কালো সকাল। হলুদ দুপুর। নীল রাত্রি।

কালো সকাল। হলুদ দুপুর। নীল রাত্রি।

এত আনন্দ শরীরে নাকি মনে? মন কোথায় থাকে— মগজে না অন্তরে? যাহা অন্তর, তাহাই মন? হৃদয় আর হৃদপিণ্ডের ফারাক কতটুকু? বিজ্ঞানের সাথে অবিজ্ঞান যতটা দূরে? অথচ দুটোর অস্তিত্ব সমান সত্য। প্রমাণ-পর্যবেক্ষণ-সিদ্ধান্তই শেষ কথা —কে বললে? আড়ালের রহস্য উদঘাটন করবে কার সাধ্যি? খুব কাছে, অথচ অধরা! আত্মাকে সার্জারি করে বের করো দেখি কেমন মুরোদ! যাহা অন্তর, তাহাই ঈশ্বর? সাত-পাঁচ ভাবনায় ক্লান্তি আসে। মস্তিষ্ক এখন ঘুমুবে, আর মন জেগে জেগে স্বপ্ন দেখবে! স্বপ্নের অস্তিত্ব নেই, অথচ স্বপ্ন দেখি! জীবন থেকে হারিয়ে গেছে যে সময়, তাকে ফিরে পেতে পারি?

এই দিনরাত্রি, এই সকাল বিকেল, এই মায়াবন্ধন— সবই ওই স্বপ্নের মতো গোলমেলে, যা সত্য অথচ সময় পেরোলে অস্তিত্বহীন…

আদর…

খুব ছোটবেলায় পুকুরঘাটে একজনের আদর খেয়েছিলাম। মেয়েদের যেমন আদর করে, ঠিক সেরকম। অবাক হয়ে ভাবছিলাম, কাকু করছেটা কী? বুক টিপছে, পাছা ধরছে। শেষে হাত ছাড়িয়ে পুকুরঘাট থেকে দে দৌড়! প্রতিটি ট্রান্সজেন্ডারের আরেকটি জন্ম বুঝি এইভাবেই হয়?

পুরুষ জন্মের মৃত্যু……

বয়স মনে নেই। মেয়েবেলা শুরু হয়েছিল ছোট থেকেই। খেলাটির নাম “মা-বাবা” খেলা। সকলে মিলে আমাকেই বউ সাজাতো। কোমরে কলসি রেখে জল ভরে আনতাম। শ্যাওলা দিয়ে রান্না করতাম। সকলকে খেতে দিতাম। তুলতুলে মাথার ভেতর প্রতিদিন আমার পুরুষ জন্মের মৃত্যু ঘটে চলেছিল, টেরও পাইনি।

এ ছেলে সন্ন্যাসী হবে…

মামার বাড়ি কোলাঘাটে একবার এক বৃদ্ধ হাত দেখে বললেন, “এ ছেলে সন্ন্যাসী হয়ে যাবে।” তখন ফোর কি ফাইভে পড়ি। রানিগঞ্জ রায় সাহেব মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালয়ের শঙ্কর স্যারও যতবার দেখেছেন, ততবার বাবাকে বলেছেন, “এ ছেলে ঘরে থাকবে না, সন্ন্যাসী হয়ে পালাবে।” এসব শুনে টুনে আমিও হঠাৎ করে ঠাকুর ভক্ত হয়ে উঠলাম। পড়ার ঘরে ঠাকুর পাতলাম, ফুল, ধূপ, প্রদীপ জ্বালিয়ে জেঠিমার মতই আরতি করতাম, শেষে জপ করে পুজো শেষ হতো। ঠাকুর-দেবতা নিয়ে এত হুজুগ দেখে জ্যাঠা-জেঠিমা ভয় পেয়ে গেলো। এর চোটে পড়ালেখার বারোটা বেজে যাচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যেই অবশ্য এই পুজো-আর্চা সব বন্ধ করে দিয়ে আবার পড়ালেখায় মন দিলাম। জ্যাঠা-জেঠিমাও স্বস্তি পেল। ছোট্টবেলার কয়েকদিনের ভক্তি, আজ যেন রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে চলেছে। চোখের সামনে এত মৃত্যুতে হয়তো ভেসে যেতাম। আজ কোথাও অন্তত মাথা ঠেকিয়ে একটু আশ্রয় পাই….

কী আমার পরিচয় মা?…

নীল মুখে সাদা চুনকাম! দু’চোখ জুড়ে টানা অন্ধকার! ঝাপসা রঙা লিপস্টিক! নাকে নোলক, কাঁধে ঢোলক! দুই হাতের ঠিকরিতে বাজ ভাঙার শব্দ! এই মানুষ গুলোই আমি? এরাই আমার মুখ? আমার আয়না? কে আমি? কী আমার পরিচয়? আর পাঁচজনের মতো আমি নই কেন? হাততালি দেওয়া লোকগুলো এসব জানতে পারলে আমায় ধরে নিয়ে যাবে? কী আছে সামনের দিনগুলোতে…?

মা তুমি কোথায়?

মনের ব্যামো ওষুধে মেটে না। এই প্রখর রৌদ্র মাঝে কত মৃত্যুর অন্ধকার। এই জাহান্নাম আমার ঠিক-ঠিকানা। কত হট্টগোলের মধ্যেও এত নীলচে স্তব্ধতা। মায়ায় জড়ানো এই হলুদ বিকেল, গোলাপি সন্ধ্যা, কালো রাত্রি! হরর! তারাদের দেশ? বাঃ, এই বেশ! মস্তিষ্কে পাহাড় জমে, মনে ব্যামো। দুটো চোখ বন্ধ করে এই ডুব দিলাম। মা, তুমি কোথায়? আমার যে বড্ড ভয় করছে মা! কেউ সাড়া দেয় না। মগজ থেকে মন, মন থেকে মগজ—দুমদুম করে লাফিয়ে বেড়ায় কারা? শেষ রাতে একটু চোখ লাগতেই ভূতের মতো একটা সকাল এসে দাঁড়ালো! গতকালের অন্ধকার চাই, গতকালের রাতটা চাই—পেছন ফেরার রাস্তা কোন দিকে, কেউ বলতে পারো?…

উঠোন জুড়ে রৌদ্রের এত অপচয়। মাথার ওপর ভূতের মতো বসন্ত। সকল বিপর্যয় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি একা, নিঃসঙ্গ। থমথমে সিলিং, গম্ভীর দেওয়াল, ভাঙা উঠোন, উল্টানো উনুন, ঝুলকালি তুলসী থান। সমস্ত লণ্ডভণ্ড আগলে আছি আরও ঝড়ের আশায়!

ডাকনাম রাজা, ভালো নাম কল্যাণ। এখন রানি। নাম বদলে দিয়েছি, শরীর বদলে দিয়েছি, জীবনটাও কেমন বদলে গেল! কত ঝড়ঝঞ্ঝা বয়ে গেলো জীবনটার ওপর দিয়ে! সে এক মহাভারত! গোলমেলে জীবনের এলোমেলো সেই গল্প শুরু করছি পরের সংখ্যা থেকে…


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top