ছবি ও কবি

A graceful still life of handwritten calligraphy with a quill pen and ink on paper, showcasing artistic elegance.

বইমেলা চত্বরটা তখনও ফাঁকাই আছে। ঘণ্টাখানেক পরেই এইসব জায়গায় আর দাঁড়ানো যাবে না, এমনভাবে ভিড় উপচে পড়বে। এখনই পিলপিল করে লোক ঢুকতে শুরু করে দিয়েছে।

অন্যমনস্কভাবেই কবি হাঁটছিলেন। তাঁর চলার গতি ক্রমেই মন্থর হয়ে আসছে। চারদিকে তিনি খুঁটিয়েই খুঁটিয়ে দেখছেন। পরিচিত মুখ খুঁজছেন। প্রতি বছরই বইমেলায় তিনি আসেন। বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে যান। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আসাও কমে গেছিল। এলেও বেশিক্ষণ থাকতে পারতেন না। আর এবার তো তাঁর আসার কথাই নয়। কেউই তাঁকে আশা করবে না। তবু তিনি এসেছেন। পরিচিত মুখগুলোর টানেই এসেছেন।

গত বছর কবির আশি বছর পূর্ণ হয়েছে। তবু এখনও তিনি রীতিমতো সচল। এখনও তাঁর পিঠ সোজা আছে। ঘাড় মজবুত আছে। মাথা উঁচু আছে। বয়স তাঁকে খুব বেশি কাবু করে ফেলতে পারেনি। তিনি জনপ্রিয় কবি নন ঠিকই, কিন্তু তাঁর মতো কবি বাংলা ভাষায় কজন আছেন?

সামনেই বাংলা ভাষার এক বৃহৎ প্রকাশনা সংস্থার স্টল। সেই স্টলের পিছনের দিকটায় ওপর থেকে নিচে সারি দিয়ে রয়েছে কবি-সাহিত্যিকদের ছবি। কবি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ছবিগুলো দেখতে শুরু করলেন। হঠাৎ তাঁর কেমন যেন অস্বস্তি হতে শুরু করল। তাঁর মনে হল, বিশেষ একটা ছবি তাঁর দিকে তাকিয়ে যেন ভেংচি কাটছে। ভালো করে নজর করে তিনি তাজ্জব বনে গেলেন। এ যে তাঁর নিজেরই ছবি! এরা তাঁর ছবির ফ্লেক্স এখানে লাগিয়েছে কেন?

নিজের ছবির মুখোমুখি হয়ে কবি রীতিমতো ঘাবড়ে গেলেন। তাঁর চোখে শুরুতে একটা কষ্টের ভাব ফুটে উঠলেও ক্রমে সেই জায়গা নিল তীব্র শ্লেষ। হঠাৎ কারও গলার স্বর পেয়ে কবি সেদিকে তাকালেন। ঠিক তাঁরই মতো গভীর বিস্ময়ে ছবিটির দিকে তাকিয়ে রয়েছে এক যুবক। আর নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলছে, এ কী করে সম্ভব! এ যে অদ্ভুত ব্যাপার!

কবি নিজেও বিস্ময়ের ভান করে বললেন, কী হয়েছে ভাই? তুমি এভাবে বলছ কেন?

যুবকটির বয়স বাইশ–তেইশের বেশি নয়। কবির দিকে তাকিয়ে সে সন্দেহ প্রকাশ করে বলল, আমার নাম সৃজন। কিন্তু আপনি কে? এখানে কী করছেন?

কবি নিজের মাস্কটিকে আরও আঁটোসাঁটো করে নিলেন। তারপর আবার জানতে চাইলেন, অত অবাক হয়ে কী দেখছ তুমি?

সৃজন এবার সামান্য উত্তেজিত হয়ে বলল, অতুল ধর। এই ছবিটি তাঁরই। দুর্দান্ত কবি। আপনি এর কবিতা পড়েছেন?

অল্প-স্বল্প। কবি ইচ্ছে করেই নির্লিপ্ত স্বরে বললেন, যাতে ছেলেটির মনে কোনো সন্দেহের উদ্রেক না করে!

