পোড়ামাটির গ্রাম – অষ্টম পর্ব

poramatir gram8th

অষ্টম পর্ব

‘আব্বাকে আমি মেরে ফেলতে চাইনি।‘ বিড়বিড় করে করে বলতে থাকলেন গিয়াসউদ্দিন। বাইরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। এই সন্ধ্যাটিকে সন্ধ্যা না বলে রাত বলাই বরং ভাল। চারপাশে কোথাও এক বিন্দু আলো জ্বলছে না। এতটাই দূরে, জঙ্গলের মধ্যে চলে এসেছেন, যে  মনে হচ্ছে, সভ্যতা থেকে অনেক দূরে তাঁদের আর কেউই খুঁজে পাবে না। এখানে আসার উদ্দেশ্য আসলে শিকার করা নয়। শিকার করতে তিনি পছন্দ করেন না। নিরীহ জন্তুদের মেরে কার যে কী আনন্দ হয়, তা তিনি জানেন না। তিনি জঙ্গলে ঘুরে বেড়ান নিজের মনের সঙ্গে নিজেই কথা বলার জন্য। সুফি কবি হাফিজ যেমন বলেন, নিজের মনের মধ্যেই আছে এই জন্নত। তার সঙ্গে দেখা করো, সে তোমায় দেবে অধরা মাধুরী। আহা কী কথা। গিয়াসউদ্দিন পানপাত্রখানি পাশে রেখে। তাঁবুর বাইরে চলে এলেন। রক্ষীরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের আসলে বলা আছে তাঁবুর চেয়ে একটু দূরেই দাঁড়াতে। কারণ গিয়াসউদ্দিন তাঁর এই একলা থাকাটা উপভোগ করতে চান। অনেকটা ঘুরে তাঁরা এসে পড়েছেন জঙ্গলের এক প্রান্তে। হরিণীর কথা বারবার মনে পড়ছে তাঁর। মনে আছে, এক অপূর্ব কবি এসে তাঁর রাজসভায় প্রথম হাফিজের কবিতা শুনিয়েছিল। হাফিজের কবিতা যেন রুমির কবিতার এক পুনর্জন্ম। আহা কী সে কবিতা, তিনি প্রথমে শুনেছিলেন—“ হে হাফিজ! তোমার বক্ষে ধারণকৃত এই কুরআনের চেয়ে/সুন্দর ও সুমিষ্ট বাণী আর কিছুই দেখি নি।’

তিনি সেই সুফি কবি ইসমাত শাহকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, হাফিজের সঙ্গে দেখা করা যায়?

–        আপনি তাকে পয়গম পাঠাতে পারেন জনাব। কিন্তু তিনি নিজের ঘোরে থাকেন। বলেন, তিনি আল্লার ঘরের দাস। তিনি কি আর সম্রাটের কাছে আসবেন? গুস্তাকি মাফ।

–        আরে না না। একজন কবি সবসময়ই থাকেন আমাদের এই সবকিছুর বাইরে। তাই তো তিনি কবি। হাফিজ সম্পর্কে আমাকে আরো কিছু জানাও।

–        হাফিজ ইরানের সেরা কবি জনাব। তিনি রানের শিরাজ নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম শামসুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ হাফিজ শিরাজী এবং কবি নাম বা ভনিতা হল হাফিজ। তাঁর পিতা বাহাউদ্দীন ছিলেন ইসফাহানের এক ব্যবসায়ী। পরবর্তীকালে তিনি এ ব্যবসা ত্যাগ করে শিরাজে চলে আসেন। তাঁর মা ছিলেন কাজরুনের অধিবাসী। তাঁর দুই ভাই ছিল যারা, তাঁর চেয়ে বয়সে বড় এবং বয়ঃপ্রাপ্তির পর তারা শিরাজ ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায়। কিন্তু হাফিজ মায়ের সঙ্গেই আর্থিক সংকটের মধ্যে শিরাজে থেকে যান।

–        – আরো বলুন।

–        হাফিজের শৈশব খুব একটা সুখের ছিল না। কারণ, পিতৃহারা হাফিজকে সংসারের দায় শৈশবেই বহন করতে হয়েছিল। যে কারণে অর্থ উপার্জনের বোঝা তিনি মাথায় পেতে নিয়েছিলেন। প্রসিদ্ধ ইরানি লেখক ও সাহিত্যিক আব্দুন্নবী তাঁর  মেইখানে নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, হাফিজ স্থানীয় একটি রুটির দোকানে কাজ করতেন আর এখান থেকে লব্ধ অর্থ দিয়েই দিনযাপন করতেন। এই রুটির দোকানের পাশেই একটি বিদ্যালয় ছিল যেখানে কাওয়াম উদ্দিন আবদুল্লাহ নামে একজন প্রসিদ্ধ আলেম শিক্ষা দান করতেন। হাফিজ রুটির দোকানে কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে তাঁর কাছ থেকে বিদ্যার্জন করতেন। শুধু প্রাথমিক শিক্ষাই নয়, বরং কুরআন হেফ্জ করা থেকে কুরআনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও দর্শনশাস্ত্রেরও জ্ঞান অর্জন করেন। এরপর ধীরে ধীরে ইসলামের বিধি-বিধান ও সাহিত্য সংক্রান্ত জ্ঞান নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করতে শুরু করেন। যেহেতু সেকালে সাহিত্যের জ্ঞান শরীয়তের জ্ঞান লাভের পটভূমি ছিল, সেহেতু তিনি ধর্মীয় জ্ঞানেও প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করেন। হাফিজের যুগে শিরাজ ছিল ধর্মীয় জ্ঞান ও কবি-সাহিত্যিকদের আবাসভূমি। এই বিষয়টি তাঁর শিক্ষা-দীক্ষা ও জ্ঞানার্জনে বিস্ময়কর প্রভাব বিস্তার করে।

–       

–        হাফিজ উপরিউক্ত শিক্ষক ছাড়াও শামসুদ্দীন আবদুল্লাহ শিরাজী ও কাজী এযদুদ্দীন আবদুর রহমান ইয়াহইয়ার নিকট থেকে দর্শন ও তাসাউফের জ্ঞান অর্জন করেন। জানা যায়, হাফিজ চল্লিশ বছর পর্যন্ত বিদ্যার্জনে রত ছিলেন। কুরআন কণ্ঠস্থকরণ ও কুরআনের জ্ঞানে সমৃদ্ধ হওয়ার কারণেই অবশেষে ‘খাজা হাফিজ’ নামে তিনি অভিহিত হয়েছিলেন। তাঁর কাব্যের ছত্রে ছত্রে এই কুরআনের প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে। ইরানিরা কবি হাফিজকে আদর করে ‘বুলবুলে শিরাজ’ অর্থাৎ শিরাজের বুলবুল বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। তারা হাফিজকে লেসানুল গায়েব (অজ্ঞাতের বাণী), তরজমানুল আসরার (রহস্যের মর্ম সন্ধানী) প্রভৃতি অভিধায় অভিহিত করে থাকেন।

