সেদিন বড়দির কথায় অবাক হয়ে ফিরে দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, “আমি কী দেব বড়দি? ওসবের পাট তো আমার কবেই চুকে বুকে গিয়েছে!”
বড়দি মাথা নেড়ে বললেন, “পাট যে অনেক কাল হল চুকেছে সে তো জানি বাপু, কিন্তু জিনিস গুলোতো আছে নাকি?”
মাথা নিচু করে প্রায় অনুচ্চারিত স্বরে বললাম, “নাহ, সে সব আর কিছুই নেই।”
— “বুঝেছি বাপের ঘরে বারো ভুতে লুটে নিয়েছে। কিন্তু এ বাড়িতে তোমার যে গয়না গুলো আছে তার থেকেও তো দু খানা দিতে পারো?”
এ বাড়িতে আমার গয়না! অবাক কান্ড!
আমাকে ভাবার অবকাশ না দিয়ে শাশুড়ী গলা তুললেন, “এ বাড়িতে ওর আবার কিসের গয়না রে! বাপের ঘরে নিজের গয়না খুইয়ে এসেছে আর শ্বশুর ঘরে সবাই ওর জন্য গয়না সাজিয়ে বসে আছে নাকি?”
বড়দি ও নাছোড়বান্দা, “বা রে! থাকবে না কেন শুনি? বিয়ের সময় ও গয়না পায় নি এ বাড়ী থেকে? আশীর্বাদের চার ভরির হার, এক জোড়া বালা। মুখ দেখানোর সময় জ্ঞাতি গুষ্টি সব কেউ মোহর, কেউ সিঁদুর কৌটো, আংটি, পাশা, ঝুমকো দিয়েছিল। তার পর ঠানদি সিতে হার দিয়েছিল এক খানা। তুমিও তো এক জোড়া মানতাসা আর নোয়া বাঁধানো দিয়েছিলে। আর …আর আমি … ও তখন … মানে তোমার বড়জামাই বেঁচে , আমার সমসারে লক্ষ্মী তখন উপচে পড়ছে। আমিও এক জোড়া বালা এক জোড়া পাশা আর একখানা লাল রঙের বালুচরি শাড়ি দিয়েছিলাম। মনে পড়ে মা? সেই ছোট্ট বেলায় সেজ বউ যখন অষ্ট মঙ্গলা থেকে ফিরে আবার বাপের ঘরে গেল ওর গায়ে তো ওর বাপের বাড়ির দেওয়া গয়না ছিল। এ বাড়ির কিছু তো দেওয়া হয় নি। তবে গেল কোথায় ওর জিনিস পত্তর গয়নাগাঁটি? দান সামগ্রীও তো কম পায় নি! অত কাঁসার বাসনপত্র, রুপোর ডাবর, আমার কিন্তু সব মনে আছে মা।”
সারা ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আমিও নির্বাক! দুদিন আগেও এ বাড়িরই ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের রসগোল্লা কিনে খাওয়ানোর অপরাধে হাজারটা কটু কথা শুনতে হয়েছিল। আজ শুনছি এ সংসারেও আমার মূল্যবান কিছু সম্পদ আছে!
আমার শাশুড়ী এত গলার জোর কোথা থেকে পেলেন জানি না কিন্তু তিনি সমানে বড় মেয়ের সঙ্গে তর্ক চালিয়ে যেতে লাগলেন, “আমার সেজ খোকা যখন বেঁচে নেই তখন সে সব জিনিস ওর হয় কিভাবে শুনি? তা ছাড়া ও যে এখন এখানে আছে ওর খাওয়া পড়ার খরচা কে দেয়?”
বড়দি অবাক হয়ে বললেন, “এ কী কথা বলছো মা! ও বাড়ির বউ নয়? এত দিন তো বাপের ঘরেই পড়ে ছিল, নিজের স্বার্থে ডেকে এনে এখন ওর একবেলার দু মুঠো ভাতের হিসেব করছো?”
এবারে বড় জা মুখ খুললো, “নিজের স্বার্থে সেজোর হয়ে এত কথা বলছো বুঝি বড় ঠাকুর ঝি?”