সৃজন বলল, আমি এই কবির অন্ধ ভক্ত। এঁর প্রায় সমস্ত বইই আমি পড়েছি। এই পোড়ার দেশ বলেই, এত বড়ো কবি হয়েও তিনি কখনও উপযুক্ত সম্মান পেলেন না।

কবি ঈষৎ বিষন্ন হলেন।

সৃজন আবার বলে উঠল, আচ্ছা, এদের কি মতলব, বলুন তো? জীবদ্দশায় এরা কোনোদিন কবির একটি লাইনও প্রকাশ করেনি…

তা ঠিক। কবি বললেন।

এ নিয়ে কবির মনে গভীর দুঃখ ছিল। সৃজন বলে চলে, এরা চিরকাল কবিকে অবজ্ঞা আর তাচ্ছিল্য করে এসেছে।

অতুল ধর একবার লিখেছিলেন না, প্রভাবশালী লোকের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পেলে এরা একটা কুকুরেরও বই বার করতে পারে! কিন্তু যে কবি বা লেখকের প্রতিভা থাকলেও খুঁটির জোর নেই, অথচ আত্মসম্মান বজায় রেখে বাঁচতে চায়, এরা তার দিকে ফিরেও তাকাবে না।

সৃজন বলল, হ্যাঁ, এদের প্রতি কোনওদিনই শ্রদ্ধার মনোভাব ছিল না কবির। আর এরাই আজ বিজ্ঞাপনের মতো করে কবির ছবি স্টলের গায়ে টাঙিয়ে দিয়েছে। সারা জীবন কবিকে দলে-পিষে এখন এরা নিরপেক্ষতা দেখাচ্ছে। হঠাৎ এরা এত উদার হয়ে উঠল কেন?

উদার নয়, এরা হয়তো দয়ালু হয়ে উঠেছেন। কবি বললেন। অতুল ধরকে দয়া করতেই চেয়েছেন…

তাই মনে হয় আপনার? সৃজন আপত্তি করল। কবির ছবি না থাকলে এদের এই গ্যালারি, এই প্রদর্শনী অসম্পূর্ণ থেকে যেত না? এটা নিয়ে কথা উঠত। এই প্রকাশন সংস্থার ভাবমূর্তির পক্ষে সেটা ঠিক হতো না…

কবি বললেন, এর চেয়ে বড়ো ঠাট্টা আর কী হতে পারে, বলো? নিজেদের ভাবমূর্তিকে বজায় রাখতে এরা এখন কবির ছবিকে ব্যবহার করছে। কিন্তু যদি এরা তা না করত, তাতে সত্যিই কী এদের কিছু যেত-আসত? এদের ভাবমূর্তিতে সামান্য আঁচড়ও পড়ত? কে মনে রেখেছে অতুল ধরের মতো নগণ্য একজন কবিকে? তিনি এই ছবির প্রদর্শনীতে রইলেন কী রইলেন না, কে তা নিয়ে মাথা ঘামাতো? কেউ না। না, এদের বদান্যতাকে স্বীকার করতেই হবে! তুমি বেশি বেশি ভাবছো…

সৃজন একটু চুপ করে থেকে বলল, তাহলে আপনার কী মনে হয়?

কবি কৌতুক করে বললেন, হয়তো জায়গাটা ফাঁকা থাকলে বিশ্রি দেখাতো। তাই ফাঁকা জায়গাটা ভরাট করতে হবে বলেই বাধ্য হয়ে অতুল ধরের কথা ওদের মনে পড়েছে…

সৃজনের হঠাৎ একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। সে বলল, বাধ্য হয়ে সত্যিই মানুষকে কত কি করতে হয়! আমার বাবার খুবই সাধারণ অবস্থা। বৃদ্ধ ঠাকুমার কথা ভেবেই অনেক কষ্টে টাকা জমিয়ে একটা গাড়ি কিনেছিলেন। কিন্তু আমাদের কোনো গ্যারেজ নেই, বাড়িতে গাড়ি রাখার মতো ফাঁকা জায়গাও নেই। বাধ্য হয়ে বন্ধুস্থানীয় প্রতিবেশী মনোজ কাকুকে ওদের বাড়িতে গাড়িটা রাখার প্রস্তাব দিলেন। মনোজ কাকুর বাড়িতে অনেকটা ফাঁকা জায়গা আছে। তবু তিনি রাজি হলেন না। বললেন, গাড়িটা রাখলে ওদের সুন্দর বাগানটা নষ্ট হয়ে যাবে। কিছুদিন পরেই তিনি অবশ্য একটা দামি গাড়ি কিনলেন। দিব্যি সেই ফাঁকা জায়গায় গাড়িটা রাখারও ব্যবস্থা হয়ে গেল। বাগানের ক্ষতি হওয়ার কথাটা উনি আমলই দিলেন না।

