আলোর দিশা

Enigmatic forest path illuminated by a swirling light trail at dusk.

রাতেরশেষ লোক্যালটা ঝমঝম করে স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই রৈ রৈ করে শোনা গেল কচিকাঁচাদের গলার স্বর। প্ল্যাটফর্মের আঁধারে ঘাপটি মেরে থাকে এই হ্যাভ-নটসের দল, আর পি এফের  নজর এড়িয়ে। স্টেশন চত্তরেই ওদের ঝুপড়ি, ঘাড় ধরে তাড়ালেও আবার সময়ে সময়ে হাজির হয়ে যায়! বাপ-মা! নাহ্ তা প্রায় কারোরই  নেই বললেই চলে। চারিদিকে নেশা, ভাং আর জুয়ার আড্ডা। তারই মধ্যে হেসে খেলে বড় হচ্ছে। স্কুল যাওয়ার বালাই নেই। খেতেই পায় না, তায় আবার লেখাপড়া! কোনদিন বা একবেলা জোটে, অর্ধেক বেলা পেটে কিল মেরে টিউব কলের জলই ভরসা।

সমাজের দগদগে ক্ষতর মত এই ছোট ছোট ছেলেমেয়ে গুলোর দিকে তাকিয়ে দেখার অবসর কোথায় বাকি স্টেশন যাত্রী ভদ্দরজনেদের!

মাঝে মাঝে রেলের পুলিশ বা চাইল্ড লাইনের সাহারা আন্টি এসে তাড়া লাগায়, হোমে নিয়ে যাবার, খেয়ে পড়ে একটু সুস্থ ভাবে বাঁচার জন্য।

কিন্তু ‘আরেহ্ এহী তো জিন্দগী হ্যায়, ক্যা করেঙ্গে উধার যা কে! মিলেগী তো সিরফ ঝুটমুট কা ডাঁট অউর ডাণ্ডা!’  ভাবে রফিক, আলম, শাহজাদার দল।

আন্টিকে দূর থেকে আসতে দেখেই আলম ফিসফিস করে ওঠে

— ‘আরে ছিপ যা ছিপ যা রে কাল্লু, জলদি সে।’

ওমনি কাল্লু, রফিকের দল ছুট লাগায়, পুরনো ওয়াগনের পিছনে লুকিয়ে পড়ে। আর সে কি হাহাহিহি হাসি, যেন বেশ জব্দ করা গেছে এমনি ভাব।

জন্মাবধি দেখে আসছে এই স্টেশন, প্ল্যাটফর্ম, হকার, ডেইলি প্যাসেঞ্জারদের কচকচানি, কয়লাউলি মাসির দল আর কত্ত রকমের ট্রেন। যার গায়ে লেখা থাকে হরেকরকম জায়গায় যাবার হদিশ। দু ‘ চোখ ভরে স্বপ্ন দেখে মুনীর আর শ্যাম। ‘দেখ্ না, একদিন জরুর চলা যাউঙ্গা, ট্রেন পকড়কে কোই ভী অচ্ছে জাগে পর, ভাগ যাউঙ্গা সচমুচ।’

মুনীর বলে শ্যামকে। ‘ফিলহল ইস জাহন্নম মে রহনা হ্যায় আভি, কিতনে দিন তক,পতা নেই রে।’

পালিয়ে যাবে এই নরক থেকে। সত্যিই তো নরকই বটে, চালচুলোহীন বেঁচে থাকা। রোজগার পাতি বলতে তো ঐ কয়লাউলি মাসিদের কাছ থেকে কয়লার বস্তা পিছু পাঁচটাকার কয়েন আদায়। অবশ্য আর পি এফ রাও ভাগ বসায় না যে তা তো নয়! চোরাই কয়লা লোক্যাল ট্রেনে পাচার করতে হলে কিছু খেসারত তো দিতেই হয়, তাই আর পি এফের পকেটে দশ টাকা আর রফিক আলমদের পাঁচটাকা করে। চেইন সিস্টেমে কাজ হয় এখানে।

‘বেড়ে ব্যবস্থাখানা’, ভাবে নিত্যযাত্রী স্কুল টিচার যুঁথিকা, রীনা, পারমিতারা।

রফিকদের এদিকে রেল পুলিশের সাথে বখরায় বনিবনা না হলেই তো জোর করে ধরিয়ে দেবে। ব্যাস, আন্টির দলবল তাদের ধরে নিয়ে পুরে দেবে স্বশক্তি হোমে বা বাল নিকেতনে। নাকি লেখাপড়া শিখবে, হাতের কাজ শিখবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে। হবে মানুষের মত মানুষ! ‘ছোঃ, সব বকোয়াস, বেকার কি বাত’, হাত-পা বেঁধে ফেলার মতো এই জীবনে বিশ্বাসী নয় যাদব আর শ্যাম।

