে যেন হাত-পা নেড়ে চলাফেরা করে, কথা বলে। সেগুলো বড় জীবন্ত।
মনে পড়ে পুকুরপাড়ের মেয়েদের আড্ডার কথা। বাসন মাজতে আসা বা স্নান করতে আসা মেয়েরা অনেকটা সময় নিয়ে দল বেঁধে আড্ডা দিত। মনে পড়ে ওপার বাংলা থেকে আসা সব-হারানো দুঃখী মানুষ গুলোর কথা। নিজের গ্রামে বা শহরে যার-যার মতো সম্পদ ছিল। সে সম্পদ চক-মিলানো প্রাসাদও হতে পারে, আবার দীনের কুটিরও হতে পারে। দেশভাগের মতো দুর্ঘটনা ধনী-দরিদ্র সবাইকে এক করে দিয়েছিল। ঠিক যেমন মরণের পর শ্মশানে সব এক হয়ে যায়। শুনেছি ছোট-বড় অনেক পরিবারের মেয়েরাই হয় ওদেশে, না হয় এদেশে কম-বেশি সম্মান হারিয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রেই তারা ধর্ষিত হয়েছিল। সে-সব মেয়েদের বয়স কখনো দশেরও কম ছিল, কখনো চল্লিশেরও বেশি ছিল।
যারা সম্মান নিয়ে এদেশে আসতে পেরেছিল, তাদের অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না। নিজেদের সংসারের রানিরা এখানে ভিখারিনি হয়েছিল। তেমনই একজন হল সজলের মা। আমাদের গ্রামে আসা উদ্বাস্তুদের মধ্যে একটা ছোট্ট পরিবারের গৃহকর্ত্রী। পরিবারের সবাই দাঙ্গায় কচুকাটা হয়েছিল। খুব সৌভাগ্য যে সে সময় তারা স্বামী-স্ত্রী ও তাদের ছেলে দূরের কোনো গ্রামে বিয়ের নেমন্তন্ন রক্ষা করতে গিয়েছিল। দাঙ্গায় গ্রাম শ্মশান হয়ে গেছে খবর পেয়ে তারা আর ফিরে যায়নি। যে সামান্য টাকা-কড়ি-গয়না ছিল, তাই সম্বল করে পালিয়ে এসে নানা ঘাট ঘুরে, অন্যান্য দুর্ভাগাদের সঙ্গে আমাদের গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে। তার স্বামী সারাদিন নানাভাবে রোজগারের চেষ্টা করত। বউটা অতি কষ্টে সংসার চালাত। রোজ এক পদ আর ভাত রাঁধত।
সজলের মা পুকুরঘাটে আসলে তাকে নিয়ে রগড় করা। বেশ মনে পড়ে, একদিন পুকুর থেকে নেয়ে ওঠার সঙ্গেই কানে গেল, রায় গিন্নি কাউকে চাপা গলায় বলছে–
ওই দ্যাখ, সজলের মা আসছে, চুপ করে থাক, একটা মজা দেখবি।
বেশ পুরোনো আর রং ওঠা শাড়ি পরে সজলের মা পুকুরঘাটে চান করতে এসেছে। কাঁধের গামছাটার অবস্থাও বিশেষ ভালো নয়। সঙ্গে সামান্য কিছু বাসন-কোসন, সেগুলো মেজে পুকুরে ডুব দিয়ে ঘরে ফিরবে। আমাদের দিকে চেয়ে একটু বিষণ্ণ হাসলো।
– কী গো সজলের মা, রান্নাবান্না হলো?
– আইগ্যা হ্যাঁ দিদি।
– তা কী রাঁধলে গো আজ?
যদিও গ্রাম-গঞ্জে এসব প্রশ্ন অনধিকারচর্চা নয়, অবান্তরও নয়, তবুও এ প্রশ্নের উত্তর দিতে বউটা ইতস্তত করলো। তারপর আস্তে নিচু গলায় উত্তর দিল– ওই ফুটো ডালের বড়া আর ভাত।
– কাল কী রেঁধেছিলে গা?
