মিষ্টি ভালোবাসা

busy kolkata

কলকাতার শরতের সন্ধ্যা। আকাশে তুলোর মতো মেঘ, রাস্তায় কাশফুলের গন্ধ, আর হাওয়ায় হালকা শীতের ছোঁয়া। শহরটা যেন উৎসবের অপেক্ষায়। গড়িয়াহাট মোড়ে মানুষের ভিড়, ফুচকার দোকানে লাইন, আর দূরে কোথাও পুজোর ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসছে।
ঋত্বিক তখন এক হাতে কফির কাপ আর অন্য হাতে মোবাইল নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিল। হঠাৎ পিছন থেকে একটা ধাক্কা—
ছপাৎ!
পুরো কফিটা এসে পড়ল একটা মেয়ের সাদা কুর্তির ওপর।
—“ও মাই গড!”
ঋত্বিক হতভম্ব। —“সরি! সরি! আমি দেখিনি!”
মেয়েটা বড় বড় চোখ করে তাকাল। —“দেখেননি মানে? চোখে কি কফি ঢুকেছিল?”
ঋত্বিক একটু হেসে ফেলল। —“না… তবে এখন মনে হচ্ছে আপনার রাগেই ডুবে যাচ্ছি।”
মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে বলল, —“লাইন মারছেন?”
—“এই অবস্থায় সাহস হবে?”
মেয়েটা রাগ চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল। তারপর বলল, —“ঠিক আছে, কিন্তু এই কুর্তির ক্ষতিপূরণ?”
—“আমি নতুন একটা কিনে দেব।”
—“বাহ! বেশ বড়লোক মনে হচ্ছে।”
—“না, ভুল করেছি বলে বললাম।”
মেয়েটা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, —“আমি নন্দিনী।”
—“ঋত্বিক।”
সেদিনের সেই ছোট্ট ঘটনাটা থেকেই শুরু হলো তাদের গল্প।
তারপর থেকে অদ্ভুতভাবে প্রায়ই দেখা হয়ে যেত। কখনও মেট্রো স্টেশনে, কখনও বইমেলায়, কখনও আবার একই কফিশপে। প্রথমে দুজনেই ভাবত কাকতালীয়, পরে বুঝল—ভাগ্য হয়তো একটু দুষ্টুমি করছে।
নন্দিনী ছিল ভীষণ প্রাণবন্ত মেয়ে। সবসময় হাসিখুশি, চঞ্চল, আর অসম্ভব দুষ্টু। আর ঋত্বিক ছিল ঠিক উল্টো—শান্ত, কম কথা বলা, একটু লাজুক ধরনের।
একদিন নন্দিনী হঠাৎ বলল, —“আপনি এত চুপচাপ কেন?”
—“সবাই তো তোমার মতো সারাদিন বকবক করতে পারে না।”
—“ওহ! মানে আমি বেশি কথা বলি?”
—“না… তুমি কথা বললে শুনতে ভালো লাগে।”
নন্দিনী কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর মুখ ঘুরিয়ে বলল, —“এইসব মিষ্টি কথা বলে লাভ নেই।”
ঋত্বিক মুচকি হেসে বলল, —“কিন্তু তোমার গাল তো লাল হয়ে গেছে।”
—“চুপ করুন!”
সেই প্রথম নন্দিনী একটু লজ্জা পেয়েছিল।
দিন কেটে যাচ্ছিল। ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্কটা বন্ধুত্বের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে উঠছিল। রাতে ঘন্টার পর ঘন্টা ফোনে কথা, হঠাৎ অভিমান, আবার পাঁচ মিনিট পরে মিল—সবকিছুতেই যেন এক অদ্ভুত মায়া।
কিন্তু নন্দিনীর একটা স্বভাব ছিল—সে ঋত্বিককে খুব জ্বালাত।
একদিন বিকেলে তারা প্রিন্সেপ ঘাটে বসেছিল। গঙ্গার হাওয়ায় নন্দিনীর চুল উড়ছিল।
হঠাৎ একটা ছেলে এসে নন্দিনীকে বলল, —“এক্সকিউজ মি, আপনার নামটা জানতে পারি?”
নন্দিনী চোখ টিপে বলল, —“কেন বলুন তো?”
ঋত্বিক পাশে বসে সব শুনছিল।
ছেলেটা একটু হেসে বলল, —“আপনাকে খুব সুন্দর লাগছে।”
নন্দিনী এবার ইচ্ছে করেই হেসে বলল, —“থ্যাংক ইউ!”
ঋত্বিকের মুখটা সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গেল।
ছেলেটা চলে যাওয়ার পর নন্দিনী হাসতে হাসতে বলল, —“কী হলো? মুখ এমন কালো কেন?”
—“কিছু না।”
—“হিংসে হচ্ছে?”
—“না।”
—“মিথ্যে।”
ঋত্বিক এবার একটু বিরক্ত হয়ে বলল, —“তুমি এসব ইচ্ছে করে করো, তাই না?”