–        হাফিজ ছোটবেলা থেকেই কাব্যচর্চায় অনুরক্ত হয়ে পড়েন। আবদুন্নবী তাঁর মেইখানে গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, শিরাজে যেখানে তিনি অবস্থান করতেন তার সন্নিকটে একটি বাজার ছিল। বাজারে একজন বড় বস্ত্র ব্যবসায়ী ছিলেন। যিনি ছিলেন কাব্যপ্রেমিক ও রসিক প্রকৃতির লোক। যেখানে রসিক কবি-সাহিত্যিকরা এসে জড়ো হতেন এবং কাব্যচর্চায় মুখরিত থাকতেন। হাফিজও এখানে যাতায়াত করতেন এবং সমকালীন কবিদের সংস্পর্শ লাভ করতেন। তাঁর কাব্যচর্চা দেখে অনেক সময় বন্ধুরা তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত। উল্লেখ্য যে, তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে খোদায়ী প্রেমের নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। কেননা, এ খোদায়ী প্রেমই কাব্য সাধনায় তাঁকে উজ্জীবিত করেছিল।

–        -শোনাও বন্ধু আরো কিছু কবিতা।

–        আচ্ছা, কিছু স্মৃতি থেকে শোনাচ্ছি দোস্ত।

“হায় বধুয়া! দাও পেয়ালা ঢালো শরাব মধুক্ষরা

সহজ ছিল পথটি প্রেমের দেখছি এখন কাঁটা ভরা।

ভেবেছিলাম ভোর বাতাসে কস্তুরী-বাস আসবে ভেসে

বধুর চিকন চিকুর হতে, কলজে হলো ঘায়েল শেষে”

–        আহা আহা। কী মধুর কাব্য।

–        “ওরে হৃদয়” তুই দেখেছিস- পুত্র আমার আমার কোলে

কি পেয়েছে এই সে রঙিন গগণ-চন্দ্রাতপের তলে।

সোনার তাবিজ রূপার সেলেট মানাত না বুকে রে যার,

–        পাথর চাপা দিল বিধি হায় কবরের সিথানে তার।”

–        এ তো দুঃখের কাব্য। কী হয়েছিল দোস্ত? জানো কিছু?

–        জনাব, পুত্রশোক।

–        -পুত্রশোক?

–        =তাঁর পুত্রসন্তান ‘বুলবুল’ অকালে প্রাণ হারালে এই কবিতাটি লেখেন হাফিজ।

–        – আরো শোনাও।

এসো সাকি, এসো, রেখো না বসিয়ে

হাতে হাতে দাও ভর্তি পেয়ালা;

আগে ভাবতাম প্রেম কী সহজ,

আজ দেখি তাতে কী বিষম জ্বালা।

খোঁপা থেকে মৃগনাভির সুরভি

ভেসে এসেছিল ভোরের হাওয়ায়

চমকানো তার চূর্ণ অলক

হৃদয়ে রক্তগঙ্গা বহায়।

প্রানবঁধুয়ার পান্থশালায়

এ সুখশান্তি কদিনের বলো!

দিনরাত খালি বাজছে ঘন্টা :

‘গোটাও তোমার পাততাড়ি, চলো!’

কী ঘোর রাত্রি, কী ভীষন ঢেউ,

রসাতলে-টানা ঘূর্ণী এমন—

কী করে জানবে শুকনো ডাঙ্গায়

ঝাড়া হাত-পায় যে করে ভ্রমন!

বুড়ো মাজি বলে, নমাজ পড়ার

আসনে ছুটুক মদের ফোয়ারা;

সদগুরু নয় অজ্ঞ, সে জানে

সঠিক লক্ষ্যে চলবার ধারা।

পরিনামে রটে নিন্দে, কারণ

যা করেছি শুধু নিজেরই জন্য;

সে রহস্য থাকে গোপন কিভাবে

জানাজানি হলে এ জনারণ্যে!

হাফিজ, চাও কি তার দর্শন?

করো না নিজেকে আড়াল তাহলে;

দেখা দিলে প্রিয়া, এই জগৎটা

ভুলে যেয়ো তুমি, ছেড়ে যেয়ো চলে।

এই অন্ধকার রাত্রি তার সমস্ত মনখারাপ নিয়ে যেন দাঁড়িয়ে আছে গিয়াসের সামনে। দেখা দিলে প্রিয়া এই জগৎটা, ভুলে যেও তুমি, ছেড়ে যেয়ো চলে। আহা। হরিণীর মুখটা বারবার মনে পড়ছে তার। একেই কি বলে তবে প্রেম? চোখে জল আসছে গিয়াসের। রাতের সমস্ত তারার মধ্যে যেন বা এক সঙ্গীতের সুর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

ঘন জঙ্গলের গাছগুলির মধ্য দিয়ে শোঁ শোঁ করে বয়ে যাচ্ছে হাওয়া। নক্ষত্রের আলোয় আলোকিত চারিদিক। মনে হচ্ছে জঙ্গলের ভিতর থেকে এখুনি ছুটে আসবে সেই মেয়েটি। কেমন যেন ভীতু হরিণীর মতো মুখ। কিন্তু সে ভীতু নয়। এক অদ্ভুত দৃঢ়তা তার ভিতরে কাজ করছিল। মনে হচ্ছিল সে যেন ঐ মন্দির আর মসজিদের গা থেকে খুলে চলে এসেছে। কে সে? তাকে তো দরকার। গিয়াস বুঝতে পারছে ক্রমশ, সে ওই অজানা মেয়েটার প্রেমে পড়েছে। তাকে তো পেতেই হবে। কিন্তু তাকে অধিকার করে নিতে চায় না গিয়াস। জোর করে তাকে পেতে চায় না। চায়, একজন অন্তত তাকে ভালবাসুক।

আম্মি তাকে বলেছিল একটা সময়, সে তার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী-এর পুত্র হওয়ায় তাকে অনেক বেশি যোগ্যতার পরীক্ষা দিতে হবে। কী না করেছে সে। তীর ধনুক চালানো থেকে শুরু করে যুদ্ধকৌশল শেখা, কূটনীতি সম্পর্কে অধ্যয়ন করা। আরবি, ফারসি, বাংলা,মারাঠি এবং তামিল ভাষাটিও সে জানে। সে পালি ভাষাও অধ্যয়ন করেছিল এক বৌদ্ধ ভিক্ষুর কাছে। কিন্তু সে বুঝতে পারত সেই বৌদ্ধ ভিক্ষু তাকে বৌদ্ধ দর্শন পড়ানোর উপযুক্ত বলে মনে করেননি। কেন মনে করেননি,তিনিই জানেন। কারণ, আর যাই হোক না কেন, গিয়াস নিজেকে একজন মানুষই মনে করে। দিল্লির সঙ্গে তাদের রাজ্যের যেমন দূরত্ব আছে, সে নিজেও অনুভব করে তাদের রাজ্যের সংকীর্ণ ধার্মিক উলেমাদের সঙ্গে তার দূরত্ব। সে এমন একটা রাজসভা তাই তৈরি করেছে যেখানে সকলের স্থান। অবশ্য তার বাবাই এই সর্বধর্মসম্মেলনের ভিতটা গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু তার বারোজন ভাই না বিদ্যায় না বুদ্ধিতে না চরিত্রে রাজা হওয়ার উপযুক্ত ছিল। তাই তাকে রাজ্যের কারণেই এক একজনকে হত্যা করতে হয়েছে। তার বিরুদ্ধে যখন তারই পিতা যুদ্ধঘোষণা করলেন, তখন যুদ্ধই করতে হয়েছে। আব্বাকে কিন্তু আমি মারতে চাইনি, আবার বিড়বিড় করে বলল গিয়াস।