কবি কৌতূহল বোধ করলেন। তাঁর চোখ দেখে উৎসাহিত হয়ে সৃজন বলে চলল, মনোজ কাকুর একমাত্র মেয়ের বিয়ের পর মেয়ে সেই দামি গাড়িটা নিজের ব্যবহারের জন্য চেয়ে নিল। মনোজ কাকুও দিতে বাধ্য হলেন। কিন্তু তাঁর আর আগের অবস্থা ছিল না যে, আবার একটা নতুন ও দামি গাড়ি কিনবেন। এদিকে গাড়িতে তিনি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন, গাড়ি ছাড়াও তাঁর চলবে না। বাধ্য হয়ে আমাদের সস্তা গাড়িটাই তাঁদের গ্যারেজে রাখার প্রস্তাব দিলেন বাবাকে। বাবা সব জেনেবুঝেও এই প্রস্তাব মেনে নিলেন। যে গাড়িটা একদিন মনোজ কাকু নিজের গ্যারেজে রাখতে চাননি, আজ সে-ই গাড়ির ওপরই তিনি সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। দরকার পড়লে সেই গাড়িতে চেপেই তাঁকে বেরোতে হয় এখন…

কবি বললেন, এইরকমই হয়…

সৃজন সায় দিয়ে বলল, আমারও তাই মত। অতুল ধরকেও এই প্রকাশন সংস্থা বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে। অতুলের খুব ইচ্ছে ছিল, তাঁর অন্তত একটি বই ওরা প্রকাশ করবে। সেই স্বপ্ন সফল হয়নি। আজ সেই অতুলের ছবিই ওরা টাঙাতে বাধ্য হয়েছে…

কবির চশমা ঝাপসা হয়ে এসেছিল। চশমাটা চোখ থেকে টেনে খুলতে যেতেই পট করে মাস্কের ফিতেটাও ছিঁড়ে গেল। আর সেই মুহূর্তে তাঁকে দেখে ভূত দেখার মতোই চমকে উঠল সৃজন। তারপর চেঁচিয়ে উঠল, কে আপনি? কে?

কবি সামান্য হেসে বললেন, অতুল ধর।

সৃজন খুব সাহসী ছেলে। একটুও ভয় না পেয়ে সে বলে উঠল, আপনি তাহলে ফিরে এসেছেন। শুনেছি মৃত্যুর আগে চেনা মুখগুলো খুব করে খুঁজেছিলেন। আর বলেছিলেন, ওরা কেউ আসেনি! কেউ না! যাদের আপনি ভালোবাসতেন, তাদের ভালোবাসায় একদম নিঃসন্দেহ ছিলেন আপনি। নিপাট ভালোমানুষ বলতে যা বোঝায়! কিন্তু আপনি যখন মরে যাচ্ছিলেন, কেউ আপনাকে দেখতে আসেনি। আপনার পাশে থাকেনি। তাহলে ফিরে এলেন কেন আপনি?

কবি হেসে বললেন, দেখতে এলাম, কেউ আমাকে মনে রেখেছে কিনা। কিন্তু এ যা দেখলাম, তা তো আমি আশাই করিনি! আচ্ছা, আমি তো ওদের লেখক ছিলাম না। ওরা আমাকে ঘোর অপছন্দ করত। সারা জীবন, যতভাবে পারে, সবকিছু থেকে আমাকে শুধু বাদ দিয়ে গেছে। কোনওদিন আমার একটা লাইনও ছাপেনি…

সৃজনের চোখে মিলেমিশে আছে বিস্ময় আর কৌতূহল। সত্যিই কি তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন অতুল ধর? তাঁর প্রিয় কবি? কিন্তু এই সুযোগ ছাড়াও তো যায় না।

সে বলল, ওরা আপনাকে অস্বীকার করতে পারেনি। জীবদ্দশায় ওরা আপনার উপস্থিতিকে ভয় পেতো। আপনার কলম ওদের কাছে ছিল অস্বস্তির কারণ। আপনি ওদের চোখে বিপজ্জনক ছিলেন। এখন আপনি মৃত। এখন আর আপনাকে নিয়ে ওদের কোনো আশঙ্কা নেই। কারও সঙ্গে আপনার প্রতিযোগিতাও নেই। আপনার ছবিও ওদের কাছে নিরাপদ মনে হয়েছে।

কিন্তু কীসের আশঙ্কা ছিল ওদের?

