লালওয়াটার পার্ক
ভাবলে অবাক লাগে যে মাত্র পাঁচশো বছর আগেও আমেরিকা ছিল উপজাতি অধ্যুষিত এক নিবিড় অরণ্য। ইওরোপিয়ান জলদস্যুরা কলম্বাসেরও অনেক আগে সমুদ্রে ঘুরতে ঘুরতে এসে এদেশের মাটিতে পা রেখেছিল বটে তবে তেমন ভাবে কোথাও গেড়ে বসার স্বভাব বা ইচ্ছে কোনোটাই ওদের ছিল না। কলম্বাস আসার পরেই রে রে করে নতুন মহাদেশ দখল করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্পেন, পর্তুগাল, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড। এখানকার আদি বাসিন্দা অর্থাৎ নেটিভ আমেরিকানদের অনেকে তখন মারা গেল ইওরোপিয়ান সেটলারদের সাথে অসম যুদ্ধ করে আবার অনেকেই মারা গেল ইওরোপিয়ানদের সংস্পর্শে এসে নানারকম নতুন নতুন সংক্রামক রোগে ভুগে। বাকি যারা টিঁকে গেল তাদের জোর করে নিজেদের অঞ্চল থেকে তুলে নিয়ে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হল। কারণ অনাহুত জবরদখলকারী ইওরোপিয়ানদের তখন চাষবাস, ব্যবসাবাণিজ্য আর বসবাসের জন্য অনেক জায়গার দরকার। এ বাবদে আগে থেকে তৈরি জমি পেলেই তো বেশি সুবিধা! নিজেদের জমি জায়গা ঘর বাড়ি ছেড়ে দুর্বল নেটিভ আমেরিকানরা মুখ বুজে সরে যেতে বাধ্য হল ঠিকই তবে তাদের বসবাসের চিহ্ন ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রইল পুরানো জায়গাগুলোতে। ধীরে ধীরে সেটলাররাই সব হয়ে উঠল আসল আমেরিকান। আর আদি বাসিন্দারা পরিচিত হল আমেরিকান ইন্ডিয়ান নামে।
এইসব ইতিহাস আমাদের অজানা নয়। কিন্তু যখন জানতে পারি, যে জায়গায় এখন ঘুরে বেড়াচ্ছি ঠিক এই জায়গাতেই দুশো বছর আগেও মাসকোজি ইন্ডিয়ান উপজাতিরা বাস করত, ঠিক এই জায়গা থেকেই ওদের ব্যবহার করা অনেক পুরানো জিনিসপত্র মাটির তলায় পাওয়া গেছে তখন কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়। আবার মনটা বেশ খারাপও হয়। মনে পড়ে যায় আমার নিজের দেশের সাঁওতাল, কোল, ভীল, মুন্ডাদের কথা। অরণ্যের অধিকার হারিয়ে ওরাও তো আজ নিজভূমে পরবাসী। সারা পৃথিবী জুড়েই জোর যার মুলুক তার। উন্নতির দোহাই দিয়ে জনজাতিদের জীবনধারা বিপর্যস্ত করে দেওয়ার এ এক আজব খেলা।
আটলান্টা শহরের পূর্ব দিকের যেখানে আজ বিকেলে বেড়াতে গেছিলাম তার নাম লালওয়াটার প্রিজার্ভ। জায়গাটা আমাদের বাড়ি থেকে গাড়িতে মিনিট দশেকের রাস্তা। প্রিজার্ভের ভেতর সাধারণ লোকের গাড়ি ঢোকা নিষেধ। গাড়ি পার্কিং এ রেখে পায়ে হেঁটে ঘুরতে হয়। পায়ে হেঁটে না ঘুরলে এই জায়গার সৌন্দর্য উপভোগ করা সম্ভবও নয়।
হাঁটতে হাঁটতে ভাবি, এই সব এলাকাতেই একসময় থাকত মাসকোজি ইন্ডিয়ানরা। একশ দুশো বছর নয়। কয়েক হাজার বছর ধরে। শিকার করত। চাষবাস করত। বিশেষ করে তুলো চাষে খুব দক্ষ ছিল ওরা। ভূমিপুত্রদের উচ্ছেদ করে দিয়ে অষ্টাদশ শতকে জায়গার দখল গেল তখনকার কিছু ধনকুবের আমেরিকানের হাতে। হাত বদল হতে হতে এক সময় 230 একরের লালওয়াটার এস্টেট এসেছিল কোকাকোলা কোম্পানির মালিক আসা গ্রিগস ক্যান্ডলারের ছেলে ওয়ালটার ক্যান্ডলারের হাতে। 1825 সালে ওয়ালটার সাহেব এখানে তাঁর বসবাসের জন্য লালওয়াটার হাউস নামে টিউডর-গথিক স্টাইলের এক বিশাল ম্যানসন তৈরি করান। 11000 স্কোয়ার ফুটের এই ম্যানসানের সব পাথর এই অঞ্চল থেকেই সংগ্রহ করা হয়েছিল। 1825 সালে এই বাড়ি তৈরির খরচ পড়েছিল দু লক্ষ ডলার। তেত্রিশ বছর পরেই 1858 সালে ওয়াল্টার সাহেব নিজের বাড়ি সহ পুরো লালওয়াটার প্রিজার্ভ বেচে দিলেন এমোরি ইউনিভার্সিটিকে। এখন এই লালওয়াটার হাউস এমোরি ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্টের রেসিডেন্স। ভারী সুন্দর দেখতে। যেন জঙ্গলের ভেতর টিলার ওপর এক মধ্যযুগীয় দুর্গ। থমকে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকতে হয় অনেকক্ষণ, এতটাই সুন্দর এই ম্যানসানের গঠন শৈলী।