কবিতা তাকে আকর্ষণ করে। হাফিজের প্রতি সে সমস্ত মন দিয়ে আকর্ষণ অনুভব করে। সে তাঁবুর ভিতরে যায়। ইসমাত ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। তাকে আর ডাকতে ইচ্ছে হয় না তার।

গিয়াস নিজের তাঁবুতে বসে লিখতে শুরু করে তাঁর নিজের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কবিতা। আজ সারা রাত ধরে সে কবিতা লিখবে। লিখবে, সেই মেয়েটির কথা। যাকে চাইলেই কাছে টেনে নিয়ে আসা যায়,কিন্তু গিয়াস চায় তার পদতলে বসে প্রেমের জন্য ভিক্ষা করবে।

সে লিখতে শুরু করে-

প্রেমের জন্য আমার তরবারি হল ভিক্ষা

তুমি যেটুকু আমায় দেবে, সেটুকুই আমার

তার বেশি কোনও রাত নেই, এই জগতে

অতিরিক্ত কিছুই থাকে না কারো জন্য, যেটুকু

সে সত্যই পাওয়ার যোগ্য।

হুহু করে হাওয়া বইতে থাকে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে।

হৈমন্তী এসব কিছুই টের পায় না। চন্দনের কুটিরে প্রদীপ জ্বলছে দেখে সে তার কুটির থেকে বেরিয়ে আসে চন্দনের কুটিরের সামনে। দেখে, চন্দন ভিতরে বসে লিখছে।

হৈমন্তী দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করতেই চমকে ওঠে চন্দন।

–        তুই?

–        আলোটা নিভিয়ে দাও।

চন্দন আলোটা নিভিয়ে দিয়ে বলে, বেরোবি?

–        চলো।

ঘরের মধ্যে বসে থাকার অর্থ নেই এই রাতে। রাত অবশ্য খুব গাঢ় হয়নি। কিন্তু এখানে এটাই অনেক রাত। হয়তো কেউ কেউ ঘরের ভিতরে এখনো ছবি আঁকছে। কেউ কেউ হয়তো উঠোনে মাটি পোড়াচ্ছে। কিন্তু খুব একটা বাইরে বেরোনোর কারো দায় নেই। শুধু কয়েকজন ভালবাসার মানুষ একে অপরের হাত ধরে চলে যায় কাছাকাছি বা দূরে। জঙ্গল থেকে যতই বন্য জন্তুর চলে আসার সম্ভাবনা থাকুক না কেন, তারা অকুতোভয়। একবার সুতো নদীর ধারে দুজনের ফালাফালা করে কেটে ফেলা মৃতদেহ দেখা গেছিল। আর কিছুই না। দূরের পাহাড়ী এলাকা থেকে আচমকাই একটি ভালুক চলে এসেছিল। ভালুক মানুষকে খায় না। মাথা থেকে পা পর্যন্ত চিরে দেয়। নদীর ধারে বেচারি দুজন প্রেম করতে এসে চিরকালের জন্য এই পৃথিবী থেকেই চলে যেতে বাধ্য হল। আবার সুলতানের সৈন্যরাও প্রেমিককে হত্যা করে প্রেমিকাকে ধর্ষণ করে হত্যা করে ফেলে দিয়েছে খেতের মধ্যে, এমন উদাহরণও আছে। মানুষ তো নিরাপদ নয় কোথাও। কিন্তু এত সব ঘটনা ঘটলেও কি কার মানুষকে ঘরের মধ্যে বন্দি করে রাখা যায়? এই তো কবছর আগে প্রবল জ্বর হল। জ্বরের মহামারি। এমন জ্বর, শোনা যাচ্ছিল সারা বঙ্গে তো বটেই সমস্ত জায়গায় মানুষ মারা যাচ্ছে। পণ্ডিতরা গণনা করে বলেছিল, পৃথিবীর সব মানুষ নাকি মারা যাবে। এই জ্বর যদি আটকাতে হয়, তবে শিশুবলি দিতে হবে। প্রকৃতি তথা আদিশক্তিকে তৃপ্ত করতে হবে। এমনি শিশু নয়, শিশুকন্যার বলি দিতে হবে। কেউ সেই বলি দিতে চাইছিল না। ব্রাহ্মণরা যখন নিদান দেয়, তখন সেই নিদান তাদের নিজেদের জন্য খাটে না। আর সে সময় প্রচুর সৈন্যও মারা পড়ছিল। ফলে, শাসন বলে কিছুই ছিল না। যুদ্ধও হচ্ছিল না। ফলে পুরো চাপ এসে পড়েছিল এই সমাজের নিচু স্তরের মানুষগুলোর উপর। রেশ এসে পড়েছিল এই পোড়ামাটির গ্রামেও। জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিল রবি পালের মেয়েকে। তিন বছরের বাচ্চাটাকে চারজন ব্রাহ্মণ পুরোহিত নিয়ে গিয়ে কী করে তা জানা যায় না। বলি দেওয়া হয়, না অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়া যায়, তার কোনও ইতিহাস নেই। কিন্তু এতসব বলি দেওয়ার পরেও এই অসুখের ধাক্কা কমেনি। লক্ষ লক্ষ মানুষ এই অসুখের বলি হয়েছিলেন। তারপর তা আপনা থেকেই চলে যায় কোথাও। মানুষ কোথায় নিরাপদ? কখন কী ঘটে যাবে, ক্কখন কার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাবে, মাথার উপরে আকাশ ভেঙে পড়বে, তা কেউ জানে না।

খেতের ধারে এসে বসল চন্দন। পাশে হরিণী। অন্ধকার। শুধু তারাগুলো নেমে এসেছে।

–        ওই দেখ আকাশ গঙ্গা।

–        গঙ্গা?

–        ছায়াপথ।

–        ছায়াপথ কাকে বলে?

–        তা জানি না। তবে সেখানে অনেক তারা। আমাদের সূর্যও আছে।

–        এই ছায়াপথ ধরে কোথায় যাওয়া যায়?

–        জানি না। কিন্তু বহুদূর ছুটে গেছে।

চন্দনের একটা হাত স্পর্শ করে আর ঘাড়ে মাথা রেখে আবার ফুঁপিয়ে উঠল হরিণী।

–        কী হয়েছে?

–        কিছু হয়নি।

–        কিছু হয়নি মানে?

–        না, কিছু হচ্ছে না। আমি বুঝতে পারছি না।

–        কেন?

–        আমরা অন্য কোথাও চলে যাই চল।

–        অন্য কোথাও?

–        হ্যাঁ। অন্য কোথাও। একটা নৌকো বানিয়ে সেই নৌকো ধরে আমরা ভেসে পড়ব। তারপর যতদূর যাওয়া যায়, যাব। জঙ্গল, শহর, শত্রু মিত্র যাই থাকুক না কেন

–        আর যদি মাঝরাস্তায় যুদ্ধ হয়? যদি ডাকাতে এসে তোকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়?