বাসন-মাজা শীর্ণ হাতটা একটু থামলো, বুকের কাছে নেমে আসা মুখখানা তুলে ক্লিষ্ট হেসে বললো– রোজই একই পদ রাঁধি গো দিদি। ওর বেশি সজলের বাপ জোগাড় করতে পারে না।
ওরা কয়েক বছর এ গাঁয়ে এসেছে পূর্ববঙ্গ থেকে। হরি জ্যাঠামশাই খানিকটা জমি দান করেছেন, তাতে কয়েক ঘর বাউনবস্তি মতো করে ঘর বেঁধে বাস করছে।
বউটা চলে যেতেই সবাই হেসে এ-ওর গায়ে ঢলে পড়লো– ফুটো ডালের বড়া কী ভাই? ডালে পোকা লেগে ফুটো করে দেওয়া ডাল? রোজ-রোজ পোকা-খাওয়া ডালের বড়া খায়? হি হি… পায় কোথায়? আজকাল হরেন মুদি পোকা-লাগা ভেজাল জিনিস বেচেছে?
– নারে, আগে আমিও তাই ভাবতাম। পরে বুঝলাম, ডাল আধফোটা করে নিয়ে নরম করে, তারপর বেটে… হি হি… পাগল আর কাকে বলে!
গ্রামের কেউই এদের সহ্য করতে পারে না। আগে প্রতিটা জাম-জামরুলতলা গাছ থেকে পড়া ফলে ভরে থাকত। খাওয়ার লোক পাওয়া যেত না। পচে গন্ধ বের হতো। আম-লিচু-কলা সে-ভাবে নষ্ট না হলেও সবার ঘরে খাদ্য উপচে পড়ত। দেশভাগের পর এই-সব উদ্বাস্তুরা এসেছে যেন পঙ্গপালের মতো। কোনো গাছে কোনো ফল পাকতে পারছে না। এরা যেন ওপার থেকে অনন্ত ক্ষুধা নিয়ে এসেছে। দুর্ভিক্ষের স্মৃতি এখনো ম্লান হয়নি, তার পরেও স্রোতের মতো উদ্বাস্তুদের আগমন কেউই ভালো চোখে দেখছে না। আবার এই সর্বহারা মানুষগুলোর দাবি করে যে, ওদের জমিদারি ছিল, যেটা ওদের প্রতি ঘৃণা আর অবজ্ঞার আগুনে ঘি ঢালার কাজ করে। হয়তো এদের মধ্যে কেউ কেউ সত্যিই ধনী পরিবারের, কেউ হয়তো সাধারণ গৃহস্থ। কিন্তু দেশভাগের মতো বিপর্যয় সবাইকে এক আসনে বসিয়ে দিয়েছে।
নতুন বউ প্রতিটি দুপুরে একটু একটু করে আমাকে শিক্ষিত করে তুলছিল। যে ব্যাপারটাকে নেহাত হালকাভাবে নিয়েছিলাম, তা পরিবারের আর পাঁচজনের সঙ্গে আমার পার্থক্য গড়ে দিয়েছিল। বিশেষ করে রবিঠাকুরের কবিতাগুলো যেন আমাকে ভেতর থেকে শুদ্ধ করে তুলছিল।
– ঠাকুরঝি, গান শিখবে?
– না গো বউ, যা শিখছি তাই ঢের। গান শিখলে বাড়িতে আর থাকতে দেবে না। তুমি গান জানো, আগে বলো নি তো? শোনাও দেখি!
– এ কিন্তু তোমাদের ঠাকুর দেবতার গান নয়।
– তবে কিসের গান বউ?
– শাস্ত্রীয় সংগীত।
বুঝলাম না।
– বুঝতে হবে না, বাদ দাও। বরং রবিঠাকুরের একটা গান শোনো। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে, দেখো তোমার খুব ভালো লাগবে।
অঝোরে বৃষ্টি পড়ে চলেছে সেই সকাল থেকে, উঠোনে পায়ের পাতা-ডোবানো জল জমেছে। খেয়ে-দেয়ে ছেলে-পুলে নিয়ে যে-যার নিজের ঘরে বন্দি। নতুন বউ গান ধরলো– ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী…’
ভালোবাসা, মুগ্ধতা, শ্রদ্ধা সব মিলিয়ে অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে চেয়েছিলাম, ও দুচোখ বন্ধ করে তন্ময় হয়ে গাইছে… একের পর এক বর্ষার গান। আমার শরীর-মন-আত্মা সব যেন বৃষ্টিধারায় ধুয়ে গেল… আনন্দধারা বইলো ভুবনজুড়ে। এক মঙ্গলধ্বনি আমার ছোট্ট গ্রাম-দেশ-পৃথিবী ছাড়িয়ে কোনো সুদূর মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ল, হঠাৎই সমস্ত শরীরে একটা কাঁপুনি দিল। বউয়ের কোলে জড়ো করা হাত দুটো সন্তর্পণে জড়িয়ে ধরলাম, আমার চোখেও যে বর্ষা নেমেছে।
ক্রমশ