ওরা চায়নি, ওদের পছন্দের লেখকদের সামনে ওদেরই সমর্থনে আপনি আরও বড়ো হয়ে উঠুন। আপনার উচ্চতাকে অগ্রাহ্য করে ওরা ওদের তাবেদার, খাটো মানের লেখকদের মানুষের চোখে উঁচু করে দেখাতে চেয়েছিল। কিন্তু অতুল বাবু…

কবি অবাক হয়ে তাকালেন সৃজনের দিকে। সে বলে চলল, কবি মৃত হলে তাঁকে অস্বীকার করা অত সহজ নয়, যদি তাঁর সত্যিই গুরুত্ব থাকে…

হঠাৎ অতুল ধরের ছবিটি চেঁচিয়ে উঠল, তুমি এখনও এখানে দাঁড়িয়ে আছ? কেন? কেন তুমি আমার ক্ষতি চাও? বেশ আছি আমি, নিরাপদে আছি…

কী চাও তুমি? কবি যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছেন, এইভাবে জানতে চাইলেন। নিজের সঙ্গে এভাবে বোঝাপড়া করতে হবে, খোলা ময়দানে মুখোমুখি মোকাবিলা করতে হবে, এ তিনি ভাবতেই পারেননি।

ছবিটি আবার বলল, বুঝতে পারছ না? তোমাকে এখানে, এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে ওরা আমাকে আস্ত রাখবে নাকি? টান মেরে আমাকে খুলে নেবে। আমার অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে উঠবে…

তাহলে আমি কী করব? বিপন্ন গলায় কবি জানতে চাইলেন।

পালিয়ে যাও। এই মেলার ত্রিসীমানায় থেকো না। তুমি আমার পক্ষে খুবই বিপজ্জনক। বড়ো বেশি ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছ তুমি। তোমাকে কেউ দেখতে পেলে আমার বেঁচে থাকাই অনিশ্চিত হয়ে যাবে। সবাই আমাকে সন্দেহ করবে। অস্বীকার করবে। আমাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইবে। তুমি আমাকে রেহাই দাও। আমি তোমার কাছে নিজের আয়ু ভিক্ষা চাইছি…

কবি হঠাৎ যেন কথাগুলোর গুরুত্ব বুঝতে পারলেন। তিনি আর কোনো দিকে না তাকিয়ে ছুটতে শুরু করলেন। দেখতে দেখতে তিনি ভিড়ের মধ্যে মিশে গেলেন।

সৃজন আর সহ্য করতে পারল না। ছবিটির দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল, এ তুমি কী করলে? ওঁর ছবি হয়ে ওঁকেই প্রত্যাখ্যান করলে?

আর কী করতে পারতাম আমি? ছবিটা ভেংচি কাটল। ও নেই বলেই তো আমি আছি। কে বলেছিল ওকে আমার মুখোমুখি হতে? ভাগ্যিস, দেখা হয়ে গেছিল। নইলে এতক্ষণে হুলুস্থুল বেঁধে যেতো।

সৃজন বুঝতে পারল, অতুল ধরের আর ফিরে আসার জো নেই। এমনকি ভূত হয়েও। ছবি হয়েই এখন থেকে তাঁকে থাকতে হবে।

তার মাথা হেঁট হয়ে গেল। ভূতকে সে মেনে নিয়েছিল। কিন্তু ছবিটাকে আর সহ্য করতে পারল না। এই ছবির কোথাও অতুল ধর নেই। অতুল ধরকে তাড়িয়ে দিয়ে, অস্বীকার করে এই ছবি অতুল ধর হয়ে উঠেছে। এই ছবির মধ্যে শুধু রয়েছে দম্ভ, অহংকার, কপটতা, ভণ্ডামো। সত্য নেই।

ধীরে ধীরে সে নিজেও ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top