“শিং নেই তবু নাম তার সিংহ,
ডিম নয় তবু অশ্বডিম্ব—”
গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুর। লুকোচুরি ছবিতে কিশোর কুমারের গলায় গানটা বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। গানের কথায় সিংহের নামে ‘শিং’ আছে, কিন্তু মাথায় নেই। অথচ প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে মহেঞ্জোদারোর একটা ছোট্ট তামার ফলকে ঠিক উল্টো দৃশ্য দেখি—এক মানুষের মাথায় প্রকাণ্ড শিং, হাতে তির-ধনুক, শরীরে কয়েকটা রেখা, পিছনে লেজের মতো অংশ। তাই নিয়ে কৌতূহল আজও কাটেনি। কয়েকজন গবেষক একে ‘horned archer’ বলেছেন। কিন্তু লোকটি কে? শিকারি? যোদ্ধা? পুরোহিত? দেবতা? না কি কোনও আচার করতে গিয়ে মানুষটি ওই সাজ পরেছিলেন? গবেষকেরা এখনও সিন্ধুলিপি পড়ে উঠতে পারেননি। ফলে মাথায় দুটো শিং আর হাতে ধনুক নিয়ে লোকটি আজও আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
আপনি ভাবতেই পারেন, ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে এই শিংওয়ালা ভদ্রলোককে নিয়ে এত মাথাব্যথা কেন? কারণ আছে। আর সেই কারণ আমাদের সময়েও এসে লাগে। সিন্ধু সভ্যতার কথা উঠলেই আমরা নালা, স্নানাগার, পোড়া ইট, সিলমোহর আর অপঠিত লিপি নিয়ে কথা বলি। কিন্তু একটা প্রশ্ন আড়ালেই থেকে যায়—এত বড় বড় শহর চালাত কে? মানুষ কার কথা শুনত? মিশরের ফারাওরা নিজেদের মূর্তি বানিয়েছেন। মেসোপটেমিয়ার রাজারা পাথরে যুদ্ধজয়ের গল্প লিখেছেন। সিন্ধুতে এসে আমরা থমকে যাই। কোনও রাজাকে নিশ্চিতভাবে চিনতে পারি না। অথচ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ একই মাপে ওজন মেপেছে, নির্দিষ্ট অনুপাতে ইট বানিয়েছে, সিল ব্যবহার করেছে, রাস্তা বানিয়েছে, নালা কেটেছে, জল ধরে রেখেছে। কেউ না কেউ নিয়ম বেঁধেছিল, কেউ সেই নিয়ম চালিয়েছিল। তবু রাজমুকুট-পরা মানুষটি কোথায়?
হরপ্পা থেকে ২০২৬ সালের ভারতীয় রাষ্ট্র পর্যন্ত সোজা বংশলতিকা টানা যায় না। তবু একটা পুরনো প্রশ্ন দু’জায়গাতেই মাথা তোলে—মানুষ কী দেখে বুঝবে, কার হাতে জোর আছে? কোথাও রাজা নিজের মূর্তি দাঁড় করান, কোথাও প্রতিষ্ঠান সিল লাগায়, কোথাও দফতর কাগজে আদেশ লেখে, কোথাও সমাজ কোনও চিহ্নকে বিশেষ মর্যাদা দেয়। সেই অর্থে সিন্ধু আজকের ভারতের ‘গোপন ডিএনএ’ নয়; বরং বহু পুরনো এক প্রশ্ন রেখে গেছে—মানুষ ক্ষমতাকে চিনত কী দেখে?