‘ধুউউস, নেহি যায়েঙ্গে, ভাগ! উন লোগ য়্যসেহি বলতে রহতে হ্যায়, লেকিন দেখনা, দেগা কুছ নেহি। ইসসে তো এহী অচ্ছা হ্যায়।’

পরগাছার মত বেঁচে থাকা বেশ, খড়কুটো আঁকড়ে। যখন যা পাওয়া যায়, তাই খাওয়া। পাঁউরুটির সাথে ডেন্ড্রাইটের নেশা তো আছেই। খাও আর নেশায় বুঁদ হয়ে যাও, বাবুদের মত। ওই যে যারা সব নেশাভাং করে লছীপুরের ছোকড়িদের ডেরায় যায়। 

বয়ঃসন্ধির দোরগোড়ায় এসে সবার মনেই কৌতুহল, ‘অর ক্যায়া ক্যায়া হোতা হ্যায় রে উধর, রাজুভাইয়া অগলে হপ্তে মে গয়ে থ্যে। পতা হ্যায়!’ বলেই চোখ নাচায় মুনীর। ‘আরে, হামরি পাশ জাদা প্যায়সা আয়ে না, তো ম্যায় ভী যাউঙ্গা রাজুভাইয়া কে য্যয়সা, উয়ো লছীপুর, দেখনা তুলোগ, হাহাহাহাহা’! করে খুব একচোট হেসে নেয় মুনির।

সঙ্গে সঙ্গে বাকিরা চোখ গোল করে তাকায়, বয়সন্ধির নিষিদ্ধ আনন্দের কল্পনার ভাগ নিতে চেষ্টা করে।

হরি একলাটি বসে বাঁশি বাজায় আর ভাবে

‘সাহারা আন্টিকে পাশ ইসসে আচ্ছা জিন্দেগী মিলতি হ্যায় ক্যয়া, পতা নেই! উস জাগে পর ভী তো হররোজ কিতনা ঝুটমুট কা ঝ্যামেলা।’

এই তো  সেদিনের কথা, বারোটা জলজ্যান্ত মেয়ে পালিয়ে গেল ছাদ বেয়ে!কী দুঃসাহসিক কান্ড রে বাবা! ভেজা কাপড় টাঙাবার মোটা একটা দড়িকে গাছের ডালে বেঁধে সেই দড়ি বেয়ে তরতর করে নেমে দিকবিদিক জ্ঞানশুন্য হয়ে পালাল মেয়েগুলো! হয়তো উঠবে কোন পল্লীতে, লছীপুরেরই ধারে কাছে। কী জানি বাপু, ওটাই ওদের স্বাধীনতা, খেটে খাওয়ার আনন্দ, তা সে গতরই হোক না কেন? কিন্তু এই আনন্দের কি বা মূল্য, বোঝে না ওরা। কিন্তু কিছুই কি আন্দাজ করে না, কী জানি বাপু!

খুব তোলপাড় হল কদিন, থানা-পুলিশ শোরগোল, তল্লাসী ঘরে ঘরে, সাহারা মন্ডলের হোমে। তারপর আবার সব চুপচাপ, যে কে সেই। হোমে তো সবাই পড়াশোনা করেনা। তবে কেউ কেউ স্কুলে যায়, যেমন আলিমা, রুকসানা। বাকী মালতী, নমিতা, সাহিদা এরা হোমেই থাকে। দুচোখ ভরা স্বপ্ন ওদের, একমুঠো ভাতের বিনিময়ে, একটু হাতের কাজ, সেলাই ফোঁড়াই, ঘরকন্না আরও কত কিছু। কেটেই যাচ্ছে জীবন সুখে দুখে, নানান টানাপোড়েনে। আর তা নাহলে তো সেই অন্ধকার জগতেরই হাতছানি স্টেশন চত্তরে বা লছীপুরে!