নন্দিনী ঠোঁট কামড়ে হাসল। —“হ্যাঁ।”
—“কেন?”
—“কারণ আপনি হিংসে করলে খুব কিউট লাগে।”
ঋত্বিক অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর দুজনেই হেসে ফেলল।
নন্দিনী মাঝে মাঝে এতটাই দুষ্টুমি করত যে ঋত্বিক সত্যিই রেগে যেত।
একদিন রাত্তিরে নন্দিনী মেসেজ করল— “আমি কাল বিয়ে করে ফেলছি।”
ঋত্বিকের বুক ধক করে উঠল।
সে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করল। —“মানে? কী বলছ?”
ওপাশে নন্দিনীর হাসি। —“আরে বাবা, আমার বান্ধবীর বিয়ে!”
ঋত্বিক রেগে বলল, —“তুমি একদিন আমাকে হার্ট অ্যাটাক করাবে।”
—“তাহলে বুঝলাম, আমাকে হারানোর ভয় আছে?”
ঋত্বিক চুপ করে গেল।
নন্দিনী ধীরে বলল, —“বলুন না… আছে?”
অনেকক্ষণ পরে ঋত্বিক ফিসফিস করে বলল, —“খুব।”
সেই প্রথম নন্দিনী বুঝেছিল, এই ছেলেটা তাকে সত্যিই ভালোবাসে।
পুজোর অষ্টমীর দিন নন্দিনী লাল-সাদা শাড়ি পরে ঋত্বিকের সামনে এসে দাঁড়াল।
ঋত্বিক কয়েক মুহূর্ত তাকিয়েই রইল।
—“কী হলো? এত দেখছেন কেন?”
—“তোমাকে আজ… অসম্ভব সুন্দর লাগছে।”
নন্দিনী হেসে বলল, —“আজ শুধু?”
—“না… প্রতিদিনই লাগে।”
নন্দিনী এবার সত্যিই লজ্জা পেল।
সন্ধ্যায় ভিড়ের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ নন্দিনী হারিয়ে গেল।
ঋত্বিক চারদিকে খুঁজতে লাগল। —“নন্দিনী! নন্দিনী!”
কিছুক্ষণ পরে পিছন থেকে কেউ তার চোখ চেপে ধরল।
—“এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন?”
ঋত্বিক ঘুরে দাঁড়িয়ে রাগে বলল, —“তুমি পাগল নাকি? আমি ভয় পেয়ে গেছিলাম!”
নন্দিনী একটু থেমে গেল। —“এত চিন্তা করেন আমার জন্য?”
ঋত্বিক এবার ধীরে বলল, —“কারণ তোমাকে ছাড়া সবকিছু ফাঁকা লাগে।”
কথাটা শুনে নন্দিনীর মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। চোখ দুটো হঠাৎ নরম হয়ে উঠল।
ঢাকের আওয়াজ, আলোর ঝলকানি, মানুষের ভিড়—সবকিছুর মাঝেও যেন মুহূর্তটা থেমে গেল।
নন্দিনী ধীরে বলল, —“একটা কথা বলব?”
—“হুম?”
—“আমি যদি কোনোদিন সত্যিই হারিয়ে যাই?”
ঋত্বিক এক মুহূর্তও দেরি না করে ওর হাতটা ধরে বলল, —“তাহলে আমিও হারিয়ে যাব।”
নন্দিনীর বুকটা কেঁপে উঠল।
ঋত্বিক এবার সাহস করে বলল, —“আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
নন্দিনী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে হাসল।
—“এতদিনে বললেন?”
—“মানে?”
—“আমি তো অনেক আগেই প্রেমে পড়েছি।”
—“কবে?”
—“যেদিন কফি ফেলেছিলেন।”
ঋত্বিক হেসে ফেলল। —“তাহলে সেই কফিটা কাজে দিয়েছিল!”
—“হুম। তবে একটা কথা—”
—“কি?”
নন্দিনী দুষ্টু হেসে বলল, —“বিয়ের পরেও কিন্তু আপনাকে এভাবেই জ্বালাব।”
—“আমি সারাজীবন জ্বালাতে দেব।”
নন্দিনী এবার আলতো করে ঋত্বিকের কাঁধে মাথা রাখল।
আকাশে তখন হালকা চাঁদ উঠেছে। দূরে ঢাক বাজছে। চারপাশে উৎসবের আলো।
আর সেই আলোর মাঝখানে দুটো মানুষ চুপচাপ নিজেদের ভালোবাসার গল্প লিখে চলেছে।
প্রেম আসলে এমনই— একটু দুষ্টুমি, একটু অভিমান, একটু হিংসে, আর অনেকটা মিষ্টি ভালোবাসা।
যেখানে কারও হাসিতে মন ভালো হয়ে যায়, কারও রাগেও লুকিয়ে থাকে আদর, আর কারও হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়— এই মানুষটার সঙ্গেই পুরো জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া যায়।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top