–        আমাকে কবিতা শোনাও। আমাকে গান শোনাও। আমি শুনতে চাই। আমি ভেসে যেতে চাই?

–        কীভাবে ভাসাব আমি?

–        যেভাবে ভাসানো যায়, সেভাবে ভাসাবে।

–        আমার পদ্য শুনবি?

–        শোনাও।

–        আমার গান। কিন্তু সুর দেওয়া হয়নি এখনো যে।

–        সুর ছাড়াই যে গান হয়।

–        সুর ছাড়াই?

–        সুর ছাড়াই।

–        কথায়, অনুভূতিতে, ছন্দে,

–        আচ্ছা শোন।

সুখ যুবতি প্রাণে বসত

পূর্ণ চন্দ্র হেতু আসিল ভগত

অপরূপ আধো নেত্র মুদিলে পাবক

কেহ না জানিল তার সুখে লাগি শোক।

–        আহা। সুখে লাগি শোক। কেন বললে কবি এমন ভাবে?

–        মনে হয় আমার হরিণী। মনে হয়। আমি তো পাগলছাগল লোক। আমার কিছু নাই। এমনকি আমার শস্যখেতও নাই। আমার শুধু মন আছে। আছে এই দুখান চোখ। তোকে কী খাওয়াব রে আমি? তোকে ঘর কেমনে দেব?

–        ঘর?

–        আকাশ এ ন ভাঙ রে মন

ঘর দিব অন্তরে

ভাষা যেন লাগি চন্দন

কে লিখিল অক্ষরে

–        তুমি লিখেছ এগুলো সব?

–        হ্যাঁ রে। জানিস তো, এখান থেকে অনেক দূরে আরেক কবি নাকি ভিন্ন একটা কাব্য লিখছে।

–        কে রে?

–        তার নাম কৃত্তিবাস।

–        কৃত্তিবাস?

–        হ্যাঁ। রে লিখছে রামায়ণ।

–        সে তো পুজোর ভাষায় লেখা।

–        হ্যাঁ মন্ত্রে লেখা।

–        তাহলে সে আবার কেমন করে লিখছে?

–        আমাদের যে সুলতান, সে খুব কবিদের ভালবাসে, জানিস। সে কৃত্তিবাসকে টাকা দিয়েছে, জমি দিয়েছে। বলেছে গোটা রামায়ণকে বাংলায় লেখ।

–        অ্যাঁ। সে তো অনেক বড় গো।

–        হ্যাঁ। ভালই তো। সারাজীবন বসে লিখবে। খাওয়াপড়ার গোলযোগ থাকবে না।

–        এমন কিছু করতে পারবে না?

–        আমি তো এমন পণ্ডিত না রে হরিণী। আমি তো শুধু পারি আমার মনের কথা বলে যেতে। মনে যা আসে, আমি শুধু তাই বলে যাই। আমাকে কে টাকা দিয়ে জমি দিয়ে বলবে তুমি লেখো তুমি লেখো। কেউ বলবে না। কেউ বলবে না। তাই আমরা যে লিখব, আমরা যে লিখি, তা সবাই ভুলে যাবে।

–        হুম। কিন্তু আমাদের ভাবতে হবে, কীভাবে আমরা পালিয়ে যেতে পারি।

–        কিন্তু পালিয়ে যাব কোথায়?

–        জানি না, তবে এখান থেকে অনেক দূরে। তোমার ওই কবি কোথায় থাকে?

–        ফুলিয়ায়।

–        ফুলিয়া, সে কোথায়?

–        সে এখান থেকে অনেক দূরে।

–        আচ্ছা, আমি কি খুব খারাপ দেখতে?

–        কেন?

–        একটা কথা বলব, কাউকে বলবে না।

–        না।

–        আমাকে শিবচরণ চলে যেতে বলেছে। আমাকে দেখে করবে না মূর্তি।

–        মানে? তোকে তো সেদিন ডাকল। উনি বিরাট বড় শিল্পী।া

–        হতে পারেন। কিন্তু আমাকে তার মনে ধরেনি। হয়তো অন্য কাউকে চান।

–        কিন্তু আগের দিনই তো বললেন।

–        হ্যাঁ। আমাকে দেখে মূর্তি করার কথা বলেননি। উনি আমাকে দেখে একের পর এক অন্য মূর্তি তৈরি করবেন। কত কিছু বললেন। শালভঞ্জিকা, যক্ষিণী, সেবাদাসী, পার্বতী, শকুন্তলা কত কিছুর। কিন্তু আমি জিজ্ঞেস করলাম আমি কোথায় থাকব? বললেন, তুই তো সকলের ভূমিকায় থাকবি।

–        সেটাই তো হয়।

–        মানে? আমি তো ভেবেছিলাম তিনি আমাকে গড়বেন পোড়া মাটির শিল্পে। তারপর আমাকে রাখবেন মন্দিরের গায়ে, মসজিদের গায়ে।

–        ধুর বোকা। তাই আবার হয় নাকি? তুই তো অভিনয় করবি সকলের ভূমিকায়।আমি যেমন কখনো রাম, কখনো রাবণ, কখনো বা জেলেমাঝি আবার কখনো সুলতানি শাসকের ভুমিকায় অভিনয় করি। তুই দেখিসনি আমাদের পালা?

–        আমি কি তবে নটী?

–        একদিক থেকে তো সবাই নটী। আমিও নট। আমরা কখনো নিজেদের ভূমিকায় অভিনয় করি, কখনো অন্যের ভূমিকায় অভিনয় করি। তা তুই কী বললি?

–        আমি বলেছি, করব না। বলে পালিয়ে এসেছি। আমার খুব দুঃখ হয়েছে।

–        দুঃখ হয়েছে কেন?

–        কারণ আমি চাই না আমি ছাড়া অন্য কেউ মন্দিরের গায়ে মসজিদের গায়ে থাকুক।

–        কিন্তু এমন তো হয় না। এই যে দেখ, আমি রামপালা লিখেছি। কেউ কি আর চন্দনপালা দেখতে মাঠে আসবে?

চন্দনের কথা শুনে চন্দনের দিকে তাকাল হরিণী। তারপর উঠে বসল।

–        দেখ, তুই চিরকাল থেকে যাবি মন্দির মসজিদের গায়ে। থেকে যাবি পোড়া মাটির শিল্পের ভিতর।

–        আর তুমি?

