দ্বন্দ্ব-অন্তর্দ্বন্দ্ব – শেষ পর্ব

dwanda antardwanda sesh


স্মৃতি, যন্ত্রণা,আক্রোশ, এনট্রপি বৃদ্ধ, পরিসংখ্যানবিদ সবাই নিরবচ্ছিন্নভাবে বহমান টোড়ীর সুড়ঙ্গে প্রবেশ‌ করেছে।আলাপের প্রকোষ্ঠে খেলা করছে নীলচে গোলাপি আলো। ট্রেনের কামরায় ঝালা শুরু হলো,শুরু হলো সোনালী রূপালীর আলো আলো‌ খেলা। সমস্ত সংলাপ স্তব্ধ হয়ে গেছে, শুধু খেলা করছে অনবদ্য সঞ্চালন । বন্দিশের সুড়ঙ্গে প্রবেশ করে
স্মৃতির সহযাত্রীরা বুঝতে পারছে প্ল্যাটফর্ম খুব দূরে নয়। ক্রমাগত: তারা এক সিঙ্গুলারিটির দিকে এগোচ্ছে। যেখানে অর্থহীন অর্থেরা চেতনাহীন‌ কল্পনার সুরে অবগাহন করে। কথাদের থেমে যাওয়া কোলাহলে আশাবরী নিজস্ব সুরের সুরভি নিয়ে আসে। সমস্ত কামরায় ভৈরবী -টোড়ীর রঙের সুড়ঙ্গে আশাবরী নিয়ে আসে শৈশবের গন্ধমাখা বাতাস। ঝিরঝিরে দুপুর গায়ে মেখে ট্রেন প্ল্যাটফর্মে আসে।

স্মৃতি, যন্ত্রণা,আক্রোশ,উদ্বেগ,সংশয় একে একে বাক্স প্যাঁটরা নিয়ে প্ল্যাটফর্মে নামে। হতে পারে প্ল্যাটফর্মটার নাম সিঙ্গুলারিটি প্ল্যাটফর্ম, হতে পারে প্ল্যাটফর্মের নাম অনিশ্চয়তার প্ল্যাটফর্ম। নামে কিছুই যায় আসে না। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে প্রেম,বিরহ,যৌনতা,ক্ষিদে,তদন্ত,প্রতিবাদ আর খুন হয়ে যাওয়া ঈষৎ রাগের অস্তিত্বহীন‌ অস্তিত্ব। দাঁড়ি,কমা,সেমিকোলনেরা ওদের ঘিরে ঘুরপাক খাচ্ছে। হাঁফিয়ে উঠেছে ,আবার ঘুরপাক খাচ্ছে। ছোট্ট টিলার উপর জাগ্রত চন্দ্রাহত রাত। জোনাকিদের ঝোপ-ঝাড়ে স্ফুলিঙ্গের ওঠা-নামা। ঈর্ষা,লোভ আর ক্ষমতা যারা প্ল্যাটফর্মে কোথাও ছিল না,আবার সবসময় ছিল‌। যারা ট্রেনে কোথাও ছিল না,আবার সবসময় ছিল। যারা শুধু ফিসফিস করে গেছে ,আর ধূলো ময়লার মতো তাদের ফিসফিসানি পৌঁছে গেছে সকলের ফুসফুসে,হৃদয়ে,কেউ জানতেও পারেনি। ঈষৎ রাগ কোনো এক তাড়নায় নিজের বুকে ছুরি বসিয়েছিল। আত্মহত্যার অপপ্রচারে কারণকে সরিয়ে দিতে চেয়েছে তদন্ত,চেয়েছে প্রতিবাদ।
কারণ আর ফলাফল একে অপরের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে। কেউ কাউকে
চিনতে পারছে না, এই সিঙ্গুলারিটির প্ল্যাটফর্মে।
নিস্তেজ সংলাপ তারার দিকে উর্ধ্বমুখে তাকিয়ে। সবার ছায়ার দীর্ঘশ্বাসে সিঙ্গুলারিটির প্ল্যাটফর্মে অহেতুক সর্বনাশ নেমে আসছে। প্ল্যাটফর্মের গা ঘেঁষে দাঁড়ানো ট্রেনটা ধীরে‌ ধীরে দুমড়ে মুচড়ে ঘড়ি হয়ে গেল।ঈর্ষা,লোভ,ক্ষমতার তিনটে আলাদা মুখ,কিন্তু,ল্যাম্পপোস্টের আলো-আঁধারিতে দেখা যাচ্ছে তিনজনের একটাই ছায়া।
এই ঈর্ষা কানে কানে বলেছিল ঈষৎরাগের
‘কেউ তোমাকে বোঝে না। বোঝার চেষ্টাও করে না।’
লোভ বলেছিল, ‘তোমার প্রাপ্য সবাই ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। তোমার আর কিছু করার নেই।’
ক্ষমতা ফিস ফিস করে বলেছিল,’ চুপ করে থাকো। সত্যি বললে তোমাকেই প্রশ্ন করা হবে।’
ঈষৎ রাগের মর্মে প্রবেশ করানো হলো এই তিনটে কথা। কোনো হুমকি নয়, কোনো ষড়যন্ত্র নয়, কোনো আস্ফালন নয়।
ওর আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে বিদীর্ণ হলো।বিশ্বাসের ফাঁপা দেওয়ালে ঘূণ ধরলো। ও যখন প্রতিবাদ করতে যাবে ভাবছিলো,তখন মনে হলো সবাই চিৎকার করে বলছে ‘আক্রোশ’।
ও যখন প্রশ্ন করবে ভেবেছিল, চারপাশ থেকে গুঞ্জন উঠেছিল ‘সন্দেহ,সন্দেহ’
যখন সে অপমানের কথা বলেছিল,প্ল্যাটফর্মে ফিসফিস,ফিসফাস
‘আত্মমগ্ন…আত্মমগ্ন’
ঈষৎ রাগ চেয়েছিল নান্দনিক রাগ হতে। আগুনে রাগ নয়, আলো মাখা রাগ, যে রাগ
ভাঙচুর করে না, ভাঙনের শব্দ শুনতে শেখায়।যে রাগ মানুষের বিরুদ্ধে নয়,মানুষের ভিতর জমে থাকা অন্ধকারের বিরুদ্ধে। কিন্তু, সে বাঁচলো না,সে মরলোও না। সে তার অস্তিত্বকে বদলে ফেললো,কিছু থকথকে কাদা মাখা সংখ্যা জন্মালো,কিছু হা-হুতাশের অক্ষর এলো।তারপর এক অখণ্ড ‘মানে নেই’ এর প্রবাহ সুরকে আশ্রয় করে প্লাবনের মতো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলো।