সিন্ধু সভ্যতার পরিণত নগরপর্ব মোটামুটি খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ থেকে ১৯০০ অব্দ। হরপ্পা, মহেঞ্জোদারো, ধোলাভিরার মানুষ রাস্তা বানিয়েছে, নিকাশি চালিয়েছে, জল ধরে রেখেছে, কারুশিল্পের কেন্দ্র গড়েছে, দূরদেশে পণ্য পাঠিয়েছে। অথচ প্রত্নতত্ত্ববিদেরা এখনও নিশ্চিত রাজপ্রাসাদ, রাজসমাধি কিংবা কোনও সর্বময় শাসকের বিশাল স্মারক দেখাতে পারেননি। ছোট দাড়িওয়ালা যে মূর্তিটিকে আমরা ‘Priest-King’ বলি, তার পরিচয়ও নিশ্চিত নয়; নামটির ভিতরে প্রমাণের চেয়ে অনুমানই বেশি। অ্যাডাম গ্রিন মহেঞ্জোদারোর বিভিন্ন জনসমাগমের জায়গা দেখে একটা অন্য সম্ভাবনার কথা বলেছেন—হয়তো একজন রাজা সব চালাতেন না; বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব আর কর্তৃত্ব ভাগ করে শহর চালাত। গবেষকেরা একে heterarchy ও collective action-এর কথায় বোঝান। সহজ করে বললে, সিংহাসন একটাই হবে—এমন কোনও কথা নেই।
সুতরাং শহর আছে, তবে সিংহাসনটা কোথায়? মাথায় শিং দেখেই অবশ্য উত্তর লিখে ফেললে মুশকিল। ইতিহাসে কোনও প্রতীকের একটাই মানে থাকে না। পশুর মাথায় শিং অস্ত্র, শিকারির মাথায় ছদ্মবেশ, পুরোহিতের মাথায় মর্যাদা, দেবতার মাথায় অতিমানবিক শক্তি, নেতার মাথায় জোর দেখানোর চিহ্ন হতে পারে। চিহ্ন এক, মানে অনেক।
এই কারণে মনে পড়ে অগাথা ক্রিস্টির The Moving Finger-এর মেগান হান্টারকে। স্কুলজীবন সবে শেষ হয়েছে, ইতিহাস নিয়ে সে ভীষণ বিরক্ত। তার অভিযোগ—“ইতিহাস, যেমন ধরো। একেকটা বইয়ে একেক রকম!” জেরি বার্টন উত্তর দেয়—“ওটাই তো তার আসল আকর্ষণ।” ইতিহাসের মজাটাও এখানেই। একই জিনিস দেখে দু’জন ঐতিহাসিক দু’রকম কথা বলতে পারেন। যার কথার পাশে বেশি প্রমাণ দাঁড়ায়, আপাতত তার কথাই বেশি জোর পায়। ইতিহাস তাই মুখস্থ উত্তর নয়; জেরা চলতেই থাকে।
এই জেরার সবচেয়ে বিখ্যাত নমুনা মহেঞ্জোদারোর আর-এক শিংওয়ালা মানুষ—এবার তামার ফলকে নয়, স্টিয়াটাইটের সিলে। জন মার্শাল ১৯৩১ সালে পশুবেষ্টিত, শিং-মুকুট-পরা বসা চরিত্রটির মধ্যে পরবর্তী শিবের আগের কোনও রূপ খুঁজে পেলেন। ‘পশুপতি’ নামটা এত জনপ্রিয় হল যে আজও ছবিটার পাশে যেন অদৃশ্য কালিতে লেখা থাকে—‘ইনি পশুপতি শিব’। অথচ মহেঞ্জোদারোর কেউ সেই পরিচয় লিখে রেখে যায়নি।
আপত্তিও এল দ্রুত। ১৯৪১ সালের Nature-এর আলোচনায় সালেতোরে অগ্নির কথা তুললেন, আইয়াপ্পান শিংয়ের গঠন নিয়েই প্রশ্ন করলেন। পরে ডরিস শ্রীনিবাসন আরও কঠিন প্রশ্ন তুললেন—সত্যিই কি তিনটি মুখ আছে? বসার ভঙ্গিকে যোগাসন বলব কেন? শিং দেখেই পরবর্তী শিবের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক টানব কোন যুক্তিতে? চরিত্রটি মানুষ, পশু, না কি দুয়ের মিশ্র কোনও রূপ—সেই প্রশ্নও তিনি তুললেন। সিল একই রইল, মানুষের পড়া বদলাল।
পারপোলা আবার তামার ফলক, ছবি আর লিপিচিহ্ন পাশাপাশি রেখে পড়ার চেষ্টা করলেন। তাঁর Proto-Dravidian পাঠ নিয়ে মতভেদ আছে; গবেষকেরা এখনও সিন্ধুলিপি নিশ্চিতভাবে পড়তে পারেননি। তবু তাঁর প্রশ্নটি জরুরি—ছবি আর লেখা কি পাশাপাশি পড়লে কিছু বোঝা যায়? তখন শুধু ‘লোকটি কে’ জানলেই হয় না; জানতে ইচ্ছে করে, মানুষ ওই ছবি আর চিহ্ন দিয়ে কী বোঝাতে চাইত।