‘কী জানি কী যে হল ওই বারোটা মেয়ের?’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবে হোমের কমলা। হয়ত বা মুখে রং মেখে দাঁড়াচ্ছে সিগন্যালে। তবুও তো স্বাধীনতা ! বাইরের মুক্ত হাওয়ার অনুভবে থাকে আকাশের রং বদলানো, ভোরের বেলায় টকটকে সূয্যিমামার বাচ্চা ছেলের মত লাফিয়ে ওঠা। নাকি হোমের এই তিনমানুষ সমান উঁচু পাঁচিল, উঠোন থেকে একচিলতে আকাশ, স্যাঁতস্যাঁতে ঘুপচি ঘরের মায়ায় থেকে যাবে আজীবন? চোখের সামনে আরও কিছু বিভাজন, কাঁটাতারের মত, তাদের অনুষঙ্গে নিয়ে আসে মুক্ত স্বাধীন চিন্তাধারা, সমাজ সংস্কারের প্রভেদ।

এই হোমেই আছে হাসিনাদিদি। কলেজে পড়ে, বড্ড ভালো আর ডাকাবুকো। সবাই বলে ও নাকি সাহারা আন্টির ডানহাত। মাঝেসাঝেই রাতবিরেতে ডাক পড়ে হাসিনার। কালো মুখবাঁধা পোষাকে আপাদমস্তক মুড়ে ও বেরিয়ে যায়। সঙ্গে থাকে আত্মরক্ষার রসদ, লাল লঙ্কার গুঁড়ো। কখনো কখনো নেপালী কুকরী বা ভোজালি। রাতের আঁধারে যে কোন ট্রেন ধরে খবর মাফিক চলে যায় শুনশান ছোট্ট কোন গ্রাম্য স্টেশনে। টিমটিমে আলোয় ওঁত পেতে থাকে, চোরাশিকারীর মত। নির্দিষ্ট মালগাড়ীটি এলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে আহত বাঘিনীর মত ঘাপটি মেরে থাকা মেয়ে পাচারকারী দলটির ওপর। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই অসহায় মেয়েগুলোকে উদ্ধার করে পালানোই যে তার উদ্দেশ্য। সবক’টা মেয়েকেই যে বাঁচাতে পারে এমনটাও নয়। সাংঘাতিক ঝুঁকির কাজ, সামান্য এদিক থেকে ওদিক হ’লেই ভবলীলা সাঙ্গ হ’তে কতক্ষণ! মাঝে সাঝে পুলিশের সাহায্যও যে পায় না এমন নয়। ভোলে কী করে সে, একদিন এই সাহারা দিদিও তাকে এইভাবেই যে উদ্ধার করেছিল!

সেও তো থাকত ওই স্টেশন চত্বরেরই পাশে কলাবাগান বস্তিতে।

রোজ যাতায়াতের পথে চোখে পড়ে সুখ দুঃখ ভালোবাসার মালায় গাঁথা

টুকরো টুকরো ছবির মত জীবন,

হাঁস মুরগী বিয়েবাড়ী, ভাংড়া ব্যান্ডের 

এক অদম্য ম্যাজিক। ছেঁড়া সংলাপের মতো ভেসে আসত জীবনযুদ্ধের টুকরো টাকরা। খিস্তি খেউর ঝগড়া, শরীরী ভাষা। দিন আনা দিন খাওয়ার খন্ডহর।

নির্ভেজাল সস্তা খুশীর আড়ালে মাথা চাড়া দেওয়া শ্রেনী বিভেদ মাঝে মাঝে আগুন জ্বালায় খড়কুটো আর শুকনো পাতার মত!

আধপেটা মানুষের দল খুদকুড়ো খেয়ে বাঁচে, মাঝে মাঝে ব্যোমাবাজি আর পেটোর সম্বলে ভরপুর জীবন আশার আলোয় জাগে৷ রাতের অন্ধকারের যৌন খেলা, ব্যান্ডের তালে নাচে, ম্যাজিকের মত।

বেশ কিছু বছর আগে এই হাসিনার জীবনেই ম্যাজিকের বদলে নেমে এসেছিল কালো নেশার ছায়া। কখনো সিগারেটের মধ্যে পুরে, কখনো বা পাঁউরুটিতে ডেন্ড্রাইটের নেশা। বুঁদ হয়ে থাকত সারাদিন। ওই নেশার ঘোরেই পড়ল একদিন মেয়ে পাচারকারীদের খপ্পরে। সে হেন দুর্দিনে চাইল্ড লাইনের সাহারা মন্ডলের এনকাউন্টার। ভাবলেই গায়ে কেমন কাঁটা দেয়! বাপরে সে এক রাত ছিলো বটে! যাই হোক আজ যে সে বেঁচে আছে বা স্কুলকলেজের লেখাপড়া, সবই ওই হোমের দৌলতে। ভাবতে ভাবতে কোথায় যেন হারিয়ে যায় হাসিনা। এতটুকু জীবনে কত কী যে ঘটে যাওয়া প্রলয়ের মত একের পরে এক।