–        আমিও তো থাকব। তুই যাবি শিবচরণের কাছে আর বলবি কাজ করবি।

চন্দনকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিল হরিণী। আকাশে চাঁদ নেই। কিন্তু আলোর অভাব নেই। শস্যখেতে হাওয়া পাক খাচ্ছে। মাঝেমাঝে শোনা যাচ্ছে পেঁচার ডাক। মাঠের ভিতর দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে ইঁদুর। দূরে জঙ্গলের থেকে শোনা যাচ্ছে নানারকম আওয়াজ।

চন্দনকে নিজের শরীরের সমস্ত উত্তাপ দিয়ে জড়িয়ে ধরে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে মেলে ধরল হরিণী।

চন্দন এই দৃশ্য আশা করেনি। আশা করেনি, এই ঘাস ও শস্যবিছানো প্রান্তরে সে তার প্রিয়ার সঙ্গে মিলিত হবে। কিন্তু এই মিলন হল। এ এমনই মিলন, যা একমাত্র আলোর সঙ্গে অন্ধকারের হয়। এমন মিলন, যা এক সঙ্গীত তৈরি করে। সকলের অজ্ঞাতে, পোড়ামাটির গ্রাম থেকে অনতিদূরে ঘাসের উপর নক্ষত্রের আলোয় দুটি আদিম শরীর ক্রমশ মিশে যেতে শুরু করল এবং তাদের শীৎকার মিশে গেল ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের মিলনসঙ্গীতের মধ্যে।

মাটি, এক আশ্চর্য গন্ধ। এই গন্ধ মানুষের শরীরেই মিশে থাকে খুব নির্জন ভাবে। এমন আড়ালে এই গন্ধটি থাকে, যে সবসময় বোঝা যায় না। কিন্তু সঙ্গমকালীন উষ্ণতায় মাটির সেই সোঁদা গন্ধ উঠে আসে শরীর থেকে। চন্দন এবং হরিণীর মিলনের প্রেক্ষাপটে যে প্রকৃতি ছিল, তিনিও মুচকি হাসছিলেন, কারণ তাদের মিলনের অনতিদূরেই তখন নক্ষত্রের দিকে চেয়ে সম্পূর্ণ একাকী আরেক প্রেমিক লিখে চলেছেন প্রেমের কবিতা।

“ মিথ্যে কথা নয়, আমার প্রেমের প্রতিটি অক্ষরই আজান

যে ধর্মে তুমি আমাকে দীক্ষিত করেছ, তা আমার মনের মসজিদ।“

হাফিজকে কি একটা চিঠি লেখা যায়? যদি হাফিজ আসতে পারেন একবার। দূর থেকে হলেও যে মনের টান গিয়াস অনুভব করছেন তাঁর সঙ্গে, তাতে তো মনে হয় হাফিজ তাঁর বহুদিনের পরিচিত। এত ধার্মিক, এত আধ্যাত্মিক তাঁর ভাবনা, তাঁর লেখা, মনে মনে গিয়াস সেলাম করলেন হাফিজকে।

ইসমাত কখন যে ঘুম থেকে উঠে গিয়াসের কাছে এসেছেন, তা তিনি বুঝতেও পারেননি।

–        গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ দেখছি রাতে ঘুমোন না।

চমকে গিয়ে গিয়াস তাকালেন ইসমাতের দিকে।

–        আহ দোস্ত। আমি কি শুধুই সুলতান? আমি কি নই কোনও কবি?

–        আমি জানি না ইতিহাসে কজন এমন সম্রাট এবং কবির দেখা পাওয়া যায়।

–        আমি তো সম্রাট হতে চাইনি। আর তাছাড়া দিল্লির বাদশাহকে সম্রাট বলা যায়। আমি তো বাংলার সুলতান।

–        সুলতান, এবার কিন্তু ছড়িয়ে পড়ার সময় এসেছে। সুলতান যদি দিল্লি দখল করতে পারেন, তাহলে বাংলা এই গোটা দেশকেই দখল করতে পারে।

–        আর তারপর?

–        তারপর আর কী? আপনি হবেন অধীশ্বর।

–        তুমি একজন কবি দোস্ত।

–        আমি আর কী কবি? কবি তো আপনার দোস্ত

–        শাহ মুহম্মদ সগীর। আপনি তো তাঁর নাম শুনলেই বিগলিত হয়ে পড়েন।

–        দোস্ত, শাহ মুহম্মদ সগীর এক অসামান্য কবি। তার উপর তিনি একজন বাঙালি। তুমি তাঁর ইউসুফ জোলেখা পড়েছ? যদি পড়ে থাক, তাহলে আমার অনুরাগের কারণ তুমি জানবে।

–        কিন্তু কবিতার প্রতি অনুরাগ আপনার সাম্রাজ্যবিস্তারে বাধা হয় কেন?

–        কবিতার প্রতি অনুরাগের কারণে তো নয়। আমিই তো একটা সময় প্রতিশোধ নিয়েছি। আর প্রতিশোধ নিয়েছি নিজেরই পরমাত্মীয়দের বিরুদ্ধে। নিজের বাবার মৃত্যুর কারণ আমি। আমি পিতৃহন্তারক।

–        মনে আছে দোস্ত। সেই সুবর্ণগ্রাম, যেখান থেকে ফৌজ নিয়ে আপনি নাগরি নদীর তীরে গোয়ালপাড়ায় এলেন।

–        হ্যাঁ, আর  প্রিয় সন্তানের বিদ্রোহের খবর শুনতে পেয়ে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল পিতার। সৈন্য নিয়ে তিনি পৌঁছলেন গোয়ালপাড়ায়। যুদ্ধ হল। বাবার সঙ্গে সন্তানের।  কিন্তু আমার বাহিনীর কাছে হেরে গেলেন। 

–        পিতৃহত্যা না করলেও পারতেন জনাব।

–        দোস্ত, যুদ্ধের শুরুতে আমি সৈন্যদের আদেশ দিয়েছিলাম, যাতে, পিতার উপর কোনোপ্রকার আঘাত করা না হয়। কিন্তু যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার পর রণোন্মত্ত সেনাদের কারও মাথায় রইলো না সে কথা। আব্বা জখম হয়েছেন শুনে আমি ছুটে গেছিলাম। আমার তখন অনুশোচনায় দগ্ধ অবস্থা। কেন এ যুদ্ধ করলাম, এ যুদ্ধ কি সত্যই দরকার ছিল? বাবার শেষ কথা ছিল– “তুমি রাজ্য শাসন করতে চেয়েছিলে, সে আশা পূরণ হয়েছে। এবার সর্বস্ব দিয়ে সে রাজ্যে রক্ষা কোরো।” এই বিরাট আদিনা মসজিদ, এর ভিতরেই বাবাকে সমাধিস্থ করে সেই যে পান্ডুয়া ছেড়ে চলে এলাম, আর সে দিকেই যাওয়ার সাহস পাইনি। বুকের মধ্যে কষ্ট হয়। এতটা নৃশংস আমি হলাম কী করে।

–        জনাব, একটা গল্প শোনা যায় আপনার সম্পর্কে তা কি সত্য?

–        কী গল্প দোস্ত?

–        অভয় দিন আগে, রেগে যাবেন না।

–        না না।

–        আপনি নাকি আপনার তিন উপপত্নীকে খুশি করার জন্য কবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন?