শিংয়ের কথাটাও তাই হালকাভাবে নেওয়া যায় না। কৃষক, পশুপালক বা শিকারির কাছে ষাঁড়-মহিষের শিং নিছক সাজ নয়, শক্তির দৃশ্যমান অস্ত্র। মানুষ পশুকে ভয় পেয়েছে, শিকার করেছে, পোষ মানিয়েছে, চাষে কাজে লাগিয়েছে—আবার সেই পশুর শক্তির চিহ্ন নিজের শরীরেও তুলেছে। মেসোপটেমিয়ায় মানুষ শিংযুক্ত মুকুট দেখেই দেবত্ব চিনত। নারাম-সিন নিজের বিজয়স্তম্ভে সেই চিহ্ন মাথায় তুলে সাধারণ সৈনিকদের থেকে নিজেকে আলাদা করেন। শিং সেখানে আর সাজ থাকে না; শিং বলে দেয় কে উপরে।
কিন্তু মেসোপটেমিয়ার অভিধান খুলে সিন্ধুর পাশে বসিয়ে দিলেই চলবে না। যোগাযোগ ছিল, বাণিজ্য ছিল—তাই বলে প্রতিটি চিহ্নের মানে এক হবে কেন? বরং তফাতটাই বেশি মজার। মেসোপটেমিয়ায় রাজাকে দেখা যায়। সিন্ধুতে দেখি নিয়ম, মাপ, সিল, রাস্তা, জল—কিন্তু রাজাকে দেখি না। আমরা হয়তো এত দিন ভুল জায়গায় রাজাকে খুঁজেছি।
এইখানেই বহতা আনসুমালি মুখোপাধ্যায়ের ২০২৩ সালের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। সিল, সিলিং, ট্যাবলেট, লিপিচিহ্ন আর সেগুলি কোথায় পাওয়া গেছে—সব মিলিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, সিন্ধুর মানুষ কর আদায়, বাণিজ্যের অনুমতি, কারিগরির অনুমতি, পণ্যের চলাচল কিংবা কোথায় কে ঢুকবে—এসব কাজেও লিপি ব্যবহার করে থাকতে পারে। তাঁর কথা চূড়ান্ত নয়। কিন্তু প্রশ্নটা জোরালো—সিলে ধর্মীয় ছবি আছে বলেই সেটি শুধু পুজোর জিনিস হবে কেন? একই সিল দিয়ে মানুষ দেবতার পরিচয় জানাতে পারে, পণ্যের মালিক চিনতে পারে, আবার দফতরের কাজও সারতে পারে।
এখানেই ছবিটা বদলে যায়। রাজা চোখে না পড়লেও দফতর নিয়ম বেঁধে দিতে পারে। কোন পণ্য কোথায় যাবে, কোন সিল ছাড়া কাজ হবে না, কে কোথায় ঢুকবে—এসবও কেউ ঠিক করে। ফলে একজন মানুষকে না দেখেও আমরা বুঝতে পারি, কোথাও একটা ব্যবস্থা কাজ করছে। সিংহাসনে কে বসে আছে সেটা না জানলেও তার নিয়ম গায়ে এসে লাগে।
ফুকোর ছোট্ট বাক্যটা তাই এখানে কাজে লাগে—“power produces reality.” সহজ করে বললে, ক্ষমতা শুধু ‘এটা করো না’ বলে না; অনেক সময় সে বলে দেয়, কোনটা স্বাভাবিক। বুর্দিয়ুও symbolic power নিয়ে প্রায় একই জায়গায় পৌঁছেছিলেন। মানুষ যখন কোনও পদ, চিহ্ন বা প্রতিষ্ঠানের কথাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়, তখন তাকে আর প্রতি মুহূর্তে লাঠি দেখাতে হয় না। শিং নিজে কিছু নয়; মানুষ শিং দেখেই যদি মাথা নোয়ায়, তখন শিংয়ের জোর তৈরি হয়।
এই জায়গা থেকেই সিন্ধু আর আজকের দুর্গাপুজোর মধ্যে একটা প্রশ্নের সেতু তৈরি হয়। মহেঞ্জোদারোর শহর আর আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এক জিনিস নয়। তা বলাও উচিত নয়। কিন্তু দু’জায়গাতেই একটা প্রশ্ন করা যায়—কে ঠিক করছে, কোন কাজটা স্বাভাবিক, কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল?