ঘুম থেকে উঠতে একটু বেলাই হয়ে গেছিল মুনিরের। প্ল্যাটফর্ম চত্ত্বরের আশেপাশে কানে এল শোরগোল। দেখতে পেয়ে তাড়াতাড়ি শুধোয় হরি আর আলমকে, ‘আব্বে কা হুয়া রে? ই ঝ্যামেলা কিস চিজ বা?’ হরি কোমরে হাত দিয়ে সপ্রতিভ হেসে বলে ওঠে, ‘আরে, ঝ্যামেলা কায়ে কো! এক দাদা-দাদী আয়ে থে না ইধার, জলদি সে সাহারা আন্টি ভী আ গয়ে থে হাসিনা দিদিকে সাথ। উনলোগোকো বালনিকেতন লে জানে কে লিয়ে, এক দো ঠো আর পি এফ ভী থা সাথ মে’।

‘বাল নিকেতন কিঁউ? উ তো হম য্যায়সো কো লিয়েই হ্যায় না, ইয়ে বুডঢা-বুডঢী যা কে ক্যায়া করেগা উধার?’ অবাক মুনিরের প্রশ্ন।

হরির চটপট জবাব, ‘আরে, দাদা-দাদী লোঁগোকে লিয়ে হোম কাঁহা ইধার, বোল! সব জাগে পর প্যায়সা লগতা হ্যায় বে, লড়কি লোগোকা হোম মে তো যা নহী শখতে না, ইসহি লিয়েই না বাল-নিকেতন লে কর গ্যয়ে।’

‘আরে হাঁ…! উনলোগোকে পাস কুছ ভী তো নেহী থা, মালুম প্যায়সা উইসা কুছ ভী নেহি’,

চিন্তিত শ্যামের জবাব।

‘হাঁ, বচ্চো কে সাথ বুডঢা আদমী ভী ঘুলমিল যাতে হ্যায় না!’ গম্ভীর বক্তব্য সবজান্তা আলমের।

কথাটা বাস্তবিকই তাই। কোথা থেকে এলেন এই বৃদ্ধ দম্পতি, কিইবা তাদের পরিচয় জানার কথা নয় এই মুনির, হরি, শ্যামদের।

ওরা কেবল জানে ‘য্যায়সে ভী হো, বাল নিকেতন পৌঁছ্না নেই, কভ্ভী ভী। আন্টিলোগ আ-কে পকড় লেগি তো বাস, হো যায়গি সত্যনাশ!’

এই বালনিকেতন হল পথশিশুদের রাখার একটি বিশেষ হোম মাঝেসাঝে অনুষ্ঠানের আয়োজন, হোমের শিশুদের সমাজের মূলস্রোতে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা। এরকমই এক রমনীয় সন্ধ্যায় সেই বৃদ্ধা ভদ্রমহিলার উদাত্ত স্বরে রবিঠাকুর আবৃত্তির সময়ে শ্রোতাকুলের চোখে জল। যাঁর মনের এত সমৃদ্ধি, তাঁকে সত্যিই কি কেউ পারে নিঃস্ব করতে? নিষ্ঠুর এই পৃথিবী, ধিক মানবিকতা! যা কিনা বৃদ্ধ দম্পতির শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নেয়! এমনকী মাথা গোঁজার ভিটে পর্যন্ত! একবস্ত্রে যে পিতামাতাকে পথে এসে দাঁড়াতে হয়, ধিক সে সন্তান জন্ম! শোনা যায়, বহরমপুরের গঙ্গায় স্নানরত স্থানীয় কিছু যুবক তাঁদের উদ্ধার করেন। গভীর হতাশায় সম্পূর্ণ মানসিক অবসাদগ্রস্ত এই দম্পতি ঝাঁপ দিয়েছিলেন গঙ্গার বুকে। একটি এনজিও সংস্থার তৎপরতায় এই হোমে এসে পৌঁছোন তাঁরা। আশ্চর্যের বিষয়, কি করে যে ওই বৃদ্ধ দম্পতি উল্লিখিত হোমে স্থান পেলেন, সেও এক কাহিনি যেন।