–        হাহাহাহা। আরে না। আমি তখন খুব অসুস্থ। মনে হচ্ছিল আমি আর বাঁচবই না। আয়ু বোধহয় ফুরিয়ে এসেছে। তাই ইচ্ছা ছিল প্রিয় তিন উপপত্নী আমার মৃতদেহকে গোসল করাবেন। কিন্তু সুস্থ হয়ে উঠলাম। অন্দরমহলের অন্যান্য জেনানারা আমার প্রিয় তিন উপপত্নীকে একটূ হিংসেই করে । আমি সুস্থ হয়ে উঠলাম বটে। কিন্তু তারা কী বলল জানো?  বলল লাশ-ধোয়ানি। ওদের মন খুব খারাপ হয়ে গেল। তাই আমি তাদের দুঃখ দূর করতে তাদের উদ্দেশ্যে কবিতা লেখার কথা ভাবলাম। কিন্তু কী আশ্চর্য, যে হাতে রক্ত লেগে আছে, সে হাতে কি আর সহজে কবিতা আসে? একমাত্র একটি চরণ লিখতে পেরেছিলাম। আসলে মন আমারও ভাল ছিল না। এত মানুষের মৃত্যুর কারণ হওয়া। আমার এতগুলো ভাইকে হত্যা করা। এতগুলো লোককে অন্ধ করে দেওয়া। এই ভয়ংকর নারকীয় হত্যাকান্ড করার পর কার মন ভাল থাকতে পারে? তবে তুমিও তো পারোনি। কেউই পারেনি সেই কবিতা শেষ করতে। এর পর তো তুমি জানো। মহাকবি হাফিজের কাছে দূত পাঠান। তিনি পূর্ণ করেছিলেন আমার আশা। কিন্তু…

–        আমি জানি। আমি নিজেও অনেকবার অনুরোধ করে চিঠি লিখেছিলাম তাঁকে

   বাংলায় একবার ঘুরে যাওয়ার জন্য। এই নিমন্ত্রণ ছিল রীতিমতো শাহী নিমন্ত্রণ        কিন্তু অনেক বয়স হয়ে গেছে কবির। 

–        হ্যাঁ। আমার আর মন নেই সাম্রাজ্যবিস্তারের। একদমই মন নেই।

–        তাই কি ইউসুফ-জোলেখা আপনার এত প্রিয় গ্রন্থ? জোলেখা যেমন প্রেমে পড়েছিলেন ক্রীতদাস ইউসুফের, তেমনই কি আপনিও প্রেমে পড়েছেন কারোর?

–বচন রতন মণি জতনে পুরিআ।

প্রেম রসে ধর্ম বাণী কহিমু ভরিআ।

ভাবক ভাবিনী হৈল ইছুফ জলিখা।

ধর্মভাবে করে প্রেম কিতাবেত লেখা।

–        ঠিক,জনাব। এমন কেউ কি আপনার হৃদয় জয় করার তুমুল প্রচেষ্টা করছে?

–        না, এখনো সে প্রেম রূপ পায়নি কোনও। আমি তাকে দেখেছি মাত্র।

–        তাহলে আমি ঠিকই সন্দেহ করেছিলাম।

–        হ্যাঁ। আসলে, আমার তাকে দেখে মনে হল বহুজীবন ধরে তাকে আমি চিনি।

–        এ তো কাব্যের মতো কথা বলছেন। আপনাকে কি তবে জোলেখা বলব, গোস্তাকী মাফ।

–        হাহাহাহা। তোমার রসবোধের প্রশংসা না করে থাকা যায় না। কিন্তু যদি তুমি একটু কবিতার দিকে মনোযোগ দিতে তাহলে হয়তো আরও ভাল হত।

–        জনাব। আমি কবিতা বুঝি। হাফিজের কবিতা পড়ে আমি এইটুকু বুঝেছি আমি হাফিজকে অতিক্রম করতে পারব না। আমি বুঁদ হয়ে আছি হাফিজেই। তবে আর আমি কী লিখব? আমার তো মনে হয় হাফিজ স্বয়ং যা লিখছেন সুদূর পারস্যে বসে, ওই লেখাগুলিই আমি লিখতে চেয়েছি।

–        একটা কাজ করবে দোস্ত?

–        বলুন জনাব।

–        আমি একটি চিঠি লিখব হাফিজের উদ্দেশ্যে। পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে?

–        দূত পাঠাব।

–        দূত নয়। দূত ব্যাপারটা খুব কঠিন হয়ে যায়। মনে হয় রাজা হিসেবে আমি তাকে কিছু পাঠাচ্ছি। কিন্তু আমি তো তাকে রাজা হিসেবে নয়।পাঠাতে চাই এক ভক্ত হিসেবে। তার দাস হিসেবে।

–        আপনি চিঠি লিখুন। আর তাকেও চিঠি লিখুন। যার কথা ভেবে আপনার মন থেকে বেরিয়ে আসছে মসনবী।

–        না, আমি গজল লিখতে চাই। কিন্তু গজল লিখতে গিয়েও মনে হচ্ছে আটকে যাচ্ছি। এ এক অদ্ভুত ব্যাপার। সুবর্ণগ্রামে ফিরে গিয়ে আমি কোনোমতেই আর লিখতে পারব না। তবে তুমি একবার পোড়ামাটির গ্রামে গিয়ে মেয়েটির খোঁজ করবে?

গিয়াসউদ্দিন জানতেন না সে সময়  চন্দন এবং হরিণী একে অপরের মধ্যে মোহিত হয়ে ছিল। সাক্ষী ছিল ঘাস, মাটির গন্ধ এবং আকাশের নক্ষত্র। কিন্তু রাত বাড়ছে। এসময় ডাকাত, সৈন্য এবং হিংস্র শ্বাপদ সকলেই চলে আসতে পারে। তাই দুজনেই রওনা দিলেন গ্রামের দিকে। গ্রাম এখান থেকে দেখা যায় না। গ্রাম আর তাদের এই খেতের মধ্যে রয়েছে একটি বাঁশবাগান। আর সেই বাঁশবাগানের পর রয়েছে একটি দিঘি। সেই দিঘি, যেখানে একদা শান্ত ভিক্ষু আর সূত্রধর পালের দেখা হয়েছিল। মূল রাস্তা ছেড়ে চন্দন এবং হরিণী সেই পথ ধরে এগোতে থাকলেন। দুজনেই আজ তৃপ্ত। সঙ্গমকালীন এক তৃপ্তিবোধ তাদের দুজনকেই এখনো আচ্ছন্ন করে রেখেছে। আদিঘি পেরোতে পেরোতে তাদের চোখ পড়ল অন্ধকারের মধ্যেই কে একজন তাদের গ্রামের দিক থেকে এগিয়ে আসছেন দিঘির অপরপ্রান্তের সেই দেবীমূর্তিটির দিকে। কে আসছেন?

চন্দন ইশারায় হরিণীকে চুপ করতে বলল। কোনও শব্দ করা যাবে না। এ কে, তাদের জানতেই হবে।

অবশ্য বুঝতে খুব একটা দেরি হল না।

কারণ সেই নক্ষত্রের অল্প আলোতেও তারা বুঝতে পারল এমন দীর্ঘদেহী, লম্বা চুলের ব্যক্তি পোড়ামাটির গ্রামের শ্রেষ্ঠ শিল্পী  সূত্রধর পাল ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। চন্দন এবং হরিণী দুজনেই এগিয়ে গেল তার দিকে।

খাওয়ার পর সূত্রধরের অকারণেই মনটা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। ঘুমোলো, কিন্তু সেই ঘুমের মধ্যে আর কারো স্বপ্ন তো এল না। তাহলে কি স্বপ্নের ভিতরে সেই ছেলেটি হারিয়েই গেল? ঠিক যেমন ভাবে হারিয়ে গেছে শান্ত ভিক্ষু। এইখানে এসে শান্ত ভিক্ষুর কথা মনে পড়ে গেলেই খুব কষ্ট হতে থাকে। সে একটা অলংকরণ করার চেষ্টা করেছে আজ। অনেকটা শিকারী পাখির মতো ডানা। ডানাদুটো মেলে দিয়েছে দুই পাশে। তার চোখ দুটো ভয়ংকর। সে মনে মনে তার নাম রেখেছে সময়। সত্যই কী একটা সময়ের মধ্য দিয়ে তারা চলেছে। সময় কি কখনোই ভাল হবে না? লোটন বিবির কথা মনে পড়ছে বারবার। সেদিন লোটন বিবি তার খসড়া করা অলংকরণগুলো দেখতে দেখতে কেঁদেই ফেলেছিল। কেন কাঁদছ তুমি, জিজ্ঞেস করাতে লোটন বিবি বলেছিল, কাঁদছি, কারণ এই শিল্প তোমার হাতে এমন ভাবে জীবন্ত হয়ে উঠেছে, যা আর কারো হাতে তেমন ভাবে জীবন্ত হতে দেখিনি। কিন্তু আমার কী ভয় করছে জানো তো? আমার এই মসজিদে হয়তো কেউ আসবে না।

–        কেন আসবে না?