সেখানেই সাড়ে চার হাজার বছরের পুরনো শিংটা হঠাৎ আধুনিক দেখায়। আজ রাজদণ্ডের বদলে নির্দেশিকা আসে, সিলমোহরের জায়গায় বিজ্ঞপ্তি। রাষ্ট্র অবশ্যই রাস্তা, ভিড়, আগুন, শব্দ, নিরাপত্তা, বিসর্জন—এসব নিয়ন্ত্রণ করবে। সেটাই তার কাজ। কিন্তু রাষ্ট্র বা অন্য কোনও প্রতিষ্ঠান যখন নিরাপত্তার বাইরে গিয়ে বলতে শুরু করে কোনটা ‘শুদ্ধ’, কোনটা ‘অশুদ্ধ’, কোনটা ‘ঐতিহ্যসম্মত’, কোনটা ‘শোভন’—তখন প্রশ্নটা বদলে যায়।
২০২৬ সালের দুর্গাপুজো সেই প্রশ্নটাই সামনে এনেছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার পঞ্জিকা মেনে বিসর্জন করতে বলেছে, পুজো ও বিসর্জনে ডিজে নিষিদ্ধ করেছে—ভালো কথা, সাধুবাদ জানাই। মহাষ্টমীতে মদ বিক্রি বন্ধেও সহমত। অন্যদিকে ধীরেন্দ্র কৃষ্ণ শাস্ত্রী বাঙালিকে দুর্গাপুজোর সময় মাছ-মাংস না খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বিতর্ক বাধিয়েছেন। প্রশাসনের বিধি আর ধর্মীয় নেতার নিদান এক জিনিস নয়। দু’জনের জোরও এক জায়গা থেকে আসে না। তবু শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব ঘরোয়া—আমি কী খাব, কী পরব, কীভাবে পুজো করব, আর তার মধ্যে কোনটা ঠিক—এই তালিকাটা লিখবে কে?
এইখানেই মহেঞ্জোদারোর শিং আর আমাদের সময় এক মুহূর্তের জন্য পাশাপাশি এসে দাঁড়ায়। তুলনা রাষ্ট্রব্যবস্থার নয়। তুলনা শুধু এইটুকু—মানুষ কাকে দেখে মাথা নোয়ায়? সাড়ে চার হাজার বছর আগে মানুষ হয়তো শিং, সিল বা অন্য কোনও চিহ্ন দেখে বিশেষ মর্যাদা চিনত। আজ আমরা পদ, বিধি, লাইসেন্স, অনুমতি, ‘ঐতিহ্য’, ‘শালীনতা’—এইসব দেখে বুঝি, কার কথার জোর বেশি। ক্ষমতা আধুনিক হয়েছে, শিং অদৃশ্য হয়েছে।
২০২৫ সালের একটি গবেষণায় বৈষ্ণবী দীক্ষিত, নুশরাত হুসেন, শুভম বসাক, দেবা আট্টুরু, দেবাশিস মিত্র ও উজ্জ্বল ভট্টাচার্য deep learning ব্যবহার করে সিন্ধুর সিল থেকে লিপিচিহ্ন ও motif শনাক্ত করার চেষ্টা করেছেন। তাঁরা প্রথমেই ‘ইনি শিব কি না’ বলতে যাননি। আগে দেখেছেন কোন ছবি বারবার ফিরে আসে, কোন চিহ্নের পাশে কোন ছবি বসে, কোথায় একই ধরন আবার দেখা যায়। আগে মিলগুলো ধরা, তারপর তার মানে নিয়ে কথা বলা।