বড় জায়ের এ অভিযোগে বড়দি খানিকটা সময় চুপ করে থেকে বললেন, “এমন কথা বলো না বড় বউ , সেজ বউ আমার মেয়ের বে তে কিছু দেবে কিনা জানি না, তোমরা কেউ কিছু না দিলেও আমার জোর করার কিছুই নেই। বড় জোর আর কোন সম্পপক্ক রাখবো না, কিন্তু যেটা অন্যায় তাকে আমি অন্যায়ই বলবো বাপু।”
উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ে ঘরের পরিবেশ গরম হয়ে উঠছিল ক্রমাগত। ওই সব অলঙ্কার আর দান সামগ্রীতে আমার কোন অধিকার আছে কি নেই সেই নিয়ে তরজা তুমুল হয়ে সদর দুয়ার অবধি পৌঁছেছিল বোধহয়। হটাৎ দরজার কাছে শৈলেন বাবুর গলা পেলাম, “মা ওঁর গয়না গাঁটি আর বাসন পত্র ওঁকে ফিরিয়ে দেবে আজই, এক্ষুনি। এর যেন অন্যথা না হয়। তাহলে আমি অনর্থ করব। আর বড়দি পেঁচির বিয়েতে আমি পণের টাকাটা দেব চিন্তা করিস না।”
গোলমাল চেঁচামেচি তখনই বন্ধ হয়ে গেল।

হ্যারিকেনের আলোতে রাতে গয়না গুলো দেখছিলাম। বড়দিকে দিয়েও অনেকে গয়না আমার থেকে গিয়েছিল । শাশুড়ী আঁচলের গিঁট খুব কষ্টে খুলে চাবির গোছা ছুঁড়ে দিয়েছিলেন মেয়ের দিকে। বড় আর মেজো জায়ের খুব কৌতূহল ছিল সব গয়না দেখার। কিন্তু আমার কঠিন উপেক্ষা বুঝে এসব না দেখেই একটা সময় বাধ্য হয়েই চলে গেল। যাবার সময় বলে গেল, “সবই যেন পেঁচির বিয়েতে দিয়ে দিও না সেজবৌ, আমাদেরও ছেলেপুলে আছে । তাদেরও বিয়ে পৈতে হবে, তুমি তাদেরও সেজ খুড়িমা মনে থাকে যেন।”
সীতাহার মানতাসা বালা আংটি ইত্যাদি যা দিলাম তা বারো ভরির অনেক বেশি। প্রথমে যে বালা জোড়া দেওয়ার জন্য উঠিয়েছিলাম তা দেখে বড়দি হাত চেপে ধরে মাথা নাড়লো, “এ দুটো আমি তোকে দিয়েছিলাম রে! আর এই কানপাশা জোড়া। এ গুলো ফিরিয়ে নিতে পারবো না বোন !”
নিজের ঘরে গভীর রাতে ছোট ছোট বালা আর নানা রকম সোনালী ধাতুর ঝলকানি দেখতে দেখতে কেমন যেন মোহাবিষ্ট হয়ে উঠেছিলাম। বালিকা বয়সে একদিন এই সব অলঙ্কারই অযথা ভার মনে হয়ে হয়তো বিরক্তি উৎপাদন করতো। সোনা রুপোর মিলিয়ে সাতটা সিঁদুর কৌটো। আনমনে সেগুলো খুলে দেখতে দেখতে একটা কৌটো খুলতেই লাল রঙের খানিকটা গুঁড়ো আমার সাদা সুজনিতে পড়লো। চমকে উঠলাম,এ যে সিঁদুর! এতে এখনো আমার ব্যবহার করা সিঁদুর রয়ে গেছে! এর থেকে কখনো আমি যশোরের চিরুনির ধার দিয়ে সিঁথিতে সৌভাগ্যের চিহ্ন এঁকেছিলাম!
