আমাদের কথা

vote6

সাহিত্য এখন মানুষের কথা বলে কিনা সে প্রশ্ন ধরে এগোলে বহু বিতর্ক তৈরি হতে পারে। মানুষের কথা, মানুষের যন্ত্রণা, মানুষের আবেদনের স্বরে নবনির্মাণ ক্রমশই ক্ষীণ হয়ে আসছে সাহিত্যে। যা ছিল তাকেই ঘষে মেজে নতুনের রূপ  দেওয়া হচ্ছে অথবা যাদু বাস্তবতা ঘন হয়ে উঠছে সাহিত্যে। যা কিছু ঘোর বাস্তব তার সঙ্গে রং মিশে অতিবাস্তব বা পরাবাস্তব তৈরি হচ্ছে। সহজ বিশ্বাস আর সরল বক্তব্য হারিয়ে যাচ্ছে। ভাঙা পথ ঢাকা পড়ছে আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্সে। যে পথে আমরা চলি, সে পথই আমরা হারাই। জীবনের উপর ভেসে থাকি কাল্পনিকে জীবনের অনুপ্রবেশে। এই মুহূর্তে বাঙালির যাপনকথায় অনুপ্রবেশ শব্দটি চূড়ান্ত রাজনৈতিক। বঙ্গে অনুপ্রবেশ তত্ত্বকে মাছের চোখ বানিয়ে তীরধনুক হাতে নিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। কারো এজেন্ডায় মাছের চোখ অক্ষত, কারো এজেন্ডায় মাছের চোখ শুধুমাত্র একটি ক্ষত। এই মতপার্থক্যের সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে সংখ্যালঘু এবং সংখ্যাগুরু মানুষের ব্যক্তিস্বার্থ। এই ব্যক্তিস্বার্থের ভিত্তিতেই এখন প্রার্থী নির্বাচিত হয়। সেন্টিমেন্ট এর ইনভেস্টমেন্ট হয়। প্রশ্ন আসে কার সেন্টিমেন্ট? সেন্টিমেন্ট অবশ্যই প্রার্থীর নয়। সেন্টিমেন্ট সাধারণের- সেন্টিমেন্ট অনুর্বর, অনাশ্রিতের। সেন্টিমেন্ট সর্বহারাদের। এদের সমষ্টিগত জনঘনত্ব প্রার্থীর টার্গেট।

বঙ্গে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে যে পরিমাণ আলোচনা হয়, তার সমীক্ষা করলে মনে হবে নির্বাচন আসলে পূর্বনির্ধারিত একটি ফলাফল মাত্র। ঘোষণাটি প্রকাশ করার আগে মহড়া চলছে মাত্র। প্রতিটি রাজনৈতিক দল নিরঙ্কুশ সমর্থন পাওয়ার বিষয়ে প্রবল আত্মবিশ্বাসী এবং প্রবল আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে প্রত্যেক দলীয় মুখপাত্র জানান দিতে থাকেন যে শুদ্ধ এবং সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হলে তারাই জনগণের নির্বাচিত প্রার্থী হবেন। এই যে প্রবল আত্মপ্রত্যয়—সেটি এক ধরনের রাজনৈতিক শিল্প যেখানে ভাবধারা অক্ষুণ্ণ রাখার একটি চল বহুদিন থেকেই রয়েছে। কিন্তু এই ভাবধারা অক্ষুণ্ণ রাখার প্রচেষ্টায় প্রতিযোগী ব্যক্তিরা সাড়া ফেলে দেওয়ার মতো কিছু কাজকর্ম ফোকাসে এনে শিরোনামে থাকবার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠার যে সব নমুনা প্রদর্শন করেন তা প্রযুক্তির মতোই দ্রুত এগিয়ে চলেছে সময়ের সঙ্গে।

​সাম্প্রতিককালীন রাজনৈতিক প্রচারের আত্মম্ভরিতা লক্ষ করলে দেখা যাবে, জনপ্রিয়তা কীভাবে অর্জন করা যায় তা নিয়ে রীতিমতো আলাপ-আলোচনা চলে। দলের আইটি সেল বিশেষভাবে সক্রিয় এ বিষয়ে। এই প্রবল সক্রিয় এবং বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষরা উপলব্ধি করেছেন যে সভ্যতার উন্নয়ন অথবা বিসর্জন দুটোই জনপ্রিয়তার নিরিখে সমান। আপনি সিঁড়ি দিয়ে উঠলেন অথবা নামলেন দু’ক্ষেত্রেই আপনি কতখানি সাড়া ফেলতে পারলেন তার উপর নির্ভর করে আপনার ওঠানামা বজায় রাখার ইনডেক্স। মানুষ মন্দির-মসজিদে যেমন ভিড় করে, রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটলেও তেমনই ভিড় করে। মন্ত্রীকে দেখার জন্য যেমন ভিড় করে, খুনের আসামীকে দেখার জন্যেও তেমনই ভিড় করে। ভিড়কে নিজের দিকে টেনে রাখার জন্য খুব কোনো মানবদরদি কাজ করতে হবে তাও জরুরি নয়। কারণ মানুষের দেখার এবং শোনার প্রাথমিক ধৈর্য এখন ৩০ সেকেন্ড থেকে ৯০ সেকেন্ড। এই সময়সীমার মধ্যে নজরে টিকে থাকার মতো কনটেন্ট তৈরি করতে হলে, খুব কোনো নীতিবাক্য আওড়ে সে কাজ সম্ভব হবে না। সুতরাং ‘ক্যাচলাইন’ বা ‘অ্যাডলাইন’ সদর্থক হতে হবে এমন জরুরি নয়; নঞর্থক হলেও চলবে।