–        কারণ আমি তো আসলে একজন বেশ্যা।

–        না না তা কোথায়?

–        আরে, আমাদের সেই চোখেই দেখা হয়। কিন্তু আমারও তো ইচ্ছা করে

কিছু একটা করার।

–        তুমি তো বাঈ।

–        হ্যাঁ গো, সে জন্যই তো দেখলাম নাচের যে মুদ্রাকে তুমি ফুটিয়ে তুলেছ, তা থাকুক আমাদের পোড়ামাটির শিল্পে। আমি তো আদিনায় এমন কিছু দেখেছি।

–        ওগুলো বৌদ্ধদের করা।

–        বৌদ্ধ? আদিনা তো গড়েছিলেন সিকান্দর শাহ।

–        হ্যাঁ অবশ্যই। কিন্তু জায়গাটা আগে ছিল একটা বৌদ্ধ মঠ।

–        তুমি সত্যি বলছ?

সূত্রধর মুচকি হাসল। সে শিল্প চেনে। আদিনার গায়ে এমন অনেক পোড়ামাটির কাজ সে খুঁজে পেয়েছে, যেগুলি তাদের সময়ের তৈরি করা নয়। এমনকি শালভঞ্জিকাও বৌদ্ধ শিল্পকলা।

আদিনা অবশ্যই একটি বৌদ্ধ মঠ ছিল। এক বিশাল বৌদ্ধ মঠ।

-এখন সেখানে সিকান্দর শাহ-এর একটা সমাধিও আছে।

– আমি ভয় পাচ্ছি অন্য বিবি।

কী ভয়?

–        আমাদের কোনো কাজই কি আগামী দিনে থাকবে?

এই সব কথার উত্তর যে লোটন দিতে পারবে না তা সে জানে। মনের মধ্যে সবসময়ই একটা অনিশ্চয়তাকে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। জীবন কেমন ভাবে একটার পর একটা স্তর অতিক্রম করে চলে যাচ্ছে। ফেলে যাচ্ছে কিছু, রেখে দিচ্ছে কিছু। যা ফেলে দিচ্ছে, সে সব ইতিহাস। আর যা রেখে দিচ্ছে, সে সব শিল্প।

কিন্তু তার এই শিল্প সময়ের কাছে থেকে যাবে না কি শান্ত ভিক্ষুর মতো একদিন তাকে ছেড়ে চলে যাবে, এ কথা কেই বা জানে।

মনের মধ্যে একটা দুঃখের স্রোত বইতে থাকে তার। কোথা থেকে যে এই স্রোতের শুরু আর কোন দিকে যে এই স্রোত চলে যাচ্ছে, তা কেই বা জানে।

সূত্রধরের মনে হচ্ছে বারবার, কিছু একটা ঘটতে চলেছে তার জীবনে। কেউ একজন আসছে। কেউ আসছে তাকে রাস্তা দেখানোর জন্য। কিন্তু সে এখনো এসে পৌঁছয়নি।

এই সময়েই তার পিঠে মৃদু কারো আঘাতে সে ভয় পেয়েই পিছন দকে তাকাল।

চন্দন। তার পালার অন্যতম একজন গায়ক অভিনেতা চন্দন। পালার লেখক এবং একজন কবিও বটে।

–        কী ব্যাপার, আপনি এখন এখানে?

–        আমরা যাচ্ছিলাম। দেখলাম আপনি।

–        তোমরা?

তখন মেঘের আড়াল থেকে যেমন চাঁদ আত্মপ্রকাশ করে, সেভাবেই চন্দনের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল হরিণী।

হাঁ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল সূত্রধর। এমন সুন্দর কেউ হতে পারে? এমন সুন্দর একজনের সঙ্গে চন্দন অন্ধকারে এখানে কী করছে?

–        হরিণী। আমার রাধা। আমার পার্বতী।

–        ও বাবা। তোমার হরিণী তো নিজেই চাঁদ।

হরিণী লজ্জা পেল।

–        না না লজ্জা পাওয়ার কোনও কারণ নেই। আপনা মাংসে হরিণা বৈরী। তোমার সৌন্দর্যই না একদিন তোমাকে খেয়ে নেয়। তা আমার এই অনুর্বর জমিতে তোমার মতো ফুলের গাছ কীভাবে আলো পেল, জানতে ইচ্ছে করে।

–        কাকা, তুমি আমাকে বারবারই খুব নিচু করে দেখো।

–        একদমই না সোনা। তুই আমার কাছে আমার ভায়ের মতো রে। এসো, আমার ঘরে এসো সবাই।

হরিণা সঙ্গে সঙ্গে বলল, না কাকা। আজ থাক। আজ আমাকে যেতে হবে বাড়িতে।

–        লুকিয়ে এসেছ?

–        হ্যাঁ।

–        তুমি এখানে?

জিজ্ঞেস করল চন্দন।

–        আমি এখানে আসি। ঘুম আসে না। আমি এখানে এসে বসে থাকি। একটা সুন্দর হাওয়া দেয় এখানে। হাওয়া তো শুধু হাওয়া নয়।

–        বুঝলাম।

–        তুই কবি, নিশ্চয় বুঝবি। কিন্তু বুঝলি, অবস্থা খুব একটা ভাল না। আমাদের বাংলায় একটা বড় কোনও পরিবর্তন আসছে। এমন কিছু হবে, যা আমাদের জীবনকে একেবারে উল্টেপাল্টে দেবে।

–        তাই মনে হচ্ছে?

–        আমার মনে হচ্ছে, একটা অন্ধকার সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আর যদিও বা একটূ শান্ত পরিস্থিতি নিয়ে এল আমাদের এই গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ, তার বিরুদ্ধে তৈরি হচ্ছে ষড়যন্ত্র।

গিয়াসউদ্দিন নামটা শুনেই কেমন যেন ঘোর ভেঙে গেল হরিণীর। আজ তো সেই গিয়াসউদ্দিনের সঙ্গেই দেখা হয়েছিল।

সম্রাট। সুলতান। কিন্তু বেশ ভদ্র। আর তার সঙ্গে মুখে একটা শান্তির আভাস আছে। চোখদুটি যেন বিষণ্ণ রাজপুত্রের মতো। এমন একটা লোককে দেখে প্রেমে পড়ে যাওয়া যায়।

সত্যি কথা বলতে কী, চন্দনের সঙ্গে যৌনতার সময়েও সেই লোকটার মুখ তার মন থেকে মুছে যায়নি। মন থেকে সেই সুলতান কখনোই মুছে যাচ্ছে না।

কিন্তু কীভাবে গিয়াসউদ্দিনের বিরুদ্ধে ষড়যন্র হবে? আর সূত্রধর তা টের পেলই বা কীভাবে?