লালওয়াটার প্রিজার্ভের বনভূমি আর ক্যান্ডলার লেক এখন নানারকম গবেষণার কাজে ব্যবহার করে এমোরি ইউনিভার্সিটি। আর ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রী থেকে ফ্যাকাল্টির লোকজন ইচ্ছে হলে নিজেদের কাজের ফাঁকে রাস্তা পেরিয়ে উল্টোদিকের এই পার্কে এসে খানিকটা হাঁটে অথবা জগিং করে নেয় । আসলে এই বনভূমি সকলের জন্য উন্মুক্ত নয়। এমোরি ইউনিভার্সিটির লোকজন বা তাঁদের সম্পর্কিত লোকদেরই এখানে প্রবেশাধিকার আছে। তবে কড়াকড়ি বা পাহারাও কিছু নেই। ইচ্ছে করলে ঢুকতে পারে যে কেউ, তবে সাধারণত ঢোকে না। ছেলে যেহেতু এই ইউনিভার্সিটিতে আছে সেই সুবাদেই আমরা গিয়েছিলাম ওখানে।
লেক, বনভূমি, ঘন সবুজ ঘাসে ঢাকা প্রান্তর সবকিছু নিয়ে এই জায়গাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এতটাই সুন্দর যে দেড় দু ঘন্টা একটানা হাঁটলেও কোনো ক্লান্তি আসে না। পায়ে ব্যথা নিয়েও আমার মনে হতে থাকে এই সুন্দর নির্জনতার ভেতর দিয়ে প্রকৃতির সাথে মিশে গিয়ে হাঁটতেই থাকি।
এমোরি ইউনিভার্সিটির উল্টোদিকের গেট দিয়ে ঢুকে এলেই দু পাশে লম্বা লম্বা ঘন গাছের জঙ্গল। একপাশে খাদের মত। যদিও হাঁটার জন্য জঙ্গলের মধ্য দিয়ে মোটামুটি চওড়া পাকা রাস্তা আছে, তবে সব জায়গায় নয়। কোথাও কোথাও ঝরা পাতায় মচমচ শব্দ তুলে দুপাশ থেকে ঝুঁকে আসা গাছের নিচ দিয়ে সুঁড়ি পথ ধরে হাঁটতে হয়। চারদিকে তাকিয়ে কাউকে দেখা যায় না। শুধু মোটা মোটা লেজের বড় বড় কাঠবিড়ালিরা ব্যস্ত হয়ে দৌড়ে বেড়ায় এদিক ওদিক। বাহারে শিং ওয়ালা সাদা লেজের হরিণ (White- tailed deer) সঙ্গিনীদের নিয়ে চরে বেড়ায় ঘাসের জমিতে। মাঝে মাঝে অবাক সতর্ক চোখে মুখ তুলে দেখে নেয় আমাদের, তারপর গা ঢাকা দেয় জঙ্গলের গাছের আড়ালে। নাম না জানা সরীসৃপেরা আমাদের চমকে দিয়ে তরতর করে উঠে পড়ে গাছের গা বেয়ে। ।
মাঝখানে বিরাট ক্যান্ডলার লেক। হেমন্তের রঙিন গাছেরা জলের ওপর ছায়া ফেলে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে নিশ্চুপে। জলের ওপরে জেগে থাকা মরা ডালের ওপরে বসে থাকে বাজপাখি। রাজহাঁসের ঝাঁক দল বেঁধে মাথার ওপর দিয়ে উড়তে উড়তে মসৃনভাবে নেমে আসে জলের ওপরে। একজায়গায় লেকের জল ঝর্ণার মত গড়িয়ে পড়ছে। পাশেই 1820 সালে তৈরি পাওয়ার হাউস। পীচট্রি ক্রিকের ওপর দিয়ে লোহার দড়ি আর কাঠের পাটাতনে তৈরি 210 ফুট লম্বা একটা ঝুলন্ত ব্রীজ পেরিয়ে সেখানে যেতে হয়। এই পাওয়ার হাউস একসময় পুরো লালওয়াটার এস্টেটে হাইড্রো ইলেকট্রিক পাওয়ার সাপ্লাই করত। এখন ছাদ নেই, দরজা জানালার পাল্লা নেই, শুধু পাথরের তৈরি আটকোনা লম্বা দোতলা টাওয়ারটা সারা গায়ে নির্জনতা মেখে নীল আকাশের বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।
আধুনিক আটলান্টা শহরের বুকের ওপর এমন প্রাচীনত্বের গন্ধমাখা একটুকরো অরণ্যসদৃশ নির্জন জায়গার একটা অমোঘ আকর্ষণ আছে। বারবার যেতে ইচ্ছে করে।






ক্রমশ