​আপনি মানুষের জীবন বাঁচালেন কি শেষ করলেন সেটা বিচার্য নয়, আপনি সাড়া ফেলতে পারলেন কি না সেটাই ধর্তব্য। আপনি হাসাতে পারলেও চলবে; আপনি ভুল বাংলা, অর্থহীন গল্প ফাঁদলেও চলবে। কারণ এখন মূল জনপ্রিয়তার অর্ধেক ধার্য হয় ক্লিকে। আপনি পার ক্লিকে কতজনকে টানতে পারলেন সেটাই উল্লেখযোগ্য। আর এই উল্লেখযোগ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে খুব বেশি শিক্ষারও প্রয়োজন নেই। শুধু সামান্য সঙ্গতি থাকলেই হবে—ক্লিক করবার মতো সঙ্গতি, স্ক্রল করবার মতো সঙ্গতি। সেটুকু আপনাকে সরকার জুগিয়ে যাবেন। যে সরকার ক্ষমতায় আসুক না কেন তাদের ম্যানিফেস্টো খেয়াল রাখবে বিনা যোগ্যতায় আপনার ক্লিক করবার সঙ্গতি থাকছে কি না। সুতরাং ডিজিটাল ভারতে রোবটিক সমর্থন জড়ো করে মাস ক্লিক।

​এই ডিজিটাল ক্লিকের কথায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া রাহুল অরুণোদয়ের মৃত্যুর প্রসঙ্গ নিয়ে না লিখলে তা বেশ অমানবিক। ঘটনার প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখার অজুহাতে রাহুলের মৃত্যু, তার রাজনৈতিক সমর্থন, তার মৃত্যু রহস্য, তার মৃত্যু পরবর্তী শোকমিছিল সবটুকুই কনটেন্টে পরিণত। মুহূর্তের মধ্যে রাহুল অরুণোদয়ের মরদেহ মহানায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ। তিনি মানুষ কম, কনটেন্ট বেশি হলেন জলে ডুবে এক বিভীষিকাময় মৃত্যু পার করার পর। তার শোক কীভাবে পালন করা উচিত কীভাবে নয় তা নিয়েও যদি ইন্টারনেট ক্রাউড বেড়ে থাকে, তাহলে ডিজিটাল ভারতের ভোটপ্রার্থীরা কেন ব্যবহার করবে না নেগেটিভ ক্লিক?

​গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার ‘গণ’ শব্দটির মধ্যে এখন দূষণ পরিপূর্ণ। নৈতিক এবং সামাজিক উন্নতিকল্পে কিছু করতে হলেও তাকে ওই দূষণ গিলেই আসতে হবে। আর জনগণকৃত দূষণ গিলতে হলে রাজনৈতিক আসনে কাদামাটি আবশ্যিক।

​এখানে সততা, আদর্শ, ন্যায়, নিরাপত্তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন খরচ করা অর্থহীন। কারণ আপনি তাই দেখছেন যা আপনাকে ডিজিটাল ইন্ডিয়া দেখাচ্ছে। আপনি তাই ভাবছেন যা আপনাকে খবরের কাগজ ভাবাচ্ছে। আপনি তাই সমর্থন করছেন যা আপনার ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষা করছে। আপনি দেখছেন না শুধু নিজেকে। আপনি দেখছেন না শুধু নিজের ভাবনাকে। আপনি প্রশ্ন করছেন না নিজের চিন্তাকে। আপনি তর্ক করছেন না নিজের নীরব সমর্থনকে। আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো ক্ষমতাই আপনার নেই সেটাই আপনি নির্দিষ্ট করতে পারছেন। জনগণের এই সামগ্রিক বোধের অবক্ষয় বয়ে নিয়ে কোনো রাজনৈতিক দল কলঙ্কবর্জিত হতে পারে না। সুতরাং বর্তমান আবহাওয়ার নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং তার প্রচার আসলে একটি পূর্বনির্ধারিত মাৎস্যন্যায়ের বহিঃপ্রকাশ। 


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top