 বিচিত্র মানুষের মন। প্রত্যেকের ভেতরেই এক আত্মার বাস। সম্পর্ক গাঢ় হওয়া উচিত অন্তরাত্মার সঙ্গে। বারানসীর মণিকর্ণিকা ঘাটের সামনে দিয়ে নৌকোয় গেলে এক বিচিত্র অনুভূতি আসে,  ‘আমি কে? কে আমি?’ একই মানসিক অবস্থা হয় কবরখানায় কিছু সময় বসে থাকলে।

 তুচ্ছ  জাগতিক সুখদুঃখ, মেটিরিয়ালিস্টিক কমফোর্ট। একা আসা, আবার একলাই তো চলে যাওয়া! শুধু অন্তরের আলোয় আলোকিত করা। স্রষ্টার সৃষ্টি প্রকৃতি থেকে জ্ঞানসিদ্ধ হওয়া। তাই ঐ বৃদ্ধ দম্পতিকে দেখে চোখে জল আসা অস্বাভাবিক নয়। বয়সের ভারে অশক্ত মানুষ দুটি দৃঢ় সমৃদ্ধ মননের অধিকারী। অঙ্গীকারের আলোয় আবদ্ধ বাকী জীবন এই হোমের প্রতি। হয়ত নিজেদের শেষ করে দেবার মত ভীরু মনোভাবের এইই ছিল প্রায়শ্চিত্ত। 

কখনো বা স্টেশন চত্ত্বরের ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলির জীবনযাত্রা বড়ই উদ্বিগ্ন করে। ভিক্ষে করা, নোংরা থাকা, নেশায় ঝিমোনো… কোন্ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শিকার এই নিষ্পাপ প্রাণগুলি? একটা সাহারা মণ্ডলের হোম কি পারবে তাদের সুস্থ সমাজে ফিরিয়ে দিতে? মূলস্রোতে নিয়ে আসা গেলে তাইই তো হবে যুগান্তকারী বিপ্লব। সামাজিক উত্তরণ। চাই বাঁধন মুক্তির উল্লাস। নিয়মনীতির কচকচি ছেড়ে সৃষ্টি সুখের উল্লাস।  

 হোমের আরেক লড়াকু মেয়ে হল সাইনুর। বারাসতে বাড়ী। লেখাপড়ায় মেধাবী এই মেয়েটি দরিদ্র পরিবারের একমাত্র সম্বল। অথচ একসময় অনেক কম শিক্ষিত পাত্রকে নিকাহ্ করতে অস্বীকার করায় বাড়ী থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় সাইনুর। চাইল্ড লাইনের অফিসিয়াল কাজকর্ম করে কিছু অর্থ জমিয়েছে সে টিচার্স ট্রেইনিং করবে বলে। এই দুঃসাহসী মেয়েটি ভয়কে জয় করে পাড়ি দেয় দূর দূরান্তে পুলিশথানায় উদ্ধারকৃত হারিয়ে যাওয়া ছোটছোট ছেলেমেয়েদের কাউন্সেল করে বাড়ি পৌঁছে দেবার দায়িত্ব নিয়ে। এরাই তো সমাজের গর্ব। কত মায়ের শূন্য কোল ভরিয়ে দেবার পূণ্য অর্জন করা, এও কি কম?

একেকদিন আশ্চর্য হয়ে ভাবি কমলার কথা! এই কি বাংলাদেশের বর্ডার পার করে আসা সাকিনা নয়! ওপার বাংলার একটি হোমে পড়ে রয়েছে যার সন্তান! সন্তানহারা মায়ের হাহাকার কি পৌঁছোয় সেই সমস্ত দালালচক্রের কানে? যারা সাকিনাকে তার ছোট্ট শিশুটির কাছ থেকে হিঁচড়ে এনে বিক্রী করে দিয়েছিল কোন মধুচক্রে! আজো পার্শবর্তী অন্য যে কোন মানুষের স্পর্শ সাকিনার কাছে বিষবৎ। থরোথরো কেঁপে নিজেকে আড়াল করে, আপ্রান চেষ্টা যার কমলায় রূপান্তরিত হওয়ায়।       

ভাল থাকুক কমলা; ভাল থাকুক সাইনুরের মিশন; বেঁচে থাকুক হাসিনা দিদির দুঃসাহসিক  প্রচেষ্টা। আসুক অনেক সাহারা ও সেরিনা মন্ডলদের হোম। এই অসহায় মেয়েগুলো পাক তাদের জীবনভর অন্ধকারে একটু আলোর দিশা।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top