রাত বাড়ছে। ফিরতেও হবে।

কিন্তু সূত্রধরের মুখে একটা চাপা উত্তেজনা।

–        আমাদের ভাতুরিয়ার হিন্দু রাজা বা জমিদার গণেশ।

–        কিন্তু সে তো গিয়াসউদ্দিনের কাছে কিছুই না।

–        কিছুই না, কিন্তু গণেশ একটা শকুনির মতো চরিত্র।

–        দুজনে মিলে আমাদের এই পোড়ামাটির গ্রামকেই না ধ্বংস করে দেয়।

–        তা করবে না। আমরা তো আসলে কারো সিংহাসন নিয়ে টানাটানি করছি না। আর এদের নিজেদের ঐশ্বর্য দেখানোর জন্য দরকার আমাদের মতো শিল্পীকেই। কিন্তু আমাদের এই বাংলার যে আসলে কী হবে, তা নিয়েই আমি ভাবছি।

–        কিন্তু এখন আমরা বাড়ি যাই? কী বলো?

হরিণী, চন্দন গ্রামের পিছন দিয়ে নিজেদের ডেরায় পৌঁছে দিল। তাদের এগিয়ে দিল সূত্রধর। কিন্তু তার নিজের আর বাড়ির দিকে যেতে ইচ্ছে করছে না।

কেন ইচ্ছে করবে?

যদি ঘরের মধ্যে যায় সে, একটা তীব্র অস্বস্তি কাজ করবে। কেন সেই ঘরে নেই শান্ত ভিক্ষু। তার প্রতিটি শিল্পকার্যের মধ্যে যে শান্ত ভিক্ষুর অবয়ব রয়ে যাচ্ছে, রয়ে যাচ্ছে একটা অসমাপ্ত প্রেমের কথা। একটা অসমাপ্ত ভালবাসার কথা, তা তো কারো ধরতে পারার কথা নয়। আর সে সত্যি ছাড়া আর কিছুকেই নিজের শিল্প রূপে বাড়িয়ে দিতে পারে না।

কিন্তু শান্ত ভিক্ষু এখন কোথায়?

এই সব ঘটনা যখন ঘটছে, তখন শান্ত ভিক্ষুও তাকিয়েছিলেন জঙ্গলের দিকেই। জঙ্গল পেরোলে তবে যাওয়া যাবে তাদের সেই পোড়ামাটির গ্রামে। আবার এই জঙ্গলেরই আরেক প্রান্তে যে অপেক্ষা করে সুলতানের তাঁবু, গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ রাত জেগে লিখে চলেছেন তাঁর না লেখা কবিতা, তাও তিনি জানতে পারছেন না। জানতে পারছে না, এই জঙ্গল পেরিয়ে তাদের পোড়ামাটির গ্রামে বিনিদ্র রাত কাটাতে তার সূত্রধর পাল, যার সঙ্গে দেখা করার জন্য স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে হাটতে হাঁটতে এসে হাজির হয়েছে এক অদ্ভুত চরিত্র। সে যে ঠিক কোন সময় থেকে এখানে হাজির হয়েছে, তা শান্ত ভিক্ষু বুঝতে পারছে না। কিন্তু একটা বিষয় সে স্পষ্ট বুঝতে পারছে, এই যোগসূত্রের একটা কোনও কারণ আছে। আর সে কারণ সে বুঝতে পারছে না। জঙ্গল কিন্তু শান্ত নয়। জঙ্গলের থেকে ভেসে আসছে নানারকমের ধ্বনি। কিন্তু ডাকাতের আসার কোনও সম্ভাবনা আছে কিনা তা তিনি বুঝতে পারলেন না। পাশে অঘোরে ঘুমোচ্ছে মৃন্ময়। শুধু মৃন্ময় কেন, যে কোনও মানুষ যখন ঘুমোয়, তখন তাকে পবিত্র বুদ্ধের মতো লাগে। কিন্তু তার একটা অদ্ভুত ব্যাপার মনে হচ্ছে। তিনি কীভাবে পোড়ামাটির গ্রামে আবার গিয়ে পৌঁছবেন। সেটি কি সূত্রধরের পক্ষে ভাল হবে? তাঁর তো এখন হয়তো অনেকটা দূরই এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল তাম্রলিপ্ত বন্দরের দিকে। গঙ্গার সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি একটি অদ্ভুত লোকের সঙ্গে ফিরে চলেছেন তাঁর প্রেমিকের কাছে।

কিন্তু পোড়ামাটির গ্রামে যাওয়ার আগে একবার জঙ্গলে প্রবেশ করতে হবে। সেখানে বৌদ্ধ মঠে প্রবেশ করে তাকে ভাল পোশাক দিতে হবে। তাকে দিতে হবে ছদ্মবেশ। সেই ছদ্মবেশ ছাড়া সে এখানে অচল। মারাও যেতে পারে।

আসলে যে তিনি জেগে আছেন, তা বুঝতে পারেনি মৃন্ময়।

মৃন্ময়ের বোঝার কথাও না।

যেমন বাড়ি ফিরে আর চন্দনের কথা মনের মধ্যে ভাসছে না হরিণীর। ছটফট ছটফট করতে লাগল বিছানায়।

বিছানা থেকে উঠে এসে দাঁড়াল তাদের বাগানের শেষ প্রান্তে। এখান থেকে দূরে দেখা যায়। দূর, মানে জঙ্গলের সেই প্রান্ত, যেখানে সে মন খারাপ করে চলে গিয়েছিল। কিন্তু তিনি কে তাকিয়ে আছেন তার দিকে?

না, তা সম্ভব নয়। কারণ তিনি সুলতান। আর হরিণী গ্রামের একজন সাধারণ মেয়ে।

সে জানত না, বাংলার সুলতান, গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ তখন ভাবছেন এমন এক পংক্তি, যা শুধু হরিণীকে দেখে তার মনের মধ্যে এসেছিল।

কিন্তু কিছুতেই তিনি তা লিখে ফেলতে পারছে না।

‘আমি সুলতান হতে চাই না। রাজা হতে চাই না। যুদ্ধ করতে চাই না। আমি আমার পাপের বোঝা বুকের উপর নিয়ে এ জীবনে একটা কবরের মতো অপেক্ষা করছি। আমার কবরের উপর একটি ফুলের গাছের মতো তুমি এস। এস। কোথায় তুমি?

এ কথা হয়তো হরিণীর বুকের মধ্যেও তরঙ্গ তুলছিল।

জীবন রহস্যময়। প্রেম, তার চেয়েও রহস্যময়।

(ক্রমশ)

আগের পর্বের লিঙ্কঃ পোড়ামাটির গ্রাম- সপ্তম পর্ব


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top