দেওয়ালে টাঙানো ছবিটার দিকে চোখ পড়ল। নাহ, হ্যারিকেনের আলো অত দূর পৌঁছায় না। দেওয়ালের ওই অংশ গাঢ় অন্ধকার। কোন আলো নেই … পাতি হাঁস গুলো কেমন হেলতে দুলতে সার বেঁধে ছানা পোনা নিয়ে প্যাঁক প্যাঁক করে জলে নেমে যাচ্ছে, কত দিন পরে যে আবার এমন দৃশ্য চোখে পড়লো! বড়দির বাড়ির পেছনেই পুকুর। পুকুরটা ঘিরে সার সার নারকেল গাছ লাগানো আছে। মাঝে মাঝেই ঝপ করে নারকেল পড়ে। পাড়ার যত দুষ্টু ছেলে পুলে হুড়োহুড়ি করে অমনি জলে ঝাঁপ দিয়ে সে নারকেল তুলে আনে। কাড়াকাড়ি করে, মারামারি করে। বড়রা গিয়ে ওদের শান্ত করে। মিটমাট করিয়ে দেয়। পাকা তাল পড়লেও একই অশান্তি। গ্রাম বাংলার সর্বত্র বোধহয় একটি চিত্র। কতদিন পরে এসব দেখে আমার মনটা ভাল হয়ে গেল। এখন যেখানে বসে আছি সপ্তাহ খানেক আগে সূর্য ওঠার আগে এয়োতিরা এই ঘাটে গঙ্গা নিমন্ত্রণ করতে আসবে বলে দেরি করে এসেছিলাম। আলতা পরা জোড়া জোড়া রাঙা পায়ের চাপে ঘাটের ভিজে নরম মাটিতে ছাপ আঁকা হয়েছিল। ওরা ফিরে যাওয়ার পর বড়দি এবং আরো কয়েক জন বিধবার সঙ্গে চান করতে এসেছিলাম। আজ কেউ কোত্থাও নেই, চুপ করে বসে বসে দেখছিলাম চির পরিচিত গ্রামের প্রকৃতি। আমার খোঁজ করতে করতে বড়দি পাশে এসে বললেন, “হ্যাঁ লো সেজ বউ নাইবি না? কাল একাদশী গেছে চল নেয়ে ধুয়ে দুটো জল বাতাসা মুখে দিবি। ওকি! হাসলি যে বড়?”
বড়দির দিকে হাসি মুখ তুলে চেয়ে বললাম, “এমনিই হাসলাম গো, চল নেয়ে নিই।”

সেই ছোট বেলায় বিনি প্রতি একাদশীতে চুরি করে খাওয়াতে গিয়ে একবার ধরা পড়ে ওর মায়ের হাতে বেদম ঠ্যাঙানি খেয়েছিল। চড় থাপ্পড় আমার কপালেও জুটেছিল ভালো মতো। কিন্তু বিনিকে দমিয়ে রাখা সহজ নয়, তারপর একসময় বড় হয়ে নিয়মটা আমি নিজেই মানতে শুরু করে ছিলাম। বৈধব্যের এই কঠোর সাধনায় পুণ্য নেই, না মানলে পাপ। ছোট থেকে আমি তো এমনটাই শুনেছি।
পেঁচির বিয়েতে গোলমাল কম হয় নি । বিয়ের দুদিন আগে পাত্রপক্ষ ছেলের হাত ঘড়ি, গান শোনার কল আর সাইকেল দাবি করেছিল নতুন করে। যে পরিমান সোনা চাওয়া হয়েছিল তার প্রায় দ্বিগুণ দেওয়া হচ্ছে শুনে তখনকার মতো থেমে গেল বটে কিন্তু বাড়ির সবার মনে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ ঘনিয়ে এলো, এদের খাঁই দিনকে দিন বেড়েই চলবে না তো? শৈলেন বাবু হপ্তা খানেকের ছুটি নিয়ে এসেছিলেন, সব শুনে বিয়ের রাতেই বর কর্তাকে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিলেন যে আর কিছু দাবি করলে বা শ্বশুর ঘরে মেয়ের ওপর নির্যাতন হলে আদালতে টেনে নিয়ে যাবেন। লোকে শাপশাপান্ত করার সময়বলে, ‘তোর ঘরে মামলা ঢুকুক’। আশা