পুরোনো চাঁদ পুরোনো মেঘের আড়ালে চলে যাচ্ছে,গাঢ় অন্ধকারে সুর গিলে নিচ্ছে বাক্স-প্যাঁটরা সমেত পরিসংখ্যানবিদ, এনট্রপি বৃদ্ধ, আক্রোশ,যন্ত্রণা, প্রেম,যৌনতা,খিদে,ভায়োলিন‌ সমেত আবোল তাবোল, সবাই ..সবাই এক এক করে সুরের প্রবাহের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে প্রবেশ করছে,তারপর মিশে যাচ্ছে ,একে অপরের সাথে । কিন্তু,কেউ কারুর মধ্যে বিলীন হচ্ছে না, সুরের প্রবাহের গাঁথনীর‌ মধ্যে তারা অপরিসীম ধৈর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অনন্তকাল ধরে তারা মিলবে ,ছড়াবে,ভাঙবে সুরের প্রবাহের গাঁথনির মধ্যে, তারা ভুলে যাবে তাদের অস্তিত্বের কথা,অতলে তলিয়ে যাওয়া
মৃতবৎ প্রাণের মত কোথাও কেউ নেই। তারা শূন্য হবে, শূন্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এক সম্ভাবনাকে কাঁধে চাপিয়ে তারা জাগ-ঘুম সুরের মধ্যে স্নিগ্ধ অন্ধবিন্দু হয়ে সম্পাদকের অপেক্ষায় থাকবে।

একটি পৃথুলা নাট্যকাব্যের লেখকের দিকে সম্পাদক তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছেন এরপর ‘কি?’ এবং’কেন?’
লেখক উত্তর হাতড়ে যাচ্ছেন, সেইসময় পাঁচমুড়ো পাহাড় থেকে,শ্যামলী নদী থেকে, দইওয়ালার ঘামে ভেজা পরিশ্রম থেকে কিছু ‘ কথা-কাহিনী’ কুলকুল করে নামছে
অগাধ ভালোবাসায়,আটপৌরে হেরে যাওয়া ঘর-কন্না চোখের জল মুছছে। লেখক দেখতে পাচ্ছেন,কিন্ত সম্পাদককে সে কথা বলতে পারছেন না।
সম্পাদক ভুরু তুলে তাকালেন,
লেখকের মনে হলো,’তার ভুরুর ধনুক বেঁকে ওঠে তনুর তলোয়ার..’
সম্পাদক বললেন,’এটা পাঠক খাবে মনে করছেন?’

লেখকের মাথা নিচু, ভাবছে পাঠক কতদিন ধরে কতকিছু খেয়েছে, ম্যাকবেথ,ওয়েস্ট ল্যান্ড,গীতাঞ্জলি,আরণ্যক,মহাভারত,বিষবৃক্ষ,কুবলাখান,এখনো খাচ্ছে আর স্বাদের কোরকে জমা হচ্ছে খিদে,আরো কতকিছু খুঁজে খুঁজে নতুন নতুন রেসিপি দিয়ে তৈরি জম্পেশ কবিতা,উপন্যাস,গল্প খেয়ে নিচ্ছে,তার এই বিদঘুটে ঘটোৎকচ স্বাদের ‘দ্বন্দ্ব অন্তর্দ্বন্দ্ব’ পাঠক খাবে কিনা জানা নেই।
লেখক মাথা নেড়ে বললেন,’জানি না’
সম্পাদক টেবিল চাপড়ে বললেন,’জানি না বললে হবে? আমার বই তো কাটতে হবে..’
টেবিল-চাড়ানোর সাথে সাথে’ দ্বন্দ্ব-অন্তর্দ্বন্দের’ পাণ্ডুলিপির পাতারা ফরফর ফরফর করে যন্ত্রণা,আক্রোশ,প্রেম,খিদে,এনট্রোপি বৃদ্ধ,পরিসংখ্যানবিদ সবাইকে নিয়ে উড়তে উড়তে বাতাসে ভো-কাট্টা, বাতাস তাদের কুটিকুটি করে কেটে সম্পাদকের মেঝের উপর জড়ো করছে, উপুর হয়ে আছে ছেঁড়া-ফাটা -কাটা সব চরিত্র, মেঝেতে শুধু চরিত্রের স্তূপ জমছে জমাট বেঁধে থাকা কান্নার মতো… স্তূপের পর স্তূপ …লেখক ধীরে ধীরে সেই স্তূপের মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে প্রবেশ করছে। সম্পাদকের টেবিল জুড়ে একটা ছোট কমা চিহ্ন বড় হতে হতে পুরো টেবিলেই গ্রাস করে ফেলছে।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top