একশো বছরে গবেষকেরা প্রশ্ন করার ধরনও বদলেছেন। মার্শাল শিবের আগের রূপ খুঁজেছেন, শ্রীনিবাসন আপত্তি তুলেছেন, পারপোলা ছবি আর লিপি পাশাপাশি পড়েছেন, গ্রিন দেখেছেন একজন রাজা ছাড়াও শহর চলতে পারে কি না, মুখোপাধ্যায় খুঁজেছেন সিল আর লিপি দিয়ে দফতরের কাজ চলত কি না, নতুন প্রযুক্তি খুঁজছে কোন চিহ্ন কোথায় ফিরে আসে। ফলে ‘লোকটি কে?’ প্রশ্নে আর সব শেষ হয় না।
এখন প্রশ্ন আরও সোজা—কে নিয়ম বানাত? কে মানত? কে সিল দিত? কে পণ্য আটকে দিত? কে ঢুকতে দিত? আর শহরটা চলত কার কথায়?
আমার কাছে ওই তামার ফলক আর সিলগুলোর আসল গুরুত্ব এখানেই। শিংওয়ালা মানুষটি রাজা ছিলেন কি না আমরা জানি না। কিন্তু তিনি আমাদের একটা কথা ভাবতে বাধ্য করেন—সব ক্ষমতা সিংহাসনে বসা একজন মানুষের হাতে থাকে না। অনেক সময় সিংহাসনের কাজটাই করে প্রতিষ্ঠান। তার মাপ আছে, সিল আছে, অনুমতি আছে, নিয়ম আছে। সে যখন নিজের নিয়মকেই স্বাভাবিক বলে চালাতে পারে, তখন প্রতিদিন তলোয়ার দেখানোর দরকার পড়ে না।
মহেঞ্জোদারো থেকে আমাদের সময়ে আসতে হাজার হাজার বছর লেগেছে। রাজা বদলেছে, সাম্রাজ্য বদলেছে, রাষ্ট্র বদলেছে, দফতরের পোশাক বদলেছে। এখন কেউ সত্যিকারের শিং পরে অফিসে বসে না। দরকারও নেই। চেয়ার আছে, পদ আছে, সিল আছে, বিধি আছে। যে সেই আসনে বসে ভাবে শেষ কথাটা তারই, সে একটু ঘাড় কাত করলেই নিজের অদৃশ্য শিংটা দেখিয়ে দেয়।
মণিভূষণ ভট্টাচার্য ‘চেয়ার’ কবিতায় কয়েক লাইনে ব্যাপারটা সেরে দিয়েছিলেন—
“যে কেউ সেটাতে বসে সে-ই মাতব্বর হয়ে যায়
এবং তার শিঙ গজায়।
আর শিঙ গজালে
গুঁতোবার প্রশ্নটি এসে যায়।”
মহেঞ্জোদারোর মানুষটির শিং ঠিক কী বোঝাত, সেটা আমরা এখনও জানি না। ইতিহাসের সব রহস্য ঐতিহাসিকেরা মেলাবেন, এমনও নয়। কিন্তু সাড়ে চার হাজার বছরের পথ অন্তত একটা জিনিস দেখায়—আগে চিহ্ন আসে, তারপর মানুষ সেই চিহ্নের জোর মানতে শেখে, তারপর সেই জোর চেয়ার পেতে বসে।
তাই শিং শুধু মাথায় থাকে না। কখনও মুকুটে, কখনও সিলে, কখনও নিয়মে, কখনও চেয়ারে।
আর ক্ষমতায় বসে কে আমাদের শিং দেখাচ্ছে—সেটা বুঝতে আজ আর সিন্ধুলিপি পড়তে হয় না।
শিং, সিংহাসন ও শহর