করা যায় পেঁচির শ্বশুরবাড়ি কথাটা বুঝবে এবং মনে রাখবে। অবশ্য তিনি নিজের হাতের নতুন দামি ঘড়িটাও নতুন বরকে উপহার দিলেন। ঘড়িটা নাকি তাঁর কোন মক্কেল উপহার দিয়েছিল। ভাগ্নির বিয়ে উপলক্ষে সেটা পরে এসেছিলেন। বাই সাইকেল অবশ্য তারা আর পেল না। আমি বিধবা মানুষ তাই বিয়ের সব আচার অনুষ্ঠান থেকে দূরেই ছিলাম। কনে বিয়ের পিঁড়িতে ওঠার আগে বড়দি আর তাঁর ছেলের বউরা ডেকে নিয়ে গেল আশীর্বাদ করার জন্য। দুধে আলতা রঙের বেনারসীতে মেয়েটাকে যে কী ভালোই লাগছিল! শৈলেন বাবু শহর থেকে স্নো পাউডার এসব নানা সাজের জিনিস গুছিয়ে কিনে এনে দিয়েছিলেন। বড়দিই আনতে বলেছিলেন। সেসবের দাম অবশ্য তিনি নেননি। কে বলে শ্যামলা মেয়ে সুন্দরী হয় না? অমন শ্যাম স্নিগ্ধ রূপ দেখার চোখ থাকতে হয়।
আমার যা দেওয়ার সবই তো বড়দিকে দিয়ে দিয়েছিলাম, তাই ধান দুব্ব দিয়ে খালি হাতেই আশীর্বাদ করতে গেলাম। কিন্তু বড়দির সব দিকে নজর, তিনি আমার দেওয়া সীতা হার খানা হাতে তুলে দিয়ে বললেন, “বাকি গুলো তো পরিয়ে দিয়েছে, এখানা আমি আলাদা করে সরিয়ে রেখেছিলাম। খালি হাতে আশীর্বাদ করিস নে। মামার বাড়ি থেকে তো একমাত্র তুইই এসেছিস। অন্য মামীরা তো আর এল না।”

বড়দি দীর্ঘশ্বাস লুকোতে পারলেন না।
সত্যিই, আমার বড় জা বা মেজ জা কেউই আসেনি। আসেননি বড় আর মেজ ভাসুরও। ওরা যে গয়না দেবে বলেছিল তাও দেয়নি। শৈলেন বাবুকে দিয়ে বলে পাঠিয়েছে এক বাড়ি থেকে আর কত দেওয়া হবে? সেজ বউ তো মনের সুখে গয়না বিলিয়ে দিয়েছে। সেসব গয়না তো বাড়িরই গয়না। শৈলেন বাবুও পণের টাকা দিচ্ছেন।
ছেলে পুলের ইস্কুলের পরীক্ষার পড়া আছে তাই নাকি তারা আসতে পারল না।
শুভ দিনে চোখের জল ফেলতে নেই, বড়দি সবার অলক্ষে অবাধ্য চোখের জল মুছে গভীর আক্ষেপে বললেন, “ও বাড়ি থেকে আসার সময় ছেলে পুলে গুলো বড় পিসির বাড়িতে আসবে বলে আনন্দে লাফাচ্ছিল। বিয়ে বাড়ির ভোজ খাওয়ার থেকেও ছুটো ছুটি করে খেলা, বিয়ের বাড়ির হাজার রকম মজা দেখার আনন্দ অনেক বেশি। বড় মেজ ওদের খুশির দিকটাও বিবেচনা করে দেখল না। না হয় কিছুই দিত না, তুই যা দিয়েছিস তার পর আর তো কিছু দেওয়ার দরকার ছিল না।”
বউরা বলল, “ছেড়ে দিন মা। ও নিয়ে আর মন খারাপ করবেন না। বিয়ের পর পেঁচি জামাইকে নিয়ে না হয় মামা মামীদের পেন্নাম করে আসবে। বর এখনই মণ্ডপে বসবে। সবাই পেঁচিকে আশীর্বাদ করে নিন। লগ্ন এগিয়ে এসেছে। পেঁচিকে পিঁড়েতে করে নিয়ে যাবে।”
গুরুজনরা পর পর আশীর্বাদ করতে লাগল। মুহুর্মুহু হুলুধ্বনিতে বাড়ি মুখরিত হয়ে উঠল। আমি আর বড়দি আস্তে আস্তে ওখান থেকে সরে গেলাম।
ক্রমশ



